বড় প্রেম শুধু কাছেই টানেনা- ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে। রাজলক্ষ্মীর বিরহে কাতর হয়ে এমনটা ভেবেছিলেন শ্রীকান্ত। উপন্যাসের বাইরে বাস্তব জীবনেও প্রেম বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে তা থেকে তৈরি হতে পারে মনোমালিন্য, বিষাদ, ঈর্ষা। সঙ্গীকে সীমাহীন ভালোবেসে ফেললে সে ভালোবাসাই ধীরে ধীরে অনুভূতিকে বিষাক্ত করে দিতে পারে। তৈরি হতে পারে সঙ্গীর প্রতি অবিশ্বাস, অহেতুক সন্দেহ, যা একসময় রূপ নিতে পারে এক মানসিক ব্যাধিতে। ওথেলো সিনড্রোম নামক এই মানসিক সমস্যায় কেউ আক্রান্ত হলে ব্যক্তি ঈর্ষাপরায়ণতায় ভুগতে শুরু করেন। সঙ্গীর মনোযোগকে নিজের দিকে টেনে নেওয়ার জন্য তিনি যাচ্ছেতাই আচরণ শুরু করতে পারেন। যার ফলে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জোগাড় হয়।

ওথেলো সিনড্রোম নামটি নেওয়া হয়েছে শেক্সপিয়ারের নাটক ‘ওথেলো’ থেকে। নাটকে মূল চরিত্র ওথেলোকে তার স্ত্রী পরকীয়া করছে বলে ভুল বোঝানো হয়। এ কাজটি করেন ওথেলো’র বিশ্বাসভাজন ইয়াগো। ইয়াগোর প্ররোচনায় ধীরে ধীরে স্ত্রী ডেসডিমোনাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেন ওথেলো। শেষে তার ঈর্ষাপরায়ণতা এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি নিজের হাতে নিজের স্ত্রীকে খুন করেন এবং পরিশেষে নিজেও আত্মহত্যা করেন।

শেক্সপিয়ারের ‘ওথেলো’ নাটকের প্রচ্ছদ; Image Courtesy: imimg.com

প্রণয়ঘটিত যেকোনো সম্পর্কে একজন তার সঙ্গী প্রসঙ্গে অনেক সময় ঈর্ষাপরায়ণ হতেই পারেন- এটা একেবারে অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ব্যক্তি যদি সবসময় ভাবতে থাকেন তার সঙ্গী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, তাকে কম মনোযোগ দিচ্ছে তাহলে তা ধীরে ধীরে ওথেলো সিনড্রোম নামক এই মানসিক সমস্যা তৈরি করে। এ সমস্যায় পতিত হলে ব্যক্তি তার সঙ্গীর প্রতি অযৌক্তিক, অনুচিত, অমূলক সন্দেহ ও রাগ পুষে রাখেন। কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলেই ব্যাপারটি পরিস্কার বোঝা যাবে।

৬৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ তার স্ত্রীকে সারাক্ষণ পরকীয়ার জন্য দোষারোপ করতেন। শেষে আর নিতে না পেরে স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তিনি। তারপর নিজেও আত্মহত্যা করেন।

প্রেমের সম্পর্কে সঙ্গী স্বাভাবিকভাবেই ঈর্ষাপরায়ণ হতে পারে; Image Courtesy: 123rf.com

৪২ বছরের এক নারী তার স্বামীকে ঘর থেকে বেরোবার আগে এবং বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করার পর নিয়মিত জেরা করতেন। তিনি তার স্বামীর ফোন, ইমেইল ইত্যাদি ঘেঁটে দেখতেন এবং তাকে টেলিভিশন দেখতে দিতেন না। কারণ তার ভয় হতো তার স্বামী টেলিভিশনে সুন্দরী নারী দেখে তার প্রেমে পড়ে যাবে।

৩৯ বছরের জনৈক প্রৌঢ় তার স্ত্রীর প্রতি নিয়মিত পরকীয়ার অভিযোগ তুলতেন। ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার ঘরে ফিরে আসতেন তার স্ত্রীর ‘অপকর্ম’ হাতেনাতে ধরবেন বলে। মাঝেমাঝে তিনি স্ত্রীর পিছু নিতেন। এছাড়া অনেক প্রতিবেশীকে তার স্ত্রীর সাথে জড়িয়ে গালমন্দও করেছেন তিনি।

এই কেসগুলো থেকে বোঝা যায় ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে একজন মানুষ কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন।

১৯৫১ সালে ড. জন টড নামের একজন ব্রিটিশ মনোরোগ চিকিৎসক প্রথম এ সিনড্রোমের নামকরণ করেন। মস্তিষ্কবিকৃতি, পরিত্যক্ত হওয়ার তীব্র ভয় থেকে ধীরে ধীরে ব্যক্তি কোনটি বাস্তব আর কোনটি নয় তা নির্ণয় করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। ফলে তিনি ধীরে ধীরে ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত হন।

প্রেমের সম্পর্কে সঙ্গী সন্দেহপ্রবণ হতে পারে; Image Courtesy: lacomadre.mx

মরবিড জেলাসি, ডিল্যূশনাল জেলাসি, ইরোটিক জেলাসি সিনড্রোম, ওথেলো সাইকোসিস, সেক্সুয়াল জেলাসি ইত্যাদি নামেও পরিচিত ওথেলো সিনড্রোম। ভাইস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শার্লট নামের ২১ বছর বয়সী এক তরুণী জানাচ্ছেন, ‘হঠাৎ করেই আমার মধ্যে এ সিনড্রোমের লক্ষণগুলো দেখা দিতে লাগলো। আমার মনে হচ্ছিল আমার সঙ্গী আমাকে অবিশ্বাস করবে বা ব্রেক-আপ করে নেবে।’ ধীরে ধীরে তার ভেতর ঈর্ষা জন্মাতে শুরু করলো। তিনি সম্পর্ক শেষ করার কথাও ভাবতে শুরু করেছিলেন। শেষে নিজের লক্ষণগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার পর তিনি বুঝতে পারলেন তিনি ওথেলো সিনড্রোমে ভুগছিলেন। ‘নামটা জানার পর যেন একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম’, মন্তব্য করেন শার্লট।

জর্জিয়া’র র‍্যাচেল (৩১) একজন প্রাইভেট হেলথ কেয়ার ওয়ার্কার। মরবিড জেলাসি’র সাথে তার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। “আমার মা এই সিনড্রোমে ভুগতেন। আমাদের নতুন বাড়িতে ওঠার পর মা কিছু প্লেবয় ম্যাগাজিন খুঁজে পান সেখানে। তিনি ভেবে বসলেন সেগুলো বাবার ছিল। ঘরের দেওয়ালে ম্যাগাজিনের পাতাগুলো সাজিয়ে তিনি বাবার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘দেখো, দেখো, তোমার বেশ্যাদের দেখো’। মা ভাবতেন, বাবা দুনিয়ার সব সুন্দরী নারীদের সাথে বিছানায় যেতে চান।”

প্রেমের সম্পর্কে অহেতুক সন্দেহ সঙ্গীর সাথে দূরত্ব তৈরি করতে পারে; Image Courtesy: dreamstime.com

গোল্ডস্মিথস ইউনিভার্সিটির এমিরেটাস অধ্যাপক উইন্ডি ড্রাইডনের মতে, যারা ওথেলো সিনড্রোমে ভোগেন তারা তাদের সম্পর্ক নিয়ে সবসময় অনিশ্চয়তায় ভোগেন। তারা তাদের পার্টনারের পক্ষ থেকে তাদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে বারবার নিশ্চয়তা পেতে চান। প্রফেসর ড্রাইডনের পরামর্শ হলো, ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গীর উচিত এটা বলা যে, আমি তোমাকে ভালোবাসি কিন্তু তা-ই বলে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই। ড্রাইডনের মতে, বারবার সম্পর্কের সুস্বাস্থ্য নিয়ে আশ্বাস দিতে থাকলে তা আখেরে খারাপ পরিণতির দিকেই টেনে নিয়ে যায়। ওথেলো সিনড্রোমের কারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর আক্রান্ত ভুক্তভোগী ভাবতে শুরু করেন, তার পক্ষে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তিনি আর নতুন সম্পর্কে নিজেকে জড়াতে পারেন না। ফলে তৈরি হতে পারে একাকিত্ব, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা। তাই ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। চিকিৎসা না করালে এর লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হয়ে মনের ভেতর গেড়ে বসে। ছদ্মবেশ ধরে পিছু নেওয়া তথা স্টকিং, খুন, আত্মহত্যা ইত্যাদি হতে পারে ওথেলো সিনড্রোমের শেষ পরিণতি।

ওথেলো সিনড্রোমের কারণে সম্পর্ক ভেঙ্গে যেতে পারে; Image Courtesy: karibunicenter.com

বর্তমানে অবশ্য কিছু মনোবিজ্ঞানী দাবি করেছেন, ওথেলো আদতে ওথেলো সিনড্রোমে ভোগেননি। কারন তার সাথে প্রবঞ্চনা করে তাকে ভুল বোঝানো হয়েছিল, সেজন্যই স্ত্রীর প্রতি তিনি সন্দেহ প্রকাশ করা শুরু করেন। যেহেতু তার এই সন্দেহপরায়ণতা তার ভেতর থেকে সহজাতভাবে তৈরি হয়নি বরং তাকে মিথ্যা বুঝিয়ে তৈরি করা হয়েছে তাই তার নাম দিয়ে এই সিনড্রোমের নামকরণ করা ভুল।

Feature Image Courtesy: diariofemenino.com

References: