momotadi by manik bandopadhyay

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা, এক বিস্ময়। মধ্যবিত্তীয় হীনমন্যতাকে অতিক্রম করে তিনি সাহিত্যে নিয়ে এসেছিলেন সমাজের তথাকথিত নিচুতলার মানুষদের গল্প। ভদ্র সমাজের সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামির মুখোশটিও টেনে ছিঁড়ে ফেলে ভেতরের কুৎসিত-কদর্য রূপটি তিনি বের করে এনেছেন নিপুণ দক্ষতায়।

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আলোচিত গল্পগ্রন্থ ‘সরীসৃপ’। এই গ্রন্থের-ই একটি গল্প ‘মমতাদি’। নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে থাকার সুবাদে গল্পটি সবারই পড়া হয়েছে। তবে সেটি ছিল সংক্ষেপিত রূপ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প 'মমতাদি', Image Courtesy: Anandabazar.com
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘মমতাদি’, Image Courtesy: Anandabazar.com

মমতাদি ‘ভদ্রঘরের’ মেয়ে। অন্যের বাড়িতে কাজ করা ভদ্রঘরের মেয়েদের শোভা পায়না! কিন্তু কী আর করা- স্বামীর চাকরি না থাকায় একটি বাড়িতে তাকে নিতে হয় রান্নার কাজ। বারো টাকা মাইনে আশা করলেও বাড়িটি থেকে তাকে দিতে চাওয়া হয় পনেরো টাকা। আর এতেই কৃতজ্ঞতায় চোখে জল আসে মমতাদির৷

গল্পটিতে উত্তম পুরুষে একটি শিশুর চরিত্র বর্ণনা করেছেন মানিক। সেই শিশুটির কোন নাম উল্লেখ নেই বটে, তবে তার জবানীতেই আমরা পুরো গল্পটি জানতে পারি।

তার প্রতি মমতাদির ছিল অপার স্নেহ। নিজের ভাইয়ের আসনে তাকে বসিয়েছিল মমতাদি। এর প্রমাণ আমরা পাই তার সেই কথায়- ‘আমায় বামুনদি বলো না খোকা, দিদি বলো। তোমার মা রাগ করবেন দিদি বললে?’

মমতার আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রখর। ছেলেটিকে নিজের ভাইয়ের আসনে বসানো, কিংবা তার প্রতি করা স্নেহপূর্ণ আচরণে কোন রকম বাধা হয়ে দাঁড়াননি বাড়ির কেউ। যদি তা হতো, তবে মাইনের পনের টাকা কিংবা অভাবের সংসারের তোয়াক্কা না করেই মমতাদি চাকরি ছেড়ে চলে যেতো৷

দেহসর্বস্বতার বাইরে এই গল্পে হৃদয়ের সন্ধান করেছেন মানিক; Image Courtesy: kalerkantho.com
দেহসর্বস্বতার বাইরে এই গল্পে হৃদয়ের সন্ধান করেছেন মানিক; Image Courtesy: kalerkantho.com

মমতার স্বামীর পরে চাকরি হয়৷ কিন্তু তখনও সে অব্যাহত রাখতে চায় এই বাড়ির কাজ৷ কিন্তু শুধু কি অর্থের প্রয়োজনে? মোটেও তা নয়৷ এই শিশুটির সঙ্গে তার গড়ে উঠেছিল হৃদয়ের বন্ধন৷ অজস্র পুরুষের শরীরসর্বস্ব ভালোবাসার, কিংবা বলা ভালো কাম-লালসার বাইরে এই শিশুটির সংস্পর্শ তাকে দিয়েছিল এক পবিত্র অনুভূতি। শিশুটির প্রতি তার প্রশ্রয়ও আমাদের চোখে পড়ে। সে অনেক বেশি মিষ্টি খেয়ে ফেললে মমতা কোন রকম বকাঝকা করেনা তাকে। শুধু আবেদনের সুরে বলে- ‘যা খেয়েছ তাতেই বোধহয় অসুখ হবে, আর খেও না, কেমন?’ ..

স্বামীর হাতেও অনেক সময় নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে মমতাকে। তার আভাস আমরা গল্পে পাই। এক সকালে তার গালে হাতের আঙুলের তিনটি দাগ দেখে শিশুটি ঠিকই বুঝতে পারে কেউ হয়ত মেরেছে তার প্রিয় মমতাদিকে। কিন্তু ওইটুকু বয়সে সেটা তার কাছে স্পষ্ট হয়না। মমতাও বিষয়টিকে এড়িয়ে যায় মশার কামড়, হাত দিয়ে মশা মারতে গিয়ে গালে দাগ পড়ার মত হাস্যকর প্রবোধ দিয়ে। কিন্তু শুধু সেটুকু তো মমতার কষ্টের কারণ ছিল না। অসংখ্য লালসাপূর্ণ পুরুষদেহকে প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হতো তাকে। এই শিশুটির ভালোবাসার কাছে নিজেকে পণ্যের জায়গায় মানুষ মনে হতো তার। আর এই আক্ষেপ তার কণ্ঠে ঝরে যখন শিশুটিকে সে বলে- ‘সবার কাছে যা পাই না, তা তুমি দেবে কেন?’

সাহিত্যে ভদ্রসমাজের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেছেন মানিক; Image Courtesy: chakribd.com
সাহিত্যে ভদ্রসমাজের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করেছেন মানিক; Image Courtesy: chakribd.com

শিশুটির পক্ষে অবশ্য এত গভীর কথার অর্থ ওই বয়সে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়না। সে শুধু ভাবে কী-ই বা দিতে পারে সে? কী দেয়ার কথা বলছে তার প্রিয় মমতাদি? এই দান কারো লালসা বা কাম চরিতার্থের জন্য দেহ দান নয়, এই দান মমতার, শ্রদ্ধার, হৃদয় থেকে উৎসারিত পবিত্র ভালোবাসার দান।

পাঠক, এ পর্যায়ে এসে আপনারা হয়ত একটু চমকে উঠছেন। বিশেষত আমরা যারা বোর্ডবইয়ে পড়েছিলাম গল্পটা। সংক্ষেপিত ভার্সন হওয়ায় সেখানে এই বিষয়টির উল্লেখ ছিল না।

আসল ব্যাপার হলো, মমতাদি ছিলো একজন যৌনকর্মী। তার স্বামীর চাকরি চলে যাওয়ায় অভাবের সংসারকে টেনে নিয়ে যেতে তাকে এ পথে পা বাড়াতে হয়। কিন্তু বিষয়টি ছিল গোপন, তাই সমাজের তথাকথিত ভদ্রতার খোলসে কোন ফাটল ধরেনি এতে৷ কিন্তু যখন মমতা গৃহকর্মীর কাজ করে সম্মানের সাথে জীবিকা নির্বাহ করতে চায়, সামাজিক তথাকথিত ভদ্রতা সেটি সহজে মেনে নিতে পারেনা। মমতাদির পেশার কারণে বহু পুরুষের সাথে শারীরিক সংস্পর্শে এসেছে সে, লিপ্ত হয়েছে সঙ্গমে। কিন্তু সে তো শুধু লালসা। ভালোবাসা কিংবা মানসিক কোন সম্পর্ক সেখানে নেই।

সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ পরম মমতায় ঠাঁই পেয়েছে মানিকের সাহিত্যে; Image Courtesy: teachers.gov.bd
সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ পরম মমতায় ঠাঁই পেয়েছে মানিকের সাহিত্যে; Image Courtesy: teachers.gov.bd

মমতাদির প্রতি গল্পের এই শিশুটির অনুভূতি যেন সেই সব পুরুষদের চেয়ে আলাদা। আর তাই শিশুটি তার কাছে নিজ ভাইয়ের সমান হয়ে ওঠে, যে মমতার ভেতরের মানুষটিকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে৷ শরীরসর্বস্ব লালসার বাইরে এই শিশুটির প্রতি তাই সে হৃদয়ের গভীর থেকেই টান অনুভব করে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এই গল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটো কাজ করেছেন।

প্রথমত, সমাজের নিচতলার মানুষদের নিয়ে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়। সাথে আচরণিক শ্রেণিভেদ দূর করেছেন। দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গৃহকর্মীদের সাথেও সম্মানজনক সম্পর্কের।

দ্বিতীয়ত, ভদ্র সমাজের পুরুষরা যৌনকর্মীদের সাথে সঙ্গম করলেও তারা ভদ্র, সভ্য। কিন্তু ওই নারীরা সমাজের চোখে ‘পতিতা’। এই নারীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখেছেন মানিক, সন্ধান করেছেন তাদের হৃদয়ের সংবেদন।

আর তাই, বাংলা সাহিত্যের অনন্য এক সংযোজন হিসেবে কাল অতিক্রম করে টিকে আছে এই গল্পটি।


Feature Image Courtesy: onlineporaleka.blogspot.com