দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভূ-রাজনীতি

এশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাদেশ। এখানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ লোক বসবাস করে।  আর এশিয়ার রয়েছে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। এশিয়ার দক্ষিণের দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান। চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশ না হলেও দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোতে রয়েছে এর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ।

চীন ও ভারত শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর থেকেই এই অঞ্চলের ভূ -রাজনীতির চাল পাল্টে যাচ্ছে। বর্তমানে এ অঞ্চলের রাজনীতি বিশ্ব কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভূ-রাজনীতি, পারস্পরিক সম্পর্ক ও উন্নতি নিয়েই আজকের এই লেখা।

দক্ষিন এশিয়ার মানচিত্র; Image Courtesy: World Regional Geography

ভারতের সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক

সম্প্রতি ভারতের সাথে এর প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। বিশেষ করে চীন শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর ভারত দক্ষিণ এশিয়াতে বেকায়দায় পড়েছে। ভারতের সাথে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, চীন, ভুটান, আফগানিস্তান, মায়ানমার, নেপালের বর্ডার রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বাদে কোন দেশের সাথেই ভারতের তেমন সুসম্পর্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

পাকিস্তানের সাথে ভারতের শত্রুতা ঐতিহাসিক। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, কাশ্মীর নিয়ে দ্বন্দ্ব, ‘৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত পাকিস্তানের অংশগ্রহণ এবং সম্প্রতি মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইল অপারেশন পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক তিক্ততা ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনেনি। চীন শক্তিশালী হয়ে উঠার আগে পাকিস্তান-আমেরিকা-চীন একজোট ও ভারত মোটামুটি নিরপেক্ষ ও জোটে আসা যাওয়ার মধ্যে ছিল। কিন্তু চীন এখন আমেরিকার শক্ত প্রতিপক্ষ। ভারতও তাদের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে ক্ষমতার জানান দিচ্ছে ও দক্ষিণ এশিয়াতে প্রভাব বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি অনেকটাই জটিল আকার ধারণ করেছে। বিগত কয়েক বছরে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পেছনেও রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূ-রাজনীতি। চীন ও পাকিস্তানের বন্ধুত্ব মুলত ভারত বিরোধের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে অনেকটা শত্রুর শত্রু বন্ধু এই প্রবাদের মতো। তাই আমেরিকা ইচ্ছা করলেও চীন-পাকিস্তান জোট ভাঙতে পারছে না এবং পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হচ্ছে। একইসাথে আমেরিকা পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমন পদক্ষেপেও আস্থা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি মোদি এবং ট্রাম্প যেন দুই বাল্যবন্ধুর মত আচরণ করছে পরস্পরের সাথে।

সম্প্রতি লাদাখ সীমান্তে ভারত চীনের সংঘর্ষে প্রায় ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে। লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় যেখানে ২০ জন সেনা মারা গেছে তার কাছেই চীন নতুন স্থাপনা তৈরি করেছে যেটা লাদাখ তথা পুরো ভারত-চীনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

লাদাখে চীন ও ভারতীয় সৈন্য; Image Courtesy: outlookindia.com

নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা ভারতের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসছে এবং চীনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলছে। নেপাল ছিল বরাবরই ভারতের বন্ধু। কিন্তু সম্প্রতি নেপাল তাদের পার্লামেন্টে নেপালের নতুন মানচিত্র পাশ করেছে যেখানে ভারতের নিজেদের বলে দাবি করা বিতর্কিত ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেকের মতানুযায়ী নেপাল আসলে চীনের মদত ও উস্কানিতেই এমন কাজ করছে।   

নেপালের মানচিত্রে নতুন অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল সমূহ; Image Courtesy: BBC

চীনের সাথে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্পর্ক

দক্ষিণ এশিয়াতে প্রভাব বিস্তারের জন্য চীন খুব ধীরস্থির ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতে প্রবেশের দ্বার হিসেবে চীন নেপালকে বেছে নিয়েছে। তাই নেপালকে হাতে রাখতে চীন বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে চীন নেপালে প্রায় আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো বিনিয়োগ করেছে। চীন আরও ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে নেপালের সড়কপথ, রেলপথ, ফাইবার কেবলের সংযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে।

চীন এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব প্রাচীন, সেই ১৯৫০ সাল থেকেই। আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার দরুন সেই পুরোনো সম্পর্ক যেন আবার নতুন যৌবন ফিরে পেয়েছে। তৈরি হচ্ছে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (China Pakistan economic corridor) যা CPEC নামে পরিচিত। ২০১৫ সালের এপ্রিলে শি জিনপিংয়ের পাকিস্তানে সফরকালে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের CPEC চুক্তি সাক্ষরিত হয়।  CPEC বা সিপেক চীনের ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড বা এক অঞ্চল, এক পথ প্রকল্পের একটি অংশ।

সিপেক; Image Courtesy: Indian Defence Review

ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড বা এক অঞ্চল, এক পথ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং দ্বারা ২০১৩ সালে প্রস্তাবিত একটি উন্নয়ন কৌশল ও কাঠামো যা অনেকটা প্রাচীন সিল্ক রোডের আধুনিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বের ৬০টি দেশের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করা হবে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে সড়ক পথে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। এই সড়ক পথের সঙ্গে রেলপথ ও তেলের পাইপলাইনও রয়েছে। চীন এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সমুদ্র পথেও যুক্ত হবে।  ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং এর ঢাকা সফরের সময় ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ যোগ দেয়। তবে ভারত এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন দুটি ইকোনমিক করিডর তৈরি করছে। একটি কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আরেকটি জিনজিয়াং থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সমুদ্রবন্দর গাওদার পর্যন্ত।

ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড; Image Courtesy: Top China Travel

এছাড়াও চীন পাকিস্তানের গোয়াদার এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় বন্দর স্থাপন করেছে। অনেক ভারতীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষক চীনের এই প্রজেক্টের নাম দিয়েছেন মুক্তোর মালা অর্থাৎ চীন তার আধিপত্যবলয় সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে ভারত মহাসাগরকে মুক্তার মালার মতো বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত নৌবন্দর দিয়ে ঘিরে ফেলবে। আবার অনেকের মতে মুক্তোর মালা প্রজেক্টের ধারাবাহিকতায় চীনের পরবর্তী নজর পড়তে পারে মিয়ানমারের সিতওয়ে বন্দর ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং; Image Courtesy: xinhuanet.com

দক্ষিণ এশিয়াতে আমেরিকা

এশিয়ায় বিশেষত পাকিস্তান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় আমেরিকার ট্রাম্প কার্ড হচ্ছে এখন ভারত। আমেরিকার দক্ষিণ এশীয় নীতি ছিল পাকিস্তান ঘেষা কিন্তু পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় আমেরিকা ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার খারাপ সম্পর্কের দরুন আমেরিকা পাকিস্তানকে দেয়া ৩০০ মিলিয়ন ডলার বা ৩০ কোটি ডলারের তহবিল বাতিল ঘোষণা করেছে। 

অন্যদিকে আমেরিকা ভারতকে স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড অথরাইজেশন-১ (এসটিএ-১) এর মর্যাদা দিয়েছে। এই মর্যাদা ফলে ভারতের কাছে এখন প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক প্রযুক্তিসহ উচ্চপ্রযুক্তি বিক্রির অনুমোদন সহজ হবে। এশিয়ায় মধ্যে এই সুবিধা শুধুমাত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে দেয়া হয়েছিল। বিশ্বের মাত্র ৩৭টি দেশকে যুক্তরাষ্ট্র এ সুবিধা দিয়ে থাকে। ২০১৬ সালে সামরিক খাতে উন্নতির জন্য ভারত ও আমেরিকা নজিরবিহীন এক চুক্তি করে। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের সামরিক বাহিনী একে অন্যের নৌ, বিমান বা সেনা-শিবিরগুলোতে গিয়ে নতুন শক্তিতে বলীয়ান হতে পারবে। সামরিক ভাষায় একে বলা হয় রিপ্লেনিশমেন্ট। এছাড়াও ট্রাম্পের প্রথম ভারত সফরেই ভারতের সাথে ৩০০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি; Image Courtesy: al jazeera

দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমানবিক শক্তি সম্পন্ন দেশ। তাই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের জন্য এই দুই দেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে; যেটা করে যাচ্ছে চীন এবং আমেরিকা। এক্ষেত্রে আমেরিকা ভারতমুখী ও চীন পাকিস্তানমুখী নীতি গ্রহণ করেছে।  

দক্ষিণ এশিয়া মধ্যপ্রাচ্য

ইরানের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক খুবই খারাপ যাচ্ছে। ইরান গ্যাস মজুদ ও জ্বালানি তেলে অন্যতম শীর্ষ দেশ হলেও আমেরিকার নিষেধাজ্ঞায় ইরান তা বিক্রি করতে পারছে না। ফলে আমেরিকার বিরোধিতার প্রশ্নে চীন ও ইরান অনেকটাই কাছাকাছি এসেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে ইরান সফরের সময় আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাথে বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তির প্রস্তাব করেন। যদিও এই চুক্তি সম্পর্কে চীন ও ইরান খোলাসা করে কিছু বলেনি কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস সহ অনেক শীর্ষ মিডিয়া এই চুক্তি সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে যা থেকে ধারনা করা যায় এই চুক্তি এ অঞ্চলের রাজনীতির চিত্র বদলে দিবে। এই চুক্তি অনুযায়ী ইরানের তেল-গ্যাস, ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর উন্নয়ন, রেলওয়ে উন্নয়ন এবং আরো কয়েক ডজন খানেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীন আগামী ২৫ বছরে কমপক্ষে ৪৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এই চুক্তি অনুযায়ী চীন তাদের বিনিয়োয়ের সুরক্ষায় ইরানে প্রায় ৫০০০ পর্যন্ত সৈন্য মোতায়েন করতে পারবে। এর মাধ্যমে চীন অফিসিয়ালি মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন করবে। বিগত এক দশকে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য ও সেনা মোতায়েন করে আসছে সেখানে চীনের বাগড়া আমেরিকা মেনে নেবে সেটা মনে করার কোনো কারণই নেই। তাই ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং; Image Courtesy: xinhuanet

এছাড়াও সৌদি আরবের সাথে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান উভয়েরই সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের ২০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়। পাকিস্তানে এক হাজার কোটি ডলারের তেল শোধনাগার স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব। সৌদি আরব ভিশন-২০৩০ কর্মসূচিতে ভারত সহ  বিশ্বের আটটি দেশের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশে ভারত ও চীনের দ্বৈরথ

ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ গভীর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সরাসরি বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে, শরণার্থী হিসেবে জায়গা দিয়েছে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশিকে। তাই ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন। ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কও রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবের সবচেয়ে বড় কারণ বলে বিবেচনা করা হয় দুই দেশের সাংস্কৃতিক মিলের কারণে। সাম্প্রতিক দুই দেশের মধ্যে স্থল ও সমুদ্র-সীমা নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময় এসব বিষয়ে অগ্রগতি একটি বড় অর্জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী; Image Courtesy: bd-pratidin.com

চীনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটে ১৯৭৫ সালে। তবে এ অঞ্চলের সাথে চীনের সম্পর্কও ভারতের মতই সুপ্রাচীন। বাংলাদেশকে চীনের সাথে যুক্ত করেছিল যে পথ তা সিল্ক রোড নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। পশ্চিমা সিল্ক রোড রাজধানী সিয়ান (তৎকালীন ছাংআন) থেকে শুরু হয়ে সিনজিয়াং হয়ে আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে ভারত হয়ে পৌঁছেছিল বাংলাদেশে (মংচিয়ালা)। কয়েক শতাব্দী ধরে এই মংচিয়ালাই ছিল চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের সেতুবন্ধ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০০ সালের ৯০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৫ সালে ১৪৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা চীন সফর করেন এবং ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশ সফর করে। সে সময় চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যে ২৬টি নানা ধরনের চুক্তি এবং সমঝোতা হয়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী চীন বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেবে বিভিন্ন খাতে যার বেশিরভাগই অবকাঠামো খাতে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং; Image Courtesy: Dhaka Courier

রাজনীতি এবং কূটনীতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা ইস্যুর সাথে সম্পর্কিত। অন্যদিকে চীনের সাথে সম্পর্কটি পুরোপুরি অর্থনৈতিক।

কিন্তু সম্প্রতি ভারত ও চীন বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে যে দ্বন্দ্বে নেমেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম। বাংলাদেশের সাথে ভারত ও চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, চীন বাংলাদেশে রপ্তানি করে ১৬/১৭ বিলিয়ন ডলার যেখানে আমদানি করে মাত্র ৭৫০ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারত রপ্তানি করে ৮ বিলিয়ন ডলার ও আমদানি করে মাত্র ২৬০ মিলিয়ন ডলার। চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে ভারতীয় কোম্পানিকে হটিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনের শেয়ার কেনায় এগিয়ে আছে। বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় ভারত ও চীনের জন্য বাংলাদেশে রয়েছে বেশ বড় বাজার।

এছড়াও বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার কারণ হিসেবে মনে করা হয় মুক্তোর মালা নামে খ্যাত প্রজেক্ট বাস্তবায়ন। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের একটি চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারবে ভারত। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশে চীনের বন্দর স্থাপন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোপরি ভারত ও চীন উভয় দেশই চায় বঙ্গোপসাগরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে। 

কিন্তু ভারত ও চীন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাতাটা খুবই কম। ভারতের সাথে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিসাব, সীমান্ত হত্যাসহ নানাবিধ অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘে চীন সরাসরি বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ভারতও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে কোনো সাহায্য করেনি। বাংলাদেশে বড় আকারে রেল প্রকল্পে, গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনে উভয় দেশই আগ্রহ দেখিয়েছে কিন্তু এসব প্রকল্প খুব বেশি এগাচ্ছে না। অর্থাৎ এই দুই দেশের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে অবকাঠামো খাতে খুব বেশি লাভবান করতে পারেনি। এছাড়াও দুটি দেশের কোনোটিই বাংলাদেশকে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় এখনো পর্যন্ত দিচ্ছে না।

ফারাক্কা বাঁধ; Image Courtesy: the independent

তবে ভারত ও চীন একই সাথে বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে যেমনটা করেছিল আমেরিকা পারস্পারিক দুই শত্রু দেশ ভারত ও পাকিস্তানের সাথে, দীর্ঘদিন মিত্রতা বজায় রেখে। বাংলাদেশের জন্য বর্তমানের ভূ-রাজনীতি অনেকটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে একই বনে দুই বাঘ থাকার কারণে। ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভারত ও চীন উভয়ের সাথেই সমঝোতা করে চলতে হচ্ছে। কোন পণ্য বা সেবা ক্রয় বা পদ্মা সেতুর মত বড় বড় প্রজেক্টে আমাদের শুধু ফাইনান্সিয়াল কস্ট-বেনিফিট হিসেব করলেই হবে না। একই সাথে নজরে রাখতে হয় পলিটিক্যাল কস্ট-বেনিফিটও।   

বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের উচিত এখন দক্ষ কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেন বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো তথা বিশ্বের অন্যন্য দেশগুলির সাথে লাভজনক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

Feature Image Courtesy: theindependentbd.com

References:

  1. Eastasiaforum.org
  2. BBC.com
  3. Aljazeera.com
  4. Cpec.gov.pk
  5. Daily-sun.com
  6. Npr.org
  7. Thehindu.com
  8. Time.com