বেল উইচ কেভ

আমেরিকার টেনেসিতে থাকা এক শহর এডাম’স সিটিরহস্যঘেরা বেশকিছু জায়গার জন্য সুপরিচিত এই শহর। প্রায়ই এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে আসেন পর্যটকেরা। রহস্যময় প্রাচীন বিভিন্ন নিদর্শন চমৎকৃত করে তাদের। আর এই নিদর্শনগুলোর মধ্যে সবার আগে নাম করতে হয় বেল উইচ কেভের

আজ এই জায়গাটা এক অপার রহস্যের ভাণ্ডার। অথচ এই গুহার পাশেই একদিন ছিলো বড় একটা বাড়ি। এক পরিবার সুখে-শান্তিতে বাস করতো সেখানে। তাদের ছিল প্রচুর চাষ-জমি। সমাজে সম্মান কিংবা প্রাচুর্য কিছুরই কমতি ছিল না তাঁদের। কিন্তু আচমকা এক ঝড় এসে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু।

সময়টা ১৮০৪ সাল। জন বেল তার চার সদস্যের পরিবার নিয়ে বাস করতে আসেন এখানে। আশেপাশে বাড়ি-ঘর খুব বেশি ছিল না। জন এই এডামস সিটিতে এসেছিলেন ভাগ্য অন্বেষণে। শহরের উত্তরে নিজের বাড়ি করে পরিবার নিয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি। প্রচণ্ড পরিশ্রমী আর কৌশলী জন অল্পদিনেই চাষ-বাষ করে বেশ ভালো আর্থিক অবস্থা দাঁড় করিয়ে ফেলেন।

জন বেল, Image Courtesy: twocreepybs.com

পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব সুখেই দিন কেটে যাচ্ছিল জনের। প্রতিবেশি জেমস জনসনের সাথে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। এছাড়া একজন সফল চাষী হিসেবে অনেকেই তাকে খুব সম্মান করতেন। এভাবে দিনে দিনে ধনে-মানে জন শিখরে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

সময় বয়ে যেতে থাকলো। দেখতে দেখতে কেটে গেলো তেরোটি বছর। তখন ১৮১৭ সাল

এক গ্রীষ্মের রাতে পরিবারের সদস্যরা শুনতে পেলেন অদ্ভুত কিছু শব্দ। যেন বেশকিছু কুকুর একসাথে চিৎকার করে কাঁদছে! এর সাথে সাথে তারা শুনতে পেলেন অদ্ভুত রকমের বিভিন্ন শব্দ। তবে তখনই তাঁরা বিষয়টিকে অতটা গুরুত্ব দেননি। গ্রীষ্মের ওই সময়ে এমনিতেও কুকুর কাঁদত। অস্বাভাবিক ছিল না সেটা, অন্তত তাদের কাছে।

এরপর সময় যত যেতে থাকলো, ভুতুড়ে কাজ-কারবারও বেড়ে গেলো। বাড়িতে শোনা যেতে থাকলো মাটিতে শিকল আঁছড়ে ফেলার শব্দ। পুরো বাড়িটায় যেন ভারি কোন শিকল টেনে নিয়ে যেতো কেউ! আর আঁছড়ে আঁছড়ে ফেলতো তাদের কাঠের মেঝেতে! প্রচণ্ড শব্দে কাঠ যেন ভেঙে যাবারই উপক্রম হতে থাকলো।

বেলদের সেই বাড়ি; Image Courtesy: mentalfloss.com

প্রথমে তারা ভেবেছিলেন ব্যাপারটা কাউকে না জানানোই ভালো হবে। তাছাড়া এসব ভূত-প্রেত ধরণের ব্যাপার মোটেও বিশ্বাস করতেন না জন বেল। তবে উপদ্রব যখন দিন কে দিন বাড়তেই থাকলো, তখন ঠিক করলেন তার সেই বন্ধু জেমস জনসনকে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে এসে থাকতে বলবেন। তবে আগে থেকে কিছুই জানালেন না তাকে।

বন্ধুর আমন্ত্রণে কয়েকদিনের জন্য সস্ত্রীক বাড়িতে থাকতে এলেন জেমস। প্রথম রাতেই শুনতে পেলেন অদ্ভুত বিভিন্ন শব্দ। সেই কুকুরের ডাকাডাকি, বাড়িময় শিকল বয়ে নিয়ে যাওয়া আর মেঝেতে আঁছড়ে ফেলার শব্দ। তারপরও আরো কিছুদিন বাড়িটিতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু সেই একই ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তিই ঘটতে থাকে। 

জেমস জনকে বলেন আরো মানুষকে ব্যাপারটা জানাতে। জানানো হলো, নানারকম খোঁজও চললো, কিন্তু পাওয়া গেলো না তেমন কিছুই। অবশেষে তারা ঠিক করলেন পাদ্রী ডাকা হবে। এই অদৃশ্য শক্তির সাথে তাদের কথা হওয়া দরকার।

পাদ্রী ডাকা হলো। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা হলো অদৃশ্য শক্তির সাথে কথোপকথনের। একটি নারীকণ্ঠ তারা শুনতে পাননারীটি তার পরিচয় দিয়েছিল কেট ব্যাটস নামেতার অভিযোগ ছিল জন বেল তাকে তার প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন। তিনি জনকে বলে গিয়েছিলেন তার মৃত্যু হলে তার আত্মা বেল পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াবে। চরম মাশুল দিতে হবে জন ও তার পরিবারকে। মৃত্যু ঘটেছে তার। আর সেই সাথে শুরু হয়েছে নির্মম প্রতিশোধের পালা। 

জন বেল প্রথমে তেমন পাত্তা না দিলেও ক্রমে অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে থাকে। জেমসের পরামর্শে তিনি এই নারীর উত্তরাধিকারদের খুঁজেছিলেন, কিন্তু তেমন কাউকে পাননি। আর তাই প্রতিশোধের হাত থেকে নিস্তারও হয়ে উঠলো অনিশ্চিত।

গুহার পাথরের এই প্রতিকৃতিকে অনেকে কেটের মুখের আদল মনে করেন; Image Courtesy: bellwitchcave.com

আবারো পাদ্রী ডাকা হয়। এবারে সোজাসুজি হুমকি দেয় এই অতৃপ্ত আত্মা। তার মূল দুটো লক্ষ্যের কথা জানায় সে। জন বেলকে হত্যা ও জনের মেয়ে বেটসির বিয়ে ভেঙে দেয়াবিভিন্ন কলা-কৌশল প্রয়োগ করেও কিছুই হচ্ছিল না। বাড়িটিতে এই অদৃশ্য শক্তির প্রভাব দিন দিন আরো বাড়তে থাকে।

১৮২০ সালের দিকে এই অবস্থা ভয়ানক হয়ে ওঠে। প্রায় রাতেই বেটসির মনে হতো কেউ তাকে আক্রমণের চেষ্টা করছে। সকালে উঠে সে দেখতে পেত আঁচড়, কামড় বা মারের দাগ! জন দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। তার মুখ ফুলে যাচ্ছিলো, বেঁকে যাচ্ছিল চেহারা। চোয়াল সহজে নাড়াতে পারতেন না তিনি, মনে হতো কিছু যেন আটকে রয়েছে ভেতরে। সে বছরেরই ২০ ডিসেম্বর, এক প্রচণ্ড শীতের রাতে জন মারা যান

পরের বছর অর্থাৎ ১৮২১ সালের মার্চে জশুয়া গার্ডনারের সাথে বেটসির পাকাপাকি হয়ে থাকা বিয়ে ভেঙে যায়। দুটো উদ্দেশ্যই সফল হয় কেট ব্যাটসের।

এরপরও বাড়িটিতে থাকতেন জন বেলের পুত্র জন বেল জুনিয়র। তবে জুনিয়র বেলও অনুভব করতে পারতেন এমন কিছু কিছু অদ্ভুত ব্যাপার। আত্মাটি আবারো বড় রকম উৎপাত করতে শুরু করে সাত বছর পর ১৮২৮ সালে। সে যাত্রায় বেঁচে গিয়ে কিছুদিন পর বাড়ি ছেড়ে চলে যান জুনিয়র বেল ও বাকি সদস্যরা। এরপর সময় গিয়েছে অনেক। একসময় ভেঙে ফেলা হয় বাড়িটা। বাড়ির চিমনির পাথর, লোহার কেটলিসহ আরো বিভিন্ন নিদর্শন রাখা হয় নতুন করে বাড়ির পাশেই গড়ে তোলা রেপ্লিকা হাউজে।

বর্তমান রেপ্লিকা হাউজ; Image Courtesy: bellwitchcave.com

কিন্তু এতেও শেষ হয়নি সেই রহস্যবাড়ির কাছেই রয়েছে একটা গুহা। আর সেই গুহা ঘিরে আজও ঘটছে নানারকম অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপার। অন্তত বিভিন্ন পর্যটকদের বয়ানে তেমনটাই জানা যায়।

যেমন এক পর্যটক দলের একবার হয়েছিল অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। তাদের ইএমএফ ডিটেক্টর (ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড) এর লাইটগুলো বাড়ির সীমানায় প্রবেশের পর থেকেই ঘন-ঘন জ্বলতে-নিভতে থাকে।

এরপর সেই কুখ্যাত গুহায় প্রবেশের সময় এক পর্যটকের প্রচণ্ড বমি ভাব হচ্ছিল। ভেতরে তারা কেউ কেউ শুনতে পেয়েছিলেন অনেকগুলো শিশুর হাসির শব্দ! (সেখানে কোন শিশু ছিলো না)

রেপ্লিকা হাউজের ভেতরেও সেই পর্যটক (যার বমি ভাব হয়েছিল) গলায় ও ঘাড়ে চাপ অনুভব করেন। তার মনে হচ্ছিল কেউ তাঁর গলা চেপে ধরার চেষ্টা করছে! এছাড়া তাদের সেই ইএমএফ ডিটেক্টর এর লাইটগুলোও হুট করেই নিভে যায়! কিছুতেই সেগুলোকে আর জ্বালানো সম্ভব হচ্ছিল না।

তবে কেট ব্যাটসের প্রেতাত্মার এতসব প্রতিশোধমূলক কাজের বাইরে ভিন্ন এক রূপের কথাও জানা যায়।

গুহায় ঢোকার মুখের সিঁড়ি; Image Courtesy: bellwitchcave.com

একবার এক শিশু তার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঢুকে পড়ে গুহায়। গুহার দুইটি পাথরের ফাঁকে আটকে পড়ে সে। অনেক খুঁজেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে দেখা যায়, এই রহস্যময় গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে সে। তার থেকে জানা যায়, প্রচণ্ড শক্তিধর দুটো হাত নাকি এসে তাকে বের করে নিয়েছিল পাথরের ফাঁক থেকে! এটাকেও স্থানীয়রা সেই কেট ব্যাটস এর প্রভাব বলেই মনে করেন।

যা হোক, জন বেলের মৃত্যুর পর দুশো বছর পেরিয়ে গেছে। সেই বাড়িটি আর না থাকলেও বাড়ির কাছের রেপ্লিকা হাউজ আর আলোচিত এই গুহা (বেল উইচ কেভ) ঘিরে আজও সন্ধান পাওয়া যায় রহস্যময় বিভিন্ন ঘটনার। কেউ হয়ত মনে করবেন এসব কিছু জন বেলেরই কর্মফল, আজও সেই প্রেতাত্মা তার অতৃপ্তি নিয়ে গ্রাস করে আছে এই জায়গাগুলো। কেউ হয়ত ভাববেন এসব কিছু শুধুই গাল-গল্প বা বাজে আলাপ। তবে যে যা-ই ভাবুন না কেন, বেল উইচ কেভ আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে তার অপার রহস্য নিয়ে, হয়ত থাকবে আরো বহুকাল।

Feature Image Courtesy: wkrn.com

References:

  • www.werewoofs.com
  • bellwitchcave.com