সার্জিও লিওন ও তার ‘ডলার’ ট্রিলজি

চলচ্চিত্রের শহর হলিউডের অনবদ্য সব কীর্তিগুলোর পেছনের এক কারিগর, চলচ্চিত্রকার সার্জিও লিওনির ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম’ ট্রিলজি নিয়ে লেখাটি তো পড়েছেন-ই। পাঁচ মিনিটের ভিডিও দশ সেকেন্ড করে ফরোয়ার্ড করে দেখার এই যুগে ঘন্টার পর ঘন্টা মানুষকে সিনেমা হলে বসিয়ে পর্দায় বুঁদ করিয়ে রাখা এই লোকটির অন্য ট্রিলজি – বিশ্ববিখ্যাত ‘ডলার’ ট্রিলজি নিয়ে আলাপের দ্বিতীয় কিস্তি পড়ুন আজ।

হলিউড আকাশের তারা: সার্জিও লিওন ও তার ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম’ ট্রিলজি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

‘ডলার’ ট্রিলজিকে বলা হয় আমেরিকান ওয়েস্টার্ন ধরনের সিনেমার ধারা বদলে দেয়া একটা পর্যায়। ১৯৫০ এর পর থেকে হলিউডের ওয়েস্টার্ন গল্পের সিনেমাগুলো হয়ে উঠছিল খুব ক্লিশে। নায়ক মানেই একদম পুরোপুরি সৎ, খলনায়ক মানেই সে মায়ের পেট থেকে বের হওয়া মাত্রই খারাপ, আর সবসময় নায়কই জিতে – এরকম একটি চক্রে ঘুরপাক খেতে খেতে দর্শক বিরক্ত হয়ে পড়ে। তখন প্রযোজক সংস্থাগুলোও এই ধরনের সিনেমা নির্মাণ কমিয়ে দেয়। এটির একটি বড় কারণ সার্জিওর ইতালি, স্পেন এসব দেশে পুরো সিনেমা শ্যুট ও মুক্তি দেওয়ার। এছাড়া তার সিনেমায় তিনি ইতালীয় চলচ্চিত্রের যে নিজস্ব ভাষা, লিওনি যা ভিট্টোরিও ডি সিকার সহকারী হিসেবে থাকতে ভালই রপ্ত করেছিলেন, তার প্রয়োগ ঘটান। ডি সিকা’কে চিনলেন? – যার নির্মিত ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ দেখার পর আমাদের সত্যজিৎ রায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে “নাহ্, সিনেমাই বানাব!”

পরিচালক সার্জিও লিওন; Image Courtesy: thewalkoffame.it

আমাদের দেশে যে সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ন অনুবাদের এত জনপ্রিয়তা সত্তর- আশির দশক থেকে বহমান, তা সম্ভব হয়েছিল ডলার ট্রিলজির বৈশ্বিক সফলতার সুবাদে। অথচ জেনে অবাক হবেন যে লিওনি এর আগে কখনো আমেরিকা যাননি, বুনো পশ্চিম তো দূর কি বাত, আর ইংরেজি শেখেনও নি কখনো ওভাবে। শৈশবে ইতালিয়ানে ডাব করা যেসব ওয়েস্টার্ন দেখেছেন তাই তার অনুপ্রেরণা ছিল। অনেকটা বলিউডের ভারতীয় ওয়েস্টার্ন ‘শোলে’র নির্মাতা রমেশ সিপ্পির মত।

‘ডলার’ ট্রিলজির কাহিনী নিয়ে পরে বলি। আগে এর নির্মাণ নিয়ে যেসব গল্প, যা পর্দায় দেখা যায় না, তাই জানাই। এই ট্রিলজির অপর নাম ‘ম্যান উইদ নো নেম’ ট্রিলজি। পৌরুষদীপ্ত চেহারার সেই চরিত্র – ম্যান উইদ নো নেম, যা অভিনেতা ক্লিন্ট ইস্টউডের জীবনটাই বদলে দিয়েছিল। কারণ এর আগে ইস্টউড ছিলেন শুধু একজন টিভি অভিনেতা। তাও প্রায়সময় কোন ধারাবাহিকে বহুজনের মধ্যে একজন। টিভি পর্দার সেই বর্গাকার ফ্রেম থেকে সিনেমাস্কোপের বিশাল চওড়া ফ্রেমে আসার জন্য বিধাতা এক-দুইজন না, পাক্কা নয়জনকে এই প্রজেক্ট থেকে বাদ পড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। লিওনি ‘আ ফিস্টফুল অফ ডলারস’ চলচ্চিত্রটির জন্য প্রথমে হেনরি ফন্ডা, তারপর চার্লস ব্রনসন এবং একে একে প্রায় অনেক প্রথম সারির অভিনেতাদের কাছে ধর্ণা দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে রিচার্ড হ্যারিসন ইস্টউডকে নেয়ার পরামর্শ দেন।

অভিনেতা ক্লিন্ট ইস্টউড; Image Courtesy: tvovermind.com

প্রায় দুই লাখের অধিক ডলারের বাজেটে ইস্টউডের পারিশ্রমিক কত ছিল, জানেন? মাত্র পনের হাজার ডলার। পরে চলচ্চিত্রটি ব্যবসায়িক ভাবে সফল হওয়ায় অবশ্য একটা মার্সিডিজ গাড়িও তিনি উপহার পান। সাথে পরবর্তী দুটি সিনেমার প্রধান চরিত্রও।

পরবর্তী সিনেমা ‘ফর আ ফিউ ডলারস মোর’-এ মূল চরিত্রটি তার করা নিয়েও মজার গল্প আছে। যারা আমেরিকান মিডিয়া বা জনমানস সম্বন্ধে খোঁজখবর রাখেন, তারা বলতে পারবেন যে অধিকের চেয়েও অধিক আমেরিকানদের কাছে পৃথিবী বলতে কেবল আমেরিকাই। কখনো আমেরিকা যেসব দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রেখেছে সেসব দেশ তারা কালেভদ্রে চিনে। তেমনই যেহেতু সার্জিও লিওনিকে হলিউডের কোন পরিবেশক চিনতো না, আর ইস্টউড তখনো ইউরোপের ‘ইংরেজি ভাষা না বলা’ দেশগুলোতেই শুধু জনপ্রিয়, তাই আমেরিকায় সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। লিওনি যখন ইস্টউডের সাথে পুনরায় কাজ করতে যোগাযোগ করলেন তখন তিনি বললেন, “আমি তো আগের সিনেমাটাই দেখিনি। আগে দেখি কী অবস্থা, তারপর আলাপ হবে!”

‘আ ফিস্টফুল অফ ডলারস’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য; Image Courtesy: filmforum.org

তখন কী আর করা, ইতালীয় ভাষার একটা কপি হলিউডে ইস্টউডের বাসায় দেখানো হলো। দর্শক তার কিছু বন্ধু বান্ধব। কিন্তু ভাষা না বুঝলেও সিনেমাটা তারা এত পছন্দ করলো যে বলা হলো “যেন ইংরেজিতেই দেখলাম”, আর ইস্টউডও সাইন করতে রাজি হলেন। এবার তার পারিশ্রমিক হলো পঞ্চাশ হাজার ডলার। তিনগুণেরও বেশি! আর তৃতীয় ছবিতে ইস্টউড বলেছিলেন যে, “প্রথম ছবিতে আমি একাই ছিলাম, দ্বিতীয় ছবিতে আরেকজন এলো আর এখন তিনজন হিরো। আমি কাজ করব না।” তো কী আর করা, এবার পারিশ্রমিকের সাথে যুক্ত হলো একটি ফেরারী গাড়ি আর লভ্যাংশের ১০ ভাগ। তবে লিওনির অতি পারফেকশনিস্ট মনোভাবে বিরক্ত হয়ে ইস্টউড পরে আর কখনো তার সাথে কাজ করেননি।

কিন্তু এই ট্রিলজির প্রথম সিনেমা ‘আ ফিস্টফুল অফ ডলারস’ নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে তখন, যখন বিখ্যাত জাপানিজ চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া আদালতে মামলা করেন যে সার্জিও লিওনি অনুমতি ছাড়াই তাঁর ‘ইয়োজোম্বো’ চলচ্চিত্রটি রিমেক করেছেন। অনেকগুলো তথ্যসূত্র যদিও এই দাবিটি সমর্থন করে যে লিওনি ও তার বন্ধুরা ইতালির থিয়েটারে কুরোসাওয়ার জাপানিজ পটভূমিতে নির্মিত সিনেমাটি দেখেই একই গল্প ওয়েস্টার্ন পটভূমিতে করার চিন্তা করেন। কিন্তু লিওনি আমৃত্যু এই দাবি এড়িয়ে গিয়েছেন এবং উল্টো বলেছেন যে কুরোসাওয়া নিজেই ইউরোপীয় মঞ্চনাটক ‘সার্ভেন্ট অফ টু মাস্টার্স’ ও উপন্যাস ‘রেড হার্ভেস্ট’ থেকে অনুপ্রাণিত। লিওনি শুধু ‘ইয়োজোম্বো’ থেকে কিছুটা আবহ ধার নিয়েছে। কিন্তু সেই ধার লিওনির কাজের ভিজ্যুয়ালে এতই প্রকট যে পরে কুরোসাওয়াকে লভ্যাংশের একটি ভাগ দিতেই হয়।

‘ফর আ ফিউ ডলারস মোর’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য; Image Courtesy: filmforum.org

এজন্যই হয়তো ট্রিলজির পরবর্তী সিনেমা ‘ফর আ ফিউ ডলারস মোর’-এ স্রেফ অর্থোপার্জন বা গুন্ডাদলের হাত থেকে সাধারণ জনগণের মুক্তির পাশাপাশি ভিন্নধর্মী করতে যুক্ত হয়েছিল অদ্ভুত এক প্রতিশোধের গল্পও। আর শেষ সিনেমা ‘দ্য গুড, ব্যাড এন্ড আগলি’ তে এসেছিল যুদ্ধের অসারতা নিয়ে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের এক খণ্ডচিত্র।

কিন্তু গল্পের বৈচিত্রতা, সে প্রথমটি কারো না কারো থেকে ধার করে আনা হোক, এর থেকেও এই ট্রিলজি চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ এজন্যেই যে এটি সংযোজন করেছিল এক নতুন ভাষা।

যেমন ক্লোজ আপ শটের ব্যবহারের কথাই যদি বলি, আগে হলিউডের নির্মাণ গ্রামার অনুযায়ী ক্লোজ শট ছিল শুধু কোন একটি ঘটনায় চরিত্রগুলোর অভিব্যক্তি কী, কিংবা দমদার, আবেগী কোন সংলাপ বলার সময় ব্যবহার করার উপকরণ। কিন্তু লিওনি দেখালেন কীভাবে চিত্রকর্মের মত ক্লোজ আপ শটকে ব্যবহার করা যায়। চরিত্রগুলোর অন্তর্গত ভাবনা কীভাবে ভয়েস ওভার অডিও ছাড়াই দর্শককে বোঝানো যায়। ছন্দে ছন্দে আবর্তন (মাস্টার, মিড, ক্লোজ, এক্সট্রিম ক্লোজআপ) আবেগ আর শটগুলোর মধ্যে সংযোগ যেন ব্যাপারটিকে অপেরায় গানের মত স্নিগ্ধ করে দেয়।

‘দ্য গুড, ব্যাড এন্ড আগলি’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য; Image Courtesy: britannica.com

আর যে লং শট ব্যবহার করে অনেক পরিচালক গালমন্দ পেয়েছেন সেখানে লিওনি হয়েছেন বন্দিত। কারণ তার লং শটগুলোর অদ্ভুত কাব্যময়তা। লং শটের কাব্যিকতা প্রসঙ্গে বলি, লিওনের প্রায় সব সিনেমাগুলোয় তার ক্লাসমেট বন্ধু এন্নিও মরিকোনির সুর করা গীতিময়তা ব্যবহার করতেন। স্ক্রিপ্ট পড়ে শুটের আগেই মরিকোনি প্রতিটি চরিত্রের জন্য আলাদা আলাদা সুর সৃষ্টি করতেন। সঙ্গীত আর দৃশ্যের যে চমৎকার সিনক্রোজাইশন আমরা লিওনির সিনেমায় দেখি, তা সম্ভব হয়েছিল কারণ লিওনি সেটেই মরিকোনের কম্পোজিশন বাজাতেন আর চরিত্র ও ক্যামেরা মুভমেন্টও সেভাবে হতো। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে শটে চরিত্রদের অ্যাকশন শেষ কিন্তু ক্যামেরা চলছে, ফিল্মের নেগেটিভ খরচ হচ্ছে, কারণ লিওনি মিউজিকটা বন্ধ করতে চাচ্ছেন না।

এই ট্রিলজির শেষ সিনেমা ‘দ্য গুড ব্যাড এন্ড আগলি’ তে গুপ্তধনের খোঁজে বিশাল কবরস্থানে টুকো চরিত্রটির ঐ দীর্ঘ দৌড়ের শটটি মনে করুন। মিউজিকটা এমন যেন মনে হয় কবরের মৃত আত্মারা টুকোর প্রতি বিদ্রুপের হাসি হাসছে। মরিকোনির সুরের মাধুর্য হয়তো এজন্যেই লিওনি ছাড়া আর খুব কম পরিচালকের সিনেমাতেই প্রস্ফুটিত হয়েছে৷ যেখানে সমকালীন অন্যান্য সিনেমায় শুটিং শেষ হবার পর কম্পোজার সুর করতেন আর সম্পাদক সিনক্রোনাজাইশনের দিকটি দেখতেন। চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীতে এটি ছিল সত্যিই অভিনব সংযোজন।

ফর আ ফিউ ডলারস মোর’ চলচ্চিত্রের শুটিং সেটে সার্জিও লিওন; Image Courtesy:

কস্টিউমের ব্যাপারেও বলতে হয় যে এর আগে ওয়েস্টার্ন সিনেমার কস্টিউমে নায়ক সাদা হ্যাট পরবে আর খলনায়ক কালো হ্যাট পরবে বা কালো ধরনের জামাকাপড় পরবে, এটি যেন গৎবাঁধা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্ত লিওন পোশাকে কোন ইতরবিশেষ রাখলেন না। স্রেফ হ্যাট খোলা, পরার ম্যানারিজমের বদলে তিনি যুক্ত করলে সিগারেটের এক সিগনেচার। তখন অবশ্য সিগারেট যে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা নিয়ে অত উচ্চবাচ্য ছিল না। তবে ক্লিন্ট ইস্টউড অধূমপায়ী ছিলেন হেতু সবসময় মুখে সিগারেট রাখায় তেঁতো ভাবটি তার ঐ বিখ্যাত অভিব্যক্তি দাঁড় করাতেও সাহায্য করেছিল। এই অস্থির সময়ে তাই দেখে নিন ডলার ট্রিলজির অনবদ্য তিন কাজ, শুভকামনা।

Feature Image Courtesy: criticaloptimistblog.files.wordpress.com