কৃষ্ণকুমারী

আধুনিক বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করলে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা সর্বপ্রথমেই বলতে হয়। বলা হয় যে আধুনিক বাংলা কাব্য সাহিত্যের পূর্ণতা পায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে। ব্যক্তি জীবনের উত্থান-পতন, বিদেশি সাহেবীপনার প্রতি প্রবল টান, ধর্মান্তরিত হওয়া, স্বেচ্ছাচারী জীবন যেমন তাকে তৎকালীন সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিল তেমনি তার বিচিত্র সাহিত্যকর্মও এখনো তাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অগ্রগণ্য করে রেখেছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাস ‘সেই সময়’-এ উপন্যাসিক মধুসূদন দত্তের এই জীবন প্রবাহকে বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের অবদান কতটুকু তা বলার অবকাশ রাখে না। মহাকাব্য রচনা, অন্তমিল ছন্দ থেকে অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টি, সনেট রচনা, পত্রকাব্য, সার্থক ট্রাজেডি নাটক রচনা ইত্যাদি সৃষ্টিতে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তিনি অবিনশ্বর হয়ে আছেন। মাত্র ৪৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তার সাহিত্যিক জীবন আরোও সংক্ষিপ্ত। তবে এই সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার মহত্ব অপরিসীম। তবে আজকের আলাপনে তার সমস্ত সাহিত্যকর্ম মুখ্য বিষয় না, আজ তার সৃষ্ট নাটক কৃষ্ণকুমারী মুখ্য বিষয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত; Image Courtesy: observerbd.com
মাইকেল মধুসূদন দত্ত; Image Courtesy: observerbd.com

কৃষ্ণকুমারী নাটকের রচনা কাল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ৬ই আগস্ট থেকে ৭ই সেপ্টেম্বর। যে একমাস ধরে মাইকেল মধুসূদন দত্ত কৃষ্ণকুমারী রচনা করেছেন সে একমাস তিনি ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্য রচনা স্থগিত রেখেছিলেন। কৃষ্ণকুমারী গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালের শেষ দিকে। পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১১৫। নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। কলকাতার শোভাবাজার নাট্যশালায় অভিনীত ‘কৃষ্ণকুমারী’ প্রথম মঞ্চায়ন হবার কথা ছিল বেলগাছিয়ায়। সে অনুসারে নাট্যকার যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরকে নাটকের সঙ্গীত রচনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর দু’টো গান লিখে দিয়েছিলেন এবং তা নাটকে সংযোজিত হয়েছে- এ রকম মতামত দিয়েছেন যোগীন্দ্রনাথ বসু। তবে এ মতের পক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত কৃষ্ণকুমারী নাটকটি উৎসর্গ করেছিলেন তৎকালীন বিশিষ্ট অভিনেতা কেশবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে। কেননা এই নাটকটি রচনার পেছনে রয়েছে তাঁর বিশেষ ভূমিকা, তিনিই অনুপ্রাণিত করেছিলেন লেখককে। তবে এই সার্থক ট্রাজেডিটি রচনার পেছনে রয়েছে একটি অসফল গল্প। মধুসূদন দত্ত প্রথম ‘রিজিয়া’ নামে একটি নাটক রচনায় হাত দিয়েছিলেন। ১৮৬০ সালের প্রথম দিকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও গদ্যে তিনি রিজিয়া নাটক রচনা শুরু করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য মুসলমানদের কাহিনী নিয়ে রচিত হবে বলে বেলগাছিয়া থিয়েটার কতৃপক্ষ রিজিয়া নাটক মঞ্চায়নে সম্মত হননি। যার কারণে মধুসূদন দত্ত রিজিয়া নাটক রচনায় বিরত হন। তারপর তিনি উইলিয়াম টডের রাজস্থানের ইতিহাস পাঠ করে কৃষ্ণকুমারী রচনা করেন।

মঞ্চে অভিনীত হচ্ছে নাটক কৃষ্ণকুমারী; Image Courtesy: tagbangla.com
মঞ্চে অভিনীত হচ্ছে নাটক কৃষ্ণকুমারী; Image Courtesy: tagbangla.com

কৃষ্ণকুমারী নাটকটি ইতিহাসকে আশ্রিত করে রচিত হয়েছে। দেখা যায় রাজা ভীম সিংহ, শাসক ও পিতা রূপে কঠিন সংকটের মধ্যে তাঁর শাসনামল অতিবাহিত করেন। ষোড়শী রূপবতী কন্যা কৃষ্ণকুমারীকে বিয়ে করার জন্যে তিন সহস্র সৈন্য নিয়ে জয়পুরের প্রতিনিধিদল উদয়পুরে উপস্থিত হয়। বাইরের আক্রমণে ও লুণ্ঠনে বিপর্যস্ত উদয়পুর রাজা, জয়পুরের রাজার উপঢৌকন বাধ্য হয়ে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু মারবারের রাজা মানসিংহ তার পূর্ববতী মৃত রাজার বাগদত্তা বধূরূপে কৃষ্ণকুমারীকে দাবি করেন। মানসিংহ প্রত্যাখ্যাত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, জয়পুরের রাজার সাথে কৃষ্ণকুমারীর বিয়ে হতে দেবেন না। উদয়পুরের অর্থনৈতিক দাবি গ্রাহ্য না হওয়ায় ভীমসিংহ, মানসিংহের পক্ষ গ্রহণ করেন। জগৎসিংহের দাবী অগ্রাহ্য হলে, তিনি উদয়পুর আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। মানসিংহও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হন। বিয়ের প্রস্তাব বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় এই সংঘর্ষের প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে মানসিংহের বিরুদ্ধে সিংহাসনের দাবিদার হয়ে দাঁড়ালেন ধনকুল সিংহ।

ধনকুল সিংহকে সমর্থন দেয় জয়পুর রাজ ও পাঠান সর্দার নবাব আমীর খাঁ। কিন্তু ধনকুল পাঠান সর্দারের বিশ্বাসঘাতকতায় নিহত হলেন। মানসিংহ যুদ্ধে পরাজিত হলে তার রাজধানী লুণ্ঠিত হয় জয়পুর রাজ কর্তৃক। আবার মারবারের সর্দাররা জয়পুর বাহিনীর প্রতি আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করলে জগৎসিংহ অপমানিত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এদিকে পাঠান সর্দার খবর প্রেরণ করলেন যে, কৃষ্ণকুমারীকে রাজা মানসিংহ’র কাছে হস্তান্তর করতে হবে অথবা কৃষ্ণকুমারীর মৃত্যুর বিনিময়ে রাজওয়ারায় শান্তি স্থাপিত হবে। রাজা ভীমসিংহ দেশপ্রেমিক ও কন্যাবৎসল বলে দেশের শান্তি রক্ষায় কৃষ্ণকুমারীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

কৃষ্ণকুমারী নাটকের কভার; Image Courtesy: boitalik.com
কৃষ্ণকুমারী নাটকের কভার; Image Courtesy: boitalik.com

কৃষ্ণা’র মূত্যুর দায়িত্ব দেওয়া হল দৌলত সিংহকে। কিন্তু দৌলত সিংহ নিস্পাপ কুমারীকে হত্যা করতে সম্মত হলেন না। এরপর দায়িত্ব অর্পিত হয়, ভীমসিংহের পিতার উপ-পত্নী জাত পুত্র মহারাজ জওহন দাসের ওপর। কৃষ্ণকুমারীকে বধ করতে গিয়ে তার হাত থেকে তরবারি খসে পড়ে। তখন পিতার আদেশের কথা শুনে কৃষ্ণকুমারী হাসিমুখে বিষপাত্র গ্রহণ করে। জননীর শোক নিবারণে স্বান্তনা দেয় কৃষ্ণকুমারী। তিনবার বিষপান করার পরও তার মৃত্যু হয় না। অবশেষে কৃষ্ণকুমারীকে কুসুমরসমিশ্রিত অহিফেন দেওয়া হয়। সে আনন্দ সহকারে তা পান করে এবং চিরনিদ্রায় ঢলে পড়ে। কৃষ্ণার মা গভীর দুঃখে স্বল্পকালের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাসের এই কাহিনীকে অবিকৃতভাবে ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকে সংযোজন করা হয়েছে। তবে নাটকে ইতিহাস যতটুকু স্থান পেয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী স্থান দখল করেছে মধুসূদন দত্তের কল্পনা। মধুসূদন দত্ত ইতিহাসের পরিণতিকে স্বীয় আবেগে ধারণ করে উপস্থাপন করেছেন।

কৃষ্ণকুমারী নাটকের চরিত্র সংখ্যা প্রধানত ১৫, এরমধ্যে ১০জন পুরুষ ও ৫জন নারী চরিত্র। নারী চরিত্রগুলো হচ্ছে অহল্যা দেবী (ভীমসিংহের পাটেশ্বরী), কৃষ্ণকুমারী (ভীমসিংহের কন্যা), তপস্বিনী, বিলাসবতী, মদনিকা। পুরুষ চরিত্রগুলো হচ্ছে ভীমসিংহ (উদয়পুরের রাজা), বলেন্দ্র সিংহ (রাজভ্রাতা), সত্যদাস (রাজমন্ত্রী), জগৎসিংহ (জয়পুরের রাজা), নারায়ণ মিশ্র (রাজমন্ত্রী), ধনদাস (রাজসহচর), ভৃত্য, রক্ষক, দূত, সন্ন্যাসী প্রমুখ।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতিকৃতি; Image Courtesy: jugantor.com
মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতিকৃতি; Image Courtesy: jugantor.com

বাংলা নাট্য সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্রাজিক নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী’, এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ কম। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইতিহাসের তথ্যসমূহকে অক্ষুন্ন রেখে ঐতিহাসিক নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী’ রচনা করেন। এ নাটকে তিনি প্রেমময় চিত্তের হিংস্র প্রকাশ যেমন দেখিয়েছেন, তেমনি ব্যক্তির বেদনাকে ম্লান করে দেশ ও জাতির দুঃখকে উর্দ্ধে তুলে ধরেছেন। ভীমসিংহের ট্রাজেডি, দেশের জন্যে কৃষ্ণার আত্মত্যাগ, শোকে কাতর রাজমহিষী অহল্যা দেবীর মৃত্যু, কৃষ্ণকুমারীর প্রেম পিয়াসী মানসিংহ ও জগৎসিংহের দ্বন্দ্ব, কৃষ্ণকুমারীর মনের সুপ্ত বাসনা ও ইতিহাসের সত্য সব মিলেই ‘কৃষ্ণকুমারী’ হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক রোমান্টিক ট্রাজিক নাটক।

Feature Image Courtesy: newsviews.media