সুনীলের ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’: ক্ষুধা কিংবা বাঁচার আকুতি

ভূত কিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি

ভূতের তেলে ওষুধ হবে স্বপ্নে আদেশ পেয়েছি

প্রতি অমাবস্যায় নিশুতি রাতে ওরা আসে। উঠতি বয়সের এগারোজন ছেলে। গলা ছেড়ে গাইতে থাকে এই গান।

‘ভূতের নাতি ভূতের পুতি বুড়ো হাবড়া ছোঁড়াছুঁড়ি

যেমন তেমন ভূত পেলে ভাই হবে না আর ছাড়াছাড়ি

ভূত জিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি

ভূতের তেলে ওষুধ হবে স্বপ্নে আদেশ পেয়েছি 

দশ টাকা! দশ টাকা! দশ টাকা!’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গল্প ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’– তে এভাবেই গান গেয়ে ভূত কেনার কথা বলে গ্রামের জোয়ান ছেলে-পেলেরা।

এদের নেতা সুরেন্দ্র, সুরেন নামে পরিচিত। সুরেন, নিতাইদের দলটা এসে থামে নিবারণের বাড়ির কাছে। তার বুড়ো বাপ পবন ডাকে ওদের। এখান থেকে আমাদের পরিচয় হয় এই দরিদ্র পরিবারটির সাথে। গল্পের মূল চরিত্র সুরেন্দ্র হলেও গল্পের মূল নিয়ামক বলা যায় এই পরিবারটিকে।

আমরা দেখি প্রচণ্ড দরিদ্র পবন গোবর মিশিয়ে তামাক খাচ্ছে! ঘরে লন্ঠন নেই। নিবারণের স্ত্রী নিতাইদের লন্ঠন নিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যাচ্ছে।

সুরেন অনেক আগে গ্রাম ছেড়েছিল। তখন গ্রামের চৌধুরী বাবুদের খুব দাপট। মেজোবাবুর হাতে তুচ্ছ একটা কারণে মার খেয়ে সুরেন এক কাপড়ে গ্রাম ছেড়ে গিয়েছিল।

লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; Image Courtesy: muktamancha.com

গ্রামের মানুষ জানত সে রেলস্টেশনে কাজ করে। কিন্তু সুরেন এখন প্রতি সপ্তাহে শনি-রবিবার গ্রামে আসে। চকচকে শার্ট, হাতে হাতঘড়ি আর পকেটভর্তি টাকা। প্রতি অমাবস্যার রাতে বের হয় সেই টাকা বিলোতে। শর্ত হলো ভূত দিতে হবে।

ভূত কেনা বলতে সুরেন কী বোঝায় তা অবশ্য গ্রামের মানুষ বোঝে। লেখকের ভাষায়সবাই তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে থাকে না

সুরেনকে রেলস্টেশন থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজ সন্তানের মত মানুষ করেছেন ফাদার পেরেরা। বড় ডাক্তার উনি, কোলকাতায় প্রচুর নাম-ডাক। তার মেডিকেল কলেজে কঙ্কাল সাপ্লাইয়ের কাজ করে সুরেন। এখন দশ টাকা বেড়ে রেট গেছে একশো টাকায়। একশো টাকায় কিনে ফাদারের কাছে বেচে আড়াইশো টাকায়। লাভজনক ব্যবসা, ভালোই চালিয়ে যাচ্ছে সে।

সুরেনের বাবার মৃত্যুটা ছিল রহস্যময়। ট্যাঁকভর্তি ধান বিক্রির টাকা নিয়ে ফিরছিল মানুষটা। খুন হয়ে গেলো! লোকে বললো ভূতের কারবার। পবন দেখেছিল সেই লাশ। চোখ উলটে গেছে, ভয়ে কালসিঁটে পড়ে গেছে মুখে!

দারিদ্র‍্যর প্রতীকী ছবি; Image Courtesy: richmondvale.org

সুরেন গ্রামে ফিরে বলতো- আত্মা বলে কিছু নাই এ নিয়ে গ্রামের যোগেন মাস্টার ওকে প্রশ্ন করলে শান্ত-সুবোধ বালকের মতো সব মেনে নেয় সে। শেষে বলে- ‘আমার বাবার ট্যাঁকে সেদিন ধানবেচা টাকা ছিল তার একআধলাও পাওয়া যায়নি কে নিল সেই টাকা? আত্মা না পরমাত্মা? কার বেশী টাকার দরকার?’

গ্রামের লোক ভাবতে শুরু করে খ্রিষ্টান হয়েছে সুরেন্দ্র। কিন্তু সেবারই বড় করে দুর্গাপূজাও করায় সে। চৌধুরীবাড়িতে এতদিন হতো পূজা। সেটাকে সেখান থেকে বের করে সে নিয়ে এলো গ্রামের জনমানুষের কাতারে।

এতক্ষণ শুধু সুরেনের কথাই বলছিলাম। নিবারণের সংসারেও এদিকে অনটন আরো বাড়তে থাকে। তারা ছিল বংশ-পরম্পরায় ঘরামী। এখন ঘরের কাজ যা হয় শহর থেকে মিস্ত্রি আসে। তাই ঘরামীর পেশা ছেড়ে নিবারণকে নিতে হলো মাটি কাটার কাজ। মহাজনের কাছে নিজ জমি বন্ধক রেখে এখন সেখানে বর্গাচাষী হয়েছে সে। আর এই মাটিকাটার কাজ হবে একদিন পরপর। দিনে পারিশ্রমিক সাড়ে চার টাকা।

সাড়ে চার টাকা, নিবারণের জন্য অনেক। এই টাকায় অন্তত কিছুটা চাল কিনতে পারবে সে। সাড়ে চার টাকা তার কাছে এক পৃথিবী সুখ!

দারিদ্র্য যে কতোটা প্রকট হতে পারে, কতোটা অভিশাপ বয়ে আনতে পারে তা অবশ্য আমরা দেখতে পাবো আরো সামনে।  

হাসিমুখের আড়ালে দারিদ্র‍্যের কষাঘাত; Image Courtesy: Neeraj Kumar Photography

গ্রামীণ কুসংস্কারের কথাও উঠে এসেছে গল্পটিতে। সুরেনকে নিবারণসহ আরো কয়েকজন ডেকে নিয়ে যায় ভূত ছাড়াতে।

সুরেন তখন বিছানায় শুয়ে তার মৃত মা-র কথা ভেবে চোখের পানি ফেলছিল। এই একটাই দুর্বলতা বা কষ্টের জায়গা আছে তার। সে গ্রাম ছেড়ে গিয়েছিল রাগের বশে, তার মা ওলাওঠায় তিনদিন ধরে মরে পড়েছিল এই ঘরেই, কেউ আসেনি!

ওদের ডাকে সে যায় সর্বানন্দর বাড়ি। তার পুত্রবধূকে কেমন ভূতে ধরেছে তা দেখতে। কিন্তু কিসের কী! একজন মৃগিরোগীকে কীভাবে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ওঝা দিয়ে ঝাঁড়-ফুক করানো হয় তা-ই দেখে সে। প্রতিকারও করে আসে শক্ত হাতে। সে ফাদার পেরেরার কাছে মানুষ হয়েছে, এসব বুজরুকিতে তার অন্তত বিশ্বাস নেই। এদিকে নিবারণের কপালে নেমে আসে আরো দুর্গতি। জমিতে লাগানো ফুলকপির সব চারা নষ্ট হয় ভারী বৃষ্টিতে। শীতকাল, তবু বৃষ্টি থামার নাম নেই। কয়েকদিন খাবার জোটেনি তাদের। নিবারণের বউ সন্তান-সম্ভবা, কিন্তু তাদের কাউকেই খাওয়াতে পারার মত ক্ষমতা নেই তার। সে আশা করেছিল তার বুড়ো বাপ এবার পটল তুলবে! কিন্তু বুড়ো এবারের শীতেও বেঁচে গেলো ঠিকই।

বই হাতে লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়; Image Courtesy: anandabazar.com

গল্পটার শেষে এসে শুরু হয় এক অন্য লড়াই। এই পরিবারের প্রতিটি মানুষ ক্ষুধার্ত। তাদের রাক্ষুসে ক্ষুধা মেটানোর চিন্তাটাই করে তারা সবার আগে। আর তাই শেষপর্যন্ত এক কঠিন পথে পা বাড়ায় নিবারণ। যাতে ক্ষুধাটা মেটানো যায় সবার আগে। একটু গরম ভাত হয়ে দাঁড়ায় জীবনের চেয়েও বড়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প হিসেবে স্বীকৃত এই গল্পটি। ক্ষুধা মেটানোর সংকটই যে জীবনে সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তার কাছে যে তুচ্ছ হয়ে পড়ে অন্য সবকিছু, এমনকি অন্য কারো জীবনও এটাই অত্যন্ত দক্ষ হাতে তুলে এনেছেন তিনি। গ্রামীণ জীবনের নানাবিধ সংকট, কুসংস্কারের কথাও এসেছে গল্পটিতে। সবমিলিয়ে, সুনীলের এই গল্পটি বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয়, কালোত্তীর্ণ সংযোজন।

Feature Image Courtesy: newsviews.media