বর্তমানে দুর্গাপূজার একটি চমৎকার অনুষঙ্গ কুমারী পূজা। আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে, পূজাটি কেন করা হয়? আর কোন মেয়েকে পূজা পেতে হলে কুমারীই কেন হতে হবে?


“যেখানে নারীরা পূজিত হন, সেখানে দেবতাদের প্রসন্নতা থাকে। আর যেখানে নারীরা যোগ্য মর্যাদা পান না সেখানের আর সব ভাল কাজও নিষ্ফল হয়।”

(ঋষি মনু, ৩/৫৬)

আসলে অনেকে কুমারী পূজা সম্পর্কে টিভিতে বা পত্রিকায় শুনে মনে করে যে আমরা হয়তো মানুষকে দেবী হিসেবে পূজা করছি৷ কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। ঐযে বলেনা, দরিদ্র নারায়ণ সেবা, লক্ষ্মীপতি নারায়ণ কী দরিদ্র? মোটেও না, পুরো বিষয়টিই প্রতিমা পূজারই একটি অন্যরকম সংস্করণ। অব্যয় দেবী শক্তিকেই পরিবর্তনশীলতার দেহে আমরা কল্পনা করছি। বারবার নিজেকে মনে করাচ্ছি সেই শাস্ত্রবচন, “যা দেবী সর্বভূতেষু….”, ভুলে যাই তো, তাই কতোবার কতোভাবেই না নারীকে অবমাননা করে ফেলি। এই পূজার মাধ্যমে যেন বলা হয়, ক্ষমা করে দাও মোরে। তেমনি সমাজের দরিদ্রদের সেবার মধ্যে আমরা দেখি শ্রীবিষ্ণুরই সেবা, তাই দরিদ্র নারায়ণ সেবা। তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই তো তিনি প্রকাশিত। এটাই সনাতন শাস্ত্রের দর্শন।

কুমারী পুজায় এক কিশোরী; Image Courtesy: dinersheshey.com

তেমনি এই কুমারী প্রতীকটা আসলে বিশ্বময়ীর স্বরূপকেই বোঝাতে। শ্রীগীতাতে শ্রীকৃষ্ণ যখন বলছেন তিনি অধ্যবসায়ীদের ভেতরের ইচ্ছা, তার সাথেই কিন্তু বলছেন তিনি ছলনাকারীদের মধ্যে পাশাখেলা। তিনি নিজেকে মৃত্যু বলে পরিচয় করাচ্ছেন, আবার বলছেন তিনি জন্মও। এটিই আসলে বেদোক্ত ঈশ্বরের ধারণা। অবাঙমানসগোচর; মানুষের বাক্ অর্থাৎ কথার গোচর তিনি না। ওমা, তাহলে কী দিয়ে পূজিব তাঁকে, উপাচার পাবো কই!


কিন্তু তিনিই “মনোবৈচনাকাধার”, তাঁকে ভাবার মনের সকল চিন্তা ও বাক্য তিনিই যুগিয়ে দেন। উপনিষদে বহুবার বলা হচ্ছে তিনি অনন্ত অসীম ইত্যাদি, আবার বলছে, কেউ যদি কোনভাবে তাঁর সবটুকু দেখেছে বলেও মনে করে, তারপরও তিনি আরো দশ আঙ্গুল অতিরিক্ত হয়ে অবস্থান করেন। তাইতো হিরণ্যকশিপু নানা অদ্ভুত শর্ত দিয়ে মৃত্যুকে এড়াতে চেয়েও পারেনি, কারণ ভগবান অদ্ভুতাদ্ভুত বা অদ্ভুতের চেয়েও বেশিকিছু।


এরকম নানা বৈপরীত্যের সূত্র ধরেই জগজ্জননী পূজার মাঝখানে এই “কুমারী” পূজা। মানে তিনি জননী হয়েও কুমারী। সাধারণ ভাবে কী এমনটা সম্ভব? না। তাই তো তিনি অসাধারণ। অসাধারণ হিন্দুর এই উপাহৃত উপলব্ধি।

সাধারণত দুর্গাপূজার মহাষ্টমী পূজার শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়; Image Courtesy: channelionline.com

এখন এই কুমারীপূজায় এক বা একাধিক কুমারী নারীকে পূজা করা হয়। দুর্গাপূজা যেহেতু শাক্তমতের পূজা, তাই তন্ত্র মার্গের প্রভাব এতে বেশিই। তন্ত্রসারেই এই পূজাবিধি, ঐ যে বলেছিলাম, কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে এক মেয়ে আবির্ভূত হলে ঋষি স্নেহভরে কন্যা সম্বোধন করেছিলেন… তো সে রূপ তো কুমারী ছিলো, তন্ত্রসারের ঋষি ওরকম উপলব্ধি করেই কীভাবে জগতের মেয়েদের মধ্যে মাকে অনুভব করে পূজা করবে তা বলে দিয়েছে। বলছে যে এই ধরনে পূজার জন্য ১ থেকে ১৬ বছর বয়স হলেই ভাল। যেমন শাখায় শাখায় কত জুঁই মালতী, কিন্তু মায়ের পায়ের সাথে জবাফুলেরই আলাপন।


কেন ১৬?

ঐ যে নবপত্রিকায় যেমন দেবীর ৯টি রূপকে পূজা করা হয়, তেমনি তন্ত্রসার রচনা হওয়ার সময় মনে হয় মায়ের ১৬টি রূপ ঋষিরা উপলব্ধি করতে পেরে মন্ত্র নির্বাচন, সিদ্ধ এসব করে পূজা শুরু করেছিলেন।

সেরকম উপলব্ধি অনুযায়ী এক বছর বয়সী কুমারী হলো দেবীর “সন্ধ্যা” নামের রূপটির চেতনার প্রতীক। দুই বছর বয়স্কা “সরস্বতী”, তিন বছরে “ত্রিধা”, চার বছরে “কালিকা”, পাঁচ বছরে “সুভগা”, ছয় বছরে “উমা”, সাত বছরে “মালিনী”, আট বছরে বলে কুষ্ঠিকা।

নয় বছর বয়সী কুমারী প্রতীকের নাম “কালসন্দর্ভা”, দশ বছর বয়সে “অপরাজিতা”, এগারো বছর হলে “রুদ্রাণী”, বারো বছর হলে “ভৈরবী”, তের বছরে “মহালক্ষ্মী”, চৌদ্দ বছরে “পীঠনায়িকা”, পনের বছর হলে “ক্ষেত্রজ্ঞা” এবং ষোল বছর বয়স হলে কুমারী “অন্নদা” বা “অম্বিকা” রূপের প্রতীক। এই রূপগুলোর বিস্তারিত “তন্ত্রসার” ও “সাধন সমর” নামের অসাধারণ গ্রন্থে পাবেন। আমি আর বলছি না।

দুর্গা পূজায় পূজা মণ্ডপ; Image Courtesy: c.ndtvimg.com

তো এখানে আরেকটি কথা হচ্ছে, ষোল বছর বয়সী হলেও যে কুমারীকে নির্বাচন করা হচ্ছে তার রজঃস্বলা বা মাসিক হওয়া যাবে না। এইরে, মাসিককে কি তবে অপবিত্র বিবেচনা করছে নাকি? উহু, তন্ত্রসার আমাদের আশ্বস্ত করছে “অজাতপুষ্প” শব্দটির মাধ্যমে। মানে মাসিক বা ঋতুমতী হওয়াকে পুষ্প বা ফুল ফোঁটার সাথে তুলনা করছেন রচয়িতা, যেমন করেছেন মুনি বশিষ্ঠ, মুনি যাজ্ঞবল্ক্য। আর ফুল থেকেই তো বীজ, ফল এসব হয়, মানে নতুন কিছু সৃষ্টি হয়। মা-ই সৃষ্টিময়ী, কিন্তু আমরা তো মায়ের বিপরীত ভাবের পূজাটি করতে বসেছি। তাই ঋতুমতীতে উত্তীর্ণ কোন মেয়েকে, যার মধ্যে নতুন প্রাণ সৃষ্টির শক্তি প্রবেশ করেছে, তাকে আর এই পূজাপর্যায়ে নিই না। সে তো ইতিমধ্যেই ঐ মূল প্রতিমা কাঠামোর ভাবেরই অংশ। আবার redundancy বা পুনরাবৃত্তি কেন।
আবার, অজাতপুষ্পের সাথে সুলক্ষণা শব্দটাও আছে। সুলক্ষণ হতে হবে কারণ পূজা তো একাগ্র আরাধনার বিষয়, আর কুমারীর দেহেও দেবীকে আবাহন করতে হবে। তাই মনকে নির্মল, স্থির, শান্ত রাখতে হয়। আর সমাজে লোকে সবসময় নিজের থেকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকেই শ্রদ্ধা সম্মান করে। পূজার একটি অর্থ এগুলোও। আর সত্যি বলতে আমাদের চরিত্রে কুলক্ষণই তো বেশি। তাই পূজ্য কুমারীর সুলক্ষণা হওয়া উচিত।

কুমারী পূজায় নারীর বন্দনা; Image Courtesy: bd-pratidin.com

চঞ্চলা ধরনের হলে বা অল্পেই ধৈর্য্য হারালে তো আমরা ভাববো, ওমা, এই মেয়ে তো আমাদেরই মতো। এ যদি পূজনীয় হয় তো আমি কী দোষ করলাম।


তন্ত্রোক্ত কুমারী পূজাকে বেশি জনপ্রিয় করেছেন বিশ্ববরেণ্য মনীষী স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর জীবনীতে পাঁচবারের মত এরকম পূজা করার উল্লেখ করা যায়, ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন জাতির মেয়ের মধ্যে। রাণী রাসমণিকেও এক সাথে একহাজারের বেশি দরিদ্র অভাজন কুমারী মেয়েকে পূজা করেছেন, তাঁদের সব দায়দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু অনেকে অভিযোগ তুলে যে স্রেফ ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যাই কুমারী পূজার উপযুক্তা। তাই এটি বর্ণবাদী ব্যাপার আসলে। বিভিন্ন জায়গায় রামকৃষ্ণ মিশনের পূজাতে কুমারী হিসেবে নির্বাচিতার নাম দেখেও এমনটা মনে হয় যে আসলেই কি শুধু ব্রাহ্মণের কন্যাই পূজনীয়।


কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা না। স্বামীজি, মানে যিনি রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি যে পাঁচবার কুমারী পূজা করেছেন, তার মধ্যে কাশ্মীরে মাঝির কন্যাকেও পূজা করার কথা আছে। আর “মেরুতন্ত্র” অনুযায়ী, সর্বকামনা সিদ্ধির জন্য ব্রাহ্মণ কন্যা, যশঃলাভের জন্য ক্ষত্রিয় কন্যা, সম্পদ লাভের জন্য বৈশ্য কন্যা, ও সন্তান লাভের জন্য শুদ্রকুলে জন্ম নেওয়া কন্যা পূজা করা হয়।

চঞ্চলা ধরনের হলে বা অল্পেই ধৈর্য্য হারালে তো আমরা ভাববো, ওমা, এই মেয়ে তো আমাদেরই মতো। এ যদি পূজনীয় হয় তো আমি কী দোষ করলাম।


তন্ত্রোক্ত কুমারী পূজাকে বেশি জনপ্রিয় করেছেন বিশ্ববরেণ্য মনীষী স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর জীবনীতে পাঁচবারের মত এরকম পূজা করার উল্লেখ করা যায়, ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন জাতির মেয়ের মধ্যে। রাণী রাসমণিকেও এক সাথে একহাজারের বেশি দরিদ্র অভাজন কুমারী মেয়েকে পূজা করেছেন, তাঁদের সব দায়দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু অনেকে অভিযোগ তুলে যে স্রেফ ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যাই কুমারী পূজার উপযুক্তা। তাই এটি বর্ণবাদী ব্যাপার আসলে। বিভিন্ন জায়গায় রামকৃষ্ণ মিশনের পূজাতে কুমারী হিসেবে নির্বাচিতার নাম দেখেও এমনটা মনে হয় যে আসলেই কি শুধু ব্রাহ্মণের কন্যাই পূজনীয়।


কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা না। স্বামীজি, মানে যিনি রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি যে পাঁচবার কুমারী পূজা করেছেন, তার মধ্যে কাশ্মীরে মাঝির কন্যাকেও পূজা করার কথা আছে। আর “মেরুতন্ত্র” অনুযায়ী, সর্বকামনা সিদ্ধির জন্য ব্রাহ্মণ কন্যা, যশঃলাভের জন্য ক্ষত্রিয় কন্যা, সম্পদ লাভের জন্য বৈশ্য কন্যা, ও সন্তান লাভের জন্য শুদ্রকুলে জন্ম নেওয়া কন্যা পূজা করা হয়।

নারীকে সন্মান জানানোই কুমারী পূজার মূল লক্ষ্য; Image Courtesy: sanatanexpress.com

এখন ব্রাহ্মণ কন্যাতে কেন বাকি তিনজনের ব্যাপারগুলোও প্রবেশ করেছে? কারণ আগেকার ব্রাহ্মণ পরিবারে, এখনও অনেক ব্রাহ্মণ পরিবারে ধর্মচর্চা করার একদম বা সবচেয়ে বেশি উপযোগী পরিবেশ থাকে। যেটা অন্য পরিবারগুলোতে চাইলেও অনেকসময় পারা যায় না। তো একটা ধর্মীয় আবহে ছোট থেকেই বড় হয় বলে গড় হিসেবে ব্রাহ্মণ কন্যার আধার বেশি উপযুক্ত বলে ভাবা হয়। কিন্তু পুরোহিত বা সন্ন্যাসী যদি নিজের সাধনশক্তি দিয়ে বুঝতে পারেন যে শূদ্র কন্যা যে, সে শূদ্র পরিবারের সন্তান হলেও অন্তরে মননে প্রবল ধার্মিক বা কোন পরীক্ষা দিয়েও যদি বুঝেন এমনতেমন, এর মধ্যে ব্রাহ্মণের নয়টি গুণই আছে, তাহলে সানন্দেই ঐ কন্যাকে পূজার আসনে বসানো হয়। আর সর্বকামনার মধ্যে সকাম ভক্তের যশ, সম্পদ, সন্তান সব তো লাভের কামনা জানানো হচ্ছেই।


তো আমরা বুঝতে পারছি যে কুমারীপূজা আসলে নারীর মধ্যেও যে দেবীর প্রকাশ হচ্ছে, তা আরো দৃঢ়ভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যই একটি প্রয়াস। আমাদের কন্যারা আমাদের দেবী। বাৎসল্যভাবে আমরা তাদের স্নেহ করি। নির্জন রাস্তায় কোন মেয়েকে একাও যদি দেখতে পাই, তাকে যেন দেবীই মনে করি। মনু ঋষি যেমন বলেছেন, অহেতুকভাবে কোন নারীকে কষ্ট দিলে আমাদের আর সব ভাল কাজেরও কোন মূল্য থাকবে না, সেই ভাবটা যেন মনের মন্দিরে স্থাপন করি।


Feature Image Courtesy: news18.com