সেন্টিনেল: বঙ্গোপসাগরের বুকে নিষিদ্ধ এক দ্বীপ

অজানা, রহস্যময় কিংবা নিষিদ্ধ কোনো কিছুর নাম শুনলে প্রায় সবারই কানখাড়া হয়ে যায়। আর রহস্য যাদের টানে কিংবা ভ্রমণ যাদের নেশা বা থ্রিলারপ্রেমী মানুষদের বেলায় তো কোনো কথাই নেই, এগুলো হচ্ছে তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তাই কেউ যদি শোনে তাদের খুব নিকটেই এমন কিছুর অবস্থান তাহলে জানার আগ্রহ আরো দ্বিগুণ হয়ে যায়। হ্যাঁ, আমাদের বঙ্গোপসাগরের বুকেই আছে এমন অজানা এক নিষিদ্ধ দ্বীপ, যার নাম ‘সেন্টিনেল’।

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উত্তরে অবস্থিত এই দ্বীপের বাসিন্দা কারা, কী তাদের পরিচয়, তাদের বসবাসের ধরন কিংবা কেমন তাদের ভাষা, তা জানা নেই অনেকেরই। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে সাগরের তলদেশ থেকে মহাকাশ পর্যন্ত সব জায়গায় বিজ্ঞানের ছোঁয়া, সেখানে এই নির্জন দ্বীপ সম্পর্কে জানা নেই অনেকের। অদ্ভুত না? মূলত দ্বীপের বাসিন্দারাই পৃথিবীর সবকিছু থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। যতবারই কেউ তাদের সংস্পর্শে যেতে চেয়েছে ততবারই তারা বিরূপ আচরণ করেছে। ঠিক যেন হুমায়ূন আহমেদের দারুচিনি দ্বীপের রহস্য। তারা নিজেরাই তাদেরকে সবার কাছে রহস্যময়ী করে রেখে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। কেউ যদি তাদের সীমানায় ঢোকার চেষ্টা করে তার পরিণাম হয় ভয়াবহ। জলসীমা ও ভৌগোলিক সীমারেখায় জায়গাটি ভারতের হলেও কোনোদিন ভারতের সরকার বা জনগণ সেখানে প্রবেশাধিকার পায়নি। সে দ্বীপের বসবাসকারীরা নিজেরাই রাজা তাদের নিজেদের রাজত্বে।

আয়তন ও অবস্থান

ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একটি অঞ্চলের নাম ‘সেন্টিনেল দ্বীপ’। স্মিথ দ্বীপের প্রায় ২০ মাইল পশ্চিমে ও রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ৫০ কি.মি দূরে অবস্থিত এই দ্বীপ, যার আয়তন ৫৯.৬৭ বর্গকিলোমিটার। সেন্টিনেল দ্বীপের দৈর্ঘ্য ৭.৮ কি.মি ও প্রস্থ ৭.১ কি.মি। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, এই দ্বীপের বয়স প্রায় ৬০ হাজার বছর। অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যে সজ্জিত এই দ্বীপটি প্রবাল প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। চারপাশের প্রবাল প্রাচীরগুলো ৪০০ থেকে ১২৯০ মিটার পর্যন্ত প্রসারিত। চতুর্ভুজ আকৃতির এই দ্বীপটি থেকে সমুদ্রের উচ্চতা প্রায় ১২২ মিটার। এক কথায় বলতে গেলে, মোহনীয় সৌন্দর্যের প্রতীক এই সেন্টিনেল দ্বীপ।

মানচিত্রে উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ; Image Courtesy: bbc.com

সেন্টিনেল দ্বীপের ইতিহাস

নৃতাত্ত্বিকদের মতে, এই দ্বীপের বাসিন্দাদের আদিপুরুষরা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে এসেছিলেন। ১৭৭১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি জাহাজ দ্বীপের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে আলো দেখতে পাওয়ায় বেশ অবাক হয়। কারণ এরকম একটা নির্জন জায়গায় আগে কখনো কাউকে দেখা যায়নি। তখন থেকেই শুরু হয় এই দ্বীপ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা। তবে সময়ের স্রোতে এই দ্বীপের কথা ভুলে যায় সবাই।

তারপর অনেক বছর পর এই দ্বীপের মানুষের দেখা মেলে ১৮৬৭ সালের দিকে। ‘নিনেভেহ’ নামক ভারতের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ যাত্রাপথে সেই দ্বীপে নোঙর ফেলে। তৃতীয় দিনে খাবারের উদ্দেশ্যে সেখানে ঘোরাফেরা করলে তাদের চোখে পড়ে কৃষ্ণকায় উলঙ্গ একদল অদ্ভুত মানুষ হাতে বর্শা, তীর ও ধনুক নিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ছুটে আসছে। সেখান থেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন কোনোরকমে পালিয়ে আসতে পারলেও পালাতে পারেননি বাকিরা। শেষমেশ ব্রিটিশ রয়াল নেভির সাহায্যে জাহাজের সবাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

তীর-ধনুক হাতে কয়েকজন সেন্টিনেলিজ; Image Courtesy: newsinside.com


এই ঘটনার কয়েক বছর পর ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী এমভি পোর্টম্যানের নেতৃত্বে একটি দল গবেষণার জন্য সেখানে যান ও তাদের সাথে মেশার চেষ্টা করেন। কিছুটা সফলও হন তারা। পরে সেখান থেকে গবেষণার জন্য এক বৃদ্ধ দম্পতি ও চারজন ছোট ছেলেমেয়েকে নিয়ে আসেন। তাদের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়। তবে কিছুদিন পর তাদের মধ্যে একজন মারা গেলে বিজ্ঞানীরা ভড়কে যান এবং বাকিদের দ্বীপে ফিরিয়ে দেন। এ ঘটনায় দ্বীপের বাসিন্দারা তাদের প্রতি খুবই ক্ষুব্ধ হয় এবং তারপর থেকে দ্বীপের প্রবেশাধিকার সকলের জন্য নিষিদ্ধ করে দেয়। আর যতবারই কেউ সেখানে প্রবেশ করতে চেয়েছে ততবারই তারা আক্রমণ করেছে।

এসব জানা সত্ত্বেও ১৯৭৫ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির এক ফটোগ্রাফার দ্বীপটি নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরির উদ্দেশ্যে সেখানে গেলে তাকেও বিষাক্ত তীরের আঘাত নিয়ে ফিরে আসতে হয়।

১৯৯০ সালে ভারতের নৃবিজ্ঞানী ত্রিলোক নাথ পণ্ডিত তাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে অবশেষে তাকেও খালি হাতে ফিরতে হয়। তারপর ১৯৯১ সালের দিকে মধুমালা চট্টোপাধ্যায় নামের এক মহিলা দ্বীপের বাসিন্দাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে প্রথমে ব্যর্থ হলেও পরে সফল হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও দ্বীপ থেকে বিতাড়িত করা  হয়।

সেন্টিনেলিজ শিশুদের সাথে কথা বলাকালীন মধুমালা; Image Courtesy: alokitorangamati.com

তারপর যারাই গেছেন সেন্টিনেল নামক দ্বীপে কেউই আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেননি। ২০০৬ সালে সুন্দর রাজ ও পণ্ডিত তিওয়ারি নামক ভারতীয় জেলে মাছ ধরতে যান দ্বীপটির কাছাকাছি। অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে নৌকায় ঘুমিয়ে পড়লে রাতে স্রোতের টানে নৌকা সেন্টিনেল দ্বীপে চলে যায়। পরের দিন দ্বীপের বাসিন্দারা তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে খবর পেলে ভারতীয় কোস্টগার্ড হেলিকপ্টারে করে জেলের লাশ আনতে গেলে ফের আক্রমণ করে বসে তারা। এরপর থেকেই ভারত সরকার দ্বীপটির ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত সীমানায় ঢুকতে নিষেধ করে এবং সেন্টিনেলের গায়ে নিষিদ্ধ দ্বীপের তকমা এঁটে দেয়।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর এলেন চাউ নামক একজন ধর্মপ্রচারক ও পর্যটক দ্বীপের ৬ জন জেলেকে ঘুষ দিয়ে ঢোকার প্রচেষ্টা চালান। দ্বীপে প্রবেশ করতে দেখলেই দ্বীপের বাসিন্দারা তীর নিক্ষেপ করে এবং তাকে হত্যা করে তার লাশ গায়েব করে দেয়।

সেন্টিনেল দ্বীপে এলেন চাউ; Image Courtesy: bbc.com

সেন্টিনেলিজ

সেন্টিনেল দ্বীপ নিয়ে গবেষণা করে এই দ্বীপের অধিবাসীদের নামকরণ করা হয়েছে ‘সেন্টিনেলিজ’। সেন্টিনেলিজরা মূলত আন্দামানি জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তবে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে জারোয়া, ওঙ্গে ও গ্রেট আন্দামানিজ নামে আরও তিনটি উপজাতি রয়েছে। তবে তাদের কারোর সাথেই সেন্টিনেলিজদের কোনো সামঞ্জস্য নেই আর তারা এতটা হিংস্রও নয়।

জনসংখ্যা

২০০১ সালের সরকারি জরিপ অনুযায়ী তখন সেখানে আনুমানিক ৩৯ জনের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এরপর হেলিকপ্টার করে মাঝে মাঝে সেখানে টহল দেয়ার চেষ্টা করা হলে তাদের সংখ্যা সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। ধারণা করা হয়, সেন্টিনেল দ্বীপে ১০০ থেকে ৫০০ জনের মত লোক বসবাস করে। তবে কোনো এক কারণে সেন্টিনেলিজরা বেশিদিন বাঁচতে পারে না। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এতই কম যে সামান্য সর্দি-কাশি-জ্বর হলেই মারা যায়, ফলে তাদের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

অদ্ভুত সাজের আবরণে আক্রমণাত্মক সেন্টিনেলিজ; Image Courtesy: newsinside24.com

ভাষা ও ধর্ম

সেন্টিনেলিজরা অদ্ভুত এক ভাষায় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। পার্শ্ববর্তী ওঙ্গে জাতির সাথে মিল থাকলেও ওঙ্গে জাতির কেউ সেন্টিনেলিজদের ভাষা বুঝতে পারে না। আর তাদের নাম অনুসারেই গবেষকরা তাদের ভাষার নাম দিয়েছে সেন্টিনেলিজ ভাষা।

সেন্টিনেলিজদের উপর অভিযান চালানো সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় তাদের ধর্ম কী, তারা কিসের উপাসনা করে সেসব সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই ধারণা করা সম্ভব হয়নি।

সেন্টিনেলিজদের জীবন-যাপন

সেন্টিনেলিজরা নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে বেশ সচেতন। যখনই কোনো জাহাজ বা নৌকা দ্বীপে আসে কিংবা হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনতে পায় তখন তারা তীর-ধনুক ছুঁড়তে শুরু করে। তারা এতোটাই নৃশংস যে মানুষকে পানিতে ডুবিয়ে, তীর নিক্ষেপ করে, ধারালো ছোরা দিয়ে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে রাখে। তারপর মৃতদেহ দ্বীপের সীমানায় লাঠির সাথে বেঁধে সবাইকে হুশিয়ার করে দেয়।

সমুদ্রে শিকার কালে এক কৃষ্ণকায় হিংস্র সেন্টিনেলিজ; Image Courtesy: risingbd.com

তাদের জীবিকার উৎস হলো শিকার করা। বেঁচে থাকার তাগিদে সেন্টিনেলিজরা মৎস্য শিকার, প্রাণী শিকার, ফলমূল ও বন্য লতাপাতা আহরণ করে খাদ্যাভাব দূর করে। তবে খণিজ ধাতুর ব্যবহার না জানলেও তাদের কিছু জিনিসে ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। তাদের কৃষিকাজ ও আগুন জ্বালানোরও কোনো জ্ঞান নেই বলে জানা যায়। সেন্টিনেলিজদের বেশভূষাও অন্যরকম। তারা গাছের বাকল দিয়ে গোপনাঙ্গ ঢেকে রাখে আর পাতা দিয়ে মাথায় একরকম মুকুট পরিধান করে। সারা শরীরে রঙ মেখে বিভিন্ন উল্কি এঁকে সাজগোজ করে।

তাদের বানানো ঘরগুলো হয় মূলত দেয়ালবিহীন। শুধু মাথার উপরের ছাউনি মাটি পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে থাকে। তারা একঘরে কয়েক জন বসবাস করে বলে ধারণা করা হয়। আবার কিছু কিছু ঘর তৈরি করে যেগুলো মাটি থেকে একটু উঁচুতে বানানো হয়। সেসব ঘরগুলো তুলনামূলক একটু বড় হয় এবং সেখানে বেশ কয়েকজন বসবাস করলেও নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখে।

সেন্টিনেলিজ দের ছাউনির তৈরি বাড়িঘর; Image Courtesy: anandabazar.com

প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা

২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামি ও ভূমিকম্পের কবলে পড়ে উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপ। সরকার কর্তৃক সেখানে ত্রাণ দেয়ার জন্য দ্বীপের কাছাকাছি গেলে সেন্টিনেলিজরা ক্ষিপ্ত হয়ে হেলিকপ্টারকে কেন্দ্র করে বিষাক্ত তীর ও বর্শা নিক্ষেপ করতে শুরু করে। তাদের সাহায্য করার উদ্দেশ্য তারা বিপরীত ভাবে নেয়ায় সেখানে আর হেলিকপ্টার নামতে পারেনি। অবশেষে তাদেরকে সহযোগিতা ছাড়াই সেখান থেকে সাহায্যকারী দলকে ফিরে আসতে হয়।

হেলিকপ্টারের দিকে তীর ছোড়ার মুহূর্ত; Image Courtesy: nagorik.com

কিছুদিন পর তাদের খোঁজখবর নেয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে গেলে দেখতে পাওয়া যায় তারা আগের মতই স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হতে সক্ষম হয়েছে। এরপর থেকে ভারত সরকার তাদের আর বিরক্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্য কেউ যাতে তাদের জীবনযাপনে বিঘ্ন না ঘটায় সেজন্য পদক্ষেপ নেয়। আর তাই আপনি আমি চাইলেই সেখানে যেতে পারব না। কারণ সরকার সেন্টিনেল দ্বীপের তিন কিলোমিটার পর্যন্ত নিষিদ্ধ সীমানা হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি সবার উদ্দেশ্যে জারি করে –

“Let Them Live Alone”

Feature Image Courtesy: anandabazar.com

References: