কোনো দেশ তথা সমাজব্যবস্থায় মুক্তবুদ্ধি, অবাধ স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, মনুষ্যত্বের পরিস্ফুটনের উর্বর ও পূর্ণ স্থান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চ শিক্ষার আঁতুড়ঘর পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার প্রধান অনুষঙ্গ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয় মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও ধর্মান্ধতার অপশক্তির নিকট মাথা নত না করে কীভাবে অসাম্প্রদায়িক ও সমতার শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে মানবিক ও বোধসম্পন্ন মানবশক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও দেশপূর্ব অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলিম সমাজের মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আজ থেকে ঠিক একশত বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিন্দুতে সিন্ধুর উচ্ছ্বাস জাগানো বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

ঢাবির জগন্নাথ হলের বুদ্ধমূর্তি; Image Courtesy: quora.com

বিশ্ববিদ্যালয়টি বয়সের ভারে প্রবীণ হলেও তার নিত্যনৈমত্তিক গতিশীল উপাদানের দরুণ তা দেশ ও দেশের বাইরে সর্বদা চির সজীব ও আলোচনার বিষয়। দেশের মেধাবী তরুণ সমাজের মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও মনুষ্যত্ব বিকাশের দৃঢ় অঙ্গীকার এই প্রতিষ্ঠানির সাহসিক অভিযাত্রা চলমান রয়েছে দিনের পর দিন। আর এই প্রতিষ্ঠানের সাহসিক অভিযাত্রার অগ্রদূত হিসাবে ভূমিকা রাখছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো। তেমনিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলমন্ত্রের সাথে সন্ধি স্থাপন করে দীপ্ত অভিযাত্রা চলমান রেখেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের পূর্ণ স্থান ঢাবির জগন্নাথ হল।

ঢাবির জগন্নাথ হলের ঐতিহ্যবাহী জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা ভবন; Image Courtesy: atntimes.com 

ঢাবির জগন্নাথ হলের ইতিহাস:

১৯২১ সালে যে তিনটি হল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রাপথের সূচনা করে সেই তিনটি হলের একটি হলো জগন্নাথ হল। মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায়চৌধুরীর পিতা জগন্নাথরায় চৌধুরীর নামে এই হলের নামকরণ করা হয়। শুরু থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বী, বোদ্ধ, খ্রিষ্টান ও আদিবাসী মেধাবীদের আবাসনের জন্য হলটি বরাদ্দ ছিল। শুরুতে উত্তর বাড়ি (বর্তমান গোবিন্দ চন্দ্র দেব ভবন) ও দক্ষিণ বাড়ি (বর্তমান জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা ভবন) নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই ঐতিহাসিক হলটি। বর্তমানে হলটিতে চারটি ভবন রয়েছে এবং একটি নির্মাণাধীন ছাত্রাবাস রয়েছে। হলটির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রাধাক্ষ্য ছিলেন অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত।

জগন্নাথ হলের পুরাতন অনুদ্বৈপায়ন ভবন; Image Courtesy: eibela.com

দেশপূর্ব ও দেশপরবর্তী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাবির জগন্নাথ হল:

অবিভক্ত ভারতবর্ষের শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলে জগন্নাথ হলের ছাত্রসংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেতে থাকে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করার পরপরই মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় নবগঠিত রাষ্ট্রের মাতৃভাষা নিয়ে একটি বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্টু মতবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বানানোর প্রস্তাব দেন। এর বিরুদ্ধে প্রথমেই ফুঁসে উঠে সংস্কৃতি ও অধিকার বোধে সচেতন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

মুক্তিযুদ্ধে জগন্নাথ হলের শহীদদের স্মরণে নির্মিত নামফলক; Image Courtesy: banglatribune.com

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কাসেম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘তমদ্দুন মজলিস’ সর্বপ্রথম সংগঠন হিসাবে এর বিরোধিতা জানায় এবং মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। মায়ের ভাষার যথাযথ স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অধিকার সচেতন শিক্ষার্থীদের মতো জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীদের অবদানও অনস্বীকার্য। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ হলের দক্ষিণ বাড়িতে অবস্থিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি হাউজ এ গণপরিষদের একটি অধিবেশনের প্রস্তুতি ছিল। এরই মধ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা শোনার পর তৎকালীন বর্ষীয়ান নেতা মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশসহ বিরোধী দলীয় কয়েকজন সদস্য অধিবেশন ত্যাগ করে আন্দোলনে যোগ দেয়। এর ফলে আন্দোলন আরো গতিশীল হয়।

জগন্নাথ হলের নতুন ভবন ও পুকুর; Image Courtesy: samakal.com

জগন্নাথ হলকে ঘিরে সবচেয়ে নারকীয় ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। কসাই খ্যাত ইয়াহিয়া খান ও টিক্কা খানের নিরীহ বাঙ্গালি নিধনের নীলনকশা থেকে বাদ যায়নি জগন্নাথ হল। শুরু থেকেই জাত্যাভিমান ও ধর্মীয় সংকীর্ণতায় বিশ্বাসী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অমুসলিমদের সবসময় ছোট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখত। তাই ২৫ মার্চে সংঘটিত নারকীয় অপারেশন সার্চলাইটে তাদের প্রাইম টার্গেট ছিল জগন্নাথ হল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জগন্নাথ হলের রুমগুলোতে তল্লাশি চালায় এবং ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রায় ৬০ জনকে নির্বিচারে হত্যা করে এবং মৃতদের লাশ উত্তর বাড়ির সামনে মাটিতে পুঁতে রাখে। বুয়েট শিক্ষক নুরুলউল্ল্যাহ ধারণকৃত ভিডিওতে প্রদর্শিত হয় পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক জগন্নাথ হলে সংঘটিত নৃশংসতা মাত্রা।

জগন্নাথ হল ধসের ঘটনায় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ; Image Courtesy: ekushey-tv.com

ঢাবির জগন্নাথ হলের শোকাবহ অধ্যায়: 

১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে ছাত্র আন্দোলন বেগবান ছিল। এমনই সময় জগন্নাথ হলের তৎকালীন অনুদ্বৈপায়ন ভবনের টিভি রুমে বিটিভি তে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক ‘শুকতারা’ দেখার জন্য প্রায় চারশত ছাত্র জমায়েত হয়। হঠাৎ নাটক চলাকালীন অবস্থায় রাত প্রায় পৌনে নয়টায় ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে। মুহূর্তেই পাল্টে যায় জগন্নাথ হলের চিত্র। ছাত্রদের আর্তনাদ ও আহাজারিতে ভারী জগন্নাথ হল তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ। এই দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৮ জন ছাত্র-কর্মচারী মারা যায়। এই দুর্ঘটনার ঘটার পর থেকেই এই দিনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস হিসাবে পালিত হয়। এই দুর্ঘটনায় নিহতের স্মরণে একটি ভবন নির্মাণ করা হয় যা ‘অক্টোবর স্মৃতি ভবন’ নামে পরিচিত। এই ভবনের নীচ তলায় নিহতের স্মরণে একটি ছোট জাদুঘর রয়েছে। যেখানে ১৯৮৫ সালের সেই স্মৃতিবিজড়িত টিভিটি রাখা আছে। এছাড়াও ভবনের সামনে নিহতদের নাম সংবলিত নামফলক রয়েছে। 

ভবন ধসের স্মৃতি রক্ষায় তৈরি ভবন; Image Courtesy: sukhabor.com.bd

শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে ঢাবির জগন্নাথ হলের ভূমিকা:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি হয় সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের সুশোভিত বাগান, তাহলে জগন্নাথ হল বিবেচিত হবে সেই বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ও সুরভিত ফুল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল সেখানে বরাবরই সামনের সারিতে ছিল জগন্নাথ হল। প্রতিষ্ঠার পর-পরই জগন্নাথ হলের সাবেক প্রভোস্ট ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদারের আমন্ত্রণে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকা সফরের সময় জগন্নাথ হল পরিদর্শনের কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থতার কারণে কবিগুরু জগন্নাথ হল পরিদর্শনে আসতে না পারলেও পরবর্তীতে ‘বাসন্তীকা’ নামক একটি সাময়িকীতে একটি গীতিকবিতা লিখে জগন্নাথ হলের প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করেন।

প্রতিবছর উৎসাহ উদ্দীপনায় জগন্নাথ হলে আয়োজিত হয় সরস্বতী পূজা; Image Courtesy: jugantor.com

প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে জগন্নাথ হলের মাঠে চারুকলা অনুষদ সহ সকল ডিপার্টমেন্টের আয়োজনে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সরস্বতীপূজার আয়োজন হয় জগন্নাথ হলে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ বিদেশের সকল মানুষের অংশগ্রহণে আনন্দ-মিলনের মহাসমুদ্রে পরিণত হয় জগন্নাথ হল। এছাড়াও প্রতিবছর হোলি উৎসব, রথযাত্রা, জন্মাষ্টমী, শারদীয় দুর্গোৎসব, কালীপূজা সহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী সহ বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের আয়োজনে উৎসবগুলো পরিণত হয় অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন উৎসবে। দেশ ও দেশের বাইরে স্থাপিত হয় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর চিত্র।  
 
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ তথা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বাংলাদেশ বিণির্মাণে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা রাখে জগন্নাথ হল। অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সাংস্কৃতিক প্রতিভার বিকাশে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে জগন্নাথ হল। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অন্যতম প্রিয় সংগীত ব্যাণ্ড বাংলা, বাংলার প্রকৃতি তথা বাংলা লোকজ সংস্কৃতির ধারক বাহক ব্যাণ্ড জলের গানের যাত্রা শুরু হয়েছিল এই হল থেকেই। এছাড়াও নবীন উদীয়মান সংগীত ব্যাণ্ড কৃষ্ণপক্ষরেও জন্মদাতা এই শতবর্ষী হল। 

ঢাবির শতবর্ষের প্রোগ্রামে গান গাইছে জলের গান ব্যান্ড; Image Courtesy: prothomalo.net

খেলাধুলায় ঢাবির জগন্নাথ হল :

হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চিত্তবিনোদনের জন্য জগন্নাথ হলে রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ। এই মাঠ জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন অনুষদ বা বিভাগ কর্তৃক ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রিমিয়ার লীগের খেলাও অনুষ্ঠিত হয় এই মাঠে। বড় মাঠ ও অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুবিধা থাকায় বরাবরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত আন্তঃহল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানগুলোতে জগন্নাথ হল সবসময়ই কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করে। এছাড়াও এই হলের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি ভবন সংলগ্ন মাঠে শর্ট পিচের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি হলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আলাদা গেমস রুমেরও ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা ইনডোর গেমসগুলো সানন্দে খেলতে পারে।

জগন্নাথ হল খেলার মাঠ; Image Courtesy: quora.com

ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উপাদান সবকিছুর সমন্বয়ে এই হল অভিহিত হয় মনুষ্যলোকের স্বর্গ হিসাবে। নবপ্রজন্মের নবীনদের হাত ধরে ইতিহাস, ঐতিহ্যের ধারক বাহক এই হল দেশ ও জাতিকে উপহার দিতে থাকুক নতুন নতুন গৌরবময় ইতিহাস। 

Feature Image Courtesy: eibela.com