মৎস্যকুমারী উপাখ্যান: কতটা মিথ, কতটা বাস্তব?

মৎস্যকুমারী – শরীরের উপরের দিকটা মানুষের আর কোমর থেকে শেষাংশ মাছের লেজের আকৃতির। বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের পুরাণে উল্লেখ পাওয়া যায় এদের। কিন্তু মৎস্যকুমারীরা কি আসলেই আছে? নাকি এটা শুধুই মিথ?

মৎস্যকুমারীদের ইংরেজিতে বলে মারমেইড। Mere অর্থ জল আর Maid বলতে কুমারী। একইভাবে মারম্যান বা মৎস্যমানবদের কথাও জানা যায়।

তবে মৎস্যকুমারীদের বিষয়টিই আলোচিত হয়েছে বেশি। এদের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় কোথায় তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে খ্রী.পূ. ১০০০ অব্দে এসিরিয় পুরাণে দেবী আতারগাতিস এর বর্ণনা পাওয়া যায়। আতারগাতিস ছিলেন তাদের উর্বরতার দেবী। আরেক দেবী সেমিরামিস ছিলেন তার মেয়ে। আতারগাতিস ভালোবেসে ফেলেন এক রাখালকে। দেবীরা পুরাণমতে ছিলেন অমর। এই রাখাল ঘটনাচক্রে নিহত হয় আতারগাতিসের ভুলে। অনুতপ্ত দেবী ঠিক করেন মাছের জীবন নিয়ে জলে চলে যাবেন। তিনি রূপান্তরিত হন মৎস্যকন্যায়। এভাবেই মূলত মিথটির শুরু।

রাশিয়ান শিল্পীর আঁকা ছবিতে মৎস্যকুমারী; Image Courtesy: livescience.com
রাশিয়ান শিল্পীর আঁকা ছবিতে মৎস্যকুমারী; Image Courtesy: livescience.com

প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় সেইরিন বলে একরকম জলচর প্রাণীদের উল্লেখ পাওয়া যায়। হোমারের ‘ওডেসি’ মহাকাব্যেও আছে এই প্রাণীদের উল্লেখ। এদের সাথে অবশ্য মৎস্যকন্যাদের পার্থক্য আছে। এদের শরীরের অর্ধেকটা পাখির মত, বাকি অর্ধেকটা মানুষের রূপ।

মৎস্যকুমারী নিয়ে আরেকরকম মিথ জানা যায়, যার সাথে জড়িয়ে আছে মহাবীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নাম। আলেকজান্ডারের বোন থেসালোনিক এর মৃত্যুর পর নাকি তার জলে বিচরণ শুরু হয় মৎস্যকন্যা হিসেবে! গ্রীসের নাবিকদের সমুদ্রঝড়ে পড়ার কারণ হিসেবে দায়ী করা হতো তাকে! সে জানতে চাইতো যে কেমন আছে তার ভাই?

নাবিকেরা যদি খুশিমনে উত্তর দিত- হ্যাঁ, তিনি তো দিব্যি বেঁচে আছেন, গোটা পৃথিবীটাই তো তার হাতের মুঠোয়; তবে রক্ষা। আর নয়তো প্রবল চিৎকার দিয়ে, সমুদ্রে ঝড় নিয়ে এসে থেসালোনিক ধ্বংস করে দিতো জাহাজগুলো!

 জন উইলিয়ামের আঁকা ছবিতে মারমেইড (১৯০০); Image Courtesy: royalacademy.org.uk
জন উইলিয়ামের আঁকা ছবিতে মারমেইড (১৯০০); Image Courtesy: royalacademy.org.uk

শুনতে খুবই অদ্ভুত লাগছে, তবে প্রাচীন গ্রীসের মানুষের বিশ্বাস ছিলো এমনই।

ইউরোপের আরো অনেক অঞ্চলেই মৎস্যকুমারীদের মনে করা হয় অশুভ। স্কটল্যান্ডে তারা পরিচিত সেলকি নামে। এদের ভেতর অবশ্য পুরুষগুলোকে বেশি বিপজ্জনক ও নিষ্ঠুর মনে করে তারা। আর নারীরা সৌন্দর্য ও কামনার প্রতীক।

ইউরোপের অন্য কিছু অঞ্চলে এদের পরিচিতি আছে রুসালকি নামে। সেখানেও মূলত এদের জাহাজডুবি বা সামুদ্রিক ঝড়ের মত ব্যাপারগুলোর সাথে সম্পর্কিত বিবেচনা করা হয়। কোন জাহাজের আশেপাশে এদের দেখলে বা কোন জাহাজে এরা ওঠার চেষ্টা করলে জাহাজটা ডুবতে চললো- এমনই মনে করা হয়।

প্রখ্যাত হরর সাহিত্যিক এইচ.পি. লাভক্রাফটের ‘দ্য টেম্পল’ গল্পটিতেও আমরা মৎস্যকন্যাদের এই রূপে দেখতে পাই।

মৎস্যকুমারী চরিত্র অবলম্বনে তৈরি হয়েছে নানা কার্টুন; Image Courtesy: all-free-download.com
মৎস্যকুমারী চরিত্র অবলম্বনে তৈরি হয়েছে নানা কার্টুন; Image Courtesy: all-free-download.com

আফ্রিকার দেশগুলোতেও আছে এমন জলজ জীবের ধারণা। ‘মামা ওয়াটা’ বা Mother of Water বলে থাকে তারা এদের। এরাও মৎস্যকুমারীদের মতই। সমুদ্রের গভীরে বাস করে। এদের অসন্তুষ্ট করলে সমূহ বিপদ হতে পারে। আবার, কোন জেলে বা নাবিককে সিডিউস করে তারা নিয়ে যেতে পারে সমুদ্রের একেবারে গভীরে। যেখানে গেলে আর ফেরার কোন পথ নেই!

রসায়নবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী প্যারাসেলসাস এর লেখাতেও পাওয়া যায় মৎস্যকুমারীদের উল্লেখ। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন, এরা এমন এক জীব যারা নাবিকদের পথভ্রষ্ট করে নিয়ে যায় সাগরের অতলে, চরিতার্থ করে এদের কামনা। তবে মৎস্যকন্যারা যে সবসময়ই এমন বিধ্বংসী, তা নয়। থাইল্যান্ডে রামায়নের যে ভার্সনটি প্রচলিত আছে, সেখানে উল্লেখ পাওয়া যায় রাবনের মেয়ে মৎস্যকুমারী সুর্বণমৎসার। হনুমানকে সেতু নির্মাণে বাধা দিতে গিয়ে পরে তারই প্রেমে পড়ে সে। সহযোগিতা করে সেতু নির্মাণে।

থাইল্যান্ডের রামায়ণে বর্ণিত হয়েছে হনুমান ও মৎস্যকুমারী সুবর্ণামৎসার কথা; Image Courtesy: rmg.co.uk
থাইল্যান্ডের রামায়ণে বর্ণিত হয়েছে হনুমান ও মৎস্যকুমারী সুবর্ণামৎসার কথা; Image Courtesy: rmg.co.uk

এছাড়া হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারসনের সেই বিখ্যাত রূপকথা ‘লিটল মারমেইড’ তো আছেই। এক রাজপুত্রকে ভালোবেসে এক হৃদয়বান মৎস্যকন্যা স্থলে চলে আসে। কিন্তু রাজপুত্রের সাথে মিলন হয়না তার। প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে না পেরে সে নিজেকে মিলিয়ে দেয় বাতাসে।

তবে ডিজনীর তৈরি করা এনিমেশন পিকচারে আমরা অবশ্য মধুর সমাপ্তি দেখি, যা হ্যান্সের মূল কাহিনী থেকে ভিন্ন।

আরব্যরজনীতেও উল্লেখ পাওয়া যায় এদের। তবে সেখানে এদের দেখানো হয়েছে অনেকটা মানুষের মতই। এমনকি মৎস্যকুমারীদের সাথে এদের বিয়ে ও সন্তানও হয়। এদের সন্তানরা পানিতে থাকতে ও পানির ভেতরে শ্বাস নিতে পারে। জেলে ও মৎস্যকুমার আবদুল্লাহ এর গল্পে এমন দেখা যায়।

  হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারসনের চিরায়র রূপকথা 'লিটল মারমেইড'; Image Courtesy: abebooks.com
হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারসনের চিরায়র রূপকথা ‘লিটল মারমেইড’; Image Courtesy: abebooks.com

এতক্ষণ যা লিখলাম সবই অবশ্য মিথ কিংবা সাহিত্যের উদাহরণ। তবে বাস্তবে মৎস্যকন্যা দেখেছেন এমনও দাবি করেন কেউ কেউ। যেমন- ক্রিসোফার কলম্বাস ১৪৯৩ এ আমেরিকা মহাদেশে এসে নাকি দেখেছিলেন তিনটি মৎস্যকুমারী! ক্যাপ্টেন জন স্মিথেরও নাকি দ্বিতীয় সমুদ্র অভিযানের সময় দেখা হয়েছিল মৎস্যকুমারীর সাথে!

তবে এসবই কল্পকাহিনী বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। DeepSeaNews এর বরাতে বলা হয়েছিল, মাছ ও স্তন্যপায়ীদের হজমপ্রক্রিয়া আলাদা। তাছাড়া থার্মালসিস্টেম কিংবা জন্মদানপ্রক্রিয়া কিছুই এক নয়। কাজেই মৎস্যকুমারী থাকা অসম্ভব। এছাড়া বিভিন্ন নাবিকরা দূর থেকে কিংবা ঝড়ের সময়ে অস্পষ্টভাবে সমুদ্রগরু (এক রকম মাছ), শুশুক, এমনকি সীল মাছ দেখেও মৎস্যকুমারী মনে করে ভুল করতে পারেন বলেই গবেষকেরা মনে করেন।

 বহু নাবিক সীল মাছকে অনেক সময় ভুলবশত মৎস্যকুমারী মনে করেন; Image Courtesy: ocean.si.edu
বহু নাবিক সীল মাছকে অনেক সময় ভুলবশত মৎস্যকুমারী মনে করেন; Image Courtesy: ocean.si.edu

২০০৯ সালে ইসরায়েলের কির‍য়াত ইয়াম শহরে কয়েকজন পর্যটক দাবি করেন তারা মৎস্যকন্যা দেখেছেন। পরে মেয়র মোটা অঙ্কের পুরষ্কার ঘোষণা করলেও তারা কোন প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

যা হোক, মৎস্যকুমারীদের ব্যাপারটি এখনো প্রতিনিয়তই মানুষের কাছে দারুণ একটি কৌতূহলজাগানিয়া ব্যাপার।  বাস্তবে না হয় তাদের অস্তিত্ব নেই; কিন্তু পুরাণে, সাহিত্যে আর মানুষের কল্পনার জগতে হয়ত তাদের বিচরণ থাকবে চিরকাল।


Feature Image Courtesy: sandiego.edu

References:

  1. www.rmg.co.uk
  2. www.britannica.com
  3. www.weird.com
  4. www.livescience.com