মতুয়া: যুগান্তকারী বিপ্লবী এক সম্প্রদায়

অতি সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে এসে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দি ধাম ভ্রমণে অনেকের মধ্যেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ওড়াকান্দি ধাম একপ্রকার তীর্থক্ষেত্র, কিন্তু এখানে নরেন্দ্র মোদীর ভ্রমণ কতটা ধর্মীয় ভাব থেকে আর রাজনৈতিক অভিসন্ধি থেকে কতটা সেই বিতর্কে আমরা যাবো না। আমরা আমাদের পাঠকদের অন্যান্য কৌতুহল মেটাতে একটু চেষ্টা করবো। জানাতে প্রয়াস রাখবো ওড়াকান্দি ধাম ও এর সাথে জড়িয়ে থাকা হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুর ও মতুয়া সম্প্রদায়ের নামের কথা।

১৮১২ সালের ১১ মার্চ, সনাতন ধর্মমতে পবিত্র মহাবারুণী স্নানের তিথিতে হরিচাঁদ ঠাকুর গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলার ওড়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মানোর সময়টা একটু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেসময় কলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষিত সমাজের আন্দোলনের ফলে অনেকে সনাতন ধর্মকে কুসংস্কারের আখড়া বলে প্রতিপন্ন করছিল। মিশনারীদের ব্যাপক প্রচারণায় অনেকে খ্রিস্টমতে দীক্ষিতও হচ্ছিল। কিন্তু সনাতন সমাজের মাথা সেজে বসে থাকা ব্রাহ্মণ সমাজ ছিল নির্বিকার৷ অলীক সুখের মোহগ্রস্ত হয়ে তারা হয়ে উঠছিল আরো ক্ষমতালোভী, আরো ফতোয়ার মত বিধানবাজ। মানুষের সততা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে তারা বৈদিক সাম্যবাদকে চেপে রেখে তৈরি করেছিল ভয়ানক বৈষম্য।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২০ সালে বংলাদেশ সফরকালে মন্দির পরিদর্শনের ছবি; Image Courtesy: apblive.com
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২০ সালে বংলাদেশ সফরকালে মন্দির পরিদর্শনের ছবি; Image Courtesy: apblive.com

ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত তো করেই, এমনকি অনেক জায়গায় মন্দিরে প্রবেশের অধিকারও কেড়ে নেয়। যেখানে পবিত্র যজুর্বেদে ব্রাহ্মণ, শূদ্র, নারী, শিশু সকলেরই বেদপাঠের অধিকার বর্ণিত হয়েছে, সেখানে এসকল ধর্মব্যবসায়ী অব্রাহ্মণ কারো বেদপাঠ, শ্রবণ নিষিদ্ধ করে দেন।

এখন কেউ যদি তার প্রিয় স্রষ্টার বাণী পড়তেই না পারে, কাছে যেতেই না পারে, তখন তার মনে অভিমান হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই মনোকষ্ট, অপমান আর অভিমান থেকেই দলে দলে অবহেলিত লোক ধর্মান্তরিত হতে থাকে৷ এছাড়া ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সম্পত্তি দখলের অন্যতম কৌশল ছিল অহেতুক জাতিচ্যুত করা। এমন সমস্যার ভুক্তভোগী অনেক সৎ নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণও হয়েছিলেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষরা। স্রেফ গোমাংস রান্নার ঘ্রাণ পেয়েছেন বলে তাদের জাতিচ্যুত করা হয়েছিল। তো এসব হাস্যকর কিন্তু নির্মম ভেদাভেদ বৈষম্যের ফলে মানবাত্মার ডুকরে কেঁদে ওঠার ক্ষণেই মহাত্মা হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ি; Image Courtesy: bbc.com
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ি; Image Courtesy: bbc.com

শৈশব থেকে সমাজের এসব বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখতে দেখতে যুবাবয়সে তিনি সূচনা করেন তার নিজস্ব বিপ্লব। সনাতন ধর্মমতে পরমেশ্বরের এক নাম হরি। কারণ তিনি সবসময় হরণ করেন বা কোনকিছু নিয়ে নেন। সেটা ভক্তের কষ্ট হতে পারে, অপরাধীর সুখও হতে পারে। হরিচাঁদ ঠাকুর ব্রাহ্মণ্যবাদীদের তোয়াক্কা না করে নিজের বাগ্মীতা আর তাঁর পূর্বসূরি শ্রীশ্রী চৈতন্যদেবের হরিনাম সংকীর্তনের ধরনকে পুনর্জাগরিত করেন৷ এই হরিনাম প্রেমে যারা মাতোয়ারা অর্থাৎ পুরোপুরি নিজেকে নিবেদন করতে পারে তারাই মতুয়া। আর হরিচাঁদ ঠাকুর কর্তৃক নির্দিষ্ট করে দেওয়া বৈদিক গ্রন্থানুযায়ী জীবনাচরণই তাদের মতুয়া ধর্ম। তিনটি স্তম্ভের উপর এই গৃহস্থ আশ্রম নির্ভর মতটি প্রতিষ্ঠিত।

প্রথমটি হচ্ছে, “জীবে দয়া”। অপরের দুঃখে দুখী ও অপরের সুখে সুখী – এই ভাবটি থাকলেই অন্তরের পাপচিন্তা, বেদনা সব ধুয়েমুছে যায়। এটিই দয়া।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে “নামে রুচি”। পরমেশ্বরকে একেকজন একেক নামে ডাকলেও তিনি সকলের প্রতিই কৃপাশীল। ঐকান্তিক নিষ্ঠা নিয়ে যদি কেউ তাঁকে ডাকে, তাহলে অভ্যাসের ফলে তার দ্বারা আর সহজে খারাপ কাজ হয়না।

মতুয়া সম্প্রদায়ের আদি ধর্মস্থান বাংলাদেশে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে; Image Courtesy: bbc.com
মতুয়া সম্প্রদায়ের আদি ধর্মস্থান বাংলাদেশে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে; Image Courtesy: bbc.com

তৃতীয় স্তম্ভটি হচ্ছে “মানুষে নিষ্ঠা”। ঐসময় যখন মানুষকে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণ, কায়স্থ ধোপা, মুচি ইত্যাদি ছত্রিশ জাতিতে ভেদাভেদ করা হতো তখন হরিচাঁদজী বলতেন প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা সত্য আছে। আমাদের সেই সত্য পরমাত্মার খাতিরেই মানুষকে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করতে হবে।

বিপ্লবের এখানেই শেষ না। সেসময় লোকে সনাতন ধর্ম চর্চা বলতে কেবল সংসারত্যাগ করে সন্ন্যাসী হওয়া বুঝতো। এই ধারণা এখনো কিছুমাত্রায় বিদ্যমান। যে কারণে অনেক অভিভাবক তার সন্তানদের ধর্মচর্চা করান না। কিন্তু হরিচাঁদ ঠাকুর গৃহস্থের ধর্মচর্চাতেই বেশি জোর দেন। ঘর ঠিক রাখতে পারলেই তো কেউ জগত ঠিক রাখার উপযুক্ত হবে। মতুয়া মতের জনপ্রিয়তার এটাও একটি অন্যতম কারণ।

এছাড়া তিনি চৈতন্যদেবের মতই নারীর ধর্মচর্চাকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। যেখানে এক শ্রেণীর ভণ্ড সাধক নারীকে তুচ্ছ জ্ঞান করতেন, সেখানে বিদুষী গার্গী, লোপামুদ্রা, বাক, রুচিরা, ঘোষার আদর্শকে স্থান দিয়ে হরিচাঁদজী বলেছিলেন, নারী সাধন পথের সহায়ক। ধর্ম পথের সহায়তা করে বলেই তো স্ত্রীর অপর নাম সহধর্মিণী।

 প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমাবেশের আগে মতুয়া মিছিল; Image Courtesy: indianexpress.com
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমাবেশের আগে মতুয়া মিছিল; Image Courtesy: indianexpress.com

কিন্তু হরিচাঁদ ঠাকুর বা মতুয়া ধর্মমতের মাহাত্ম্য এজন্য না শুধু। এটি বুঝতে হলে আমাদের তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের কর্মজীবনও দেখতে হবে। ১৮৪৭ সালে জন্ম নেয়া এই মহাত্মা তাঁর পিতার কর্ম ও স্বপ্নকে পরিপূর্ণ ও বিস্তৃত রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর কাজের মূল কেন্দ্র ছিল পিছিয়ে পড়া মানুষদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে অবহেলিত সমাজে যদি কখনো শিক্ষার আলো না পৌছে তাহলে কখনোই এই দুরবস্থা থেকে তাদের মুক্তি ঘটবেনা। বিদ্যাশক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তিই কারো মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মূল শক্তি। তিনি বলতেন, খাও বা না খাও, সবে বিদ্বান করাও। কোন ঘরে যেন অবিদ্বান সন্তান না থাকে।

১৮৮১ সালে বাগেরহাটের দত্তডাঙ্গা সম্মেলন থেকে তিনি শিক্ষা আন্দোলনের ডাক দেন। প্রাথমিকভাবে ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় পাঠশালা স্থাপন করা হলেও ওড়াকান্দিতে অচিরেই স্থাপিত হয় প্রথম উচ্চবিদ্যালয়। পুরুষদের পাশাপাশি নারীশিক্ষাও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতেন বলে ১৯০৮ সালে “সত্যভামা বালিকা বিদ্যালয়”ও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজ বা বেগম রোকেয়ার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই কাজটি ছিল অসামান্যের চেয়েও বেশি। জেনে অবাক হতে হয় যে দক্ষিণবঙ্গে প্রায় ১৮১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাম জড়িত।

ওড়াকান্দি গ্রামে মতুয়া ভক্তদের মহামেলা; Image Courtesy: banglatribune.com
ওড়াকান্দি গ্রামে মতুয়া ভক্তদের মহামেলা; Image Courtesy: banglatribune.com

শুধু উচ্চশিক্ষিত করা না, তিনি এসকল ছেলেমেয়েদের চাকরির ব্যবস্থাও করেছিলেন। এজন্য অবশ্য তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসনের সাথে তাঁকে কিছু আপোষ করতে হয়েছিল। সারা ভারত তখন স্বদেশী স্বাধিকার চেতনায় উত্তাল। এজন্য গুরুচাঁদজী ভাবলেন ইংরেজ নির্ভরতা কমিয়ে সকলকে স্বনির্ভর হতে হবে। তিনি তখন মতুয়া সম্প্রদায়ের লোকদের ব্যবসা ও যে শিক্ষা তারা অর্জন করেছে, তা থেকে পাওয়া বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে বলেন। যার ফলে দক্ষিণবঙ্গে মতুয়াদের একটা সুন্দর স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠে।

এছাড়া সরকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্ণবাদী “চণ্ডাল” শব্দের বিলোপসাধন, জমিদার, জোতদারদের অত্যাচার থেকে দরিদ্র প্রজাদের রক্ষা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে মিলে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সহায়তা – এমন আরো উল্লেখযোগ্য কাজ তিনি করেন।

বাংলাদেশ ছাড়া ভারতেও রয়েছে মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেক অনুসারী; Image Courtesy: jugasankha.in
বাংলাদেশ ছাড়া ভারতেও রয়েছে মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেক অনুসারী; Image Courtesy: jugasankha.in

মতুয়া মত একটি বিপ্লবের নাম আসলে। এতে ধর্ম ও কর্মের চমৎকার সুসমন্বয় দেখা যায়। ধর্ম তো তাই যা ধারণ করে মানুষ বাঁচে, যা মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে। ধর্ম থেকেই মানুষ আগে নৈতিকতা শিখতো, অন্তর্দৃষ্টি বাড়াতো। পারস্পরিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ এগুলোই ধর্ম শিক্ষা দেয়। যখন ধর্মের নামে কিছু অসৎ লোক বৃদ্ধি পায় আর উল্টো পথে হাঁটে, তখনই সংস্কারের দরকার হয়। মতুয়া মত হরিচাঁদ গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে তেমনই এক সংস্কার।

তাঁদের উদ্যোগ, কর্মপ্রচেষ্টা যে সফল তা তো বলার আর অপেক্ষা রাখে না। সেজন্য আজ ভারতের মত বিশাল দেশের প্রধানমন্ত্রীও কোন না কোন উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের এক গ্রামের মন্দিরে এসে প্রণাম করে যান।

মতুয়া সম্প্রদায়ের পাশাপাশি আমাদেরও উচিত এই শিক্ষা স্বনির্ভরতার বিপ্লব আদর্শ গ্রহন করে আমাদের নিজ নিজ সমাজকে আরো উন্নত করা। আলাপন এখানেই সমাপ্ত। Feature Image Courtesy: vajiramias.com