দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যত মিথ

ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে জার্মানরা আত্মসমর্পণ করেছিল ১৯৪৫ সালের ৮ মে। তারপর পেরিয়ে গেছে ৭৫ বছর। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় ভাটা পড়েনি এতটুকুও। তবে শুধু আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি সেটি; মিথ কিংবা ভ্রান্ত ধারণাও ছড়িয়েছে প্রচুর।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জাদুঘরের সিনিয়র হিস্টোরিয়ান রব সাইটিনো জানিয়েছিলেন বিগত কয়েক দশক ধরে সবচেয়ে বড় মিথগুলোর কথা। যা দূর করার জন্য তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। যদিও পুরোপুরিভাবে দূর হয়নি। এখনো সেসব মিথ বা ভুল ধারণা বিদ্যমান। চলুন দেখে আসা যাক সেসব মিথগুলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একদল সেনাসদস্য; Image Courtesy: filminspector.com
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একদল সেনাসদস্য; Image Courtesy: filminspector.com

ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ও পার্ল  হার্বার

আমেরিকার ইতিহাসে পার্ল হার্বার ভয়াবহ এক ঘটনা। প্রায় আড়াই হাজার আমেরিকান মৃত্যুবরন করেন এই আক্রমণে। তবে অনেক মানুষই মনে করেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নাকি আগে থেকেই জানতেন এই আক্রমণের কথা! তাও তিনি সেটি স্বেচ্ছায় ঘটতে দিয়েছেন।

আমেরিকার ৩২ তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট; Image Courtesy: wsj.com
আমেরিকার ৩২ তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট; Image Courtesy: wsj.com

শুরু থেকেই কিছু স্কলার এই ভ্রান্ত ধারণা ছড়াতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৮২ সালে নিজের লেখা এক বইয়ে জন টল্যান্ড দাবী করছিলেন যে কেউ একজন খবর পেয়েছিল পার্ল হার্বার আক্রমণ সম্পর্কে। সে তার উচ্চ পদস্থ কারো কাছে সেটি হস্তান্তর করলেও সেটি নিয়ে মাথা ঘামায়নি কোনো হর্তাকর্তারাই।

অথচ যুদ্ধচলাকালীন সময়ে বাতাসে এরকম ছড়ানো খবরের সংখ্যা ছিল প্রায় মিলিয়নের উপর। যার ৯৯% ই ছিল উড়ো খবর।

দ্য ডেজার্ট ফক্স

এরভিন রোমেল কিংবা ডেজার্ট ফক্স যে নামেই ডাকুন না কেনো এক নামেই তাকে চেনার কথা সবার। তাকে নিয়ে একটি বড় মিথ ছিল তিনি ছিলেন জার্মানির ইতিহাসে সর্বকালের সেরা জেনারেল! প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রোমেল ছিলেন মাউন্টেন ইনফ্যান্ট্রি ম্যান। অতর্কিতভাবে হামলার জন্য রোমেল ছিলেন বিখ্যাত। পাহাড়ের পাদদেশে অতর্কিতভাবে হামলা চালাতো রোমেল বাহিনী। যুদ্ধশেষে জার্মান আর্মি দ্বারা পুরষ্কৃত হন তিনি।

জেনারেল এরভিন রোমেল; Image Courtesy: ddoughty.com
জেনারেল এরভিন রোমেল; Image Courtesy: ddoughty.com

এরপরের সময়গুলো তিনি জার্মানি যুদ্ধ প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে থাকেন। সেই সময়ে হিটলারের চোখে পড়েন তিনি। এরপরের পুরো ক্যারিয়ারে রোমেল বেড়ে উঠেন হিটলারের ছায়ায়। মূলত হিটলারের আদেশেই আফ্রিকায় গিয়ে ডেজার্ট ফক্স উপাধী পান তিনি। তবে জেনারেলের মানদন্ডে হিটলারের ধারে কাছেও যেতে পারেননি রোমেল। উল্টো তার দূরদর্শিতার অভাবের জন্যই ওয়েস্টার্ন এলাইন্সে জুনের ৬ তারিখ তিনি পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হন।

জার্মানির হারের কারণ একমাত্র হিটলার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে লেখা ৯০% বই এ হিটলারকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো হয় জার্মানির হারের কারণ দেখাতে গিয়ে। যুদ্ধ কিংবা হলোকাস্টের গুরু হিটলার হলেও প্রতিটি ভুল পদক্ষেপের জন্য দায়ী ছিলেন না হিটলার। হিটলার ছাড়াও পুরো যুদ্ধের সময়টায় বিশাল সংখ্যক বড় বড় জার্মান অফিসাররা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। সামগ্রিকভাবে তাদের ভুল পদক্ষেপেই জার্মানির পরাজয় বরণ করে নিতে হয়।

শুধু হিটলারের কারনেই যুদ্ধে হারেনি জার্মানি; Image Courtesy: immediate.co.uk
শুধু হিটলারের কারনেই যুদ্ধে হারেনি জার্মানি; Image Courtesy: immediate.co.uk

জাপানের সুযোগ

প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে অন্যতম হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান সহজেই জিততে পারতো যদি তারা পার্ল হার্বারের তেলের ডিপো এবং জাহাজ গুলোয় আক্রমণ চালাতো। কিন্তু ব্যাপারটা পুরোপুরি সত্য নয়। হয়তো সেগুলোয় আক্রমণ চালালে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় লাভের সময়টা একটু বিলম্বিত হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের কিছু সেনা সদস্য; Image Courtesy: crwflags.com
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের কিছু সেনা সদস্য; Image Courtesy: crwflags.com

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় ছিল অবিসংবাদিত। বরং আমেরিকার তেলের ডিপো আক্রমন করলে জাপানের দিকে আরো ভয়াবহ ভাবে ঝাপিয়ে পড়তো যুক্তরাষ্ট্র।

টার্নিং পয়েন্ট

আপনি যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে থাকেন তাহলে দেখবেন যে কয়েক ডজন টার্নিং পয়েন্টের কথা উল্লেখ থাকবে। তার সিংহভাগই মনগড়া কথা। যেমন অনেকের মতে ১৯৪২ সালের জুনের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্র চারটি জাপানিজ এয়ারক্রাফট ধবংস করে দিয়েছিল। সেটিই নাকি ছিল টার্নিং পয়েন্ট।

বার্লিন আক্রমণের একটি দৃশ্য; Image Courtesy: bbci.ichefco.uk
বার্লিন আক্রমণের একটি দৃশ্য; Image Courtesy: bbci.ichefco.uk

আবার অনেকের মতে ১৯৪৪ সালের ৬ জুন ওয়েস্টার্ন আলাইজের ইউরোপে অবতরণের পরই পাল্টে যায় যুদ্ধের গতিপথ। কেউবা মনে করেন ১৯৪৩ সালের জুলাইয়ে ব্যাটল অফ কুর্স্ক ছিল যুদ্ধ পাল্টে দেওয়ার মূল কারণ। কিন্তু আদতে এত বড় যুদ্ধ কোনো একটি একক ঘটনায় সম্পূর্ন মোড় নিতে পারেনা। বরং সব ধরনের ছোটো বড় উল্লেখযোগ্য ঘটনাই সমাধি করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের।

হিটলারের এটমিক বম্ব

আরেকটি বড়সড় মিথ ছিল যে জার্মান বিজ্ঞানীরা হিটলারের জন্য এটমিক বম্ব আবিষ্কার করে ফেলেছিল প্রায়ই। প্রায়ই বলতে হচ্ছে কারন বাস্তবে সেটি ঘটেনি বরং বলা চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বড় এক ভ্রান্ত ধারণা এটি। যুদ্ধশেষে জানা যায় যে জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটমিক বম্ব নিয়ে গবেষণার ধারেকাছেও ছিলেন না।

জেনারেলদের সাথে আলোচনায় হিটলার; Image Courtesy: squarespace-cdn.com
জেনারেলদের সাথে আলোচনায় হিটলার; Image Courtesy: squarespace-cdn.com

জার্মানির প্রধান নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানি ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এর ধারণা ছিল এটমের ফিউশনের মাধ্যমে এক শক্তিশালী বম্ব তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে সেটা কিভাবে করতে হয় কিংবা হবে সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না তার।

হিরোশিমা ও নাগাসাকি

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহতা নিয়ে জানাশোনা নেই এমন লোক খুবই কম। তবে যুদ্ধের সেই বম্বিং এর জন্যই পরবর্তীতে জাপান আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু অনেকের মতে সেই বম্বিং ছিল অপ্রয়োজনীয়। রেড আর্মির জন্য এমনিতেই জাপান আত্মসমর্পণ এর দ্বারপ্রান্তে ছিল। তবে আদতে তা ছিল ভুল ধারণা। কারণ হিরোশিমা নাগসাকি ঘটনার আগেও জাপান এশিয়া ও প্যাসিফিকের বিশাল অংশ জুড়ে ছিল।

এটমিক বোমার নৃশংসতায় ছাই হয়ে যায় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি অঞ্চল; Image Courtesy: assets.labroots.com
এটমিক বোমার নৃশংসতায় ছাই হয়ে যায় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি অঞ্চল; Image Courtesy: assets.labroots.com

তাছাড়া এপাড়েও জাপানের প্রায় মিলিয়ন এর উপর সৈন্য ছিল। যারা মিত্র শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে বম্ব ছাড়াও পরিপূরক ছিল। সেটি হচ্ছে পুরো জাপান জুড়ে সৈন্য মোতায়েন করে জাপানি আর্মিদের পিছু হটানো। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধ শেষ হতেও অনেক দেরি হয়ে যেতো।

Feature Image Courtesy: filminspector.com