এডগার অ্যালান

১৮৪৯ সালের ৩ রা অক্টোবর। মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে সেদিন শেরিফ নির্বাচন। এর একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিলো গানার’স হল। সেটি পড়েছিল ৪ নং ওয়ার্ডে। এখানে জোসেফ ওয়াকার দেখলেন মলিন পোশাকে বোম্বাজিন কোর্ট আর মাথায় স্ট্র হ্যাট পরে আহত অবস্থায় শুয়ে রয়েছে এক লোক। কাছে যেতেই রীতিমত অবাক হলেন তিনি। মানুষটি আর কেউ নন, প্রখ্যাত কবি কথাসাহিত্যিক এডগার অ্যালান পো!  

কিন্তু কী করে এমন হাল হলো তাঁর? ফ্যাকাশে মুখ, চোখে কেমন শূণ্যদৃষ্টি! পো তখন ঠিক করে কিছু বলতেও পারছেন না। ওয়াকার তাঁর থেকে শুধু শুনলেন ব্যক্তিগত চিকিৎসক জোসেফ স্নোডগ্রাস এর নাম। তিনি চিঠি লিখলেন স্নোডগ্রাসের উদ্দেশ্যে। কয়েকঘন্টার ভেতরই ওয়াশিংটন মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হলো এডগার অ্যালান পো-কে। সেখানে তাঁকে দেখলেন ডা. জন মোরান। পো সঠিকভাবে বলতে পারছিলেন না কী ঘটেছিল। শুধু আউড়ে যাচ্ছিলেন একটি নাম- রেনল্ডস।

এডগার অ্যালান পো; Image Courtesy: pinterest.com

পো-র সে সময়ের বাগদত্তা এলমিরা শেলটন খবর পেয়ে হাসপাতালে আসেন। এলমিরা ছিলেন পো-র জীবনের প্রথম প্রেম। কিন্তু পরিণয় হয়নি তাদের। সেসময় পো বিপত্নীক। ভেঙে পড়েছিলেন খুব। এদিকে এলমিরাও কয়েকবছর হলো বিধবা হয়েছেন। পো তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এলমিরা সময় চেয়েছিলেন। পো তাঁকে সময় দেন। এর ভেতর নিজে থেকে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করার উদ্যোগ নেন। এর ফান্ড সংগ্রহের জন্যই তিনি গিয়েছিলেন ভার্জিনিয়ায়। সেখান থেকে বাল্টিমোর হয়ে নিউইয়র্ক যাবার কথা ছিলো তাঁর। কিন্তু এই বাল্টিমোরেই এমন আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হলো তাঁকে।

জন মোরান খোঁজ করতে শুরু করলেন এই রেনল্ডসকে। এর ভেতর দুজন রেনল্ডসকে পাওয়া গেলো। একজন রেনল্ডস ছিলেন পত্রিকা সম্পাদক ও অভিযাত্রী। তাঁকে দেখে অণুপ্রাণিত হয়ে পো লিখেছিলেন তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘আর্থার গডন পিমের অ্যাডভেঞ্চার’। আরেকজন পো-র দূর সম্পর্কের চাচা।

এডগার অ্যালান পো-র একমাত্র উপন্যাস ‘আর্থার গডন পিমের অ্যাডভেঞ্চার’ এর প্রচ্ছদ; Image Courtesy: goodreads.com

পো হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল অব্যাহতভাবে, হৃৎস্পন্দন ছিল অনিয়মিত পানি পানেও কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। মাঝে অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও ৬ অক্টোবর থেকে তাঁর অবস্থা আবারো খারাপ হতে শুরু করে তারিখ ভোর পাঁচটার দিকে তিনি মারা যান

পরদিন বিকেলে তাঁকে কবর দেয়া হয় ওয়েস্টমিনিস্টারের গোরস্থানে। খুব সাদামাটাভাবে সম্পন্ন হয় শেষকৃত্য। তাঁর এক আত্মীয় সস্তা একটা কফিন যোগাড় করেন। এক কাজিন আনেন কাফনের কাপড়। দমকা হাওয়ার এক মেঘলা দিন ছিল সেটি। তাই মাত্র সাত-আটজনের উপস্থিতিতেই তিন মিনিটের ভেতর সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। সে কবরটির তেমন কোন চিহ্নও ছিল না। মৃত্যুর ২৬ বছর পর ১৮৭৫ সালে তাঁর কবর বর্তমান সমাধিতে স্থানান্তর করা হয় তৈরি করা হয় সমাধিফলক

কিন্তু পো’র মৃত্যু কীভাবে হলো? এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোন জবাব মেলেনি আজও। মৃত্যুর পর তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে বলা হয়েছিল মস্তিষ্কের প্রদাহ ও রক্তক্ষরণের কথা। কিন্তু পরে সেটির কোনো কপি খুঁজে পাওয়া যায়নি।  

এডগার পো-র সমাধিফলক, মৃত্যুর ২৬ বছর পর ১৮৭৫ এ তৈরি; Image Courtesy: pinterest.com

স্নোডগ্রাস যখন প্রথম পো-কে দেখেন, তিনি ধারণা করেছিলেন এটা অ্যালকোহলের প্রভাব। কিন্তু জন মোরান পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, তাঁর অসুস্থতার জন্য মদ্যপান দায়ী নয়। তাছাড়া, পো তখন এলমিরার অনুরোধে নিজেও মাদকবিরোধী একটি সংস্থার সাথে যুক্ত হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যু নিয়ে আলোচিত আরো কিছু কারণ আলোচনায় আসে। এর ভেতর একটি হলো কুপিং। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে সেদিন ছিল শেরিফ নির্বাচন। এসময়ে নির্বাচনগুলোতে প্রার্থীদের কিছু ভাড়া খাটা মাস্তান থাকতো। তারা ভোটারদের কাউকে-কাউকে নেশাগ্রস্থ করে ইচ্ছামত জাল ভোট দিইয়ে নিত। কখনো কখনো তাদের প্রচণ্ড মারধোর করে অচেতন করে ফেলা হতো। পো’র মলিন পোশাক সেসবের একটা ইঙ্গিত দেয়।  কুপাররা সাধারণত পোশাক পরিবর্তন করিয়ে জীর্ণ, মলিন পোশাক পরিয়ে দিত ভিকটিমদের। এতে লোকে সহজে চিনতে পারতো না তাদের। বিশেষত পো’র পায়ের জুতোটি ছিল বেমানান। তার পায়ের সাথে জুতোর সাইজের মিল ছিল না। এটি কুপিংয়ের বড় একটি লক্ষ্মণ।

শিল্পীর তুলিতে পো; Image Courtesy: saatchiart.com

আবার তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে জলাতঙ্কের কথাও পো হ্যালুসিনেশন, পানি পানে অনীহাসহ আরো কিছু লক্ষ্মণ এদিকে ইঙ্গিত করে। ১৯৯৬ সালে এক পরীক্ষায় কয়েকজন চিকিৎসক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পো জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিলেন!

তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাইপোগ্লাইসেমিয়া, ডায়াবেটিস, কলেরাসহ আরো বিভিন্ন রোগের কথা বলা হয়েছে। পো ১৮৪৯ এর জুলাইয়ে ফিলাডেলফিয়া গিয়েছিলেন। সেখানে তখন কলেরা মহামারী চলছে। তিনি নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে এটি সরাসরি তাঁর মৃত্যুর কারণ নয়। কলেরার চিকিৎসায় তাঁকে দেয়া হয়েছিল পারদসমৃদ্ধ ওষুধ। এতে তাঁর শরীরে পারদের পরিমাণ বেড়ে যায়। যা তাঁর মস্তিষ্কের রোগের কারণ হয়ে থাকতে পারে।

তবে এখানে আরো একটি বিষয় সম্পর্কে রহস্য আছে। পো ম্যারিল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ। কিন্তু তাঁকে এখানে দেখা যায় অক্টোবরের ৩ তারিখে। মাঝের কয়েকদিন তিনি কোথায় ছিলেন? এ নিয়ে পরিষ্কারভাবে কিছু জানা যায়নি।

এখানেই চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন এডগার অ্যালান পো; Image Courtesy: cbslocal.com

আবার হত্যার তত্ত্বও দিয়েছেন কেউ কেউ এলমিরার ভাইয়েরা রাজি ছিলেন না এই বিয়েতে কারো কারো মতে, তারাই পিটিয়ে আহত করেন পোকে, খাইয়ে দেন মদ! এই আঘাত ও নেশাগ্রস্ততার ফলেই পরে স্ট্রোক হয় পো’র। হয়ত বিষাক্ত কিছুও তাঁকে খাওয়ানো হয়ে থাকতে পারে! তবে এই তত্ত্ব তেমন একটা ধোপে টেকেনি। পো’র যদি তেমন কিছু হয়, সেটা ভোট ডাকাতির সময় কুপিংয়ের ফলে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।


তবে যা-ই হোক, আধুনিক রহস্য সাহিত্যের জনক এডগার অ্যালান পো’র মৃত্যু আজও রয়ে গেছে একটি অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে। ঠিক কী কারণে তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল তা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি কেউই।      আমরা যা জেনেছি, যতটুকু জেনেছি তার সবটাই সম্ভাবনা। পো-র মৃত্যুবিষয়ে প্রকৃত সত্যটি কী তা হয়ত রয়ে যাবে অজানাই।


Feature Image Courtesy: Britannica.com

References:

  1. www.britannica.com
  2. www.smithsonianmg.com