ভূত নেই একথা তো আমরা জানি। কিন্তু ভূত না থাকলে কী হবে, ভূতের ভয় তো অনেকেরই আছে। আর তাই ভৌতিক গল্পের আবেদনও চিরন্তন। কিন্তু ভাবুন তো, এমন যদি হয়- কোন গল্পে সরাসরি ভূত নেই, কিন্তু ভূতের ভয়টা তৈরি হচ্ছে ঠিকই! বরং, আরো তীব্রভাবে সেই ভয় গ্রাস করে নিচ্ছে সকলকে।

পাঠক, এই বিষয়টি আমরা খুব চমৎকারভাবে দেখতে পাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত হররগল্প ‘নিশীথে’- তে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যপ্রতিভা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। একমাত্র মহাকাব্য ছাড়া বিশ্বসাহিত্যের এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে তিনি হাত দেননি। আর যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই ফলেছে সোনা।

রবীন্দ্রনাথ এই গল্পটি লিখেছেন বাংলা ১৩০১ সালের মাঘ মাসে। অর্থাৎ, ১৮৯৫ সালের জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারিতে।  সে সময়ের বাংলা হরর গল্পগুলো ছিলো মূলত স্কন্ধকাটা-মামদো ভূত বা শাকচুন্নি নিয়েই। অর্থাৎ, একেবারেই  শিশুতোষ কাহিনী। রবি ঠাকুর সেখানে এনে দিলেন অন্যরকম পরিপক্বতা। ইংরেজি ছোটগল্পের জনক হরর সাহিত্যের মাস্টারক্লাস লেখক এডগার অ্যালান পো-র গল্প গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল তাঁকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, Image Courtesy: ekushey-tv.com

পো-র গল্পে যেমন প্রাকৃতিক দৃশ্য বা প্রেমের চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় এক আদিম আতঙ্কের ছোঁয়া- যা ছাপ ফেলে পাঠকের মননে, তৈরি করে ঘোর। রবি ঠাকুর বাংলা হরর-এ নিয়ে এলেন এই বিষয়টি। সরাসরি ভূত নেই, সে করছেনা কোনরকম নৃশংসতা; কিন্তু গল্পের চরিত্রগুলোর মনস্তত্বে তুলে দিচ্ছে কালবোশেখী ঝড়। আর তার অন্যতম নিদর্শন তার এই কালজয়ী গল্প ‘নিশীথে’।

গল্পের শুরুতে আমরা দেখি উত্তম পুরুষে বর্ণিত একটি ডাক্তার চরিত্র। তার কাছে রাত আড়াইটার সময় এসেছেন একজন জমিদার। তার খুব জ্বালাতন হচ্ছে রাতে। ঘুম হয়না। ডাক্তারের ওষুধেও কাজ হচ্ছে না। আর তাই ব্যক্তিগত অনুতাপবোধ থেকে তিনি স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন। বলতে থাকেন অতীত জীবনের নানা কথা।       

এ পর্যায়ে আমরা জানতে পারি, জমিদার দক্ষিণাচরণবাবুর প্রথম পক্ষের দাম্পত্যজীবনের কথা। তার স্ত্রী ছিলেন খুব কর্তব্যপরায়ণ। কিন্তু কেন যেন স্ত্রীকে ভালোবাসার কথা বলতে গেলে একরকম উপেক্ষার হাসি হেসে এড়িয়ে যেতেন স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যে মানসিক সম্পর্ক, তা তাদের বেলায় খুব একটা দৃঢ় ছিলোনা কখনোই। কখনো-সখনো তিনি স্ত্রীকে বলতেন, ‘তোমাকে আমি জীবনে কখনই ভুলিবনা।’ স্ত্রী এসবকে ছেলেমানুষি হিসেবেই দেখতেন।

নিশীথে' গল্পের প্রচ্ছদ; Image Courtesy: amazonaws.com

জমিদারবাবুর একবার খুব অসুখ করেছিল। গব্য ঘৃত (গরুর দুধের ঘি) আর শেকড়-বাঁকড় বেটে খাইয়ে এক কবিরাজ আরোগ্যলাভ করালেন তাকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয়টা ছিলো তার স্ত্রীর সেবা। দিন-রাত এক করে, নাওয়া-খাওয়া শিকেয় তুলে তার স্ত্রী সেবা করছিলেন তার।

এর কিছুদিন পর তার স্ত্রী নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি সেবার চেষ্টা করলেন যথাসাধ্য, কিন্তু স্ত্রীর আরোগ্যলাভ আর হয়না। কখনো কখনো তার স্ত্রীর প্রিয় বকুলতলায় সাদা পাথরের বেদীতে তারা বসে থাকতেন। বকুল ঝরে-ঝরে পড়ত।  

এর ভেতর দৃশ্যপটে আগমন হরিচরণ ডাক্তারের। ডাক্তারের মেয়ে মনোরমার সাথে পরিচয় ও প্রণয় গড়ে উঠতে থাকে জমিদারবাবুর। স্ত্রীর সেবা করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে ওঠেন তিনি। প্রায়ই স্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে বেড়ানোর কথা বলে যেতে থাকেন ডাক্তারের বাড়ি। কিন্তু তার স্ত্রী সবই বুঝতেন।

গল্পে বর্ণিত জমিদারের প্রথম স্ত্রীর ভীষণ প্রিয় ছিলো বকুলগাছ ও ফুল; Image Courtesy: Wikipedia.com

জমিদার নিজ মুখেই বলেন– ‘ভাবিতাম নির্বোধ, কিন্তু নির্বোধ আমি।’

স্ত্রীরও তাকে বলতে শোনা যায়- ‘তোমার বেড়াবার সময় হইয়াছে একটু না বেড়াইলে তো আবার তোমার রাত্রে ক্ষুধা হইবে না

মনোরমা ঘটনাচক্রে আসে রোগিনীকে দেখতে। আবছা আলোয় তাকে দেখে উনি চিৎকার করেন- কে, কে কে গো? ‘

পরিচয় জানানো হয় তাকে। তখন মনোরমার সাথে বিয়ের কথা চলছে দক্ষিণাচরণের। সে রাতেই নীল শিশিভরা মালিশের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন তার স্ত্রী!  প্রথমটায় ভেঙে পড়লেও জমিদার দক্ষিণাচরণ পরে একরকম মুক্ত বোধ করতে থাকেন। মনোরমার সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় সেই অদ্ভুত ঘটনাটা।

গল্পে দেখা যায়, জোছনারাতে ভৌতিক অভিজ্ঞতা হয় জমিদারের; Image Courtesy: kureghor-web.blogspot.com

বকুলতলায় বসেছিলেন তারা দুজন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। তিনি হঠাৎ শুনলেন সেই কথাটা– ‘ কে, কে, কে গোআর দেখলেন শীর্ণ এক নারীর অবয়ব!

ব্যাপারটা এই যে শুরু হলো, আর থামলো না। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে ভরা জোছনার হলদেটে চাঁদের আলোয় আবারও শুনলেন সেই কথাগুলো।

এরপর হাওয়াবদলের জন্য নদীভ্রমণ। এখানে প্রাকৃতিক দৃশ্যের চমৎকার বর্ণনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। দুজন মানব-মানবী খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ভাবছে ভালোবাসার জন্য একটা ঘর যথেষ্ট নয়, তাদের জন্য আছে এই সুবিশাল আকাশ।

কিন্তু তখনই আবার সেই ও কে, ও কে…

নৌকাভ্রমণে গিয়ে চাঁদের হলদেটে আলোয় সেই রহস্যময় ডাক শুনতে পান জমিদার; Image Courtesy: hd.wallpaper.flaper.com


সে রাতে জমিদার দেখলেন মনোরমার মাথার কাছে যেন দাঁড়িয়ে আছে শীর্ণ এক নারীমূর্তি! শীর্ণ একটা আঙুল তুলে দেখাচ্ছে তাকে। বলছে সেই কথাগুলোই। কিন্তু আলো জ্বালাতেই সব উধাও, কেউ নেই!

এরপর থেকে জমিদারের আর কোন রাতেই ভালো ঘুম হয়নি। প্রতি রাতেই মগজে হানা দেয় কটা কথা– ‘ কে, কে, কে গো…’

জমিদার দক্ষিণাচরণবাবুর প্রথম পক্ষের স্ত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে তার ভেতর অনুতাপ ছিলো। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার মেন্টাল ট্রমা। সাথে হ্যালুসিনেশন। আর তার ফল এই ঘটনা।

খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্টতার মুহূর্তে জমিদার আবার শুনতে পেলেন সেই কথাগুলো; Image Courtesy: pinterest.com

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সময়ে এই গল্পটি লিখেছেন সে সময়ে মনস্তাত্ত্বিক ভৌতিক গল্প বাংলাভাষায় ছিলো না। সরাসরি কোনরকম ভূত বা নৃশংসতা ছাড়াই যে একটা হরর গল্পকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় এবং পাঠকের মনে কীভাবে ছাপ ফেলা যায়- তা এই বিশ্বমানের হরর গল্পটি না পড়লে বোঝা কঠিন। আর তাই ‘নিশীথে’ গল্পটি বাংলা হরর সাহিত্যের অনন্য এক সংযোজন হিসেবেই টিকে থাকবে।

Feature Image Courtesy: YouTube.com