আমেরিকান লেখক রিচার্ড কনেলের আলোচিত ‘দ্য মোস্ট ডেনজারাস গেম’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি মাসে আমেরিকান সাহিত্য সাময়িকী কলিয়েরস-এ। গল্পটি ‘হাউন্ডস অভ য্যারোফ’ নামেও পরিচিত। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও জীবন-রক্ষার সংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ গল্পটি।

এই গল্পের মুখ্য চরিত্র সেঞ্জার রেইনসফোর্ড। গল্পের শুরুতে দেখা যায়, বন্ধু হুইটনির সাথে শিকার বিষয়ে আলাপ করছে সে। হুইটনির জাগুয়ারবিষয়ক দার্শনিক আলাপ পাত্তা দেয়না সে। বলে- ‘পৃথিবীতে শুধু দুটো শ্রেণি আছে, শিকারি আর শিকার।’

রেইনসফোর্ড একজন দুর্দান্ত শিকারী। আবেগের স্থান তার জীবনে নেই। ক্যারিবিয়ান সাগর দিয়ে ভেসে চলছে জাহাজ। জাহাজের নাবিকেরা এদিকটাকে মনে করে অশুভ। কিন্তু এসব মোটেই পাত্তা দেয়না রেইনসফোর্ড। নাবিকদের এসব কুসংস্কার তার মতো একজন যুক্তিবাদী মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পাত্তা দেবে না।

লেখক রিচার্ড কনেল; Image Courtesy: xwhos.com

হুইটনিকে বিদায় জানিয়ে সেদিন রাতে জাহাজের ডেকের একটা চেয়ারে বসে আরামে পাইপ টানছিল রেইনসফোর্ড। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে চমকে ওঠে সে। উৎস সন্ধান করতে গিয়ে রেলিংয়ের ওপর দাঁড়াতেই দড়ির বাড়ি লেগে পাইপটা পড়ে যায় পানিতে। তার সাথে সাথে ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে যান রেইনসফোর্ড।

রেইনসফোর্ডের লড়াইয়ের শুরুটা এখান থেকেই। গুলির শব্দটা এসেছিল ডানদিক থেকে। ওদিক বরাবর সাঁতরে এগিয়ে চললো সে। এরপর ভেতর শুনলো কোন এক জন্তুর গোঙানির শব্দ। মিনিটদশেক পর আবারো পিস্তলের গুলি। গুলির শব্দের দিক ধরেই সাঁতরে গেলো সে। তীর পেয়ে উঠে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো সে রাতের মতো।

১৯৩২ সালে নির্মিত সিনেমার পোস্টার; Image Courtesy: medium.com

পরদিন বিকেলে ঘুম ভাঙলে সাগর পাড় ধরে এগিয়ে চললো সে। বুলেটের খোসা পেলো। শিকারীর পদচিহ্ন অনুসরণ করতে গিয়ে দেখলো এক প্রকাণ্ড প্রাসাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে ওখানে। সেখান গিয়েই দানবসদৃশ এক মানুষের সাথে দেখা মিললো তার। ইভান, বিশালদেহী এক মানুষ; চেহারায় মনে হয় যেন বন্যমানুষ- রিভলভার তাক করে আছে তার বুক বরাবর।

এ সময়েই দৃশ্যপটে আগমন জেনারেল য্যারফের। প্রখ্যাত এই শিকারী একসময়ে সেনাবাহিনীতে ছিলেন। একঘেয়েমি ধরে যাওয়ায় সেসব ছেড়ে মেতেছিলেন শিকার নিয়ে। এখন আর বাঘ-ভাল্লুক শিকার করতেও ভালো লাগছে না তার। তাই এই দ্বীপে প্রাসাদ বানিয়ে আছেন তিনি, নতুন নতুন শিকারও মিলছে। প্রথমটায় খুব ভালো লেগেছিলো রেইনসফোর্ডের। য্যারফের ব্যবহার, আতিথেয়তা, শিকারের অভিজ্ঞতা- সবই। একটা বিশাল কেপ-বাফেলোর মাথা দেখে রেইনসফোর্ড বলেন, ‘আমার ধারণা সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকারএই কেপ-বাফেলোটাই।’ কিন্তু তার সাথে দ্বিমত করেন য্যারফ। বলেন যে এরচেয়েও বিপজ্জনক শিকার আছে।

মহিষ শিকারের ছবি; Image Courtesy: nativeamericannetroots.ne

ক্রমে পরিষ্কার হয়ে যায় তার সেই শিকারের কথা। তার শিকারদের বুদ্ধি-বিবেচনা আছে, বিচারবোধ আছে, নিজস্ব ইচ্ছাও আছে; তিনি শিকার করেন মানুষ!

পাঠক, ঠিকই পড়েছেন, এই গল্পের কর্ণেল য্যারফ শিকার করেন মানুষ! তার ভাষায়- ‘জীবনটা শক্তিশালীর ভোগের জন্য, প্রয়োজন হলে জীবন গ্রহণ করবার অধিকার আছে তার। দুর্বলদের পাঠানো হয়েছে কেবল শক্তিমানদের আনন্দ দেবার জন্য। আমি শক্তিশালী। কেন আমি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবো না?

ক্রমে রেইনসফোর্ড বুঝতে পারেন কর্নেল য্যারফের এবারের শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছেন তিনি! শর্তানুযায়ী, একটা মোকাসিন, একটা ছুরি আর কিছু খাবার দিয়ে তাকে বের করে দেয়া হয় প্রাসাদ থেকে। তিনদিন য্যারফের চোখকে ধূলো দিতে পারলেই বেঁচে যাবেন রেইনসফোর্ড। আর না হলে বরণ কর‍তে হবে নির্মম মৃত্যু। নাম উঠে যাবে য্যারফের শিকারের খাতায়।

রেইনসফোরডের পেছনে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল ব্লাড হাউন্ড; Image Courtesy: K9.rl.com

শুরু হয় রেইনসফোর্ডের টিকে থাকার সংগ্রাম। কখনো শেয়ালের মত পায়ের ছাপ দিয়ে বিভ্রান্ত করা, কখনো বিড়ালের মত কৌশলে গাছে উঠে যাওয়া, আবার কখনো চোরাবালিপূর্ণ জংলায় গর্ত খুঁড়ে আগাছা আর চারাগাছ থেকে খুঁটি বানিয়ে গর্তে রেখে গর্তের মুখ বন্ধ করে দেয়া। তার পেছনে লেলিয়ে দেয়া হয় রক্তলোভী হিংস্র হাউন্ড। এমনকি উগান্ডায় শেখা বুনো আঙুরলতা দিয়ে চারাগাছ বেঁধে তার সাথে ছুরি বেঁধে দেয়ার কৌশলও প্রয়োগ করেন তিনি।

কিন্তু শেষপর্যন্ত কি রেইনসফোর্ড সত্যি বেঁচে ফিরতে পারলেন য্যারফের হাত থেকে? নাকি য্যারফ পেলেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম শিকারের স্বাদ?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর পাঠক পাবেন গল্পটির শেষে। গল্পটি নিয়ে ১৯৩২ সালে আমেরিকায় সিনেমা তৈরি হয় একইনামে। এছাড়া আমেরিকার ষাটের দশকের শেষভাগের কুখ্যাত খুনী দ্য জোডিয়াক কিলার এর কিছু চিঠিতে উল্লেখ পাওয়া যায় এই গল্পের। আমেরিকার আশির দশকের আরেক কুখ্যাত খুনি রবার্ট হ্যানসেন এর অনেকটাই মিল পাওয়া যায় এই গল্পের কর্নেল য্যারফের সাথে।

গল্পটির প্রথম বাংলাদেশি অনুবাদক কাজী আনোয়ার হোসেন; Image Courtesy: bdnews24.com

গল্পটি বাংলাদেশের অনুবাদকদের ভেতর প্রথম অনুবাদ করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। ১৯৬৭ সালে সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ছয় রোমাঞ্চ বইয়ের সর্বশেষ গল্প ছিল এটি। সেখানে গল্পটির নাম দেয়া হয়েছে সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকার অনুবাদটি খুবই সাবলীল ও চমৎকার, তবে সেখানে মূল লেখক রিচার্ড কনেল এর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে বইয়ের ফ্ল্যাপেই এটা উল্লেখ করা ছিল যে, ছয় রোমাঞ্চ ছয়জন বিদেশি লেখকের গল্পের সংকলন।

রিচার্ড কনেলের এই চমকপ্রদ গল্পটি পাঠককে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত ভরিয়ে রাখে টানটান উত্তেজনায়। একইসাথে,  জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করবার মত কৌশল সম্পর্কেও ধারণা দেয়। আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি শেখায়, তা হলো বিপদের সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখা, যার ফলে পেরিয়ে আসা যেতে পারে জীবনের শত বিপদসংকুল মূহুর্ত।

Feature Image Courtesy: haikudeck.com