মেজর খালেদ'স ওয়ার

১৯৭১ সালের জুন মাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দিকে চোখ রাখছে গোটা বিশ্বের গণমাধ্যম। বিবিসি, টাইমসের মতো বড় বড় গণমাধ্যমের বাইরেও অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাদের মতো করে মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছিল। মেজর খালেদ মোশাররফ নামক এক চৌকস সেনা অফিসারের নেতৃত্বে তখন ২নং সেক্টরে চলছিল তুমুল যুদ্ধ। গেরিলাদের অ্যামবুশে শত শত পাকিস্তানী বাহিনী নিহত হচ্ছে, ভয়ে পিছু হটে যাচ্ছে, বাঙালী সেনাবাহিনী আর সিভিলিয়ান মিলে ইতোমধ্যে একটা জনযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যর গ্রানাডা টিভিতে তখন বিশ্বের চলমান বিভিন্ন ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে ‘ওয়ার্ল্ড ইন অ্যাকশন’ নামে একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান হতো।

জুনের প্রথম সপ্তাহ। ভারি বৃষ্টিতে বাংলার অবহেলিত পথঘাট হয়ে উঠেছে আরও দুর্গম। পশ্চিমবঙ্গ থেকে সীমান্ত পার হয়ে ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশ এসে পৌঁছে গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড ইন এ্যাকশন টিম’। পরিচালক ভানিয়া কিউলির নেতৃত্বে তৈরি হয় ২নং সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র, যার নামকরণ হয় ‘মেজর খালেদ’স ওয়ার’। এটি তৈরি করতে তাদের টিমকে সেখানে ৮ দিন অবস্থান করতে হয়। তথ্যচিত্রটি জুলাই মাসে বিবিসি এবং গ্রানাডা টিভিতে প্রকাশিত হয়।

গ্রানাডা টিভির ১৯৭১ সালের প্রচারিত অনুষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড ইন এ্যাকশন’; Image Courtesy: Wikipedia

২৬ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের এই তথ্যচিত্রে বড় একটি সময় ধরে খালেদ মোশাররফকে ক্যামেরার সামনে অথবা ব্যাকগ্রাউন্ডে কথা বলতে শোনা যায়। একজন চৌকস সেনা কর্মকর্তা, ইংরেজি বলার অসাধারণ স্টাইল, সিগারেট খাওয়ার নিজস্ব ভঙ্গি, চমৎকার বিশ্লেষণী শক্তি। পুরো তথ্যচিত্রে পশ্চিমা এই গণমাধ্যমকে দারুণভাবে একাই সামলেছেন। একের পর এক ভানিয়া কিউলির প্রশ্নের জবাব যেমন দিয়েছেন, তেমনি নিজের মতো করে মুক্তিযুদ্ধের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দিকগুলোও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। জনজীবন থেকে ক্যান্টনমেন্টে থাকা এই অফিসারের কথা শুনলে মনে হতেই পারে তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতা, অথবা তিনি চলচ্চিত্রের দুনিয়ার একজন পাকা নায়ক। হয়তো সেবারই তার ক্যামেরার সামনে প্রথম আসা, অথচ তার কণ্ঠে জড়তা নেই, চেহারায় নেই সামান্য ক্যামেরা ভীতিটুকুও, খুব চমৎকারভাবে কথা বলে যাচ্ছেন।

তথ্যচিত্রে খালেদ মোশাররফ; Image Courtesy: Feature Writer

তথ্যচিত্রেও তার আগমনী দৃশ্যটি নায়কোচিত। সবুজ-শ্যামল বাংলায় ভাঙা ব্রীজের ওপর দিয়ে মানুষ গরু পার করছে, কেউ বীজ তুলছে, কেউ করছে হাল চাষ। আবার সেই সময়েই দেখা যাচ্ছে একদল মানুষ ভারী ভারী অস্ত্র সাজিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে। ওয়াকিটকি হাতে একজন ‘ফায়ার’ বলে উঠলেই গোলার শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। ঠিক সেই সময়েই খালেদ মোশাররফ বলতে থাকেন ‘উই আর ফাইটিং এ ওয়ার অফ এ্যাট্রিশন, ইন দ্যাট উই কিল কিল কিল ইন সেলফ ডিফেন্স এ্যাজ লং এ্যাজ দে আর গোয়িং টু কাম এ্যান্ড ফাইট উইথ আস’। এক নিশ্বাসের এতটুকু কথাতেই খালেদ মোশাররফ মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেন আক্রমণের বিপরীতে একটি ‘যৌক্তিক প্রতিরোধ’ হিসেবে।

তথ্যচিত্রে খালেদের সাথে ক্যাপ্টেন আইনুদ্দীন; Image Courtesy: Feature Writer

ইয়াহিয়া সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধকে আন্তর্জাতিক মহলে কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদীর সীমান্ত সংঘাত বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছিল। খালেদ যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেন পাকিস্তানের সাথে তারা রীতিমতো যুদ্ধ করছেন এবং যুদ্ধের অনেক সরঞ্জামই সেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুদ্ধ মানেই প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ। শান্তিপ্রিয় বাঙালির এই মরণ খেলায় অংশ নেবার পেছনের কারণটাও ব্যাখ্যা করেন মুক্তিযুদ্ধের এই মহারথী। তিনি বাঙালিকে ‘নট ভায়োলেন্ট ইন ন্যাচার’ বলে আখ্যা দেন। বাঙালির সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্যের কথা বলে জাতি হিসেবে সুসভ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তারপর সেই নিরস্ত্র জাতির ওপর পাকিস্তানি আর্মির বর্বরতার বর্ণনা দেন এবং বলে ওঠেন, “উই আর ফোর্সড, উই আর কমপ্লিটলি পুশড টু দ্যা প্লেস হোয়ার উই হ্যাভ টু ফাইট এ্যান্ড উই উইল ফাইট। দেয়ার উইল বি নো কোয়েশ্চেন অফ ইট।”

মুক্তিযু্দ্ধের সময় বিশ্বজুড়ে চলছে সোভিয়েত-আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ। সেই সুযোগে মুক্তিযুদ্ধকে বামপন্থীদের কূটকৌপশল বলেও চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। কৌশলী খালেদ সেই প্রোপাগাণ্ডারও জবাব দেন। দৃঢ়ভাবে বলেন “পিপল মেবি থিংকিং ইটস আ লেফ্টিস্ট ইনসারজেন্সি… বাট আই ক্যান অ্যশিওর ইউ দ্যাট ইটস আ মিলিট্যান্ট ইনসারজেন্সি হোয়ারবাই দ্যা দি পিপল স্টুড এ্যাগেইস্ট ইনজাস্টিস।”

তথ্যচিত্রে সশস্ত্র মেজর খালেদ; Image Courtesy: Wikipedia

খালেদ যুদ্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক ব্যাখ্যা করেন। কীভাবে পাকিস্তান সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখছেন তার বর্ণনা দেন। সামগ্রিকভাবে যুদ্ধের যৌক্তিকতা, কৌশল এবং যু্দ্ধ নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন অপপ্রচারের জবাব দেন।

২নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন সালেক চৌধুরীর দেখা মেলে এই তথ্যচিত্রে। শুরুর দিকে তাকে দেখা যায় একটি ম্যাপের মাধ্যমে খালেদ মোশাররফকে পাকিস্তানি সৈন্যদের অবস্থান ও আক্রমনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। নির্ভীক খালেদ সেই সম্ভাবনাকে পাত্তা না দিয়েই এগোতে বলেন। একাত্তরের ৭ জুন সালেক চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি বৈদ্যুতিক পাইলন উড়িয়ে দেয়ার দৃশ্য তথ্যচিত্রে দেখানো হয়। সালেক চৌধুরীও মুক্তিযুদ্ধকে সীমান্ত সংঘাত বলার বিপরীতে যুক্তি দেন এবং তার যুদ্ধের বিভিন্ন দিক বর্ণনা করেন। এভাবে কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে এমন প্রশ্নের জবাবে সালেক বলেন, “আমাদের যতদিন অস্ত্র আছে ততদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাব। অস্ত্র ফুরিয়ে গেলে সুদানের মতো লাঠি এবং বিভিন্ন দেশীয় কৌশল ব্যবহার করব।” অসম্ভব সাহসী এই যোদ্ধা পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তার পরিবারের কোনো খোঁজ পাননি। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “যেহেতু আমি তাদের ত্যাগ করেছি তো তাদের নিয়ে ভাবার কোনো সুযোগই আমার নেই।” রণক্ষেত্রে তিনি যেমন ছিলেন বীর যোদ্ধা একইভাবে মিডিয়ার সামনেও ছিলেন দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত, চতুর এবং সুবক্তা।

তথ্যচিত্রে সালেক চৌধুরী; Image Courtesy: sachalayatan.com

এক পর্যায়ে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ বলে ওঠেন “উই ইনটেন্ড টু দি হোল নেশনস ইনটু এ ফাইটিং ফোর্স।” ঠিক তখনই দেখা যায় বেশ কয়েকজন তরুণ অস্ত্র হাতে সবুজ মাঠের ভেতর দিয়ে আসছেন। তাদের মধ্যে একজনের নাম ইশরাক। সিভিলিয়ান হলেও যুদ্ধে তার ছিল বিশেষ খ্যাতি। অসম্ভব সাহসের সাথে যুদ্ধ করতেন। তথ্যচিত্রে তিনি ধান ক্ষেতের ভেতর একটা জায়গা দেখান যেখানে আগের দিন তিন ইঞ্চি মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার ধ্বংসাবশেষ হাতে নিয়ে বিদেশি সংবাদকর্মীদের সাথে সামান্য রসিকতা করলেন। তিনি বললেন, “শেলিং কন্টিনিউয়াস হিয়ার অলমোস্ট অল দ্যা টাইম। এ্যান্ড ইউ আর ভেরি লাকি নট টু উইটনেস এনি শেলিং রাইট নাউ।”

তথ্যচিত্রে ইশরাক ও তার সহযোগী; Image Courtesy: Feature Writer

আরও এক তরুণকে দেখা যায় পাকিস্তানীদের গণহত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপকর্মের কথা খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করছেন। ইয়াহিয়াকে হিটলার, আইকম্যানের মতো দাবি করে দেশের সবগুলো ক্যান্টমেন্টকে কনসেনট্রেশান ক্যাম্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মলিন মুখে বসে থাকা এই তরুণের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাদির জুনাইদ-এর মতে, ওই তরুণের নাম হুমায়ুন কবির চৌধুরী যিনি বর্তমানে প্রবাসে আছেন।

তথ্যচিত্রে হুমায়ুন কবির চৌধুরী; Image Courtesy: Feature Writer

তথ্যচিত্রে আরও দেখা যায় ক্যাপ্টেন মেহবুবকে। পাকিস্তানিদের জ্বালিয়ে দেওয়া একটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন এক বৃদ্ধ। তার কথাগুলো ইংরেজিতে বলে দিতে দেখা যায় এই তরুণ সেনা অফিসারকে। এছাড়া ম্যাপ হাতে খালেদ মোশাররফের সাথে এবং স্থানীয় জনগণের থেকে পাকিস্তানি আর্মির খোঁজ নিতেও দেখা যায়।

তথ্যচিত্রে গেরিলা শইদুল্লাহ খান বাদল (বামে) ও তৎকালীন লেফটেন্যান্ট ফজলুর করিম (ডানে)

এছাড়া, তথ্যচিত্রে দুই সন্তান হারানো এক বৃদ্ধকে দেখা যায়। তিনি বেশ চমৎকার ইংরেজিতে পাকিস্তানি আর্মির অমানবিকতার কথা তুলে ধরেন। পাক আর্মির হাতে খুন হওয়া বাবার মৃত্যুর করুণ বর্ণনা দিচ্ছিল এক শিশু, তার পাশে বসেই কাঁদছিলেন বিধবা মা। তার চোখের জল যেন লক্ষ বাঙালি নারীর এমন অশ্রুর কথাই জানান দিচ্ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টর অন্যসব সেক্টর থেকে আলাদা ছিল। খালেদ মোশাররফ সাহসী, চৌকস ও কৌশলী যেমন ছিলেন তেমনি ছিলেন খোলামেলা স্বাভাবের। পুরো ডকুমেন্টারিতে বেশ কয়েকবারই দেখা যায় তার সামনেই সাধারণ যোদ্ধারা সিগারেট খাচ্ছেন। এভাবেই খালেদ সবাইকে আপন করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

খালেদের সাথে ম্যাপ নিয়ে যুদ্ধের আলোচনা করছেন ক্যাপ্টেন মেহবুব, পাশে সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে একজন; Image Courtesy: Feature Writer

তথ্যচিত্রের শেষদিকে খালেদ যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “পাকবাহিনীর কোন একটা দল অ্যামবুশে ধরা পরার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া স্বরূপ তারা ওখানকার গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, নারীদের ধর্ষণ করে। আমার ভয় হয়, সাধারণ মানুষ এসবে অতিষ্ট হয়ে আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করে বসে এবং ভেবে নেবে এই যুদ্ধ একটা হীন কর্মকাণ্ড। এসব কথা বলার সাথে সাথেই খালেদ নিজেই আবার শোনান আশার বাণী। জনগণ এখনো মুক্তিবাহিনীকে বলে যাচ্ছে, দরকার হলে এই দেশে কেউ বেঁচে থাকবে না, তবুও তারা এদেশের মাটি কেড়ে নিতে পারবে না। আমাদের আক্রমণ অবশ্যই চলবে।” এরপরই আত্মবিশ্বাসী চোখে খালেদ বলে ওঠেন, “দেয়ারফোর দ্যা ওয়ার উইল গো অন।” খালেদের কথা শেষ হলেই ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা সুর বেজে ওঠে। সহযোদ্ধাদের নিয়ে খালেদ অস্ত্র হাতে হেঁটে যান, ঝোপের আড়ালে বসে পরবর্তী এ্যাকশনের পরিকল্পনা করতে করতে সিগারেটে খেতে দেখা যায় তাকে। সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে যেন বের আসে খালেদের বুকভরা আত্মবিশ্বাসের গন্ধ, যা ছড়িয়ে পড়ে কুমিল্লার গ্রাম থেকে ঢাকার রাজপথে। ততক্ষণে পুরো দুই নং সেক্টর জেনে গেছে ‘দ্যা ওয়ার উইল গো অন’।

Feature Image Courtesy: thedailystar.net

Documentary Link: https://www.youtube.com/watch?v=tsjTQLtIHEI&t=19s