অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম

লুইস ক্যারলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যালিসে’স অ্যাডভেঞ্চার্স ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ যারা পড়েছেন বা ওই উপন্যাস অবলম্বনে বানানো সিনেমা যারা দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন অ্যালিসের ওয়ান্ডারল্যান্ডে কত রকম চমৎকারিত্বই না ঘটতে পারে! অ্যালিসের কখনো বিশালদেহী হওয়া আবার কখনোবা লিলিপুটদের মতো ছোট হয়ে যাওয়া, প্রাণীদের মুখ দিয়ে কথা বের হওয়- এসব অবাস্তব ব্যাপারগুলো যদি বাস্তবেও সম্ভবপর হয়, তাহলে কেমন হয়? যদিও বাস্তবে ওরকম কিছু সম্ভব নয়, কিন্তু একটা বিরল মানসিক কন্ডিশনের কারণে মানুষ অনেক সময় এই অভিজ্ঞতাগুলোর সম্মুখীন হতে পারে। এই কন্ডিশনটির নামই রাখা হয়েছে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম (এডব্লিউএস)। ১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জন টড প্রথম একটি পেপারে এই সিনড্রোমটির কথা উল্লেখ করেন। তাই এ সিনড্রোমটি টড’স সিনড্রোম নামেও পরিচিত। এছাড়া কখনো কখনো এটিকে লিলিপুটিয়ান হ্যালুসিনেশন নামেও ডাকা হয়।

লুইস ক্যারলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যালিসে’স অ্যাডভেঞ্চার্স ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ এর প্রচ্ছদ; Image Courtesy: amazon.com

এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে ব্যক্তি বেশকিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। তিনি তার চারপাশের বস্তুকে বিকৃত, কিম্ভূতকিমাকার অবস্থায় দেখতে পান। কখনো তার চোখের সামনে থাকা বস্তু ছোট হয়ে যায়, কখনোবা বস্তু প্রকৃত আকারের চেয়ে বেশি বড় হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আবার কখনো মনে হয় বস্তু যেখানে থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক দূরে অবস্থান করছে। শুধু পারিপার্শ্বিক বস্তু নয়, আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের দেহকেও ছোট বা বড় অনুভব করতে পারেন। কখনো মনে হতে পারে ব্যক্তির হাত শাঁকচুন্নির হাতের মতো লম্বা হয়ে গেছে, আবার কোনোসময় তার উল্টোটাও বোধ হতে পারে। বস্তুর রঙ পাল্টে যাচ্ছে, ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র হেঁটে বেড়াচ্ছে, নিজের একটি পা খুঁজে পাচ্ছেন না; এরকম দৃশ্যের দেখা মেলাও সম্ভব অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে।

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়; Image Courtesy: nytimes.com

এ অপ্রকৃতস্থ ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করার মানে এই নয় যে ব্যক্তি হ্যালুসিনেশনে ভুগছেন, বা তার চোখে সমস্যা আছে। বরং দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের পাঠানো সংকেতকে মস্তিষ্কের ভুল ব্যাখ্যাই (perception) এসব অবাস্তব ঘটনা অনুভবের কারণ।

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমটি খুবই বিরল একটি সিনড্রোম। এটি সাধারণত বাচ্চাদের হয়ে থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় হওয়ার সাথে সাথে সিনড্রোমটি হারিয়ে যায়। তবে তার মানে এই নয় যে কোনো বয়স্ক লোক এ সিনড্রোমে আক্রান্ত হবেন না।

সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা সবার এক নাও হতে পারে। কোনো একটি অভিজ্ঞতা কারও জন্য কয়েক মিনিটের হতে পারে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে তা আধাঘণ্টাও ছাড়াতে পারে।

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির হ্যালুসিনেশন হতে পারে; Image Courtesy: ndnr.com

এ সময় আক্রান্ত ব্যক্তি যেসব অভিজ্ঞতা, লক্ষণের সম্মুখীন হতে পারেন সেগুলো হলো:

মাইগ্রেন

এ সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি মাইগ্রেনের অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। অনেক গবেষক মনে করেন, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম খুব সম্ভবত মাইগ্রেনের বিরল একটি সাবটাইপ।

আকৃতির পরিবর্তন

আকৃতি পরিবর্তন পজিটিভ বা নেগেটিভ দুটোই হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি যখন নিজের শরীর বা আশেপাশের বস্তুকে ছোট হতে দেখেন তখন তাকে মাইক্রোপসিয়া (Micropsia) বলে। অন্যদিকে ম্যাক্রোসপিয়া (Macropsia) হচ্ছে বস্তু যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বড় দেখায়।

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির মাইগ্রেনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে; Image Courtesy: besthealthmag.ca

বীক্ষণে বিকৃতি

বস্তু যদি বড় দেখায় অথবা মূল অবস্থানের চেয়ে কাছাকাছি দেখায় তখন তাকে পেলপসিয়া (pelopsia) বলে। আর উল্টো অভিজ্ঞতা হলে তাকে টেলিওপসিয়া (teleopsia) বলে।

সময়জ্ঞানহীনতা

এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে ব্যক্তির সময়জ্ঞানও লোপ পেতে পারে। কোনো মুহুর্তে মনে হতে পারে সময় খুবই ধীরে বইছে এবং কখনো তার উল্টোটাও ঘটতে পারে।

শ্রবণে গণ্ডগোল

এ সিনড্রোমের কারণে শব্দ স্বাভাবিকের চেয়ে বড় শোনায়। এমনকি অল্পশব্দও কানের ভেতর বর্ধিত হয়ে প্রবেশ করে।

এছাড়া শরীরের পেশির ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। সোজা বস্তু বা লাইনকে আঁকাবাঁকা দেখায় যাকে মেটামরফোপসিয়া (Metamorphopsia) বলা হয়। অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমের কারণ নিয়ে ডাক্তাররা এখনো নিশ্চিত নন। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে চোখে সমস্যা, হ্যালুসিনেশন বা স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা ইত্যাদির সাথে এ সিনড্রোমের কোনো সম্পর্ক নেই।

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির দৃষ্টিভ্রম বা অন্যান্য বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে; Image Courtesy: huffingtonpost.com

এ সিনড্রোমটি বিরল হওয়ায় খুব বেশি গবেষণা করা সম্ভব হয়নি এর ওপর। তবে গবেষকদের মতে মস্তিষ্কের ভেতর বিরল বৈদ্যুতিক সিগন্যালের কারণে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে অস্বাভাবিক রক্ত প্রবাহের সূচনা হয়। তার ফলে দৃষ্টিভ্রম বা অন্যান্য বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে এ সিনড্রোমে আক্রান্ত ৩৩% মানুষের মস্তিষ্কপ্রদাহের সমস্যা রয়েছে। মস্তিষ্কে এপস্টেইন-বার ভাইরাসের আক্রমণের সাথে সিনড্রোমটির সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। হেড ট্রমা ও মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে আক্রান্তদের ছয় শতাংশের মধ্যে। কিন্তু অর্ধেকের বেশি মানুষের এ সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য অন্যান্য কারণগুলো হচ্ছে স্নায়ুচাপ, হ্যালুসিনেশনের ঔষধ নেওয়া, মৃগীরোগ, স্ট্রোক, ব্রেইন টিউমার ইত্যাদি। এছাড়া জিনগত কারণেও এডব্লিউএস-এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পরিবারের কারও মাইগ্রেন বা সিনড্রোমটির পূর্ব-ইতিহাস থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও এ সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির দিনে বেশ কয়েকবার নানা অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে; Image Courtesy: huffingtonpost.com

অ্যালিসের স্রষ্টা লুইস ক্যারলও এ সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন বলে মনে করেন অনেকে। সিনড্রোম-আক্রান্ত ব্যক্তির ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা লাভ হলেও এটি কোনো ক্ষতিকারক সিনড্রোম নয়, বা এ সিনড্রোম থেকে আরও মারাত্মক কোনো রোগ শরীরে বাসা বাঁধারও সম্ভাবনা নেই। একজন ব্যক্তি দিনে কয়েকবার সিনড্রোমের অভিজ্ঞতাগুলো পেতে পারেন। এ লক্ষণগুলো টানা কয়েকদিন দেখা যেতে পারে। এরপর আবার কয়েক সপ্তাহ বা মাসের জন্য কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। সময়ের সাথে সাথে লক্ষণের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে লক্ষণগুলো পুরোপুরিভাবে মিলিয়েও যেতে পারে।

Feature Image Courtesy: medsphere.wordpress.com

References: