ইথিওপিয়াতে সংঘর্ষ: অনিশ্চিত গৃহযুদ্ধের পথে রাষ্ট্র?

আফ্রিকা অঞ্চল নিয়ে সাধারণত আমাদের আগ্রহ কম থাকে। আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো যাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভ্যাস তারা বাদে আফ্রিকা সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখার গরজ কম মানুষই অনুভব করে। কিন্তু গত বছর নানা জল্পনা-কল্পনা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার নাম পাশ কাটিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১৯ এর জন্য যখন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নাম ঘোষিত হলো তখন উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার রাষ্ট্র ইথিওপিয়া বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিলো। প্রতিবেশি ইরিত্রিয়ার সাথে দীর্ঘ দিনের যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি করে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্যে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ হতে ইথিওপিয়ার ফেডারেল সরকার ও উত্তরাঞ্চলীয় তাইগ্রে সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। মার্কিন নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে ইথিওপিয়া।

নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১৯ লাভ করেন আবি আহমেদ; Image Courtesy: dw.com

প্রেক্ষাপট

আফ্রিকার দ্বিতীয় ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র ইথিওপিয়ায় ছোট-বড় ৮০টি জাতিগোষ্ঠীর বাস। তিন বছরের লাগাতার সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর ২০১৮ সালের এপ্রিলে জনবৈচিত্র্যপূর্ণ এই দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে আবি আহমেদ একটি নতুন ঐক্যবদ্ধ ইথিওপিয়া উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আবি আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন ক্ষমতাসীন জোট ইথিওপিয়ান পিপলস রেভল্যুশনারি ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইপিআরডিএফ) এর নেতা হিসেবে। চারটি আঞ্চলিক দল- তাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ), আমহারা ডেমোক্রেটিক পার্টি (এডিপি), ওরোমো ডেমোক্রেটিক পার্টি (ওডিপি) এবং সাউদার্ন ইথিওপিয়ান পিপলস ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এসইপিডিএম) এর সমন্বয়ে গঠিত এই জোট।

ইথিওপিয়ার মানচিত্র; Image Courtesy: Deutsche Welle

আবি আহমেদ ছিলেন ওডিপি এর নেতা। দীর্ঘ ৩০ বছর এই ইপিআরডিএফ জোটে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল দেশটির উত্তরপ্রান্তের তাইগ্রে অঞ্চলের সংগঠন টিপিএলএফ। কিন্তু আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ধীরেধীরে টিপিএলএফকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। টিপিএলএফ নেতা ডেব্রেটসিয়ন জেরবাইমাইকেল এর অভিযোগ, তাদের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির মামলা দিয়ে আটক করা হয়েছে। দূরত্ব বাড়তে বাড়তে এক সময় সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। আবি আহমেদ গত বছর ইপিআরডিএফ জোট ভেঙ্গে দিয়ে ওডিপি, এডিপি, এসইপিডিএম এবং আরো বেশকিছু দল একত্র করে প্রসপারিটি পার্টি নামে একটি একক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে যায় টিপিএলএফ।

ইথিওপিয়ায় মেকেলে শহরের একটি দেয়ালে তাইগ্রে অঞ্চলের পতাকা; Image Courtesy: GETTY IMAGES

সংঘর্ষের সূত্রপাত

বিদ্যমান বিরোধ আরো ঘনীভূত হয় যখন ২০২০ এর ২৯শে আগস্টে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণকালে দুই বছরের মধ্যে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আবি আহমেদ। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার সুবাদে তিনি সহজেই নির্বাচনটি স্থগিত করতে পেরেছিলেন। বিরোধী টিপিএলএফ এই পদক্ষেপকে আবি আহমেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার কৌশল হিসেবে অভিহিত করে এর প্রতিবাদ করে আসছে। আবির নেতৃত্বাধীন ফেডারেল সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে তারা সেপ্টেম্বরে তাইগ্রে অঞ্চলে একটি স্থানীয় নির্বাচনের আয়োজন করে।

তাইগ্রে অঞ্চলের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের লাইন; Image Courtesy: GETTY IMAGES

আবি আহমেদের কেন্দ্রীয় সরকার এই নির্বাচনটিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। পারস্পরিক মুখোমুখি অবস্থানের প্রেক্ষিতে তাইগ্রের স্থানীয় সরকার এই অঞ্চলে একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার পদায়ন ঠেকিয়ে দেয়। তাইগ্রে অঞ্চলে শুরু হয় বিমান হামলা। আবি আহমেদের দাবি সশস্ত্র টিপিএলএফ গোষ্ঠী কর্তৃক সামরিক বাহিনীর অবস্থানে আক্রমণের জবাবে এই হামলা শুরু হয়েছে। উল্টোদিকে টিপিএলএফ প্রথমে সংঘর্ষ শুরু করার অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে আদ্দিস আবাবার ফেডারেল সরকারের দিকে।

তাইগ্রে অঞ্চলে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ; Image Courtesy: cbsnews.com

চলমান সংঘর্ষ

টিপিএলএফ একটি বিপজ্জনক শক্তি যাদের রয়েছে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জাম সমৃদ্ধ আড়াই লাখ সদস্যের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক বিশাল বাহিনী। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংঘর্ষে লিপ্ত কোনো পক্ষই আলোচনায় বসতে রাজি না হলে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

অস্ত্র হাতে টিপিএলএফ সেনা; Image Courtesy: newsus.cgtn.com

প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ যদিও নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন, তথাপি অন্তঃদেশীয় এই যুদ্ধে ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। সংঘর্ষ ছড়িয়েছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাইগ্রে ও আমহারা অঞ্চলের সীমান্তে যার অবস্থান সুদান ও ইরিত্রিয়া সীমান্তের কাছাকাছি। ফেডারেল সরকারের অনুগত সেনাবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ড সুদান সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে বলে খবরে প্রকাশ পেয়েছে। নর্দার্ন কমান্ড টিপিএলএফ এর বেশকিছু অবস্থান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি করেছে। উদ্ধার হয়েছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম। তাইগ্রে অঞ্চলে মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় প্রকৃত অবস্থা জানাও দুরূহ হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ তাইগ্রে অঞ্চলের স্থানীয় সরকারকে বহিষ্কৃত করে নিজস্ব অনুগত প্রশাসন চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন।

ইথিওপিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের সদস্যরা তাইগ্রে অঞ্চলের একটি সীমান্তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে; Image Courtesy: REUTERS

সংঘর্ষের প্রভাব

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাইগ্রে অঞ্চলে সেনা স্থানান্তরের কারণে অন্য অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। এমনিতেই জাতিগত দ্বন্দে জর্জরিত ইথিওপিয়া। সেনাবাহিনীর অনুপস্থিতি যেকোনো অঞ্চলে নতুন কোনো সংঘাত সৃষ্টির কারণ হতে পারে। এর মধ্যে কিছুদিন আগে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্রোহী একটি গোষ্ঠীর এক বন্দুকধারীর আক্রমণে প্রায় ৫০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিগত বিভাজনের প্রভাব পড়তে পারে খোদ সেনাবাহিনীতেও। ধারণা করা হচ্ছে, সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের অপ্রকাশিত বিভাজনরেখা বিদ্যমান রয়েছে।

সংঘাত নিয়ে সংবাদপত্রে প্রতিদিনই আসছে নতুন নতুন খবর; Image Courtesy: aljazeera.com

পূর্বে তাইগ্রের অনেক সামরিক কর্মকর্তাকে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গ্রেফতার বা গৃহবন্দী করা হয়েছে যাকে বিরোধীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে। ইতোমধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদ- সেনাপ্রধান, গোয়েন্দাপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদগুলিতে রদবদল করা হয়েছে। চলমান সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বহুধা বিভক্ত ইথিওপিয়া একটি গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে যার ফল মোটেও ভালো কিছু হবে না। মানবিক সংকট তৈরী হবে এবং অর্থনৈতিক দূরাবস্থা সৃষ্টি হবে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কি দেশ একটি অনিশ্চিত গৃহযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হতে পারে?

আমেরিকায় আবি আহমেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; Image Courtesy: newsus.cgtn.com

আন্তর্জাতিক প্রভাব

একটি দীর্ঘ সংঘাত শুধু যে ইথিওপিয়ার ১০ কোটি মানুষের জীবনকেই শঙ্কায় ফেলে দিবে তা কিন্তু নয়, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গোটা ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ অঞ্চল। স্থলবেষ্টিত এই দেশটির উত্তরে রয়েছে ইরিত্রিয়া, উত্তর-পূর্বে জিবুতি, পূর্বে সোমালিয়া, দক্ষিণে কেনিয়া, পশ্চিমে দক্ষিণ সুদান এবং উত্তর-পশ্চিমে সুদান।

ইরিত্রিয়ার সাথে ইথিওপিয়ার শান্তিচুক্তি হয়েছে মাত্র কয়েক বছর আগে। এখন যে সংঘর্ষ চলছে তা ইরিত্রিয়া সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চলেই যা দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। ইতোমধ্যে সুদান সীমান্ত পেরিয়ে হাজার হাজার ইথিওপিয়ান নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থী শিবিরে।

ইথিওপিয়ার জনবৈচিত্র্য ও ভৌগোলিক অবস্থান; Image Courtesy: The Economist

দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সৈন্য উপস্থিতি কমিয়ে আনা আরো বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে যদি সোমালিয়ায় সক্রিয় আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাগোষ্ঠী আল শাবাব ইথিওপিয়ায় প্রবেশ করার চেষ্টা করে। আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র জিবুতিতে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তির সামরিক স্থাপনা যার জন্যে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের (ইথিওপিয়ার) স্থিতিশীলতা অবশ্যই প্রয়োজনীয়।

কাজেই স্বীয় রাষ্ট্র ও এই অঞ্চলের সার্বিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে ইথিওপিয়ার জন্য সংঘর্ষের পথ পরিহার করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Feature Image Courtesy: newsus.cgtn.com

References: