আঠারোজন ঘোরসওয়ারের বাংলা জয়

১২০৪ সালের ঘটনা। বাংলায় তখন হিন্দু সেন রাজাদের রাজত্ব চলছে। আশি বছর বয়স্ক বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণ সেন তখন বাংলার মসনদে। রাজধানী বিক্রমপুর ছেড়ে এসেছেন পশ্চিম বাংলার নদিয়ায়। জীবনের শেষ কয়টা দিন গঙ্গার তীরে পবিত্র ভূমিতে কাটাবেন বলে। কিন্তু তার এই সুখ বেশি দিন থাকলো না। রাজগণকের গণনার ফলাফল শুনে সবার মুখের কথা যেন নাই হয়ে গেল। ক্রমেই দুশ্চিন্তা আর ভয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল রাজসভাসদদের মুখে।

গণনার ফলাফল বলছে শীঘ্রই রাজ্যে তুর্কি আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। তুর্কি মুসলিমরা উত্তর ভারত ও দিল্লির মসনদে অনেকদিন ধরে রাজত্ব করছে। তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী তখন বিহার জয় করে বাংলার দিকে এগিয়ে আসছেন।

বেশ কিছুদিন ধরেই রাজ্যে তুর্কি আক্রমণের আশঙ্কা করা হচ্ছিল। গণনার ফলাফলের পর সেই আশঙ্কার কালো মেঘ যেন জেঁকে বসল রাজা, পাত্র-মিত্র ও সভাসদদের মনের আকাশে। সাবধানী রাজা লক্ষ্মণ সেন গুপ্তচর পাঠালেন বিহারে তুর্কি বীরের সম্পর্কে খোঁজ-খবর জেনে আসার জন্য। গুপ্তচর এসে যে খবর দিল তাতে সবার মুখ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল। পুঁথির কথার সাথে হুবহু মিলে গেছে বখতিয়ার খিলজীর চেহারা, আকার-আকৃতি ও গঠন।

রাজা লক্ষণ সেন গণনার মাধ্যমে জানতে পারলো শীঘ্রই বাংলায় তুর্কি আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে; Image Courtesy: bytwodesign.com
রাজা লক্ষণ সেন গণনার মাধ্যমে জানতে পারলো শীঘ্রই বাংলায় তুর্কি আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে; Image Courtesy: bytwodesign.com

রাজ্যের পণ্ডিতেরা রাজাকে পূর্ব বাংলায় ফিরে যেতে অনেক অনুরোধ করলেন। কিন্তু তাতে রাজার শরীর ও মন সায় দিল না। বৃদ্ধ রাজা নদিয়া থেকে যেতে চাইলেন না, যা হবার এখানেই হবে। নিজেকে সঁপে দিলেন ভাগ্যের হাতে। অনেকে চলে গেলেন রাজধানী বিক্রমপুরে। রাজা সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। তাছাড়া আশি বছর বয়সে শরীরে আর কত ধকল সয়!

তবে লক্ষ্মণ সেন কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে রইলেন না। রাজ্য রক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে লাগলেন সেনাবাহিনীর বিশাল বহর। তখনকার সময়ে বাংলায় আক্রমণের একটিমাত্র পথ খোলা ছিল আর তা হল রাজমহলের পাশে তেলিয়াগড়ের গিরিপথ। বাকি তিন দিকেই ছিল বন-জঙ্গল, সমুদ্র ও দুর্গম পথের বাধা।

রাজা লক্ষ্মণ সেন সেই একটিমাত্র পথে ব্যাপক সৈন্য প্রহরার ব্যবস্থা করে তুর্কি আক্রমণের ভয় মন থেকে বিদায় করে অবকাশ যাপনে মেতে রইলেন।

শিল্পীর চোখে বখতিয়ার খিলজী; Image Courtesy: kalayi.blogspot.com
শিল্পীর চোখে বখতিয়ার খিলজী; Image Courtesy: kalayi.blogspot.com

এদিকে দক্ষ সেনাপতি বখতিয়ার কিন্তু ঠিকই বাংলা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন৷ তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান সেনানায়ক৷ তার অসাধারণ যুদ্ধ কৌশলের জন্য দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক তাকে দিয়েছিলেন বিশেষ মর্যাদা। বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমণের পূর্বে এর পথঘাটের অবস্থা ভালোকরে দেখে বুঝলেন-তেলিয়াগড় দিয়ে আক্রমণের কাজ হবে বোকামির সমতুল্য। কিন্তু তাই বলে তো আর চুপ করে বসে থাকা যায় না। তাই অবলম্বন করলেন নতুন যুদ্ধ কৌশল।

তার সেনাবাহিনীকে ভাগ করলেন ছোট ছোট অনেকগুলো দলে। নিজে সতেরোজন সৈন্যের একটি ছোট দল নিয়ে দুর্গম বনের মধ্য দিয়ে রওনা দিলেন নদিয়ার উদ্দেশে। তারা যখন নদিয়ায় পৌঁছালেন তখন তাদের মূল সেনাবাহিনী অনেক পেছনে পড়ে গেছে। বখতিয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এই আঠারজন ঘোরসওয়ার মিলেই রাজ্যে প্রবেশ করা হবে। 

সে যুগে এ অঞ্চলে তুর্কিরা ঘোরা বিক্রি করতে আসত। আর যে অঞ্চল দিয়ে বখতিয়ার প্রবেশ করেছে সেখান দিয়ে রাজ্যে আক্রমণের কোনো সম্ভাবনা ছিল না তাই তারা বিনা বাধায় বাংলায় প্রবেশ করল।

মাত্র আঠারজন ঘোরসওয়ার নিয়েই বাংলা আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলেন বখতিয়ার খিলজী; Image Courtesy: alicdn.com
মাত্র আঠারজন ঘোরসওয়ার নিয়েই বাংলা আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলেন বখতিয়ার খিলজী; Image Courtesy: alicdn.com

আঠারজন ঘোরসওয়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল রাজপ্রাসাদের দিকে। কেউ টেরও পেল না একটু পরেই কী ঘটতে যাচ্ছে রাজ্যে!

এদিকে রাজপ্রাসাদের রক্ষীদের ওপর আক্রমণের নির্দেশ আসায় বখতিয়ারের সঙ্গীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল রক্ষীদের ওপরে। হঠাৎ আক্রমণে সহজেই কাবু হয়ে পড়ে লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদরক্ষীরা। এরপরে খোলা তলোয়ার নিয়ে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে বখতিয়ার খিলজীর আঠারো জনের ছোট্ট দলটি। হঠাৎ আক্রমণে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। প্রাসাদে তুর্কি সৈন্য দেখে তারা বুঝে নেয় সমগ্র নদিয়া তুর্কিদের দখলে চলে গেছে। তাই যে যেরকম পেরেছে জীবন নিয়ে পালিয়েছে। আগে থেকেই তুর্কি আক্রমণের ভয়ে তটস্থ ছিল সবাই। তাই সৈন্য সংখ্যা আঠার না আঠার হাজার তা গুণে দেখার সাহস কেউ করল না।

দুপুরবেলা রাজা লক্ষ্মণ সেন কেবল খেতে বসেছেন। এর মধ্যে লোকজন রাজপ্রাসাদে তুর্কি আক্রমণের খবর নিয়ে আসে। এবার টনক নড়ে রাজার, না পালালে প্রাণটা যে বেঘোরে যাবে। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রাসাদের গুপ্ত দরজা দিয়ে বের হয়ে বিক্রমপুরের দিকে নৌকা ভাসান তিনি।

বখতিয়ারের মূল বাহিনীর আক্রমণে রাজা লক্ষণ সেনের বাহিনীর চূড়ান্ত পতন ঘটে; Image Courtesy: wallpaperflare.com
বখতিয়ারের মূল বাহিনীর আক্রমণে রাজা লক্ষণ সেনের বাহিনীর চূড়ান্ত পতন ঘটে; Image Courtesy: wallpaperflare.com

এদিকে অল্পসময়ের মধ্যেই বখতিয়ারের মূল বাহিনী নদিয়ায় পৌঁছে আক্রমণ শুরু করে। তীব্র আক্রমণে লক্ষ্মণ সেনের সৈন্যরা সহজেই পরাজিত হয়।

এভাবে অভূতপূর্ব এক যুদ্ধ কৌশলের মাধ্যমে ১২০৪ সালে তুর্কি বীর বখতিয়ার খিলজীর নদিয়া দখলের মধ্য দিয়ে বাংলায় শেষ হয় হিন্দু সেন রাজাদের শাসনামল। সূচনা হয় নতুন তুর্কি মুসলমানদের শাসন।

Feature Image Courtesy: andreaeurope.com