সত্যেন্দ্রনাথ বসু কথন

“যারা বলেন বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয় তারা হয় বাংলা জানেন না অথবা বিজ্ঞান বোঝেন না

– সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

বোসন কণা এবং বোসন আইন্সটাইন স্ট্যাটিস্টিকস এর উপর গবেষণা করে এখন পর্যন্ত নোবেল জিতেছেন বহু বিজ্ঞানী। এই যুগান্তকারী আবিস্কারের আবিষ্কারক হলেন মেধাবী বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। আজ জেনে নেয়া যাক তার জীবনকাহিনী।   

জন্ম ও শিক্ষাজীবন
নতুন বছরের শুরুতে ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তার পিতা সুরেন্দ্র নাথ বসু ছিলেন রেলওয়ের হিসাব রক্ষক এবং মাতা আমোদিনী দেবী গৃহিণী। সত্যেন্দ্রনাথ বসু সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাড়ির সন্নিকটে নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে। এই মেধাবী বিজ্ঞানী ১৬ বছর বয়সে হিন্দু কলেজে এন্ট্রান্স ক্লাসে ৫ম স্থান অধিকার করেন। দু’বছর পর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ISC পরীক্ষায় ১ম স্থান অর্জন করেন। এর দু’বছর পর আবার ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়ে স্নাতক ও মিশ্র গণিতে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। তিনি এখানেই সান্নিধ্য লাভ করেন আচার্য স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল রায়ের মত যশস্বী অধ্যাপকের।

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর পরিবার; Image Courtesy: bongquotes.com

কর্মজীবন

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কর্ম জীবন শুরু হয় কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের প্রভাষক হিসেবে ২৩ বছর বয়সে। এখানেই তিনি বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সাথে মিশ্র গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা শুরু করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এখানে রিডার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার সময় প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম তেজস্ক্রিয়তা নীতি ধ্রুপদী পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগিতা ছাড়াই প্রতিপাদন করে একটি গবেষণা প্রবন্ধ রচনা করেন এবং সদৃশ কণার সাহায্যে দশার সংখ্যা গণনার একটা চমৎকার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই নিবন্ধটি ছিল মৌলিক এবং কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের ভিত্তি রচনাকারী। এই নিবন্ধটি তিনি বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশের চেষ্টা করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তার এই আবিষ্কারকে মৌলিক ভুল বিবেচনা করে প্রকাশ করেন নি। তারা ভেবেছিলেন বসু গোড়াতেই ভুল করেছেন। লেখা প্রকাশে ব্যর্থ হয়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসু তার নিবন্ধটি সেই সময়ের মেধাবী বিজ্ঞানী ও বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন এর কাছে। কেউ এই নিবন্ধটির মূল্য না বুঝতে পারলেও আইনস্টাইন ঠিকই এর গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তিনি এটির উপর ভিত্তি করে একটি গবেষণা পত্র লিখেন। আইনস্টাইন নিজেই সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নিবন্ধ টি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন এবং Zeitschrift für Physik সাময়িকীতে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে বোস ইউরোপে উচ্চতর গবেষণা এবং আইনস্টাইন, মেরিকুরি, লুই ডি ব্রগলির মতো জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করার সুযোগ পান। কাজ শেষ হলে তিনি ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন এবং এখানে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। যেখানে তাকে রেফারেন্স দিয়েছিলেন স্বয়ং আইনস্টাইন। দেশবিভাগ সন্নিকটে এলে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ৫২ বছর বয়সে কলকাতায় ফিরে গিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১১ বছর সেখানে কাজ করে তিনি অবসর নেন এবং ভারত সরকার তাকে এমিরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ভারত সরকারের অনুরোধে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য হিসেবে যোগ দেন এবং আরো দু’বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ করেন।

কর্মজীবনে নানা সহকর্মীর সাথে সত্যেন্দ্রনাথ বসু; Image Courtesy: bongquotes.com

বোস আইনস্টাইন সংখ্যাতত্ত্ব

ক্লাসে একদিন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আলোক তড়িৎ ক্রিয়া ও অতিবেগুনি বিপর্যয় পড়ানোর সময় শিক্ষার্থীদের বর্তমান তত্ত্বের দূর্বলতা বোঝাতে গিয়ে একটা ভুল করে ফেলেন। তার ভুলটি ছিল এইরকম যে দুইটি মুদ্রা একসাথে নিক্ষেপ করলে ২ টি হেড আসতে পারার সম্ভাবনা এক চতুর্থাংশ কিন্তু তার ফলাফল অনুসারে এই সম্ভাবনা আসে এক তৃতীয়াংশ। তরুণ শিক্ষকের এমন ভুলে সেদিন শ্রেণি কক্ষের অনেকেই হেসেছিল এবং বসু নিজেও বিব্রত ছিলেন। কিন্তু বসু দেখতে পাচ্ছিলেন যে এই সম্ভাবনা এক তৃতীয়াংশ হলেই কেবল ফলাফলের সাথে তত্ত্বের প্রমাণ মিলে যায়। তিনি বুঝতে পারলেন যে একটি ভুলের মাধ্যমে তিনি অনেক বড় একটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। তিনি অনুধাবন করেন যে ম্যাক্সওয়েল বোলৎজম্যানের সংখ্যাতত্ত্ব সকল কণার ক্ষেত্রে সত্য না, বিশেষ করে আণুবীক্ষণিক কণার ক্ষেত্রে। কারণ সেখানে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্বের কারণে কণার যে আন্দোলন তা গ্রাহ্য সীমার মধ্যে। কাজেই কণার ভরবেগ ও অবস্থান বাদ দিয়ে দশাকালে কণার প্রাপ্যতা প্লাঙ্কের ধ্রুবকের ঘনমানের সমান।

তার এই ভুল টি সঠিক ফলাফল দিয়েছিল কারণ দুটি ফোটন কে আলাদা করা কঠিন। আর দুটি ফোটনের শক্তিকে একটি ফোটনের শক্তি মনে করলে তা ভুল হবে। যদি একটিকে বোসন ধরা হয় তবে তার সম্ভাব্যতা এক তৃতীয়াংশ হয়। এই তত্ত্বটিই এখন ‘বোসন আইনস্টাইন তত্ত্ব’ হিসেবে পরিচিত।
১৯৯৫ সালে এই কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করেন পল ডিরাক এবং তিনি এর নামকরণ করেন বোসন কণা।

বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসু; Image Courtesy: bongquotes.com

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও নোবেল পুরস্কার

“S. N. Bose’s work on particle statistics (c. 1922), which clarified the behaviour of photons (the particles of light in an enclosure) and opened the door to new ideas on statistics of Microsystems that obey the rules of quantum theory, was one of the top ten achievements of 20th century Indian science and could be considered in the Nobel Prize class.”  –
জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিল নোবেলবঞ্চিত। কিন্তু বসু আইনস্টাইন পরিসংখ্যান, বসু আইনস্টাইন ঘনীভবন এবং বোসন কণার উপর গবেষণা করে বিভিন্ন সময় নোবেলপ্রাপ্ত হয়েছেন অনেক বিজ্ঞানী। ১৯৮৪ সালে কার্লোরুবিয়া ও সিমনভ্যানদারমির, ১৯৯৬সালে ড্যাভিডএমলি, ডগলাসডিওশেরফ, রবার্টসি. রিচার্ডসননোবেলপুরস্কারপান। ১৯৯৯ সালে মার্টিনজে. জি. Gerardus’t Hooft, ২০০১ সালে এরিকএলিনকর্নওয়াল, কার্লএডুইনওয়াইম্যান আরউল্ফগ্যাঙকাত্তেরলে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আর এর কারণ হিসেবে বলা হয়, “For the achievement of Bose-Einstein Condensation in dilute gases of Alkali atoms and for early fundamental studies of the properties of the condersates”!

ভারতীয় ডাকটিকেটে সত্যেন্দ্রনাথ বসু; Image Courtesy: livehistoryindia

সন্মাননা

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯২৯ সালে ভারতীয় কংগ্রেসের পদার্থবিজ্ঞান শাখার সভাপতি এবং ১৯৪৪ সালে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হন। তাকে ইন্ডিয়ানস্টাটিকালইন্সটিটিউট, কোলকাতাবিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদবিশ্ববিদ্যালয়, যোধপুরবিশ্ববিদ্যালয়সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে সত্যেন বসু অধ্যাপক পদ রয়েছে। ১৯৮৬ সালে কোলকাতা শহরে সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌলিক বিজ্ঞান কেন্দ্র নামক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হয়।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চায় তার অবদান অমূল্য। তার নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালে কলকাতার বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ গঠিত হয়।

১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় এই মহান গাণিতিক পদার্থবিদ আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু মৃত্যুবরণ করেন।

Feature Image Courtesy: indiatoday.in

References:

  1.  “Satyendra Nath Bose – Bengali physicist”। 
  2.  “Satyendra Nath Bose 1 January 1894 – 4 February 1974″। Biographical Memoirs of Fellows of the Royal Society। 
  3.  “S.N. Bose Biography Project”
  4.  “Satyendra Nath Bose, The Creator of Quantum Statistics”। 
  5.  “Satyendranath Bose”। The MacTutor History of Mathematics archive। 
  6.   Barran, Michel, “Bose, Satyendranath (1894–1974)”, Science world (biography), Wolfram.
  7.  Ghose, Partha, “Original vision”, .