দিরিলিস আরতুগুল: তুর্কিশ গেম অব থ্রোনস

আজ থেকে ঠিক ১৯ বছর আগে ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঘটেছিল পৃথিবীর ইতিহাসের এক জঘন্যতম জঙ্গি হামলা। যা ৯/১১ নামে সকলের কাছে পরিচিত। এই জঙ্গী হামলার পর থেকে একটি শব্দের সাথে আমরা নতুন করে পরিচিত হই। তা হলো ইসলামোফোবিয়া। এটি মাত্র অল্প কিছু সময় নিয়েছিল মানুষের মনে বিশ্বাস জাগাতে যে সব মুসলমান জঙ্গি। ৯/১১ এর পর থেকে পশ্চিমা মিডিয়ার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলের যেসব মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে কোনো জানাশুনা ছিল না তাদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে মুসলমানরা খারাপ, তারা বোমা মারে নিরীহ মানুষের ওপর। তারা এতটাই খারাপ যে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে মানুষের গলা কাটে। ওরা এমনই, তাই ইতিহাস এর তোয়াক্কা না করেই সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী ‘পদ্মাবতী’ সিনেমায় নিষ্ঠুর নরমাংসভোজী অসভ্যতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। মুসলিমরা ইতিহাসের আয়নায় হয়ে ওঠে অসভ্য, বর্বর নয় নিষ্ঠুর কিংবা অত্যাচারী জানোয়ার।

আর এই ইসলামোফোবিয়া দূর করতে ও মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জানাতে পরিচালক মেহমেত বোজদাগ তৈরি করেছেন দিরিলিস আরতুগুল নামে একটি ড্রামা সিরিজ। পশ্চিমা মিডিয়ায় যা তুর্কিশ গেম অফ থ্রোনস নামে পরিচিত। কিন্তু গেম অফ থ্রোনস এর মত কাল্পনিক, অবাস্তব গল্প নয় এই দিরিলিস। এই সিরিজটি তৈরি করা হয়েছে সত্য ঘটনা অবলম্বনে। এটি একটি ইতিহাস। ৮-১০ টা টিভি সিরিজের সাথে যার তুলনা চলে না। নামে, গুনে, বিশেষণে আর দর্শকদের অঢেল ভালোবাসায় দিরিলিস নিজেকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়।

দিরিলিস আরতুগুল সিরিজের পরিচালক মেহমেত বোজদাগ; Image Courtesy: tmgrup.com
দিরিলিস আরতুগুল সিরিজের পরিচালক মেহমেত বোজদাগ; Image Courtesy: tmgrup.com

দিরিলিস আরতুগুল সিরিজটি ১৩ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের ওর্ঘুদ তুর্কিদের কাহিনী নিয়ে নির্মিত। মোঙ্গলদের আক্রমণ, নির্যাতন, গণহত্যা আর ইউরোপ থেকে আগত ক্রুসেডারদের ষড়যন্ত্রের ফলে তুর্কি গোষ্ঠীগুলো তখন এশিয়া ছেড়ে পালাতে থাকে। ওর্ঘুজ তুর্কিদের এমনই একটি গোষ্ঠীর নাম কায়ি গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন সুলাইমান শাহ। আর সুলাইমান শাহ এর পুত্র ছিল আরতুগুল গাজী। এই আরতুগুল গাজী সুলাইমান শাহ এর মৃত্যুর পরে তাদের গোষ্ঠীর নেতা হয় এবং তার মিশন ছিল তার গোষ্ঠীর জন্য একটি স্থায়ী স্বাধীন ভূমি তৈরি করা। এই মিশনে আরতুগুল ও তার গোষ্ঠী মোকাবেলা করে ক্রুসেডারদের, মোঙ্গলদের, বাইজেন্টাইনদের এবং কখনো কখনো নিজ গোত্রীয় ক্ষমতালোভী মানুষদের সাথে। এমন সব ধারাবাহিক প্রেক্ষাপট এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে কীভাবে আরতুগুল গাজী উসমানীয় সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন তা এই সিরিজে দেখানো হয়।

দিরিলিস আরতুগুল সিরিজটি ১৩ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের ওর্ঘুদ তুর্কিদের কাহিনী নিয়ে নির্মিত। মোঙ্গলদের আক্রমণ, নির্যাতন, গণহত্যা আর ইউরোপ থেকে আগত ক্রুসেডারদের ষড়যন্ত্রের ফলে তুর্কি গোষ্ঠীগুলো তখন এশিয়া ছেড়ে পালাতে থাকে। ওর্ঘুজ তুর্কিদের এমনই একটি গোষ্ঠীর নাম কায়ি গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন সুলাইমান শাহ। আর সুলাইমান শাহ এর পুত্র ছিল আরতুগুল গাজী। এই আরতুগুল গাজী সুলাইমান শাহ এর মৃত্যুর পরে তাদের গোষ্ঠীর নেতা হয় এবং তার মিশন ছিল তার গোষ্ঠীর জন্য একটি স্থায়ী স্বাধীন ভূমি তৈরি করা। এই মিশনে আরতুগুল ও তার গোষ্ঠী মোকাবেলা করে ক্রুসেডারদের, মোঙ্গলদের, বাইজেন্টাইনদের এবং কখনো কখনো নিজ গোত্রীয় ক্ষমতালোভী মানুষদের সাথে। এমন সব ধারাবাহিক প্রেক্ষাপট এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে কীভাবে আরতুগুল গাজী উসমানীয় সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন তা এই সিরিজে দেখানো হয়।
সিরিজে আরতুগুল গাজী চরিত্রে অভিনয় করেন এনজিন আলতান দোজায়তান; Image Courtesy: secureservercdn.net

এই সিরিজের প্রধান চরিত্রে দেখানো হয় আরতুগুল গাজীকে। তার চরিত্রে অভিনয় করেছেন এনজিন আলতান দোজায়তান। ১৩ শতকের বিখ্যাত সুফি দরবেশ ও প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক নেতা ইবনে আরাবীর চরিত্রে অভিনয় করেন উসমান সয়কুত। আরতুগুল এর পিতা সুলাইমান শাহ এর চরিত্রে অভিনয় করেন সেরদার গোখান। এছাড়াও এতে অভিনয় করেন এসরা বিলগিস, কান তাসানের, হুসাইন ওজাই, বারিশ বাঘছি, চেঙ্গিস কশোকুন সহ আরো অনেকে। এই ধারাবাহিক সিরিজটি ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর টি আর টি.১ এ প্রথম প্রচারিত হয়। ধারাবাহিকভাবে সিরিজটির ১৫০ টি পর্ব প্রচারিত হয়। ১৫০ তম পর্ব ৬ জুন ২০১৯ এ প্রচারিত হয়। এই ১৫০ টি পর্ব আবার ৫ টি সিজনে বিভক্ত। প্রতিটি পর্বই প্রায় ২ ঘণ্টা ১০/১৫ মিনিটের মত। তুর্কি ভাষা ছাড়াও এটি প্রায় ৩৯ টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ভেনিজুয়েলা, তিউনিসিয়া, উজবেকিস্তান, সোমালিয়া, পাকিস্তান, জর্দান, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো অনেক দেশে জাতীয় ও বেসরকারী টিভি চ্যানেলে এই সিরিজটি তাদের নিজ ভাষায় অনুবাদ করে প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া নেটফ্লিক্সেও এই জনপ্রিয় সিরিজটি পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য, দিরিলিস আরতুগুল গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে ‘Best dramatic work in the history of global dramas’ হিসেবে। দিরিলিস আরতুগুল এর পরে আরতুগুল এর পুত্র ওসমান গাজী জীবনী নিয়ে ‘কুরুলুস উসমান’ নামে একটি সিরিজ বর্তমানে সম্প্রচারিত হচ্ছে।

এই সিরিজের প্রধান চরিত্রে দেখানো হয় আরতুগুল গাজীকে। তার চরিত্রে অভিনয় করেছেন এনজিন আলতান দোজায়তান। ১৩ শতকের বিখ্যাত সুফি দরবেশ ও প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক নেতা ইবনে আরাবীর চরিত্রে অভিনয় করেন উসমান সয়কুত। আরতুগুল এর পিতা সুলাইমান শাহ এর চরিত্রে অভিনয় করেন সেরদার গোখান। এছাড়াও এতে অভিনয় করেন এসরা বিলগিস, কান তাসানের, হুসাইন ওজাই, বারিশ বাঘছি, চেঙ্গিস কশোকুন সহ আরো অনেকে। এই ধারাবাহিক সিরিজটি ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর টি আর টি.১ এ প্রথম প্রচারিত হয়। ধারাবাহিকভাবে সিরিজটির ১৫০ টি পর্ব প্রচারিত হয়। ১৫০ তম পর্ব ৬ জুন ২০১৯ এ প্রচারিত হয়। এই ১৫০ টি পর্ব আবার ৫ টি সিজনে বিভক্ত। প্রতিটি পর্বই প্রায় ২ ঘণ্টা ১০/১৫ মিনিটের মত। তুর্কি ভাষা ছাড়াও এটি প্রায় ৩৯ টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ভেনিজুয়েলা, তিউনিসিয়া, উজবেকিস্তান, সোমালিয়া, পাকিস্তান, জর্দান, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো অনেক দেশে জাতীয় ও বেসরকারী টিভি চ্যানেলে এই সিরিজটি তাদের নিজ ভাষায় অনুবাদ করে প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া নেটফ্লিক্সেও এই জনপ্রিয় সিরিজটি পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য, দিরিলিস আরতুগুল গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে 'Best dramatic work in the history of global dramas' হিসেবে। দিরিলিস আরতুগুল এর পরে আরতুগুল এর পুত্র ওসমান গাজী জীবনী নিয়ে ‘কুরুলুস উসমান’ নামে একটি সিরিজ বর্তমানে সম্প্রচারিত হচ্ছে।
সিরিজে সুলাইমান শাহ এর চরিত্রে অভিনয় করেন সেরদার গোখান; Image Courtesy: allbestinspirationalquotes.com

এই জনপ্রিয় সিরিজটি নির্মাণ করেন মেহমেত বোজদাগ। অবাক করা হলেও সত্যি দিরিলিস আরতুগুলে যে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী দেখানো হয়েছে তা মাত্র সাত পাতার একটি প্রাচীন উৎস থেকে পাওয়া। এই উৎস এখন তুর্কিশ আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। সিরিজটি যথাযথ চিত্রায়নের জন্য হলিউডের এক্সপেন্ডিবলস ২, রন ইন, কোনান দ্য ব্যারব্যারিয়ানের মত চলচ্চিত্রের প্রোডাকশন টিমকে নিয়োগ করা হয়। যারা অভিনেতা, ঘোড়া ও অন্যান্য দৃশ্যের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন। এই সিরিজটির দৃশ্যায়ন করা হয় তুরুষ্কের রিভা গ্রামে।

প্রতি পর্বে ৭ লক্ষ আমেরিকান ডলার বাজেট সম্পন্ন এই সিরিজটি শিল্প নির্দেশনার ক্ষেত্রে টেলিভিশনের ইতিহাসে একটি অন্যতম মাইলফলক। ঐতিহাসিক বলেই সিরিজটি শুধু জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। সিরিজের চরিত্রগুলোর অনবদ্য অভিনয়, চমৎকার সাজসজ্জা, আবহসংগীত, অ্যাকশন দৃশ্য সবকিছু মিলিয়ে দর্শকদের কাছে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক নেতা ইবনে আরাবীর চরিত্রে অভিনয় করেন উসমান সয়কুত; Image Courtesy: Twitter
প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক নেতা ইবনে আরাবীর চরিত্রে অভিনয় করেন উসমান সয়কুত; Image Courtesy: Twitter

সিরিজটিতে পরিচালক মেহমেত বোজদাগ নারীদের যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা ছিল প্রশংসনীয়। অন্যান্য টিভি সিরিজ বা চলচ্চিত্রে মুসলিম নারীদের দেখানো হয় তারা পশ্চাৎপদ, দুর্বল, নিপীড়িত। কিন্তু দিরিলিস আরতুগুলে দেখানো হয় ভিন্ন রূপে। তৎকালীন কায়ি গোষ্ঠীর অর্থনীতি নির্ভরশীল ছিল কাপড় ব্যবসার ওপর। আর এই কাপড় তৈরি করত নারীরা। কায়ি গোষ্ঠীর অর্থনীতিতে নারীর অবদান, যুদ্ধক্ষেত্রে নারী যোদ্ধা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত সুন্দরভাবে এই সিরিজটিতে দেখানো হয়েছে।

সিরিজে সমাজে নারীদের ভূমিকা ইতিবাচকভাবে ফুটে উঠেছে; Image Courtesy: medium.com
সিরিজে সমাজে নারীদের ভূমিকা ইতিবাচকভাবে ফুটে উঠেছে; Image Courtesy: medium.com

দিরিলিস আরতুগুল এর সাথে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় করিয়ে দেয় একুশে টিভি। ১৪ নভেম্বর, ২০১৬-এ সীমান্তের সুলতান নাম দিয়ে এর কিছু পর্ব প্রচার শুরু করে একুশে টিভি। কিন্তু পরবর্তীতে এর সম্প্রচার তারা বন্ধ করে দেয়। এরপর মাছরাঙ্গা টিভি ২ এপ্রিল, ২০১৭ থেকে দিরিলিস আরতুগুল প্রচার শুরু করে। এই সিরিজের প্রথম ও দ্বিতীয় সিজন সম্প্রচারের পর মাছরাঙ্গা টেলিভিশন অজ্ঞাত কারণে এর সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।

বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বহু টিভি চ্যানেলে সিরিজটি প্রচারিত হয়েছে; Image Courtesy: AFP
বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বহু টিভি চ্যানেলে সিরিজটি প্রচারিত হয়েছে; Image Courtesy: AFP

প্রাশ্চাত্য ভাবধারার বাইরে গিয়ে শালীনতা ও নৈতিকতার মানদন্ড বজায় রেখে কোটি কোটি মানুষের মন জয় করে বিশাল আর্থিক সাফল্য যে পাওয়া যায় তা-ই প্রমাণ করেছে দিরিলিস আরতুগুল। দিরিলিস আরতুগুলের ভালো প্রোডাকশন, ঐতিহাসিক ঘটনা, শিল্পীদের অনবদ্য অভিনয় মন জয় করেছে কোটি-কোটি দর্শকের। মুসলিমদের কাহিনী বা চরিত্র নিয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র বা সিরিজ নির্মাণ করা যায় না এমন পূর্ব ধারণাকেও ভ্রান্ত প্রমাণ করেছে দিরিলিস।

Feature Image Courtesy: medium.com