আজকের পূজা আলাপনটি ‘মহালয়া’ নিয়ে। মহালয়া ব্যাপারটা কী?

“আমার তর্পণে সেই পরম ব্রহ্ম থেকে পদতলে যে ঘাস সেটিও তৃপ্ত হোক!”

আসলে মহালয়ার তাৎপর্যের দিকে তাকালে বোঝা যায় সনাতন ধর্মের দর্শন কতটা বৈশ্বিক ও মানবিক। এই তিথিটি আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথির অপর নাম। একটি মাস দুই পক্ষে হয়, চাঁদের হ্রাস পর্যায়ের তিথিগুলো মিলে কৃষ্ণপক্ষ; বৃদ্ধি পর্যায়ের তিথিগুলো মিলে হয় শুক্লপক্ষ। আর একটি পক্ষ পনেরটি তিথির সন্নিবেশে গঠিত হয়। অমাবস্যা হলো কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথির নাম। আর শুক্লপক্ষের শেষটির নাম পূর্ণিমা। কখনো কখনো এই পূর্ণিমারও নানারকম নামকরণ করা হয়।

তো এই মহালয়া তিথিতে আমরা মূলত আমাদের ছয় উর্ধ্বতন পিতৃপুরুষের স্মৃতি, কাজ, করে যাওয়া কর্তব্যের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা জানাই। এই ছয় পিতৃপুরুষ হচ্ছেন বাবা, ঠাকুর্দা, ঠাকুর্দার বাবা; মায়ের বাবা, মায়ের বাবার বাবা, মায়ের বাবার ঠাকুর্দা।

দুর্গা পূজার একটি পূজা মণ্ডপ; Image Courtesy: sanatanbarta.com

তবে এখানের মন্ত্রে ‘পিতরঃ’ শব্দের অর্থে মা, ঠাকুর্মা, দিদাও চলে আসে। কারণ সংস্কৃতে ‘পুত্রাঃ’ দিয়ে কিন্তু শুধু ছেলে না, ছেলে-মেয়ে উভয়কে বোঝায়। পুত্রা মানে বাংলাতে যাই হোক, সংস্কৃতে ‘সন্তান’। তেমনি এই ‘পিতরঃ’ শব্দটি। অর্থাৎ, পিতৃপক্ষ মানে কোন পুরুষতান্ত্রিকতা না। মাতৃগণের জন্যও এমন নিয়ম আছে, সেটি সুবিস্তারে আরো সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গে বলব। আপাতত বলি, মহালয়ার পরের পনেরটি তিথি তো “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা….”র জন্যই রাখা।
আর যাদের বাবা মা জীবিত আছেন, বুঝতেই পারছেন, তাঁরা নিতান্ত অসমর্থ না হলে আপনাদের তর্পন করার দরকার নেই। করলেও অধিকার নিয়ে পিতা মাতার নাম বাদ দিয়ে করা যায়। ‘সাথী’ সিনেমায় যেমন জিৎএর ছোট ভাইকে তার বদলে মাতৃশ্রাদ্ধের অধিকার দেওয়া হয়েছিল, মনে আছে?

তর্পণ মানে তৃপ্তি সাধন করা; Image Courtesy: bengali.news18.com


তো এই কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য প্রতীক হচ্ছে তিল, যব, চাল প্রদান, পণ্ডিত ও দরিদ্র ব্যক্তিদের সহায়তা করা ইত্যাদি। এই সমস্ত ব্যাপারকে ‘তর্পণ’ বলে।

এই যে তর্পণটা করা হয়, তা শুধু নিজের পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যেই করে কিন্তু কেউ ছাড় পাবে না। এগুলোর সাথে দেবতর্পণ, মানুষ তর্পন, যম তর্পন এবং ঋষিতর্পণও করতে হয়। দেবতর্পণের মন্ত্রে তো উদ্ভিদকুল, সরীসৃপ, পাখি, পশু সবার অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। আবার রামতর্পণ ও লক্ষ্মণতর্পণে, হ্যাঁ, অনেকের অপ্রিয় শ্রীরামচন্দ্রের সাথে জড়িত এই পর্যায়ে এসেই মানুষকে ত্রিভুবনের সমস্ত প্রয়াতকে জল তর্পণ করে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। সে যে ধর্ম, যে জাতি, যে মতবাদের হোক না কেন। এমনকি তাঁদের উদ্দেশেও তর্পণ করা হয়, জন্ম-জন্মান্তরে যাঁদের আত্মীয়-বন্ধু কেউ কোথাও নেই।

কী সুন্দর এই মন্ত্রটি!–


ওঁ নমঃ যে বান্ধবা অবান্ধবা বা, যে অন্য জন্মনি বান্ধবাঃ।

তে তৃপ্তিং অখিলাং যান্ত, যে চ অস্মৎ তোয়-কাঙ্খিণঃ।।


অনুবাদে — যাঁরা আমাদের বন্ধু ছিলেন এবং যাঁরা বন্ধু নন, যাঁরা অন্য কোন জন্মে আমাদের বন্ধু ছিলেন (বা ছিলেন না), যাঁহারা আমাদের কাছ থেকে জলের (শ্রদ্ধার) প্রত্যাশা করেন, তাঁরা সম্পূর্ণরূপে তৃপ্তিলাভ করুন।

পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যেই করে তর্পণ করা হয়; Image Courtesy: bengali.news18.com

মানে অনেক লোকের হয়না, নিঃসন্তান মারা যায়? বা পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মারা যায়..পরিবার জানেওনা বেঁচে আছে না মরে গেছে, বা এমন কোন সংস্কৃতিতে তার জন্ম যারা এসব করে না, কিন্তু সেই পরমাত্মার অংশ হিসেবে তারও তো এতে সমান ভাগ, তাই আমরা তাকেও বাদ দিচ্ছি না।

তাই তো মন্ত্রে বলে “আব্রহ্মস্তম্ভ পর্যন্তং জগত্‍ তৃপ্যতু…”। মানে আমার তর্পনে সবকিছু যিনি ধারণ করে আছেন সে ব্রহ্ম তৃপ্ত যেন হন, আবার নিজের স্বরূপ সম্পর্কে জানেনা, জগতের এমন সব সত্তা, এমনকি সামান্য স্তম্ভ.. অর্থাৎ তৃণ- ঘাস, যাকে মাড়িয়ে আমি হয়তো একরকম জীবননাশই করি, তার সত্তাও তৃপ্তি পাক।


তো এই সমস্ত কিছুর বিরাট এই সমাবেশটা, আলয়টাই মহালয়া। যার পরেই দেবীপক্ষের সূচনা। এখন ব্যাপারটার সাথে মৃতরা জড়িয়ে তো, মৃত্যু মানেই তো মনে শোক জন্ম নেয়, তাই কথার মারপ্যাঁচে শুভ মহালয়া বলা গেলেও, ইংরেজি অনুবাদে ‘হ্যাপি’ মহালয়া বলা আসলেই যায় না। বরং একটু স্থির মনে পূর্বজদের কথা ভাবলে বিনয়ী ব্যক্তি বিষাদগ্রস্তই হন নিজের করা কাজ দেখে।

মহালয়ার ভোরেই ভিড় জমে গঙ্গার ঘাটে; Image Courtesy: whatsnewlife.com

বাঙালী হিন্দুদের মহালয়া নিয়ে এত আবেগ কেন?

এর পেছনে আছেন মহাত্মা শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও তাঁর পরিবেশিত শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠের অনুষ্ঠান ‘মহালয়া’। এটির জনপ্রিয়তা এতই বেশি যে অনেকে এটি একরকম ধর্মীয় অনুষঙ্গই মনে করেন। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে উচ্চারিত স্তোত্র পাঠ না শুনলে মায়ের আগমনী সুরটা যেন ঠিক বেজে উঠে না।
প্রায় দুই ঘন্টাব্যাপী সঙ্গীতালেখ্য মহিষাসুরমর্দ্দিনী জনপ্রিয় প্রভাতী বাংলা বেতার আকাশবাণীর সর্বাধিক কাল ধরে প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানের নাম। ১৯৩১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি মহালয়ায় এই অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়। তবে তখন মহালয়াতে না, বরং ষষ্ঠী তিথিতে ষষ্ঠ্যাদিকল্পারম্ভ সময়ে এটির সম্প্রচার করা হতো।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র; Image Courtesy: bharatbarta.com


অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ দুর্গা সপ্তশতী থেকে দেবী চন্ডীর স্তোত্রপাঠ, বাংলা ভক্তিগীতি, ধ্রুপদীসঙ্গীত এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর নাট্যরূপ। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং গ্রন্থনা ও স্তোত্র পাঠ করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পঙ্কজ কুমার মল্লিক সমগ্র কলকাতায় খুঁজে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে নির্বাচন করেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র প্রথম রেকর্ড ধারণের আগে টানা তিন দিন উপবাস থেকে মাতৃভাবনায় আত্মনিমগ্ন ছিলেন যার কারণে তাঁর অন্তরে এমন ভাবের উদয় হয়েছিল যে তাঁর সেই স্তোত্রপাঠ কালজয়ী হয়েছে সকল বাঙালির হৃদয়ে।

১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচারিত হতো। এরপর থেকে নানা কারণে ১৯৬৬ সালের রেকর্ডটি বাজানো হয়। ১৯৭৬ সালে সরকারমহলের চাপে আকাশবাণি মহিষাসুরমর্দ্দিনীর পরিবর্তে ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্‌’ নামে একটি ভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করেন। যেখানে শ্লোকপাঠ করেন উত্তমকুমার এবং সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরিবর্তে অন্য কারো চন্ডীপাঠ মেনে নিতে পারে নি সাধারণ জনগণ। বাধ্য হয়ে পরবর্তীতে দুর্গাষষ্ঠীর দিন পুনরায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে অনুষ্ঠিত পূর্বের মহিষাসুরমর্দ্দিনী সম্প্রচার করা হয়। সম্প্রতি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সম্মানে এই ঘটনাটি নিয়ে ‘মহালয়া’ নামে কলকাতায় একটি সিনেমাও নির্মাণ করা হয়।

‘মহালয়া’ সিনেমার পোস্টার; Image Courtesy: sangbadpratidin.in

এই আবেগপ্রবণতা থেকেই মূলত বাঙালী ব্যাকরণে অশুদ্ধ রেখেও শুভ মহালয়া বলতে চায়। তবে এটার বিরোধিতা করা মানেও এই না যে মহালয়া অশুভ। মহাপুরুষদের দেহত্যাগের দিনকে আমরা তিরোভাব তিথি বলি। সেদিন অনেক ভাল ভাল কাজও করি। কিন্তু সেজন্য যেমন শুভ তিরোধান দিবস বলি না, তেমনি এই মহালয়ার স্মৃতি তর্পণের বিষয়টি।

আলাপন শেষ হলো।


Feature Image Courtesy: zeenews.india.com