দিয়েগো সিমিওনে: ডাগ আউটের মাইডাস

বয়স সবেমাত্র ১৭ তখন। প্রথমবারের মতো আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলে ডাক পেয়েছেন। চাপা উত্তেজনায় বুয়েন্স আয়ার্সের নির্দিষ্ট জায়গায় যোগ দেওয়ার সময়ের বেশ আগেই চলে এসেছেন সিমিওনে। ৫ মিনিট ১০ মিনিট করে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কাউকে দেখতে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন এই বালক। উপায়ান্তর না দেখে পাশের পত্রিকার দোকানে গিয়ে জিজ্ঞাসা ‘আপনি কি আমার সতীর্থদের দেখেছেন?’ ‘তারা তো সেই সাতটায় চলে গেছে’ উত্তর আসে দোকানদারের পক্ষ থেকে।

সাথে সাথেই আতঙ্ক ঘিরে ধরে সিমিওনেকে। তার সাথে আরেক সতীর্থও সময় নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন। দুইজনই তৎক্ষনাত দৌড়ে গিয়ে বাসস্ট্যান্ডে যান। সেখান থেকে দুটি বাস ধরে তবেই তারা পৌছাতে পারবেন ট্রেইনিং গ্রাউন্ডে। কিন্তু বিধিবাম! প্রথম বাস থেকে নেমে দুই জনই দেখলেন পকেট ফাঁকা। এন্টনিও হাল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সিমিওনে তখনো উপায় খুঁজছিলেন। হুট করে এন্টনিওকে নিয়ে সিমিওনে উঠে পড়লেন একটি বাসে। বাস ড্রাইভারকে সিমিওনে যা বললেন তাতে চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিলো এন্টনিওর। কি বলেছিলেন সিমিওনে?

আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন দিয়েগো সিমিওনে; Image Courtesy: thesefootballtimes.co

‘আমাদের মুখের দিকে তাকাও। চিনে রাখো আমাদের। একদিন আমরা আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলবো। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম তারকা হবো। সেট সম্ভব হবে যদি তুমি আমাদের একটু ছোট সাহায্য করো…’। সেই বাস ড্রাইভার সেদিন সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু তারপরও বাস থেকে নেমে ৬ কিলোমিটার হাঁটতে হবে তাদের। সেই ৬ কিলোমিটার দৌড়ানোর সময় প্রতিটা মূহুর্ত হাল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন এন্টনিও। কিন্তু সিমিওনে ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। কিন্তু ঘামে জবজবে হয়ে যখন তারা ট্রেইনিং গ্রাউন্ডে পৌছালেন ততক্ষনে প্র্যাক্টিস সবেমাত্র শেষ হলো। তবে তাদের এইরকম মনের জোরে বেশ খুশি হলেন অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ কার্লোস প্যাচেম। তার কথা শুনে মূল দলের কোচ কার্লোস বিলার্দোও বেশ মন্ত্রমুগ্ধ হলেন।

১ সপ্তাহ পর ১৯৯০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি উপলক্ষ্যে দুইজনকেই জাতীয় দলের সাথে জার্মানি নিয়ে যান বিলার্দো। ১৯৯১ সালেই আলবিসেলেস্তেদের হয়ে অভিষেক হয়ে যায় সিমিওনের। আর্জেন্টিনার সর্বশেষ শিরোপা জেতা প্রজন্মের অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। তার এই হাল না ছাড়া মানসিকতা শুধু খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার-ই নয় দেখা গেছে পরবর্তীতে তার কোচিং ক্যারিয়ারেও। আজ খেলোয়াড়ি জীবন তোলা থাক। আমরা চোখ বুলাবো ডিয়েগো সিমিওনে নামের এক ডেভিড ডাগ আউটে বসে কিভাবে মোকাবিলা করছেন গোলিয়াথদের।

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে খেলেছেন দিয়েগো সিমিওনে; Image Courtesy: tribalfootball.com

‘তোমার পরীক্ষার নাম্বার বেশ খারাপ ডিয়েগো?’ ‘চিন্তা করবেন না স্যার। আমি বড় হয়ে ফুটবলার হবো।’ স্কুলের নাম্বার নিয়ে কখনোই চিন্তিত ছিলেন না সিমিওনে। ১৯৮৭ সালে ভেলেজ সার্সফিল্ডের হয়ে অভিষেক হওয়ার পর সিমিওনের খেলোয়াড়ি জীবনের সমাপ্তি ঘটে আকস্মিকভাবেই। ২০০৬ সালে ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে যখন রেসিং খেলছেন তিনি তখন রেসিং এর অবস্থা খুবই সঙ্গীন। কোনো কোচই দায়িত্ব নিতে চাচ্ছিলেন না দলের। হাল না ছাড়া সিমিওনে এগিয়ে আসেন আবারও। নিজের ক্যাপ্টেন আর্মব্যান্ড জমা দিয়ে কালো স্যুট টাই পড়ে চলে আসেন ডাগ আউটে। নিজের ভাষ্যমতে এইরকম অবসরের কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। কিন্তু ফুটবল জীবনে প্রতিটা ট্রেন একবারই আসবে। সিমিওনে কখনোই সেটি মিস করতে চাননি। তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সিমিওনের কোনো আক্ষেপ নেই। আর আক্ষেপই থাকবে কেনো। এই সিদ্ধান্তই তো তাকে বানিয়েছে ইউরোপের অন্যতম এক সেরা কোচ।

আর্জেন্টিনার মার ডেল প্লাটায় যখন আট বছর বয়সী ছেলে জিওলিয়ানোর সাথে ব্রেকফাস্ট করছিলেন তখনই ফোনটি আসে সিমিওনের কাছে। কিন্তু তিনি কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। ছেলে আবার কিছুক্ষন পর বাবাকে জিজ্ঞেস করলো ‘বাবা তুমি কি ফ্যালকাওদের কোচ হবে? তুমি কি মেসি রোনালদোদের বিপক্ষে খেলবে?’ সিমিওনে নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন এটলেটিকোকে হ্যা বলে দেওয়ার জন্য। তখনই জিওলিয়ানো বলে উঠলো ‘কিন্তু বাবা তুমি যদি ভালো করো তাহলে তো আর ফিরে আসবেনা।’ কিন্তু ফুটবলের প্রতি প্যাশনই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিল। নিজের সন্তানদের কাছে থেকে দেখতে পারবেননা তাতে খারাপ লাগা কাজ করলেও এটলেটিকোকে হ্যা বলতে বেশি ভাবেননি সিমিওনে। ততদিনে সিমিওনের ৫ বছরের কোচিং ক্যারিয়ার বেশ উত্থান পতনের মধ্য দিয়েই গেছে। এস্তুদিয়ান্তেস আর রিভারপ্লেটের হয়ে শিরোপা জেতা ছাড়াও কাতানিয়াকে অবনমনের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। আবার বাজে ফলাফলের জন্য বরখাস্তও হয়েছিলেন রিভারপ্লেট ও সান লরেঞ্জো থেকে।

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কোচ হিসেবে দিয়েগো সিমিওনে; Image Courtesy: atleticodemadrid.com

২০১১ সালের ক্রিসমাসের দুই দিন আগেই এটলেটিকো ফ্যানরাও তাদের ক্রিসমাস উপহার পেয়ে যান। যদিও সেই সময় তারা জানতেনও না যে এটিই তাদের ক্রিসমাস উপহার। ডিসেম্বরের ২২ তারিখ জর্জিও মানযানো এটলেটিকোর ডাগ আউট থেকে বরখাস্ত হন। পরের দিনই দিয়েগো সিমিওনে আসেন ক্লাবটির কোচ হয়ে। ঠিক সেই মূহুর্তে কোপা দেল রে থেকে বিদায় ঘটেছে স্প্যানিশ ক্লাবটির। লিগেও অবস্থা সুবিধাজনক নয়। টেবিলে অবস্থান ১০ নাম্বারে। কিন্তু এই গড়পড়তা মানের দলকেই কিভাবে সিমিওনে করে তুললেন ইউরোপের অন্যতম সমীহ জাগানিয়া এক দল হিসেবে? চলুন দেখে আসা যাক।

ভয়ডরহীন ফুটবল

আর্জেন্টিনার হয়ে টানা তিনটি বিশ্বকাপে সিমিওনে খেলেছেন তিনটি ভিন্ন ফর্মেশনে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে আলফিও বাসিলের অধীনে আর্জেন্টিনা খেলতো ৪-২-২-২ ফর্মেশনে। ১৯৯৮ তে প্যাসারেলা দলকে সাজান ৩-৫-২ এ। আর নিজের আদর্শ মানা মার্সেলো বিয়েলসা ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে খেলিয়েছেন ৩-৩-১-৩ ফর্মেশনে। তাই দলকে কোন ফর্মেশনে খেলাবেন তা নিয়ে সিমিওনের জানাশোনা ছিল যথেষ্ট। কিন্তু ফর্মেশনের ছাড়াও সিমিওনের একটি ব্যাপার ছিল। তা হলো বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাসই আমূল বদলে দিয়েছে স্প্যানিশ ক্লাবটিকে।

‘সিমিওনে আপনাকে যথেষ্ট চেষ্টা না করার জন্য ক্ষমা করে দিতে পারবেন, কিন্তু বিশ্বাসের ঘাটতি থাকলে তা কখনোই তিনি মেনে নিবেন না।’ এই কথা গুলোই বলেছিলেন সিমিওনের স্কুল শিক্ষক ব্রুনো আমাজিনো। প্রথমে এসে সিমিওনে এই বিশ্বাসের বীজই বুনে দিয়েছিলেন খেলোয়াড়দের মাঝে। নিজের প্রথম সাত ম্যাচের একটিও হারেননি সিমিওনে। সেই মৌসুমে ১০ নাম্বার থেকে এটলেটিকোকে তিনি তুলে আনেন ৫ নাম্বার অবস্থানে।

সকল প্রকার ফর্মেশন নিয়ে অভিজ্ঞ দিয়েগো সিমিওনে; Image Courtesy: football365.com

সিমিওনে আসার আগ পর্যন্ত ১৪ বছর ধরে ২৮ ম্যাচ খেলে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি এটলেটিকো। সেবার সিমিওনের হাত ধরেই এই হারের বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে স্প্যানিশ ক্লাবটি। কিন্তু সেটিই প্রথম মৌসুমে সিমিওনের সেরা সাফল্য নয়। সেবার ইউরোপা লিগের পরবর্তী ৯ ম্যাচই অপরাজিত থেকে শিরোপা উত্তোলন করে এটলেটিকো। ফাইনালে এথলেটিক বিলবাওকে তারা হারায় ৩-০ গোলে।

‘ফুটবলকে আমি বক্সিং এর সাথে তুলনা করি। যখনই আপনি প্রতিপক্ষকে ভয় পাবেন তখনই তারা আপনার উপর চড়াও হবে অনেক বেশি গুনে। তাই আপনাকে সর্বপ্রথম বুঝাতে হবে আপনি ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে এসেছেন এখানে।’ সিমিওনের এই মানসিকতাই আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে এটলেটিকো মাদ্রিদের ড্রেসিং রুমে ও মাঠের খেলায়।

কোচ হিসেবে দিয়েগো সিমিওনের মধ্য আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল; Image Courtesy: fourfourtwo.com

পাকা জহুরী

দলবদলে সিমিওনের কেনা বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই সিমিওনের বিশ্বাসের পূর্ণ প্রতিদান দিয়েছেন। ২০১২ সালে নিজের দ্বিতীয় মৌসুমেই এটলেটিকোকে লা লিগা চ্যাম্পিয়ন করেন সিমিওনে। এর পিছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল ফরোয়ার্ড দিয়েগো কস্তার। রায়ো ভায়োকানো থেকে কস্তাকে সিমিওনে কেনার আগে তার সক্ষমতা সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানতো। এটলেটিকোতে যোগদানের পরের দুই মৌসুমে কস্তার পা থেকে এসেছে ৩৭ গোল।

পাশাপাশি স্প্যানিশ ক্লাবটিও জিতে নিয়েছে লা লিগা, উয়েফা সুপার কাপ ও কোপা দেল রে শিরোপা। কস্তা ছাড়াও ১৬ মিলিয়নে আনা আলভারো ডমিংগুয়েজ ও সালভিও নিজেদের প্রমাণ করে গিয়েছেন। আলাদা করে বলতেই হবে মাত্র ২৫ মিলিয়নে যোগ দেওয়া গ্রিজম্যানের কিংবা আড়াই মিলিয়নে নিয়ে আসা দিয়েগো গডিনের কথা। এছাড়াও থিবো কোর্তোয়া, অবলাক, গিমেনেজ, কারাস্কো, সাউল কিংবা কোকেকে বলতে গেলে সিমিওনেই করেছেন ফুটবলের তারকা।

কস্তাকে খুব ভালোভাবেই দলে কাজে লাগিয়েছেন দিয়েগো সিমিওনে; Image Courtesy: skysports.com

রক্ষন মেরুদন্ড 

  সিমিওনের রক্ষন নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়। সম্প্রতি লিভারপুলের মাঠে গিয়ে ঐতিহাসিক ৩-২ গোলের জয় নিয়ে ফিরেছেন সিমিওনে শিষ্যরা। পুরো ম্যাচে যেভাবে তার খেলোয়াড়েরা রক্ষণ আগলেছেন তার জন্য অনেক বড় বাহবার দাবিদার সিমিওনে। জোনাল মার্কিং থেকে শুরু করে ম্যান মার্কিং কিংবা নিচ্ছিদ্র রক্ষন সবকিছুকেই শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন এই কোচ। কোনো দলের রক্ষণ দেখেও যে আনন্দ পাওয়া যায় তা হয়তো সিমিওনে আসার আগে কেউ জানতোও না। নিজের শুরুর দিকের মৌসুম গুলোতে গডিন আর মিরান্ডাকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন রক্ষন দূর্গ। পরবর্তীতে সেইসব জায়গায় এসেছেন গিমেনেজ, রেনান লোদি, স্যাভিচ, ট্রিপিয়াররা। এটলেটিকোর ডাগ আউটে সবে গত নয় বছরে সিমিওনে চার গোলের ব্যবধানে হেরেছেন মাত্র একবারই।

দলের ট্রেনিং সেশনে দিয়েগো সিমিওনে; Image Courtesy: irishmirror.ie

৪-৪-২

৪-৪-২ স্বভাবতই একটি ঐতিহ্যগত একটি ফর্মেশন। কিন্তু ধারার বাইরেও সিমিওনে এই ফর্মেশনকে কাজে লাগিয়েছেন দারুনভাবেই। ২০১৩-১৪ মৌসুমে প্রায় সব ম্যাচেই এই ফর্মেশনে দলকে খেলিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার দলের দুই উইংগার সাধারনত টাচ লাইন ধরে থাকে তাতে করে পিচের বিস্তারও বেড়ে যায়। স্বভাবতই রক্ষণ নির্ভর খেলা সিমিওনের দল তাতে করে দ্রুতগতির কাউন্টার এটাক করতে সক্ষম হয়। বড় দলের বিপক্ষে তাই বেশিরভাগ সময়ই সফল হয়েছেন সিমিওনে। দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল খেলা তারই প্রমাণ।

বড় বড় দলের বিপক্ষে কোচ হিসেবে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সিমিওনে; Image Courtesy: outsideoftheboot.com

সিমিওনের হাতে এখনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ উঠেনি তা সত্য। কিন্তু গার্দিওলা, ক্লপ থেকে শুরু করে ইউরোপের বড় বড় মাস্টারমাইন্ডদের ঘোল খাইয়ে ছেড়েছেন নিজের ট্যাকটিকস দিয়ে। ফুটবলের প্রতি তার দুর্নিবার ভালোবাসা আর প্যাশন সিমিওনের এটলেটিকোকে করে তুলছে ইউরোপিয়ান জায়ান্ট। লুইস ফিগো বলেছেন “এটলেটিকো নাম শুনলেই তার মাথায় প্রথম যে বাক্যটি আসে তা হলোসিমিওনের দল কিরেন ট্রিপিয়ার এটলেটিকো তে যোগ দেওয়ার দুই মাস পরই জানিয়েছিলেন সিমিওনেই তার দেখা সেরা কোচ। তা নিয়ে হয়তো মতভেদ থাকবে অনেক। কিন্তু সেই সেরার পথে দিনকে দিন নিজেকে এগিয়েই নিয়ে যাচ্ছেন ডাগ আউটের এই মাইডাস।

Feature Image Courtesy: irishtimes.com