‘গিন্নী মা’: দেহান্তর বিদ্যা নিয়ে অবিস্মরণীয় এক গল্প

সেই চতুর্দশ শতাব্দী থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত খুব শোনা যেত ডাকিনীবিদ্যা চর্চার কথা। প্রচুর নারীকে তখন পুড়িয়েও মারা হয়েছে ডাইনী অপবাদ দিয়ে। তবে সত্যিকার অর্থেই যে কোন ডাইনী ছিল না এমন নয়। অনেকেই যুক্ত ছিল এই ডাকিনীবিদ্যা চর্চার সাথে। তবে যখন তারা বুঝতে পার‍তো শেষ হয়ে আসছে তাদের সময়, তখন তারা আশ্রয় নিত অদ্ভুত এক কৌশলের। নিজের আত্মাকে ট্রান্সফার করে দিতো অন্য কারো দেহে। ‘চাইল্ডস প্লে’ সিনেমায় দেখা চাকী নামের সেই পুতুল ভূতের কথা এক্ষেত্রে আমাদের মনে পড়তে পারে। এক সিরিয়াল কিলারের আত্মা সে পাঠিয়েছিল এক পুতুলের মধ্যে। আর সেই পুতুলের চেষ্টা ছিল যেমন করেই হোক, আত্মাটি কোন মানুষের শরীরে প্রবেশ করানোর।

পাঠক, আসুন এবার ‘গিন্নী মা’ গল্পটার কথা জানি। গিন্নী মা পক্ষাঘাতগ্রস্থ একজন মানুষ। বয়স অনেক হয়েছে তার। কত হয়েছে তার আজ আর হিসেব নেই। বিছানায় শুয়ে আছেন তিনি পঞ্চান্ন বছর যাবত। হ্যাঁ, একটি-দুটি নয়, পঞ্চান্নটি বছর ধরে একটি ঘরে বন্দী হয়ে আছেন গিন্নী মা। তার প্রকৃত নাম কী তা আমরা জানিনা। তবে বৃদ্ধ গৃহপরিচারিকা তাকে গিন্নী মা বলেই সম্বোধন করেন।

ডাকিনীবিদ্যার প্রতীকী ছবি; Image Courtesy: timeshighereducation.com

তার বাড়িতে এসেছে নতুন কাজের লোক। নাম মলিনা। মলিনাকে কাজকর্ম নিয়ে কড়া নির্দেশনা দিতে থাকেন তিনি। কোন কাজটা কখন কীভাবে করতে হবে, তা থেকে শুরু করে হাত থেকে যেন কিছু পড়েটড়ে ভেঙে না যায়, এসব কিছু নিয়েই তাকে নির্দেশনা দেন তিনি। পাশাপাশি তাকে নিয়ে আরো আশঙ্কা প্রকাশ করেন প্রবীণ সেই পরিচারিকা। মেয়েটি কি আর ফিরে যেতে পারবে তার বাড়িতে? তার স্বামীর কাছে? – এ নিয়ে একরকম উদ্বেগ প্রকাশ পায় তার কণ্ঠে।

কেন এমন আশঙ্কা তা ক্রমশ প্রকাশিত হতে থাকে কবি ও গল্পকার কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় রচিত চিরায়ত হরর গল্প ‘গিন্নী মা’-য়। এ গল্পে যেন অসীম সময় ধরে প্রবাহমান এক চক্রের কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

‘গিন্নী মা’ কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় রচিত চিরায়ত হরর গল্প; Image Courtesy: Youtube.com

দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের অচলায়তনে থাকতে থাকতে গিন্নী মা-র শরীর এখন খুব স্থূল। দেখতেই কেমন কদর্য-কুৎসিত লাগে। হাতগুলো দানবের আকৃতি ধারণ করেছে। মলিনাকে দুপুরের খাবার নিয়ে যেতে হয় তার কাছে। গিন্নী মা তার নির্দয়-নিষ্ঠুর দুটো চোখ দিয়ে খুনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে! তার সেই মোটা হাতগুলোর স্পর্শ মলিনার মনে কেমন এক ঘৃণার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। গিন্নী মা তাকে সম্বোধন করে ‘বাছা’ বলে। বলে তার মাথাটা একটু টিপে দিতে। আর সেটা করতে গেলেই দানবীয় দুটো হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে ফেলে তার হাত।  সাথে তার চোখের সেই ক্রুর দৃষ্টি আর কুৎসিত কিছু কথা। পঞ্চান্ন বছর ধরে শারীরিক চাহিদা পূরণ থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়েছে গিন্নী মা-কে। তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ আর বঞ্চনার কথা ঝরে ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে।  

কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়; Image Courtesy: telegraphindia.com

প্রতিদিন গিন্নী মা-র মুখোমুখি হতে হবে এ কথা ভাবলেই মলিনার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যায় আতঙ্কের শীতল স্রোত। সে করতে থাকে ঘরের অন্যান্য কাজ। আর সাথে সাথে জানতে পারে আরো অনেক কিছু। এ বাড়ির এক পরিচারিকার রহস্যময় মৃত্যু হয়েছে আমগাছে ঝুলে! আরো কেউ কেউ আছে যারা হয়ে গেছে নিখোঁজ! কোথায় গেছে তারা? তবে কি অতল কোন অন্ধকারের আবরণ এসে গ্রাস করে নিয়েছে তাদের?

মলিনা অপেক্ষা করতে থাকে কখন সন্ধ্যা হবে। তার স্বামী কখন তাকে নিতে আসবে। স্বামী ট্যাক্সি চালায়। অভাবের সংসার, তাই দুজনকেই কাজ করতে হচ্ছে। উদ্বিগ্ন মলিনা কাজে মন দিতে পারেনা। হাত থেকে ফেলে একটা পাত্রও ভেঙে ফেলে। একসময় সন্ধ্যা নামে আসে। মলিনা শুনতে পায় গাড়ির হর্ন। তার স্বামী এসে গেছে তাহলে!
সে প্রস্তুতি নিতে থাকে চলে যাওয়ার। ঠিক তখনি পরিচারিকার রহস্যময় কণ্ঠে নির্দেশ- ‘গিন্নী মা দেখা করতে বলেছেন তোমাকে।’

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কামাক্ষীপ্রসাদ (সর্বডানে); Image Courtesy: eisamay.indiatimes.com

অনিচ্ছাসত্ত্বেও মলিনা যায় উপরে। তারপর আবারো গিন্নী মা-র সেই নিষ্ঠুর চোখ। মাথা টিপে দিতে বলে তার  সেই হাতদুটো এবার শক্তভাবে ধরে ফেলে মলিনাকে। গিন্নী মা-র কণ্ঠে ঈর্ষা ঝরে পড়ে, পঞ্চান্ন বছর ধরে কোন পুরুষসঙ্গ না পাওয়ার ঈর্ষা!

এবারে খুবই চমকপ্রদ একটা ব্যাপার ঘটে। গিন্নী মার আত্মার দেহান্তর ঘটে মলিনার দেহে! মলিনার আত্মা বিছানায় গিন্নী মার দেহে শুয়ে বুঝতে পারে, পঞ্চান্ন বছর ধরে সে হাঁটেনি, আর কখনোই সে হাঁটতে পারবে না।  

চাইল্ড’স প্লে ছবিতেও আমরা দেখি দেহান্তর-বিদ্যার প্রয়োগ; Image Courtesy: Youtube.com

কামাক্ষীপ্রসাদ তাঁর এই গল্পে দেহান্তরবিদ্যা নিয়ে চমৎকার কাজ করেছেন। ডাকিনীবিদ্যায় এর চল ছিল। আত্মাকে অবিনশ্বর করে রাখার জন্য ডাইনীরা নিজেদের আত্মাকে ট্রান্সফার করতো অন্য কারো দেহে। আর তার আত্মা নিয়ে নিতো নিজেদের ভেতর! লেখার শুরুতে পাঠক জেনেছেন এ বিষয়ে।

এই গল্পের গিন্নী মাও তেমনই এক ডাইনী। সময় চলে যাবে, যেতে থাকবে- কিন্তু গিন্নী মার জৈবিক চাহিদাপূরণের জন্য বলি হতে হবে এমন আরো বহু মলিনাকে। কিন্তু গিন্নী মার এই দেহান্তরের শেষ হবে কবে? আমাদের জানা নেই। হয়ত এর ব্যাপ্তি অসীম, চলতে থাকবে অনন্তকাল ধরে! 

Feature Image Courtesy: Youtube.com