হোমিওপ্যাথির কিছু মূলনীতি

১৭৯৬ সালের কথা। জার্মান চিকিৎসক ও দার্শনিক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান প্রথাগত চিকিৎসা পদ্ধতি অর্থাৎ অ্যালোপ্যাথির পরিবর্তে বললেন নতুন এক চিকিৎসা পদ্ধতির কথা। তাঁর ভাবনা ছিলো ওষুধে যেহেতু রোগ আরোগ্য হয়, তবে কি ওষুধ রোগ সৃষ্টিও করতে পারে?  

এরিস্টটল, হিপোক্রেটিস, ইবনে সিনা কিংবা চরক- এদের প্রত্যেকেই জানতেন সদৃশ দ্বারা সদৃশ নিয়মটির কথা। এই নিয়মে একটি সদৃশ রোগের চিকিৎসা করার কথা অন্য সদৃশ রোগ দ্বারা। তবে তখনও এর কৌশল আবিষ্কৃত হয়নি।

হ্যানিম্যান মূলত এই তত্ত্বই প্রয়োগ করতে চাইলেন। নিজের শরীরকেই বেছে নিলেন মাধ্যম হিসেবে। ওষুধ প্রয়োগ করে দেখলেন তা সুস্থ শরীরকে অসুস্থ করে তুলছে। তিনি সংগ্রহ করে নিলেন ওষুধ দ্বারা সৃষ্ট রোগ-লক্ষণগুলো। তাঁর পর্যবেক্ষণে প্রমাণিত হলো এ ধরণের কোনো রোগ-লক্ষণ রোগীতে প্রকাশ পেলে সদৃশ লক্ষণের ওষুধ প্রয়োগে রোগ নিরাময় সম্ভব। এখান থেকেই মূলত হোমিওপ্যাথির যাত্রা শুরু।

ওষুধ

প্রথমে আসা যাক ওষুধ প্রসঙ্গে। হ্যানিম্যান মনে করতেন ওষুধ হলো কৃত্রিম রোগ। ওষুধ রোগের সদৃশ না হলে এবং ওষুধের মাত্রা রোগের মাত্রার চেয়ে বেশি হলে সেটি রোগীর দেহে ভিন্ন রোগ বা কষ্ট সৃষ্টি করবে। অ্যালোপ্যাথিতে যেমন ওষুধের সাইড-ইফেক্ট থাকে, বিষয়টি তেমনই। 

হ্যানিম্যান মনে করতেন রোগ তখনই শরীরে বাসা বাঁধবে, যখন সেটিকে বাধা দেবার মত প্রতিরোধ-ক্ষমতা শরীর রাখবে না। সেক্ষেত্রে তাঁর মতে, ওষুধ এমন হতে হবে যা প্রয়োগ করা হলে তা কৃত্রিম রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম হবে।

Image Courtesy: medgadget.com

এক্ষেত্রে অবশ্য হ্যানিম্যান মানসিক বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বিবেচনায় রোগ হলো দেহের জীবনীশক্তি বিরোধী কোনো নেতিবাচক ক্রিয়ার ফলে উত্তেজিত বা বিশৃঙখল জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়া। তিনি শল্য চিকিৎসা বা সার্জারির প্রয়োজনের বিষয়টি স্বীকার করতেন। তবে এর বাইরে অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে তিনি দেহ ও মনের বিশৃঙখল অবস্থাকে শৃঙখলায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। এককথায়, তাঁর বিবেচনায় রোগ মন ও দেহের অবস্থা বা পর্যায়ের নাম।

জীবনীশক্তি

হ্যানিম্যানের আরেকটি খুব গুরুত্বের জায়গা হলো জীবনীশক্তি। তাঁর মতে, শরীর জীবিত থাকে জীবন পরিচালনাকারী অদৃশ্য এক শক্তির দ্বারা। এর নাম জীবনীশক্তি। তিনি মনে করতেন অঙ্গ বা তন্ত্রে নয়, রোগ এবং ওষুধের ক্রিয়া জীবনীশক্তিতে।

হোমিওপ্যাথির জনক ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান; Image Courtesy: icnnational.com

 

শক্তিকৃত ওষুধ

হোমিওপ্যাথিতে মনে করা হয় রোগ জীবনীশক্তির ওপর ক্রিয়া করে। অতএব, রোগ কোনো বস্তু নয়, এটাও এক প্রকার শক্তি।

হ্যানিম্যান চিকিৎসা শুরু করেছিলেন মাদার টিংচার দিয়ে। কিন্তু তাতে দেখা গেলো, সদৃশ লক্ষণে ওষুধ প্রয়োগে প্রথমে রোগ বাড়ে। এছাড়া, মাত্রা বারবার স্বল্প-বিরতিতে দেয়া যায় না ও জটিল-গভীর মূল রোগ আরোগ্য হয় না।

তাই তিনি আবিষ্কার করলেন ওষুধের ক্ষীণায়ন, তরলায়ন ও শক্তিকরণ পদ্ধতি। পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি প্রথমে শততমিক পরে সহস্রতমিক শক্তির ওষুধ উদ্ভাবন করেন

শততমিক পদ্ধতিতে প্রত্যেক ধাপে পূর্ববর্তী ধাপের ওষুধের ১০০ ভাগের এক ভাগ নেয়া হয়। এবারে হয় ক্ষীণায়ন, অর্থাৎ ওষুধের মাত্রা কমে। পরে পানি ও এলকোহলে ওষুধ তরলীকৃত করা হয়। আর সবশেষে ঝাঁকি দিয়ে ঘর্ষণের মাধ্যমে করা হয় শক্তিকৃত।

হোমিও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় শততমিক ও সহস্রতমিক পদ্ধতি; Image Courtesy: wordonism.com

ক্ষুদ্রতম ওষুধ মাত্রা

ক্ষুদ্রতম ওষুধ মাত্রা নির্ধারণে দুটো টার্ম ব্যবহৃত হয়। একটি রোগ মাত্রা (Pathogenic dose) ও অপরটি আরোগ্য মাত্রা (Curative dose)।

সুস্থ শরীর পরীক্ষার সময় ওষুধের যে ক্ষুদ্র মাত্রায় রোগ জন্মে তা রোগ মাত্রা। রোগে জীবনীশক্তি হ্রাস পায়। ওষুধেরকাজ কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি। ফলে কমে যাওয়া জীবনীশক্তি সহজে ওষুধে আবিষ্ট হয়। তাই যে মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগে আরোগ্যের কাজ হয় ও কোনো সাইড-ইফেক্ট তৈরি হয় না, তা আরোগ্য মাত্রা।

ডা. কেন্টের লেখা ‘হোমিওপ্যাথিক ম্যাটেরিয়া মেডিকা’ বইয়ের প্রচ্ছদ; Image Courtesy: Wikipedia.com

স্থায়ী রোগ এর কারণ

হোমিওপ্যাথিতে শুধুমাত্র রোগ উপশম নয়, গুরুত্ব দেয়া হয় রোগের লক্ষণ চিকিৎসার। হোমিওপ্যাথিতে কোনো রোগের সুনির্দিষ্ট নাম নেই, কারণ এখানে রোগকে চিকিৎসা করা হয় না, করা হয় লক্ষণসমষ্টির

এক্ষেত্রে অস্থায়ী ও স্থায়ী- দুরকম রোগের কথা বলেছেন হ্যানিম্যান। অস্থায়ী রোগের কারণ নির্দিষ্ট সময় শেষে আপনা- আপনি শেষ হয়। কিন্তু স্থায়ী রোগের ক্ষেত্রে তা হয় না। হ্যানিম্যান স্থায়ী রোগের কারণ হিসেবে তিনটি মায়াজমকে দায়ী করেন। এগুলো হলো- সোরা, সাইকোসিস ও সিফিলিস। প্রত্যেকটির আছে আলাদা আলাদা লক্ষণসমষ্টি। সোরার ক্ষেত্রে স্নায়ু বিশেষত মস্তিষ্ক, সাইকোসিসের ক্ষেত্রে হৃদপিণ্ড ও সিফিলিস এর ক্ষেত্রে অস্থিকে চূড়ান্ত আক্রমণের জায়গা ধরা হয়। প্রতিটি মায়াজমের লক্ষণগুলোকে পুরোপুরি শেষ করতে না পারলে রোগ আরোগ্য সম্ভব নয়।  

‘হোমিওপ্যাথিক ম্যাটেরিয়া মেডিকা’ বইয়ের লেখক ডা. কেন্ট; Image Courtesy: 1.bp.blogspot.com

সদৃশের নিয়ম

হোমিওপ্যাথির মূল ভিত্তি সদৃশের নিয়ম, যার কথা লেখার শুরুতেই বলা হয়েছে। এবার এ সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত জানা যাক।

হ্যানিম্যান বিশ্বাস করতেন সদৃশ রোগকে সদৃশ রোগই দূর করে। বস্তুজগতে যে ওষুধ যে ধরনের রোগ- যন্ত্রণা সৃষ্টি করে, প্রাকৃতিক রোগ-যন্ত্রণাকে সে ওষুধই নিরাময় করতে পারে। এক্ষেত্রে সদৃশ রোগ যদি অল্পমাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ করে সৃষ্টি করা হয়, তবে তা জীবনীশক্তিকে আক্রমণ করবে না এবং রোগ দূর হবে। কিন্তু অসদৃশ ওষুধ স্বল্পমাত্রায় দিলেও হ্যানিম্যানের মতে তা কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে। যেমন- অ্যালোপ্যাথিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটি দেখা যায়।

আর অসদৃশ ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত ও দীর্ঘমেয়াদী হলে তা নিশ্চিতভাবেই নতুন রোগ সৃষ্টি করবে বলে হ্যানিম্যান বিশ্বাস করতেন।

যা-ই হোক, হ্যানিম্যানের উদ্ভাবিত এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সে সময় থেকেই পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা আছে। বিশেষত ওষুধের শততমিক ও সহস্রতমিক পদ্ধতিকে অনেকেই অবৈজ্ঞানিক আখ্যা দিয়েছেন। আবার, হোমিওপ্যাথির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলেও মনে করেন অনেক চিকিৎসক।

হোমিওপ্যাথি শাস্ত্রের প্রধানতম বই ‘অর্গানন অব মেডিসিন’; Image Courtesy: minotavrosbooks.comminotavrosbooks.com

তবে হ্যানিম্যান সমর্থন পেয়েছেন অনেকেরই। তাঁর সমসাময়িকদের ভেতর বিখ্যাত একজন হোমিও চিকিৎসক ছিলেন বনি হউজেন। পরবর্তীতে কেন্ট, হেরিং, টাইলার, ফেরিংটনসহ বেশ কয়েকজন হোমিও চিকিৎসক এ শাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিশেষত কেন্ট প্রথমজীবনে ছিলেন একজন অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক। পরে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকে গ্রহণ করেন। হোমিওপ্যাথিক ম্যাটেরিয়া মেডিকায় তাঁর অবদান স্মরণীয়।

শাস্ত্রের প্রধানতম বই অর্গানন অব মেডিসিন, যা স্যামুয়েল হ্যানিম্যানেরই লেখা

সবশেষে বলা যায়, হোমিওপ্যাথিকে অনেকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন মনে করেন। অনেক দেশ এই পদ্ধতিকে বাতিল করেছে। তবে হোমিওপ্যাথিতে এখনো অনেকেই আস্থা রাখেন। এখনো এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রধান একটি চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে টিকে আছে।

Feature Image Courtesy: lmhi2015.org        

Reference:

  • চিকিৎসাবিজ্ঞান: তপন চক্রবর্তী