লিবিয়া

বতর্মান বিশ্বের এক অকার্যকর, ব্যর্থ ও অশান্তির প্রতিচ্ছবি লিবিয়া। ২০১১-২০২০ টানা নয় বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে এক সময়ের ধনী রাষ্ট্র লিবিয়া এখন হাহাকারে পরিপূর্ণ। মোড়ল দেশগুলোর হস্তক্ষেপের কারণে এই যুদ্ধ থামার কোন সুযোগও নেই। ভোরের আকাশে যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেলাসহ যেখানে সেখানে হামলা যেন এখানকার নিত্তনৈমিত্তিক ব্যপার।

কীভাবে এই অবস্থার সূত্রপাত ঘটল? চলুন একটু পেছনে ফিরে যাই।

পুরনো লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলি; Image Courtesy: Britannica.com

বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক। জেলে ও যাযাবর নির্ভর এক রাষ্ট্রে হঠাৎ তেলের খনি আবিষ্কার যেন আলাদিনের জাদুর চেরাগ পাওয়ার মতো। কিন্তু দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছিল না। ষাটের দশকের শুরু তখন মাত্র। চারদিকে ক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ঠিক তখন দেশের শেষ বাদশাহকে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেন তরুণ সেনা অধিনায়ক কর্ণেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি। সব তেলখনিকে জাতীয়করণ করে দরিদ্র এক রাষ্ট্রকে আফ্রিকার ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেন। মাথাপিছু আয় দশ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং শিক্ষার হার প্রায় একশ ভাগ ছুঁয়ে ফেলে। তিনি জনগণকে এমন সব সুবিধা দেন যা বতর্মান বিশ্বের অনেক ধনী রাষ্ট্রের জনগণ কল্পনাও করতে পারে না। যেমন: বিনাসুদে ঋণ, বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা, ষষ্ঠ শ্রেণি পযর্ন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষাসহ আরো অনেক জনকল্যাণমূলক সুবিধা।

তরুণ গাদ্দাফি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন; Image Courtesy: The New Arab

এত সুবিধার পরও বাক-স্বাধীনতার অভাবে দিনকে দিন ফুঁসে উঠছিল দেশের তরুণ জনগণ। প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি, তার পরিবার ও শাসন নিয়ে সমালোচনা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রেসিডেন্ট এর মুখের কথাই সেখানে আইন ছিল।

২০১০ এর শুরু তখন মাত্র। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে গেড়ে বসা একনায়কতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল এক আন্দোলন। যা আরব বসন্ত নামে পরিচিত। ২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ আছড়ে পড়ে লিবিয়ার উপকূলীয় শহর বেনগাজিতে। ফুঁসে ওঠে দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠী। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকার দমন পীড়ন শুরু করলে জনগণ অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পরে গৃহযুদ্ধ। যুদ্ধে বিদ্রোহীদের সরাসরি সহায়তা করে লিবিয়ার পুরনো শত্রু ইউরোপ। ন্যাটো লিবিয়ায় বিদ্রোহীদের পক্ষে হামলা চালায় এবং ২০১১ সালেই সির্ত শহরের উপকূলে বিদ্রোহীদের হাতে একটি ট্রাকের উপর গাদ্দাফির করুণ মৃত্যু হয়। অবসান ঘটে চার দশক ধরে চলা একনায়কতন্ত্রের। শেষ হয় গাদ্দাফীর শাসন।

গাদ্দাফীর পতনের পেছনে তেল লোভী পশ্চিমা পুঁজিবাদ সমাজের পরোক্ষ ভূমিকা ছিল; Image Courtesy: Dave Brown

গণতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর তরুণরা তখন আশায় বুক বেঁধেছিল যে অবশেষে মুক্তি ঘটছে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়। তরুণরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পরে। তেলের খনি গুলো কেন্দ্র করে বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী এলাকা দখল করে শাসন করতে থাকে।

কোন এক অন্তর্দ্বন্দ্বে বিজয়ের পর সৈন্যদের উচ্ছ্বাস; Image Courtesy: TRT World

গাদ্দাফির মৃত্যুর পর এক ভঙ্গুর সরকার ক্ষমতায় থাকলেও ২০১৪ সালে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে খলিফা হাফতারের নেতৃত্বে একপক্ষ বিদ্রোহ করে বসে। ফ্রান্স, আরব আমিরাত আর মিশর তার পক্ষ নেয় আর পেছন থেকে কলকাঠি নাড়াতে থাকে।

গৃহযুদ্ধ চলা অবস্থায়ই ২০১৭ সালের দিকে আইএসের উত্থান হয় এবং তারা বিশাল এলাকা দখল করে নেয়। বতর্মানে আইএসের পতন হলেও একদিকে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার যাকে রাশিয়া ও তুরস্ক সমর্থন করছে আর অন্যদিকে খলিফা হাফতার সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী যাদের মিশর, ফ্রান্স ও আরব আমিরাত সমর্থন করছে। তাদের লড়াই এক প্রদেশ ছাড়িয়ে অন্য প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারি বাহিনী একসময় কাবু হয়ে পড়লেও তুরস্কের সরাসরি সহায়তায় যুদ্ধক্ষেত্র আবার তাদের হাতে এসে পড়েছে।

বিদ্রোহী নেতা খলিফা হাফতার; Image Courtesy: ispionline.it

আপাতত যুদ্ধ থামার কোন লক্ষণ নেই। তারুণ্যের গণতন্ত্রেরও মুক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এখন ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে আসে গণতন্ত্রের চাপা আর্তনাদ।

তরুণদের মুক্তির আন্দোলনে সঠিক নেতৃত্বের অভাব, বৈদেশিক শক্তির হস্তক্ষেপ ও ঘৃণ্য রাজনীতি একটি দেশকে কীভাবে টেনে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে লিবিয়া এখন তারই জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ।

Feature Image Courtesy: latimes.com

References:

  • Reutues
  • Deutsche Welle
  • Britannica.com