ফ্রান্সের শার্লি এবদো ও মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্রের ইতিবৃত্ত

সম্প্রতি ফ্রান্সে নবীজি মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের কাহিনী নিয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অনেক তোলপাড় হচ্ছে। অনেকেই ইতিমধ্যে বয়কট করেছেন ফ্রান্সের সকল প্রোডাক্টকে।

আসলে কি ঘটেছিল? কেমন ছিল সেই ব্যঙ্গচিত্র? এর উৎপত্তিই বা কখন থেকে? বিস্তারিত জানতে হলে পড়তে হবে পুরো লেখাটি। 

শার্লি এবদো

এই লেখার কেন্দ্রবিন্দু চার্লি হেবদো (শার্লি এবদো-Charlie Hebdo) নামক একটি ফরাসি ম্যাগাজিন। এই ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে নিয়মিত ছাপানো হয় বিভিন্ন কার্টুন, রম্য এবং কৌতুক। বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এই ম্যাগাজিনকে নিরীশ্বরবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ, বর্ণবাদবিরোধী এবং প্রথাবিরোধী বলা যায়৷ এই ম্যাগাজিনটিই মুহাম্মদের ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করেছে।

শার্লি এবদোর যাত্রা যেভাবে শুরু

শার্লি এবদোর শুরুর দিকের নাম ছিল হারা-কিরি ম্যাগাজিন। ১৯৬০ সালে জর্জিস বার্নিয়ার এবং ফ্রান্সেস ক্যাভান্না এই ‘হারাকিরি’ মাসিক পত্রিকাটি চালু করেন। বার্নিয়ার ছিলেন এর প্রকাশনা পরিচালক এবং ক্যাভান্না ছিলেন এর সম্পাদক। ধীরে ধীরে ক্যাভান্না এই ম্যাগাজিনের প্রকাশ ও লেখার কাজে আরও কয়েকজনকে নিযুক্ত করেন।

হারা-কিরি ম্যাগাজিন; Image Courtesy: danmazurcomics.com

শুরুর দিকে হারাকিরি এতো পাঠক সমাবেশ পায়নি। কিছুদিনের মধ্যেই একজন পাঠক তাদেরকে ‘Dumb’ এবং ‘Nasty’ বলে গালিগালাজ করেন।

বিভ্রান্তিকর ও উপহাসমূলক কন্টেন্টের জন্য হারাকিরিকে ১৯৬১ সালে একবার এবং ১৯৬৬ সালে ৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নতুন করে শুরু করার ফলে অনেক পুরোনো লেখক নতুন করে ফেরত আসেননি, আবার নতুনদের তালিকায় যুক্ত হয়েছিলেন আরো অনেকেই।

১৯৬৯ সালে হারাকিরি দল মাসিক ম্যাগাজিন এর স্থলে একটি সাপ্তাহিক সাময়িকী প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরা মূলত সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়েই কাজ করার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। ওই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রা শুরু হয় ‘হারাকিরি হেবদো’র। Hebdo হলো Hebdomadaire এর সংক্ষিপ্ত রূপ যার অর্থ–সাপ্তাহিক।

শার্লি এবদো ম্যাগাজিন; Image Courtesy: theguardian.com

১৯৭০ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল নিজগ্রাম কলম্বে-লেস-ডিউক্সে মারা যান। এর ৮ দিন পরেই সেখানকার একটি নাইট ক্লাবে অগ্নিদুর্ঘটনায় আরও ১৪৬ জন মারা যান। তখন হারিকিরি হেবদো নামের এই ম্যাগাজিনটি অন্যান্য সকল সংবাদমাধ্যমকে বিদ্রুপ করে একটি প্রচ্ছদ প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল, ‘কলম্বেতে দুঃখদায়ক ঘটনা, নিহত ১।’

এ ঘটনার পর অন্যান্য গণমাধ্যমগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে এই সাপ্তাহিকীকে আবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটাতে হারাকিরি হেবদো’র সম্পাদকীয় দল ম্যাগাজিনের নাম পরিবর্তন করে ‘চার্লি হেবদো’ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়৷

চার্লি নামটি তারা গ্রহণ করেছেন তৎকালীন ‘পিনাট’ নামক কমিক্সের মূল চরিত্র চার্লি ব্রাউনের নাম অনুসারে। এই নাম ব্যবহারের পিছনে চার্লস দ্য গল (যে কারণে বন্ধের পথে ছিল ম্যাগাজিনটি) সম্পর্কেও অভ্যন্তরীণ রসিকতা ছিল। তবে ১৯৮১ সালে এ ম্যাগাজিনটি আবার বন্ধ হয়ে গেল।

মার্কিন দুই রাজনীতিবিদ ট্রাম্প ও ওবামাকে নিয়ে শার্লি এবদো ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ব্যঙ্গচিত্র; Image Courtesy: courant.com

বর্তমানের চার্লি হেবদো (বা শার্লি হেবদো) পুনরায় শুরু হয় ১৯৯২ সালের জুলাই মাসে। নতুন প্রকাশনাতেই প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়; প্রায় ১,০০,০০০ কপি বিক্রি হয়।

শার্লি এবদোর কর্মকাণ্ড

২০০৮ সালে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী নিকোলাস সার্কোজির পুত্র জিন সার্কোজির ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার গুজব নিয়ে একটি খবর প্রকাশ করেন চার্লি হেবদোর কার্টুনিস্ট মরিস সিনেট। এরপর তিনি জিন সার্কোজিকে উপহাস করেন।

সেই সময় এই কলামটি ইহুদিবিদ্বেষের (Anti Semitism) জন্ম দেওয়ায় সম্পাদক ফিলিপ ভাল তাকে ক্ষমা চেয়ে একটি চিঠি লিখতে বলেন। অন্যথা তাকে বরখাস্ত করা হবে বলে জানান। সেরা কার্টুনিস্ট মরিস সিনেট উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি তাঁর অন্ডকোষ কেটে ফেলবেন তবুও ক্ষমা চাইবেন না। তৎক্ষনাৎ ফিলিপ ভাল তাকে বরখাস্ত করেন।

২০০৬ সালে শার্লি এবদো’র হেডকোয়াটার; Image Courtesy: time.com

পরবর্তী সময়ে উভয় পক্ষই আদালতে মামলা দায়ের করে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে কার্টুনিস্ট মরিস সিনেট তার প্রাক্তন সম্পাদকের বিরুদ্ধে আদালতের পক্ষ হতে ৪০,০০০ ইউরো লাভ করেন তাকে ভুল কারণে বরখাস্তের জন্য।

২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়ান একটি ফ্লাইট ক্র্যাশ হয় যেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল ২২৪ জন। যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র একে সন্ত্রাস হামলা হিসেবে দেখলেও শার্লি এবদো ভিকটিমদেরকে বিদ্রুপ করে একটি কার্টুন প্রকাশ করে।

ভূপতিত হওয়া প্লেনের ধ্বংসাবশেষের উপর একটি মাথার খুলি আঁকা কার্টুনের শিরোনাম ছিল, ‘The dangers of Russian low cost flights (রাশিয়ার কম দামী ফ্লাইটের বিপদ)।’

রাশিয়ান ফ্লাইট ক্র্যাশের ব্যঙ্গ করে প্রকাশিত কার্টুন; Image Courtesy: thejournal.ie

২০১৬ সালের মার্চে ব্রাসেলসের বোমা হামলা নিয়ে আরো একটি ন্যাক্কারজনক কার্টুন প্রকাশ করে এই ম্যাগাজিন। সেখানে বেলজিয়ান গায়ক স্ট্রোমা কাউকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করছে, ‘তুমি কোথায় বাবা? (Where are you dad?)’ এবং নিহতদের আলাদা হয়ে যাওয়া দেহাবশেষ উত্তর দিচ্ছে –‘এখানে(here)।’ এই ঘটনাটি স্ট্রোমার পরিবারসহ সমগ্র বেলজিয়ামবাসীকে বিমর্ষ করে তোলে।

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সালে মধ্য ইতালিতে ভূমিকম্পে ২৯৪ জন নিহত হয়। ফরাসি এই ম্যাগাজিন আবারও একটি কার্টুন প্রকাশ করে যেখানে ‘ইতালিয়ান ভূমিকম্প’ শিরোনামের নিচে নিহতদের দেখানো হয়েছে একটি পাস্তার ডিশে। এর প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে তোলপাড় হলেও কার্টুনিস্ট কোকো থেমে যাননি। তিনি আরেকটি কার্টুন প্রকাশ করেন যেখানে তিনি ইতালিয়ানদের উদ্দেশ্যে উপহাস করে বলেছেন, ‘ইতালিবাসী, শার্লি এবদো তোমাদের বাসাগুলো বানায়নি, বানিয়েছে মাফিয়ারা…’

২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর কৃষ্ণ সাগরে প্লেন ক্র্যাশ নিয়েও শার্লি এবদো কার্টুন প্রকাশ করে যা অমানবিকতার চূড়ান্ত উদাহরণ।

ইতালির ভূমিকম্প নিয়ে ব্যঙ্গ করে প্রকাশিত কার্টুন; Image Courtesy: dailymotion.com

মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে যত উপহাস

২০০৭ সালে প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদ শার্লি এবদোর প্রধান সম্পাদক ফিলিপ ভাল এর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার জন্য মামলা করে। মামলাটির কারণ ছিল সেবার ম্যাগাজিনে ইসলামকে বিদ্রুপ করে তিনটি কার্টুন প্রকাশ করা হয় যার একটিতে মুহাম্মদ (সা.) তার পাগড়ীতে বোমা বহন করছিলেন।

পরবর্তীতে ২০০৭ সালের মার্চ মাসে প্যারিসের একটি আদালত ভালকে খালাস দেন। তারা খুঁজে পেয়েছিল ‘এই কার্টুনে মুসলমানদের চেয়েও মৌলবাদীদের উপহাস করা হয়েছিল।’ শার্লি এবদো মূলত ‘বাক স্বাধীনতা’ এবং ‘ঈশ্বর সমালোচনা’র অধিকারে বিশ্বাসী।

শার্লি এবদো আরো বিতর্কের জন্ম দেয় ‘মুহাম্মদ মৌলবাদীদের দ্বারা অভিভূত (Muhammad overwhelmed by fundamentalists)’ শিরোনামে মুহাম্মদের ব্যঙ্গচিত্র উপস্থাপন করে।

শার্লি এবদোর প্রধান সম্পাদক ফিলিপ ভাল; Image Courtesy: lexpress.fr

প্রথম পৃষ্ঠায়ই দেখা যায় কান্নাকাটি করা একজন মুহাম্মদকে, সেখানে তিনি বলছেন ‘It’s hard being loved by jerks.’

সেবার তীব্র নিন্দার জন্ম দিলেও বাণিজ্যিকভাবে দারুণ সাফল্য লাভ করে শার্লি এবদো। প্রকাশের প্রথমদিন এক লক্ষ ৬০ হাজার কপি বিক্রি হয় এবং তার পরদিন আরো দেড় লক্ষ কপি প্রিন্ট করা হয়।

শার্লি এবদো এখানেই থেমে থাকেনি৷ ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর এই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম লেখা হয় এবং ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেই মুহাম্মাদের ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয় যাতে লেখা- ‘হাসতে হাসতে মারা না গেলে ১০০ দোররা (চাবুকের কষাঘাত)৷’ এতে ধর্মীয় অনূভুতিতে আঘাত লাগায় আবার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ইসলাম ধর্মালম্বীরা। এর কয়েকদিন পরেই ‘চার্লি হেবদো’র অফিসে বোমা নিক্ষেপ এবং ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়৷

চার্লি হেবদো’র অফিসে হামলা; Image Courtesy: nydailynews.com

২০১২ সালে তারা মুহাম্মদকে নিয়ে আবারও একটি বিদ্রুপাত্মক কার্টুন সিরিজ প্রকাশ করে। এদের মধ্যে একটি ছবিতে নগ্ন মুহাম্মদকে দেখানো হয় যেখানে তার মলদ্বারে একটি নক্ষত্র বসানো হয়েছে। আরেকটিতে তিনি নগ্ন অবস্থায় বাঁকা হয়ে প্রশংসিত হবার জন্য ভিক্ষা প্রার্থনা করছেন। শার্লি এবদো এর শিরোনাম দেয়, ‘Mohammad: A star is born.’

এর প্রতিবাদে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন দূতাবাস গুলোতে পরপর অনেক বোমা হামলা হয়। এজন্য ফরাসি সরকার দূতাবাসগুলোতে সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রায় ২০ টি মুসলিম দেশের দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। সম্ভাব্য আক্রমণ এড়ানোর জন্য শার্লি এবদো ম্যাগাজিন অফিসের আশপাশে দিয়ে দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুরক্ষা।

মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে শার্লি এবদোর ব্যঙ্গচিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; Image Courtesy:

শার্লি এবদোর সদর দপ্তরে আক্রমণ

২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি দুজন ইসলামী বন্দুকধারী শার্লি এবদোর প্যারিস সদর দপ্তরে প্রবেশ করে গুলি চালান। এতে বারো জন নিহত হন এবং আরও ১১ জন আহত হন যাদের চারজনের অবস্থা ছিল গুরুতর। নিহতদের মধ্যে ছিলেন স্টাফ কার্টুনিস্ট চার্ব, ক্যাবু, টিগনাস, সম্পাদক এলসা কায়াত, অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড ম্যারিস সহ আরো অনেকে।

আক্রমণের সময় একজন বন্দুকধারী ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে উঠেন। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘নবীজির প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে (The prophet is avenged)।’ এই দুই বন্ধুকধারী ছিলেন সাইদ কাউচি এবং শেরিফ কাউচি; আলজেরিয়ার বংশোদ্ভূত ফরাসি মুসলিম পরিবারের দুই আপন সহোদর।

সাইদ কাউচি এবং শেরিফ কাউচি; Image Courtesy: ibtimes.co.in

হামলার পরদিন শার্লি এবদোর বাকি কর্মীরা ঘোষণা দেন এই ম্যাগাজিনের প্রকাশ অব্যাহত থাকবে। পরবর্তী সপ্তাহে এর স্বাভাবিক বিক্রি ৬০ হাজার কপি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১ মিলিয়ন কপিতে পৌছায়।

১৩ জানুয়ারি, ২০১৫ সালে বিবিসি তে সংবাদ প্রকাশ হলো যে গণহত্যার পর প্রথম সংখ্যাটি তিন মিলিয়ন কপিতে প্রকাশিত হবে। এই অর্থ থেকে সাহায্য করা হবে নিহতদের পরিবারকে। ফরাসি সরকার ম্যাগাজিনটি সমর্থন করে প্রায় এক মিলিয়ন ডলার মঞ্জুর করে।

Je suis Charlie

আক্রমণের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষেরা ‘je suis charlie’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠেন। Je suis charlie- অর্থ হলো I am charlie.

ঘটনার পর দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের বন্যা। বিভিন্ন দেশে এই স্লোগান ব্যবহার করে শোক পালিত হয়। মূলত এই স্লোগান ব্যবহারকারীরা ছিলেন শার্লি এবদো’র অফিস আক্রমণে নিহত ব্যক্তিদের সমর্থক।

আরেকটু গভীরভাবে বলা যায়, এরা ছিলেন ‘বাক স্বাধীনতাকামী’ এবং ‘সশস্ত্র হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সমর্থক’। ‘I am charlie’ – স্লোগানটি প্রথমে টুইটারে ব্যবহৃত হলেও ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে সারা ইন্টারনেটে।

ফ্রান্সে শার্লি এবদোর প্যারিস সদর দপ্তরে হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; Image Courtesy: whichdn.com

অন্যান্য প্রতিক্রিয়া

শার্লি এবদোর ইসলাম অবমাননার এই ধৃষ্টতা ফ্রান্স ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোতে ধর্মীয় অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়। নাইজারে চার্চ পোড়ানো হয়, পাকিস্তানে এজেন্স ফ্রান্স প্রেসের ফটোগ্রাফারকে আক্রমণ করা হয়। মুসলিমরা ক্রমেই প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠতে থাকে।

জানা যায়, রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ নবীজী (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্রের প্রতিবাদে অংশ নেন। এই আক্রমণের এক সপ্তাহ পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শার্লি এবদোকে উপহাস করে ‘জঘন্য এবং অসৎ’ আখ্যা দেন।

নবীজী (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; Image Courtesy: wsj.net

২০১৫ সাল ছিল অদ্ভুত একটি বছর। ‘ইসলামিক হিউম্যান রাইটস কমিশন’ নামের একটি ব্রিটিশ এনজিও ‘বিশ্ব ইসলামোফোব অফ দ্যা ইয়ার-২০১৫’ অ্যাওয়ার্ড দেন ‘শার্লি এবদো’ কে। আবার একই বছর ‘ন্যাশনাল সেক্যুলার সোসাইটি’ নামের আরেকটি ব্রিটিশ অরগানাইজেশান সন্ত্রাস আক্রমণের সাহসী প্রতিবাদের জন্য ‘সেক্যুলারিস্ট অফ দ্যা ইয়ার-২০১৫’ পুরষ্কারে ভূষিত করেন এই ম্যাগাজিন কে।

২০২০ সালে আবার আলোচনায় শার্লি এবদো

সম্প্রতি শার্লি এবদো ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদের ক্যারিকেচারগুলো পুনঃপ্রকাশ করে। প্রচ্ছদের কেন্দ্রস্থলে মুহাম্মদ এর ব্যঙ্গচিত্রটি জ্যাঁ ক্যাবুতের আঁকা (ক্যাবু) যিনি ২০১৫ সালে গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনামে লেখা ছিল, ‘এই সমস্ত কিছুই কেবল তার জন্য।’

মূলত ‘ঈশ্বর নিন্দার অধিকারকে সমর্থন’ ও ২০১৫ সালে চার্লি হেবদো সংশ্লিষ্টদের হত্যার প্রতিবাদেই এর পুনর্জাগরণ।

সম্পাদকীয়তে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা, ‘কার্টুনগুলি পুনরায় প্রকাশের এখন উপযুক্ত সময়। ২০১৫ সালে সংঘটিত অপরাধের বিচারকাজ শুরু হওয়ার জন্যও এটি প্রয়োজনীয়।’

২০১৫ সালে হামলায় নিহতদের স্মরণ; Image Courtesy: bbc.com

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ সালে ম্যাগাজিনের সাবেক সদর দফতরের বাইরে ছুরিকাঘাতে হামলার সময় দু’জন গুরুতর আহত হয়। বিল্ডিংটি আগে শার্লি এবদোর অফিস হলেও এখন তা একটি টেলিভিশন প্রযোজনা সংস্থা ব্যবহার করছে। এবং আহত দু’জন ওই সংস্থারই কর্মী ছিল। অপরাধী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেও এই হামলার সাথে জড়িত অন্য ছয় জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর একদিন পরে, অপরাধীকে চিহ্নিত করা হয়। নাম- জহির হাসান মেহমুদ। পাকিস্তানের ২৫ বছর বয়সী এই যুবক ২০১৮ সালে শরণার্থী হিসাবে ফ্রান্সে এসেছেন বলে জানান।

তিনি তার অপরাধের কথা স্বীকার করেন, এবং জানান যে মুহাম্মদ ক্যারিকেচারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েই তিনি প্রতিশোধেরপরায়ণ হন। এই যুবক আরো জানান যে, তিনি জানতেন না যে সদর দফতর অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে।

নবীজী (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; Image Courtesy: deccanherald.com

এদিকে ৬ অক্টোবর, ২০২০ সালে ‘বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী’ স্যামুয়েল প্যাটি নামের এক ইতিহাসের শিক্ষক তার ক্লাসে মুহাম্মদ(সা) এর ক্যারিকেচারগুলো দেখান। দেখানোর আগে ক্লাসের মুসলিম ছাত্রদের অফেন্ডেড হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাদেরকে রুম ত্যাগের কথাও বলেন।

এ কারণে ১৬ অক্টোবর চরমপন্থার শিকার হয়ে নিহত হন স্যামুয়েল প্যাটি। হত্যাকারী ১৮ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আনজোরোভও প্যাটিকে শিরশ্ছেদ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

জানা গেছে, আব্দুল্লাহ স্যামুয়েল প্যাটিকে চিহ্নিত করে দেবার জন্য তার দুই ছাত্রকে ৩০০ ইউরো দেন। অবশ্য তাদের বলা হয় তিনি শুধু স্যামুয়েল কে সাবধান করতে চান এ ধরনের ইসলাম পরিপন্থী কাজ থেকে। বড়জোর একটু আঘাত করতে পারেন, তবে হত্যার কথা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি ওই দুই ছাত্র।

স্যামুয়েল প্যাটিকে হত্যার প্রতিবাদ; Image Courtesy: bangkokpost.com

স্যামুয়েল প্যাটির মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে ফ্রান্সে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষকৃত্য করা হয়েছে স্যামুয়েল প্যাটিকে। রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ‘ফরাসি প্রজাতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ উপস্থাপনের জন্য প্যাটিকে কাপুরুষ দ্বারা হত্যা হতে হয়েছে

প্যাটির কফিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠোনের কেন্দ্রে রেখে ফরাসি পতাকা দ্বারা সজ্জিত করা হয়। সেখানে তার ছাত্র, বন্ধু সহ শিক্ষকেরা পরম শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

উল্লেখ্য যে, প্যাটির শিরশ্ছেদকারী আব্দুল্লাহ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার আগে প্যাটির মাথার ছবিটি টুইটারে পোস্ট করেন। এ ঘটনা আবারও সবাইকে পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই গণহত্যাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ; Image Courtesy: insider.com

দেশটির প্রেসিডেন্ট ম্যাঁখো এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘France will not give up religious cartoons.’

শার্লি এবদো নামের ম্যাগাজিনটি কখনো থেমে থাকেনি। বিভিন্ন বিতর্কের সুযোগ নিয়ে এগিয়ে গেছে বাণিজ্যিক সফলতার হাত ধরে। এখনো সে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হচ্ছে মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্যারিকেচার!

Feature Image Courtesy: nbcnews.com