কুসুম্বা মসজিদ

আমরা যখনই কোন প্রয়োজনে পাঁচ টাকার নোট হাতে নিয়েছি, দেখেছি একপিঠে আছে অনিন্দ্যসুন্দর একটি মসজিদের ছবি। মসজিদটি নওগাঁ জেলার মান্দা থানায় অবস্থিত কুসুম্বা মসজিদ।                                                                

হোসেন শাহী যুগের উল্লেখযোগ্য এক স্থাপত্য নিদর্শন এই মসজিদ। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার অধীন কুসুম্বা এক অতি প্রাচীন গ্রাম। নওগাঁ জেলা সদর থেকে দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। মান্দা উপজেলা থেকে দূরত্ব ৩ মাইল প্রায়। মান্দা উপজেলার মূল কার্যালয় যেখানে, সেই গ্রামের নাম ছিলো দু’সতীন গ্রাম। কালিকাপুর ঘাট থেকে আত্রাই নদী অতিক্রম করলেই পড়ে গ্রামটি। পাশাপাশি থাকা গ্রামের অংশ দুটির মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই নদী।

এই দু’সতীন গ্রাম থেকে উত্তর-পশ্চিমে আরো তিন মাইল গেলে কুসুম্বা গ্রাম। অনেক আগে বরেন্দ্র অঞ্চলে কৌশুম্বী নামে একটি গ্রাম ছিলো। মধ্যযুগের কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত-এ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই কৌশুম্বী থেকেই কুসুম্বা নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

কুসুম্বা মসজিদের নকশা; Image Courtesy: findglocal.com

মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ৫৮ ফুট ও প্রস্থে ৪০ ফুট প্রায়। মূল কাঠামো ইটের তৈরি হলেও বাইরের আবরণ দেয়া হয়েছে পাথর। দেয়ালগুলোর পুরুত্ব প্রায় ৬ ফুটের মত। বাইরে থেকে দেখলে মসজিদটিকে পাথরের তৈরি বলেই ভ্রম হতে পারে। মসজিদের প্রবেশ পথের শিলালিপিতে আরবিতে কিছু কথার উল্লেখ আছে। যা থেকে জানা যায়, গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহের শাসনামলে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। এই শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি ৯১০ হিজরী মোতাবেক ১৫০৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল।

কুসুম্বা মসজিদের বাইরের দেয়াল; Image Courtesy: findglocal.com

তবে আরেকটি শিলালিপি অনুযায়ী জনৈক সোলেমান এটি নির্মাণ করেন ১৫৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দে। এই সোলেমান সম্ভবত কালিগ্রাম পরগণার ধর্মান্তরিত জমিদার সোলেমান খাঁ (মজুমদার)।

মসজিদটির সাথে একটি দীঘি আছে। দীঘিটি একসময় ব্যবহৃত হতো স্থানীয় লোকজনের পানির চাহিদাপূরণসহ নানা কাজে। দীঘিটির কাছেই মসজিদটি নির্মাণের একটা বড় কারণ হতে পারে অজুর পানিপ্রাপ্তির সুবিধা। দীঘির চারদিকে বেশকিছু বিল ছিল, এখনও আছে কিছু। সে হিসেবে দীঘির পানিতে প্রচুর কচুরিপানার প্রবেশ ঘটার কথা। কিন্তু তেমনটি দেখা যায়না। স্থানীয় মানুষের এ নিয়ে একটা অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল। তারা মনে করতেন, দীঘির পানির নিচে পারদ আছে! আর তাই দীঘির টলটলে জল কখনো পানায় ভরে না!

কুসুম্বা মসজিদ সংলগ্ন দীঘি; Image Courtesy: findglocal.com

মসজিদটি তৈরির ঘটনা নিয়েও রয়েছে নানারকম লোককাহিনী। তবে সেসব জানার আগে আসুন মসজিদের অনন্য স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে জেনে নিই। মসজিদটির দেয়ালে থাকা পাথরের আবরণের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ভেতরের কেবলার দেয়ালে রয়েছে আঙুরলতা ও নানারকম লতার নকশা। খুঁটিগুলোয় রয়েছে শেকল-ঘণ্টার নকশা। প্ল্যাটফর্মেও দেখা যায় সর্পিলাকারে আঙুরলতার নকশা। মসজিদে দুই সারিতে তিনটি করে মোট ছয়টি গম্বুজ ছিল। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে তিনটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।মসজিদটি তৈরির ঘটনা নিয়েও রয়েছে নানারকম লোককাহিনী। তবে সেসব জানার আগে আসুন মসজিদের অনন্য স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে জেনে নিই। মসজিদটির দেয়ালে থাকা পাথরের আবরণের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ভেতরের কেবলার দেয়ালে রয়েছে আঙুরলতা ও নানারকম লতার নকশা। খুঁটিগুলোয় রয়েছে শেকল-ঘণ্টার নকশা। প্ল্যাটফর্মেও দেখা যায় সর্পিলাকারে আঙুরলতার নকশা। মসজিদে দুই সারিতে তিনটি করে মোট ছয়টি গম্বুজ ছিল। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে তিনটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কুসুম্বা মসজিদের তিনটি গম্বুজ; Image Courtesy: Wikipedia.com

মসজিদটির মেহরাবগুলো কষ্টিপাথরে নির্মিত ও নানারকম কারুকার্যখচিত। মেহরাবের ফ্রেমে ও ভেতরের দেয়ালগুলোতে কেলাস পাথরের চমৎকার কাজ চোখে পড়ে। মসজিদের প্রবেশপথে তিনটি দরজা দেখা যায়। প্রথম দুটির তুলনায় অপরটি তুলনামূলক ছোট। মসজিদের দক্ষিণদিকে একসময় কালো পাথরে নির্মিত কারুকার্যখচিত তোরণদ্বার ছিলো, যা এখন আর নেই।

দক্ষিণ দিকে কিছু গুহাজাতীয় হুজরার চিহ্ন দেখা যায়। যা দেখে মনে হতে পারে, হয়ত কোন সুফি সাধক এখানে এসে ইসলাম প্রচার করেছিলেন।

কুসুম্বা মসজিদের ভেতরের দৃশ্য; Image Courtesy: Wikipedia

এই সুফি সাধকদের আগমন বিষয়ক ধারণার সাথে অবশ্য প্রচলিত একটি লোককাহিনী বেশ মিলেও যায়। গৌড় অঞ্চলটি ছিলো আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদহ মিলে। হোসেন শাহরা ছিলেন গৌড়ের সুলতান, তবে জাতিতে তাঁরা ছিলেন পাঠান। জনশ্রুতি রয়েছে, গৌড়ের এক পাঠান বাদশাহ তাঁর স্ত্রীর প্রতি নাখোশ হয়ে তাঁকে নির্বাসন দিয়েছিলেন এখানে। কোন বাদশাহ তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়না। তবে ঘটনাটা যে সত্য হতে পারে বা এর যে কিছুটা সত্যতা রয়েছে, তা বোঝা যায় অন্য আরেকটি মসজিদের নাম থেকেই।

কুসুম্বা মসজিদের বাইরের দেয়ালের কারুকাজ; Image: Wikipedia.com

সে প্রসঙ্গে আসছি। তার আগে চলুন, বেগমের ভাগ্যে কী ঘটলো তা জেনে নিই। এই জনশূণ্য বিরান ভূমিতে বেগম কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি ছিলেন নিরপরাধ, তবু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নির্বাসিত। তিনি প্রার্থনা করছিলেন এ অবস্থা থেকে মুক্তির। এ সময়ে আবির্ভাব ঘটে সুফি সাধক নানা শাহের। তাঁর দুঃখে ব্যথিত হন নানা শাহ। বেগমের প্রার্থনার জন্য এক গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ ও থাকার জন্য প্রাসাদ তৈরি করেন। বেগমের নাম ছিলো সোনা বিবি। তাঁর নামানুসারে মসজিদটির নামকরণ করা হয় সোনাবিবির মসজিদ। ভগ্ন প্রাসাদের চিহ্ন আজও আছে পরিখাবেষ্টিত হয়ে, সাথে মসজিদটিও আছে।

মনে করা হয়, এই সুফিসাধক নানা শাহকে কেন্দ্র করেই পরে এখানে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। আর তার ধারাবাহিকতাতেই তিনি বা তাঁর অনুসারীদের হাতে কুসুম্বা মসজিদ তৈরি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দুটি মসজিদের দূরত্বও অবশ্য বেশি নয়। সোনা মসজিদ থেকে কুসুম্বা মসজিদের দূরত্ব মাত্র গজ তিনেক।

মসজিদের বাইরে পড়ে থাকা নির্মাণ সময়ের পাথরের চাঁই; Image Courtesy: Wikipedia.com

কুসুম্বা মসজিদের কাছেই একজন আউলিয়ার মাজার রয়েছে। এছাড়া আরো কিছু কবর এখানে আছে। রাষ্ট্রীয় কারণে এখানে কোন শাসনকেন্দ্র থাকলে তার উল্লেখ পরবর্তী সময়ের ইতিহাসে থাকার কথা। কিন্তু তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। কাজেই মনে হয়, এখানে সুফি-সাধকদের একটি কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো এবং ধর্মপ্রচার ও ইবাদাতের সুবিধার্থে তাঁরা এখানে মসজিদ গড়ে তুলেছিলেন।

তবে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা বিষয়ে আরেকটি জনপ্রিয় উপকথা আছে। কালীগ্রাম পরগণার জমিদার ছিলেন চিলমন মজুমদার। তিনি রাজস্ব ফাঁকি দেবার কারণে কারারুদ্ধ হন। পরে ইসলাম গ্রহণ করে সোলেমান খাঁ নামধারণ করেন ও রাজস্বের দায় থেকে মুক্ত হন। একটি মন্দির গড়বেন বলে মাল-মশলা রেখেছিলেন। কারামুক্ত হয়ে পরে তা দিয়ে মসজিদটি তৈরি করেন। তাঁর স্ত্রীর ধর্মান্তরের পর নাম হয় সোনা বিবি। স্ত্রীর ইবাদাতের জন্য তিনি মসজিদটি তৈরি করেন।

কুসুম্বা মসজিদের ভেতরের গঠন; Image Courtesy: findglocal.com

কুসুম্বা গ্রামটি কালীগ্রাম মৌজাতেই। এটাও প্রমাণিত যে, চিলমন মজুমদার ধর্মান্তরিত হয়ে সোলেমান খাঁ নামধারণ করেছিলেন। সেক্ষেত্রে কুসুম্বা মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে এই উপকথা যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে সোনা বিবির মসজিদটিও সোলেমান খাঁ-র নির্মিত হওয়াই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়।

লেখার শুরুর দিকেই বলেছিলাম এই মসজিদের প্রতিষ্ঠা নিয়ে দুরকম শিলালিপির কথা। একদিকে প্রবেশপথে আরবিতে লেখা শিলালিপি, আরেকদিকে অন্য আরেকটি শিলালিপি মসজিদ প্রতিষ্ঠার ভিন্ন ভিন্ন সময় জানায়। দ্বিতীয় শিলালিপিতে (যেটিতে প্রতিষ্ঠার সাল ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দ) জনৈক সোলেমান খাঁ-র কথা উল্লেখ আছে। এই সোলেমান খাঁ চিলমন মজুমদার হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি।

সবমিলিয়ে সুফি-সাধকদের বিষয়টি যেমন অস্বীকার করা যায়না, তেমনি স্বীকার করতে হয় সোলেমান খাঁ-র কথাও। তাই প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও কুসুম্বা মসজিদ অনন্য একটি স্থাপত্য নিদর্শন হয়ে আছে ও থাকবে- এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

Feature Image Courtesy: adarbepari.com

References:

১. নওগাঁ মহকুমার ইতিহাস: খান সাহেব মোহাম্মদ আফজল

২. দৈনিক কালের কণ্ঠ