হিমোফিলিয়া

পৃথিবীতে যেসব রক্তরোগ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো হিমোফিলিয়া। এখন পর্যন্ত হিমোফিলিয়া একটি অনিরাময়যোগ্য রক্তরোগ। সেক্স লিংকড ডিসঅর্ডারগুলোর মধ্যেও এটি উল্লেখযোগ্য। হিমোফিলিয়াকে বলা হয় রাজকীয় রোগ। কারণ ইংল্যান্ডের মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সময় থেকে ইউরোপের কিছু রাজ পরিবারে হিমোফিলিয়ার অস্তিত্ব ব্যাপকভাবে ধরা পরে। তবে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার পূর্বপুরুষদের এ রোগ ছিল বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। ধারণা করা হয়, রাণীর মাধ্যমেই রাজবংশে এই রোগের সংক্রমণ ঘটে। রানী ভিক্টোরিয়ার দুই কন্যা অ্যালিস ও বিয়াট্রিশ হিমোফিলিয়ার বাহক ছিলেন। রাণীর কনিষ্ঠ পুত্র প্রিন্স লিওপোল্ড এর মৃত্যুর ঘটনায় রাজবংশে এই রোগের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। একত্রিশ  বছর বয়সে প্রিন্স সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে হাঁটু ও মাথায় চরমভাবে ব্যথা পান এবং সেরিব্রাল  হ্যামারেজ বা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

রাণী ভিক্টোরিয়া ও তার পরিবার; Image Courtesy: pinterest

হিমোফিলিয়া কী?

হিমোফিলিয়া হলো বংশগতভাবে সঞ্চরণশীল বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এক প্রকার রক্ত জমাট বাঁধা বা রক্ত তঞ্চনে অস্বাভাবিকতা জনিত ত্রুটি। লিঙ্গজনিত বংশগতিয় সমস্যা বলে চিকিৎসা বিদ্যায় একে বলা হয় সেক্স লিংক ডিসঅর্ডার। সাধারণত শরীরের কোন জায়গা কেটে গেলে বা ক্ষত হলে কিছুক্ষণ রক্তক্ষরণ হয় এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর রক্তক্ষরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই রক্তপাত বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াই হলো রক্ত তঞ্চন। সাধারণত রক্ত জমাট বাঁধার সময়কাল এক থেকে চার মিনিট। কিন্তু যখন এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শরীরের রক্ত জমাট বাঁধবে না, তখন সেই অবস্থাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হিমোফিলিয়া’ বলা হয়। হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত  রোগীর ক্ষেত্রে এই রক্তক্ষরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হতে বা রক্ত জমাট বাঁধতে স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি সময় লাগে। এই প্রলম্বিত রক্ত তঞ্চনের জন্য রোগীর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। ফলে সময় মত সঠিক ব্যবস্থা না নিলে রোগীর জীবননাশেরও ঝুঁকি থাকে।

হাতে রক্তক্ষরণ; Image Courtesy: factdr.com
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ; Image Courtesy: factdr.com





হিমোফিলিয়ার কারণ

মানবদেহে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য মোট ১৩ টি ফ্যাক্টর বা উপাদান অংশগ্রহণ করে। এ উপাদানগুলো ‘রক্ত তঞ্চন ফ্যাক্টর’ নামে পরিচিত। এগুলোর মধ্যে সাধারণত ফ্যাক্টর ৮ ও ফ্যাক্টর ৯ প্রোটিনদ্বয়ের অনুপস্থিতির জন্যে  হিমোফিলিয়া রোগ হয়ে থাকে। তবে কখনও কখনও ফ্যাক্টর ১১ এর অভাবেও হিমোফিলিয়া হতে পারে। বংশগত এই রোগটি মানুষের নির্দিষ্ট রক্ত তঞ্চন ফ্যাক্টর সংশ্লেষণের মাধ্যমে রক্ত জমাট বাঁধার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রয়েছে তাকে ব্যাহত করে। ফলে আক্রান্ত রোগীর দেহে সামান্য ক্ষতের সৃষ্টি হলে ক্ষতস্থানে রক্ত জমাট না বেঁধে অবিরাম রক্ত ঝরতে থাকে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

হিমোফিলিয়া তিন প্রকার-

১. হিমোফিলিয়া A ( ফ্যাক্টর ৮ বা অ্যান্টিহিমোফিলিক ফ্যাক্টরের অভাব হলে রোগটি হয়)

২. হিমোফিলিয়া B ( ফ্যাক্টর ৯ বা খ্রিস্টমাস ফ্যাক্টর এর অভাব হলে রোগটি হয়)

৩. হিমোফিলিয়া C ( ফ্যাক্টর ১১ এর অভাব হলে রোগটি হয়)

সাধারণত, শতকরা ৮০ ভাগ হিমোফিলিয়া রোগী ‘হিমোফিলিয়া A’ রোগে আক্রান্ত। প্রতি ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ নবজাতক শিশুর মধ্যে ১ জন ‘হিমোফিলিয়া A’ রোগী হয়।

শতকরা ১৯ ভাগেরও বেশি হিমোফিলিয়া রোগী ‘হিমোফিলিয়া B’ রোগে আক্রান্ত। প্রতি ২০,০০০ থেকে ৩৪,০০০ নবজাতক শিশুর মধ্যে ১ জন ‘হিমোফিলিয়া B’ রোগী হয়।  

‘হিমোফিলিয়া A’ ও ‘হিমোফিলিয়া B’ বংশানুক্রম হয়ে থাকে তাই এ দুটিকে সেক্স ক্রোমোজোম ঘটিত রোগ বলা হয়ে থাকে। তবে ‘হিমোফিলিয়া A’ ও ‘হিমোফিলিয়া B’ এঁর সাথে ‘হিমোফিলিয়া C’ এর বড় পার্থক্য হচ্ছে। ‘হিমোফিলিয়া C’ বংশানুক্রম ছাড়াও হতে পারে। এটি সেক্স ক্রোমোজোম ঘটিত রোগ নয়। তাই এটিকে ‘Autosomal Recessive Disorder’ বলা হয়। হিমোফিলিয়া C অপেক্ষকৃত বেশি বিরল। প্রতি এক লক্ষে গড়ে একজন ‘হিমোফিলিয়া C’ রোগী পাওয়া যায়।

পুরুষ ও নারী উভয়েরই একজোড়া সেক্স ক্রোমোজোম রয়েছে। নারীদেহে এই একজোড়া সেক্স ক্রোমোজোম হলো XX এবং পুরুষে XY। X ক্রোমোজোমের  মিউটেশনের (জীনগত পরিবর্তন) ফলে হিমোফিলিয়া রোগের আবির্ভাব  ঘটে। X ক্রোমোজোম ঘটিত অস্বাভাবিকতা বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘এক্স লিংক রিসেসিভ ডিসঅর্ডার (X-Linked Recessive Disorders)’।

Image Courtesy: cdc.gov

এই রোগে সাধারণত পুরুষরা আক্রান্ত এবং মহিলারা বাহক হয়ে থাকে। X ক্রোমোজোমে F8 এবং F9 নামক জিন থাকে যা ফ্যাক্টর 8 এবং 9 নামক তঞ্চন প্রোটিন তৈরির জন্য দায়ী। সুস্থ ব্যক্তির দেহে এই প্রোটিন রক্তের  প্লাজমাতে পরিমাণমতো থাকে। তাই  রক্তক্ষরণ আপনাআপনি বন্ধ হয়। হিমোফিলিয়ার রোগীর রক্তে এই তঞ্চন  প্রোটিনের একটি বা দুটির উপস্থিতি কম থাকে বলে তাদের রক্তপাত সহজে বন্ধ হয় না। নারীদেহে দুইটি X ক্রোমোজোম থাকায় তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহক হয় এবং পুরুষদেহে একটি X ক্রোমোজোম থাকায় এবং সেটি ত্রুটিযুক্ত হওয়ায় তারা হিমোফিলিয়ার রোগী হয়। তবে, কিছু ক্ষেত্রে যেমন- লাইয়োনাইজেশন বা দুইটি X ক্রোমোজোমের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং অন্যটি অকার্যকর  হলে মেয়েরাও হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। মেয়ে সন্তানটি টার্নার সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হলেও তার এই রোগ হতে পারে। একজন হিমোফিলিয়া বাহক নারীর  মাধ্যমে তার ৫০% ছেলে সন্তান এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং ৫০% মেয়ে সন্তান রোগের বাহক হয়। হিমোফিলিয়া আক্রান্ত পিতা থেকে তার কন্যা সন্তান এই রোগের জিন অবশ্যই বহন করবে। আবার পিতা এই জিন বহন করলেও মাতা যদি সুস্থ হয় তবে পুত্র সন্তানের এই রোগ হবে না তবে সকল কন্যা সন্তান বাহক হবে।

এই রোগের ক্ষেত্রে:

১. পিতা যদি সুস্থ এবং মাতা বাহক হন তবে তাদের ৫০% পুত্র সন্তান রোগী এবং ৫০% কন্যা সন্তান  বাহক  হবে।

২. পিতা যদি রোগী এবং মাতা সুস্থ  হন তবে তাদের সব ছেলে সুস্থ এবং সব মেয়ে বাহক হবে।

অর্থাৎ, সব হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত পুরুষ বিয়ে করতে পারবে।

৩. পিতা যদি রোগী এবং মাতা বাহক হন তবে তাদের ৫০% পুত্র সন্তান রোগী, কন্যা সন্তানদের ২৫% রোগী এবং বাকি ২৫% বাহক হবে।

এই রোগের জিন বংশ পরম্পরায় পিতা হতে কন্যার মাধ্যমে পৌত্রকে আক্রান্ত করে অর্থাৎ ‘ক্রিস-ক্রস সঞ্চারণ নীতি’ মেনে চলে।

হিমোফিলিয়ার লক্ষণ

দেরিতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতাই এ রোগের প্রধান লক্ষণ। বাচ্চার বয়স ছয় মাস না হলে এই রোগের লক্ষণ সাধারণত প্রকাশ পায় না। তবে কোন কোন সময় বাচ্চা ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর নাড়ি কাটার থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ করে।

বাচ্চা হামাগুঁড়ি দেয়ার সময় অস্থিসন্ধিতে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তক্ষরণ ঘটে। ফলে হাঁটু ও গোঁড়ালি ফুলে যায়। পেশীতে রক্তক্ষরণ হলে কালো দাগ পড়ে, বাচ্চা প্রচন্ড কান্নাকাটি করে এবং হাত পা ছোঁড়া ও খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে ব্যথা পাওয়া, ফুলে যাওয়া আবার কোথাও কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ না হওয়া এ রোগের বহিঃপ্রকাশ। দাঁত পড়ার সময় ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। তবে এই রোগের ক্ষেত্রে দেহের বাইরের ছোটখাটো আঘাত থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ইন্টার্নাল ব্লিডিং বা দেহের অভ্যন্তরীণ কোন স্থানে রক্তপাত। এই ধরনের রক্তক্ষরণকে হ্যামারেজ বলে।  

দাঁত পরার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ; Image Courtesy: shutterstock

অস্থিসন্ধি বেশি আক্রান্ত হয়। সামান্য ব্যায়াম বা দৌড়ানোর সময় দেহের বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে রক্তক্ষরণ ঘটে। এ অবস্থাকে হেমারথ্রোসিস বলে। এতে অস্থিসন্ধি ফুলে যায় এবং প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়।

হিমোফিলিয়ার কারণে দেহের বিভিন্ন পেশী, পরিপাকনালী, মূত্রনালি, দাঁত, নাসিকা গহ্বর ইত্যাদি থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হয়। মাসিকের সময়ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়।

রক্তক্ষরণের এ মাত্রা নির্ভর করে আঘাতের পরিমাণ ও রক্তে রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান (ফ্যাক্টর ৮ ও ৯) কি  পরিমাণে উপস্থিত আছে তার ওপর। যদি এই উপাদানের পরিমাণ ১% এর কম হয় তবে মারাত্মক হিমোফিলিয়া দেখা দেয়। এক্ষেত্রে সামান্য আঘাতে এমনকি বিনা আঘাতেও প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে। আবার, উপাদানের পরিমাণ ৫% এর বেশি থাকলে সেক্ষেত্রে সাধারণ হিমোফিলিয়া এবং ১% থেকে ৫% এর মধ্যে হলে মধ্যম মাত্রার হিমোফিলিয়া বলা হয়। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা না নিলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। সঠিক সময়ে রোগটি নির্ণয়  করতে পারলে এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করলে মৃত্যুর ঝুঁকিটা কমানো সম্ভব।

হিমোফিলিয়া একটি জটিল রোগ। হিমোফিলিয়া বংশে থাকলে জিনগত পরীক্ষা- নিরীক্ষা, কাউন্সেলিং ও জন্মপূর্ব পরীক্ষার মাধ্যমে আগেই অনাগত সন্তান হিমোফিলিয়া আক্রান্ত কিনা অবগত হওয়া যায়। তাছাড়া, মা রোগটির বাহক কিনা তা সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমেই জানা সম্ভব। বাংলাদেশেও বর্তমানে সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় হিমোফিলিয়া ও অন্য কোন রোগ আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

হিমোফিলিয়া শনাক্তকরণ পরীক্ষা:

১. রক্তের তন্ঞ্চন ফ্যাক্টর দুটির পরীক্ষা।

২. রক্তের জমাট বাঁধার ক্ষমতা পরীক্ষা।

হিমোফিলিয়ার চিকিৎসা

হিমোফিলিয়ার স্থায়ী কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তবে, চিকিৎসার মাধ্যমে হিমোফিলিয়া থেকে সাময়িক সুস্থতা লাভ করা যায়। শিরাপথে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর শরীরে প্রবেশ করানোই মূলত এর চিকিৎসা। রক্তক্ষরণজনিত কারণে অস্থিসন্ধিতে সমস্যা দেখা দিলে ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এবং সাবধানতার সঙ্গে জীবনযাপন করলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত রোগী প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির মাধ্যমে হিমফিলিয়ার চিকিৎসা; Image Courtesy: semanticscholar.org

হিমোফিলিয়া রোগীদের বিশেষ কিছু সাবধানতা মেনে জীবনযাপন করতে হয়। শরীরে আঘাত লাগতে পারে এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হতে বিরত থাকা, মাংসে ইনজেকশন না নেওয়া, যেকোনো ধরনের অস্ত্রোপচারের পর রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া, ব্যথানাশক ওষুধ বা রক্ত তরল করে এ রকম ওষুধ (যেমন এসপিরিন) না খাওয়া ইত্যাদি মেনে চললে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা যায়। হিমোফিলিয়ার চিকিৎসা ও ওষুধ বাংলাদেশে সম্ভব হলেও খুব একটা সহজলভ্য নয়। সচেতন হলে এই রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকখানি কমানো সম্ভব। তাই হিমোফিলিয়া সম্পর্কে সবার সচেতন থাকা একান্ত জরুরী। হিমোফিলিয়া নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। তবে দুরারোগ্য এই রক্তরোগের স্থায়ী প্রতিষেধক না থাকায় এখনো অনেকেই অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন।


Feature Image Courtesy: bioinformant.com

References: