বইপোকাদের জন্য এক আশীর্বাদ

জুন-অগাস্ট মাসে মেলবোর্নে বৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা সকালের দিকে থাকে সর্বনিম্ন, যা রাতে গিয়ে কিছুটা উষ্ণ হয়। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির সাথে ঠান্ডা দমকা হাওয়া, মাঝেমাঝে তুষারপাত। বৃষ্টি পড়লেও আদতে এটা তাদের শীতকাল। ২০১২ সালে মেলবোর্নে শীত নেমেছিল আলোর ধারাকে সঙ্গী করে — “লাইট ইন উইন্টার”, এ বার্ষিক আয়োজনাটির ষষ্ঠ আসর বসেছিল অস্ট্রেলিয়ায়।

‘লাইট ইন উইন্টার’ আগে পালিত হলেও ২০১২ সালটির জন্য এর প্রাধান্য বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ কেননা অস্ট্রেলিয়া সে বছরটিকে ‘বই পড়া বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। ফলে অবধারিতভাবেই সে বছর লাইট ইন উইন্টারের মূখ্য বিষয় ছিল- পড়া। একে তো পুরো আয়োজনটিই শীতের অন্ধকার রাতকে বিদায় জানিয়ে আলোর উষ্ণতায় ভরিয়ে দেয়ার জন্য পালন করা হয়, তার উপর প্রতিপাদ্য বিষয়ও যদি হয় জ্ঞান সম্পর্কিত তবে পুরো আবহটিই যেন জমে যায়। কেননা, বিদ্যা সর্বস্য ভূষণম্। তাই মানষ মনের অন্ধকারকে দূরীভূত করতে সে বছর লাইট ইন উইন্টার দু’টি বিষয়কে মূলে রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

‘লাইট ইন উইন্টার’ উৎসবের প্রস্তুতির দৃশ্য; Image Courtesy: architizer.com
‘লাইট ইন উইন্টার’ উৎসবের প্রস্তুতির দৃশ্য; Image Courtesy: architizer.com

‘লাইট ইন উইন্টার’ উৎসবটি সত্যিকার অর্থে চমকপ্রদ। তবে আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে শুধু ২০১২ সালের আয়োজনটিকে কেন এত ঘটা করে তুলে ধরা হচ্ছে? এর কারণ লুজিন্টারাপটাস! আজকের মূল বিষয়।

লুজিন্টারাপটাস এক স্প্যানিশ কাল্কেটিভ। শিল্পীরা এই নামটির আড়াল থেকেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এক ইন্টারভিউতে তাদের এ নামের অর্থ জানতে চাওয়া হলে তারা বলেছিল- ‘light interrupted, light subdued’ অর্থাৎ আলো বিঘ্নিত, আলো বশীভূত। অবশ্য এ নামের অর্থ তারা নিজেরাই দাঁড় করিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এরকম কোনো শব্দ ডিকশনারিতে নেই। তবে এক সৃষ্টিশীল গোষ্ঠী নিজেরাই নিজেদের সংজ্ঞায়িত করবে এটাই স্বাভাবিক।

লুজিন্টারাপটাসের একটি শিল্পকর্ম; Image Courtesy: faena.com
লুজিন্টারাপটাসের একটি শিল্পকর্ম; Image Courtesy: faena.com

আলো নিয়ে এ দলটির এরকম আসক্তির আরেকটি কারণ হল, শৈল্পিক মাধ্যম হিসেবে তারা এ উপাদানটিকেই ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ এ শিল্পী গোষ্ঠীটির সকল শিল্পকর্ম রাতকে ক্যানভাস এবং আলোকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে অন্ধকার ও আলোর অন্তরালে থেকে তারা নানা প্রকৃতিধর্মী স্থাপনা মর্ত্যে স্থাপন করে।

লুজিন্টারাপটাসের শুরুটা হয়েছিল ২০০৮ সালে। স্পেনের মাদ্রিদ শহরে লোকচক্ষুর আগোচরে চলে যাওয়া বিভিন্ন ইস্যুতে আলোকপাত করে নেটিজেনদের ভাবাতে বাধ্য করেছিল তারা। সমস্যাগুলোকে তুলে আনা তাদের শিল্পকর্মগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলেও প্রতিটা কাজ-ই যে শুধু সমস্যাকে ফোকাস করে করা হয় এমনটা না। অনেকসময় রাস্তায় পড়ে থাকা অথবা পথচারীর অযত্নে ফেলে যাওয়া কোনো বস্তুকে তারা শিল্পরুচি দান করে, যা হয়তো সাধারণ মানুষের চোখে তেমন কোনো মূল্য পাচ্ছিল না। লুজিন্টারাপ্টাসের জাদুকরী ছোঁয়ায় তা নতুন করে অর্থ লাভ করে।

রাস্তার চলাচলকারী মানুষদের বই দিচ্ছেন লুজিন্টারাপটাসের স্বেচ্ছাসেবকেরা; Image Courtesy: luzinterruptus.com
রাস্তার চলাচলকারী মানুষদের বই দিচ্ছেন লুজিন্টারাপটাসের স্বেচ্ছাসেবকেরা; Image Courtesy: luzinterruptus.com

তাদের প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু এমন হয় যা মানুষদের চকিত করতে পারে সহজেই। যেমনটি ঘটেছিলো ২০১২ সালের ‘লাইট ইন উইন্টার’ উৎসবে। শীতের গাড় কুয়াশায় আলোর ফেরি করতে ডাকা হয়েছিল লুজিন্টারাপ্টাসকে। মেলবোর্নবাসী মুগ্ধ হয়েছিল, চোখ ছিল পাতালে। সারি সারি বইয়ে নিমগ্ন। চলছে না কোনো গাড়ি-ঘোড়া, শান্ত-স্তব্ধ-সুনসান!

স্প্যানিশ দলটি ঠিক করেছিল বই-পড়া বর্ষকে মূলে রেখে তারা তাদের বই নিয়ে করা বহুল আলোচিত এবং প্রশংসিত ইন্সটলেশনটি আবার করবে, যার প্রথম প্রদর্শনীটি হয়েছিল নিউইয়র্কে। তারা এই ইন্সটলেশনটির একটি শৈল্পিক নামও দিয়েছে- “লিটারেচার বনাম ট্রাফিক”।

লুজিন্টারাপটাসের ‘লিটারেচার বনাম ট্রাফিক’; Image Courtesy: laughingsquid.com
লুজিন্টারাপটাসের ‘লিটারেচার বনাম ট্রাফিক’; Image Courtesy: laughingsquid.com

লিটারেচার বনাম ট্রাফিক! অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন রাস্তায় প্রতিনিয়ত রাজ করা সকল গাড়ি-ঘোড়ার বিরুদ্ধে লড়বে সাহিত্য, দখল করবে রাজপথ। যেমন আইডিয়া তেমনি বাস্তবায়ন। জুন মাসে উৎসব, তাই মাস কয়েক আগ থেকে দলটির ৮০-৯০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতি নেয়া শুরু করল। ইন্সটলেশনটি তৈরি করতে লাগবে প্রচুর বই, ইউনিভার্সিটি-লোকাল লাইব্রেরি-সাধারণ মানুষ সকলে এগিয়ে আসলো। স্বেচ্ছাসেবকেরা দিন-রাত খেটে বই জোগাড় করতে থাকলো। প্রদর্শনী শুরুর দশদিন আগে প্রায় ১০হাজার বইয়ে মরিচ বাতির মতো এলইডি লাইট লাগানো শুরু হলো।

ইন্সটলেশনটি স্থাপিত হয়েছিল মেলবোর্নের স্টার্ক ফেডারেশন স্কয়ারে। পথচারীরা অবাক হয়ে দেখলো তাদের নিত্যদিনের হাঁটার রাস্তাটিতে কেমন করে হাজার হাজার বই রাজত্ব করছে কিন্তু তারা এতে মোটেও বিরক্ত নয়। যান্ত্রিক শব্দে বিপর্যস্ত নগরী আজ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। রাত নামলে আলো জ্বললো বইয়ের পাতায়। হাজার হাজার বইয়ে আলোকিত রাজপথ আর এর মধ্য দিয়ে ট্রাফিক হার মানলো সাহিত্যের কাছে।

রাস্তায় সুসজ্জিত বই নিয়ে মেতে আছে এক পাঠক; Image Courtesy: luzinterruptus.com
রাস্তায় সুসজ্জিত বই নিয়ে মেতে আছে এক পাঠক; Image Courtesy: luzinterruptus.com

রাত বাড়তে প্রদর্শনীর স্থানটি উন্মুক্ত করে দেয়া হলো সাধারণ মানুষদের জন্য। তারা চাইলেই রাস্তা থেকে বই টুকে নিতে পারছিল বিনামূল্যে। যেন এক আলোময় উপহার! আর এভাবেই পরের দিনে পা রাখতে না রাখতেই রাস্তাও পরিষ্কার হয়ে গেলো।

কেন এহেন ভাবনা? এরূপ প্রশ্নের উত্তরে স্প্যানিশ দলটি বলেছিল-

সাহিত্য দখল করে নিক রাস্তাঘাট এবং রয়েছে যত জনপদ, নিস্তেজ করে দিক সব কোলাহল যানবাহনের হট্টগোল। হোক কিছু সময়ের জন্য তবুও যেন লিখিত প্রতিটি অক্ষর গ্রাস করে লোকালয়ের হইচইকে, এটাই আমাদের চাওয়া

বাংলাদেশেও অনুরূপভাবে আয়োজন করা হয় 'বুক রোড খুলনা'; Image Courtesy: thedailystar.net
বাংলাদেশেও অনুরূপভাবে আয়োজন করা হয় ‘বুক রোড খুলনা’; Image Courtesy: thedailystar.net

লুজিন্টারাপ্টাসের এই ইন্সটলমেন্টটি বইপোকাদের জন্য নিঃসন্দেহে এক আশীর্বাদ। যার সূচনা ২০১০ সাল থেকে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে টরেন্টোতে এবং ২০১৮ সালে মিশিগানে “লিটারেচার ভার্সেস ট্রাফিক” স্থাপনাটির প্রদর্শনী করা হয়।

মজার ব্যাপার হলো এ স্থাপনাটি থেকে উৎসাহিত হয়ে বাংলাদেশের খুলনাতেও ক্ষুদ্র পরিসরে এরকম আয়োজন করা হয়েছিল। ‘বুক রোড খুলনা’ শিরোনামের এই আয়োজনে পথচারীদের সাড়াও মিলেছিল ব্যাপক, শুধু বই নেয়াই না অনেকে এতে বই দানও করেছিলেন।

লুজিন্টারাপ্টাসের সার্থকতা এখানেই, তারা একটি সুস্থ বিপ্লবকে ছড়িয়ে দিতে পৃথিবীর অন্য একটি প্রান্তে।

Feature Image Courtesy: spainculture.us