চলচ্চিত্রের শহর হলিউডের অনেক সিনেমাই তো আমাদের বেশ পছন্দের। কিন্তু এই সিনেমাগুলোর পেছনের কারিগরদের আমরা ক’জন চিনি। আজকের এত আরাম আয়েশের সময়েও যেখানে আমরা পাঁচ মিনিটের ভিডিও দশ সেকেন্ড ফরোয়ার্ড করে দেখি, সেখানে দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং অনুন্নত ক্যামেরা প্রকৌশল নিয়ে কী করে হলিউড করেছে তিন ঘন্টারও বেশি সময় ব্যাপী এপিক চলচ্চিত্রগুলো, যা আবার পেয়েছে দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি সমালোচক বন্দনাও! প্রিয় পাঠক, এই জাদুকরদের নিয়েই আড্ডার প্রথম কিস্তি এই লেখাটি। 

সার্জিও লিওনকে চিনেন? 

‘দ্য গুড, দ্য ব্যাড এন্ড দ্য আগলি’ সিনেমার নাম না নেয়া হলে অনেকে সহজে তাকে চিনতে পারেন না। কিন্তু আমাদের ক্রেজ কুইন্টিন টারান্টিনোর তিনি অন্যতম অনুপ্রেরণা। আমেরিকায় যখনো ‘হাফ উইট’ (ইতালীয়-হিস্পানিক বিদ্বেষ) ধরনের বর্ণবাদী হাবভাব প্রবল তখন এই লোক একের পর এক হলিউড সুপারস্টারদের ইতালি স্পেনে উড়িয়ে এনে বানাচ্ছেন মহাকাব্যিক সব সিনেমা।

স্রেফ মারদাঙ্গার ‘স্প্যাঘেটি ওয়েস্টার্ন’ বলে একে শ্রেণীভুক্ত করা যায় না যেন। চলচ্চিত্রের ভাষা তার সিনেমার হরেক রকম শট- কখনো প্রচণ্ড ক্লোজ, কখনো বিশাল ওয়াইড হয়ে, প্রতিটি চরিত্রের জন্য আলাদা আবহ সঙ্গীত হয়ে, কখনো দ্রুত ক্যামেরা শেকিং, কখনো স্লো মোশন হয়ে নান্দনিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ফুটে উঠেছে বড় পর্দায়।

পরিচালক সার্জিও লিওন; Image Courtesy: fbcdn.net

‘ডলার ট্রিলজি’ ও ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম’ ট্রিলজি তার বিখ্যাত কাজ। দ্বিতীয়টি নিয়েই আজকের মুগ্ধতা প্রকাশ করি। ঠিক রিভিউ না, সিনেমাগুলোর পার্শ্বিক নানা গল্প নিয়েই এই লেখাটি। পরের লেখায় আমরা প্রথম ট্রিলজিটি নিয়ে আলাপ করবো। 

ষাটের দশকের শেষভাগে ‘ডলার ট্রিলজি’র সিনেমাগুলোর সাফল্যের পর সার্জিও লিওন আর ওয়েস্টার্ন কেন্দ্রিক সিনেমা বানাতে চাননি। তিনি মনে করেছিলেন যে “যা বলার ছিল, বলে ফেলেছি!” তাই তিনি ত্রিশের দশকের আমেরিকার নিউইয়র্কের এক ইহুদি পল্লী কেন্দ্রিক অপরাধজগত নিয়ে গল্পে মনোযোগী হন। কিন্তু এ নিয়ে এগুতে এগুতে বুঝলেন একটি পটভূমিকা তৈরি না করে সেই গল্পে হাত দেয়া উচিত হবে না। ফলে জন্ম হয় কাছাকাছি থিম নির্ভর ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট’ আর ‘ডাক, ইউ সাকার’ সিনেমার যা ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন রেভ্যুলেশন’ নামেও পরিচিত।

পরিচালক সার্জিও লিওনের ‘ডলার’ ট্রিলজি; Image Courtesy: criticoptimist.com

আমাদের অনেকেরই একটি পছন্দের সিনেমা ‘টুয়েলভ এংরি ম্যান’। সেখানে জুরি নম্বর আট চরিত্রে হেনরি ফন্ডার অভিনয় কে ভুলতে পারে! লিওন নিজেও ফন্ডার বড় ভক্ত ছিলেন। ঐযে লিওন যে আর ওয়েস্টার্ন সিনেমা করতে গড়িমসি করছিলেন, তখনই প্রযোজক প্যারামাউন্ট পিকচার্স তাকে বলে যে এই সিনেমাটি করলে তারা হেনরি ফন্ডা যেন অভিনয় করেন, সেই ব্যাপারটি দেখবেন৷ এতে লিওন রাজি হন, কিন্তু স্ক্রিপ্টে চরিত্রটি খলনায়কের দেখে বেঁকে বসেন ফন্ডা। কারণ তিনি এযাবৎকালে সব মোরালি কারেক্ট চরিত্র করে এসেছেন। এখন হুট করে এধরনের চরিত্র করলে যদি বাজে কথা ছড়ায়। তাই লিওন নিজে নিউইয়র্ক উড়ে গেলেন ফন্ডাকে রাজি করাতে। ফন্ডা তারপরও তার বন্ধু এলি ওয়ালচ, যিনি দি গুড ব্যাড আগলিতে কিংবদন্তি ‘টুকো’ চরিত্রটি করেছিলেন, তাকে টেলিফোন করেছিলেন। এলি তাকে বলেছিলেন, এই চরিত্র তোমাকে অমর করবে। আসলেও তাই, ভাবলেশহীন রহস্যময় চার্লস ব্রনসনের ঝলকানো চোখ বা অগ্নিঝরা রূপসী ক্লডিয়া কার্ডিনালের দ্যুতি ছাপিয়ে হেনরি ফন্ডা তার চরিত্রটিকে করে তুলেছিলেন ওয়েস্টার্ন সিনেমার ইতিহাসেই আইকনিক।    

অভিনেতা হেনরি ফন্ডা; Image Courtesy: pinterest.com

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট’ চিরাচরিত প্রতিশোধের গল্প। কিন্তু কার হত্যার জন্য প্রতিশোধ, কে কার উপরে আসলে প্রতিশোধ নিতে চায় এটি বুঝতে গল্পের শুরুর দিকে ‘শোলে’ সিনেমার ঠাকুর পরিবারের হত্যার মত দৃশ্যটি থেকে শেষের পশ্চিমের বুক চিরে নতুন পাতা রেললাইনে ট্রেনের কু ঝিকঝিক শোনা অব্দি অপেক্ষা করতেই হয়।

এই সিনেমায় যেন অতীতের ওয়েস্টার্ন সিনেমাগুলোর পুনরাবৃত্তি না হয়, পাশাপাশি লিওনির ডলার ট্রিলজি থেকেও যেন এটি নির্মাণগুণে ভিন্ন হয়ে উঠে সেজন্য লিওন তার দুই সহকর্মীসহ পাক্কা দেড় বছর ধরে আগের সব ওয়েস্টার্ন ঘরানার সিনেমা বারবার দেখেছিলেন। আসলেই, যেখানে ওয়েস্টার্ন মানেই ছিল চটজলদি বন্দুক বের করে গোলাগুলি আর কথার পিঠে কথা কেবল, সেখানে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ওয়েস্ট’ ছিল ব্যতিক্রমী সব কাব্যিক লং শট, ছোট ছোট সংলাপে কম কথায় বেশি কিছু বোঝানো একটি সিনেমা৷

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট’ সিনেমার পোস্টার; Image Courtesy: newonnetflix.info

এখানে লং শটের কাব্যিকতা প্রসঙ্গে বলি, আগের সিনেমাগুলোয় লিওন তার ক্লাসমেট বন্ধু এন্নিও মরিকোনির সুর করা গীতিময়তা ব্যবহার করেছিলেন। মরিকোনি প্রতিটি চরিত্রের জন্য আলাদা আলাদা সুর সৃষ্টি করতেন। আমরা মরিকোনিকে নিয়ে লেখায় এ নিয়ে বিস্তারিত আড্ডা দিব। তো এই সিনেমায় লিওন করলেন কি আগে মরিকোনের কাছে গিয়ে পুরো গল্পটা বললেন। একদম প্রতিটি চরিত্রের খুঁটিনাটি সহ। এরপরই জন্ম নেয় বিখ্যাত হারমোনিকা কম্পোজিশনটি। আর রেলস্টেশনে স্বামী সন্তানের প্রতীক্ষায় থাকা ক্লডিয়ার ঐ দৃশ্যটি, যেখানে টেম্পো বাড়ার সাথে সাথে ক্যামেরা উপরে উঠছিল, ক্লডিয়ার যে কেউ নেই, সেই শূণ্যতাটা স্পষ্ট করে দিচ্ছিল দর্শককে।

এই চমৎকার সিনক্রোজাইশন সম্ভব হয়েছিল কারণ লিওন নিজেই মরিকোনের কম্পোজিশন বাজাতেন আর চরিত্র ও ক্যামেরা মুভমেন্টও সেভাবে হতো। যেখানে সমকালীন অন্যান্য সিনেমায় শুটিং শেষ হবার পর কম্পোজার সুর করতেন আর সম্পাদক সিনক্রোনাজাইশনের দিকটি দেখতেন। চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীতে এটি ছিল সত্যিই অভিনব সংযোজন।

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট’ সিনেমার একটি দৃশ্য; Image Courtesy: framerated.co.uk

চলচ্চিত্র মুক্তির পর দেখা গেলো এর দৈর্ঘ্য ২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট। যারা শিল্পের সত্যিকারের সমঝদার তাদের কাছে এই দৈর্ঘ্য সামান্যই। কিন্তু আমেরিকার পুঁজিপতি স্যাম আঙ্কেল তা বুঝবেন কেন, প্যারামাউন্ট পিকচার্স সার্জিওর সাথে কোন আলাপ না করেই প্রায় বিশ মিনিটের দৃশ্য কেটে সিনেমাটি মুক্তি দিল। দর্শক দেখে অনেক দৃশ্যই বুঝতে পারলো না। সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল এমন যে ক্লডিয়ার সাথে কারো কেন একটি প্রেমময় চুম্বনও নেই। তো বক্স অফিসে সিনেমা ফেইল। অথচ কান চলচ্চিত্র উৎসবে এটিই প্রথম সিনেমা, যা টানা বিশ মিনিট হাততালিময় সম্বর্ধনা পেয়েছিল। হ্যাঁ, গতবছরের অস্কারজয়ী প্যারাসাইট পেয়েছিল আট মিনিট। আর ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানিতে এই চলচ্চিত্র দুর্দান্ত ব্যবসা করে।

প্যারিসের একটি হলে তো এই সিনেমা টানা দুই বছর চলেছিল। লিওন যখন ব্যাপার শুনে গোপনে সেখানে যান তখনো হলের বেশিরভাগ ভর্তি দর্শক তাকে চিনে ঘিরে ধরে, এমনকি প্রোজেকশনিস্টও, যে কিনা রোজ সিনেমাটি তিনবার করে চালাতো। কিন্তু এতবার দেখেও সে ক্লান্ত হয়নি।

ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য ওয়েস্ট’ সিনেমার একটি দৃশ্য; Image Courtesy: akamaized.net

আচ্ছা, একটা সিনেমা নিয়েই এত বক্তৃতা দিয়ে ফেলছি। হেয়ার কাম দা নেক্সট মাস্টারপিস। কিন্তু এর ঠিক কোন নামটি লিখব। হলিউডে যাতে ব্যবসা করে তাই ডলার ট্রিলজির সাথে মিল রেখে প্রযোজকরা এর নাম পোস্টারে ছেপেছিলেন, ‘আ ফিস্টফুল অফ ডিনামাইটস’। পরিচালক সার্জিও লিওন নিজে এর নাম রেখেছিলেন, ‘ডাক, ইউ সাকার’, মানে ‘তোর মুণ্ডু, গাধা’। কেমন একটা রাগী ক্রুদ্ধ বিদ্রোহী ভাব না?- কারণ পরিষ্কার হবে এর তৃতীয় নামে। যখন এটি সংরক্ষণের জন্য তোড়জোড় শুরু হলো, তখন ফিল্মের রিলের গায়ে লেবেল সাঁটলো – ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন রিভল্যুশন। হ্যাঁ; রুশ বিপ্লবের আগে ঘটে যাওয়া মেক্সিকান বিপ্লব নিয়ে লিওনের এই ট্রিলজির দ্বিতীয় চলচ্চিত্রটি ১৯৭১ সালে মুক্তি পায়৷  

ডলার ট্রিলজির সিনেমাগুলোয় যেমন তিনি ওয়েস্টার্ন সিনেমার প্রথাগত ধরনকে বদলে দিয়েছিলেন, তেমনি এই সিনেমায় তিনি বিনির্মাণ করেছেন বিপ্লব নিয়ে শহুরে শিক্ষিত সমাজের ধারণাকে। বিপ্লব যে কেবল মার্কস এঙ্গেলসের বইয়ের তত্ত্ব পড়ে বক্তৃতা দেয়া নয়, জন মানুষের সাথে তার সম্পৃক্ততা না থাকলে সেই বিপ্লব বেহাত হতে যে সময় লাগে না – এই সিনেমা যেন তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন রিভল্যুশন’ সিনেমার পোস্টার; Image Courtesy: almeriafilms.blogspot.com

এখানে প্রধান দুই চরিত্র জন ও হুয়ানের মধ্যে পার্থক্য আকাশপাতাল। জনকে যদি আমরা তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবী বলি তো হুয়ান হচ্ছে সেই আমজনতা, যাদের দুঃখ কষ্টের অভিজ্ঞতা থেকেই ঐ তত্ত্বগুলোর জন্ম হয়েছে। প্রলেতারিয়েত মানুষের বিপ্লব থেকে প্রাপ্তির স্বরূপ নিয়ে আলাপ তো আছেই, লিওন আর তার স্ক্রিপ্টরাইটার ডোনাটি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে আইরিশ বিপ্লবীদের সংগ্রামের সাথেও। সেই সাথে কিছু চরিত্র আমাদের জহির রায়হানকে মনে করিয়ে দেয়৷ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক নায়ক নিয়েও প্রশ্ন জাগতে পারে মনে। তবে সন্দেহ জ্ঞানে সাহায্যজনক। 
     
এই চলচ্চিত্রের প্রোডাকশনে লিওন সবচেয়ে বেশি ভুগেছিলেন কাস্টিং নিয়ে। আইরিশ বিপ্লবী জনের চরিত্রে তিনি নিতে চেয়েছিলেন ডলার ট্রিলজির নায়ক ক্লিন্ট ইস্টউডকে। কিন্তু ইস্টউড চরিত্রটিকে পুনরাবৃত্তিমূলক মনে করে ফিরিয়ে দেন। ওদিকে হুয়ানের চরিত্রটি সার্জিও তার বিখ্যাত ‘দি আগলি ম্যান- টুকো’র মত করেই গড়তে চেয়েছিলেন। এলি ওয়ালচকে প্রস্তাব করলে তিনি তার হাতের অন্য কাজ ছেড়ে চলেও আসেন সেটে।

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন রিভল্যুশন’ সিনেমার একটি দৃশ্য; Image Courtesy: bfi.org.uk

কিন্তু হলিউডে সবাই মূলত একেকটা স্টুডিওর অধীনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, নির্দিষ্ট সংখ্যক সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করেন। এখানে কোনো ব্যতয় ঘটলে আদালত, মামলাসহ অনেক হাঙ্গামা হয়। অভিনেতা রড স্টেইজারও এই সিনেমার প্রযোজক গোষ্ঠী থেকে একটি সিনেমা তার চুক্তি অনুসারে পেতেন। সার্জিও লিওনের ডলার ট্রিলজির সাফল্য দেখে তিনিও সুযোগমত চেপে ধরেন এই হুয়ান চরিত্রটি পাওয়ার জন্য। কিন্তু লিওন তাকে নিবেন না। প্রযোজক ইউনাইটেড আর্টিস্টও বললো, না নিলে তোমার প্রজেক্টে আমরা টাকা, যন্ত্রপাতি কিছুই দিবো না। এদিকে আগের সিনেমা ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ওয়েস্ট’ তো আমেরিকায় ফ্লপ। আর হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হলিউডের কী ঠেকা পড়েছে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে বিপ্লবী গল্পের সিনেমাতে অর্থায়ন করার, তাও এক ইতালিয়ানের ৷

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন রিভল্যুশন’ সিনেমার একটি দৃশ্য; Image Courtesy: homemcr.org

তো কী করা৷ রড স্টেইজারকেই নেয়া হলো। এদিকে তিনি করতে লাগলেন মহান বিপ্লবীর মত হাবভাব৷ যারা টুকো চরিত্রটি দেখেছেন তারা জানেন ওর ধরন কেমন৷ সেটে লিওনের সাথে রডের হাতাহাতি হবার যোগাড়। পরে চলচ্চিত্র মুক্তির পর অবশ্য দুজনই দুজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে পরস্পরের কাজের প্রশংসা করেছিল।

এই চলচ্চিত্রটিও আমেরিকান সরকারের ভয়ে কেটেকুটে মুক্তি দিয়ে ফ্লপ খাওয়ানো হয়। আর ইউরোপে যথারীতি প্রশংসায় ভেসে যায়। আর মরিকোনির সঙ্গীত যথারীত… আচ্ছা অন্যদিনের আলাপে।

অভিনেতা রড স্টেইজার; Image Courtesy: forgottenfilmcast.files.wordpress.com

এবার নটে গাছ মুড়ানোর আলাপ, এই ট্রিলজি ও সার্জিওর জীবনের শেষ সিনেমা ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন আমেরিকা’ নিয়ে৷ শেষ চলচ্চিত্র তাই হয়তো এতেই নিজস্ব দক্ষতার সর্ব্বোচ্চটাই দিয়েছিলেন। তিন ঘন্টা উনপঞ্চাশ মিনিটের এই সিনেমা তার মনে বেড়ে উঠেছিল সেই ষাটের দশকের শেষে, ঐ ত্রিশের দশকের গল্পটি নিয়ে, যার কথা আমরা শুরুতে বলেছি। প্রায় দশ বছরের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন লিওন, যাতে আগের মতো চরিত্রাভিনেতা নির্বাচন নিয়ে কোন সমস্যা হয় নি। আগেই বলেছি এই গল্পটা নিউইয়র্কের এক ইহুদি অধ্যুষিত বসতি নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের অবর্ণনীয় ক্ষতির কারণে শিল্প সাংস্কৃতিক মহল সবসময়ই তাদের সহানুভূতির চোখে দেখতো। হলিউডে প্রচুর সিনেমা আছে এমন৷ আর হ্যাঁ, ঠিকই ধরছেন, লিওন এবার ইহুদিদের নিয়ে গড়ে ওঠা ধারণাও বিনির্মাণে মন দিলেন। বসতির আধিপত্য থেকে কীভাবে তারা অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ে, পারিপার্শ্বিকতা বদলের সাথে কী করে বদলে যায় বন্ধুত্ব, প্রেম, শত্রুতার সংজ্ঞা তা নিয়ে এক মহাকাব্য যেন এই সিনেমা।     

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন আমেরিকা’ সিনেমার পোস্টার; Image Courtesy: dmcdn.net

এই সিনেমার সেট ডিজাইন, ফ্রেমে দেখানো ভবনগুলোর ডিজাইন দিয়ে ফরশ্যাডোয়িং (পরে কী ঘটবে তার ধারণা দেয়া) নিয়ে ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে, দেখতে পারেন। ত্রিশের দশকের আমেরিকাকে বুঝতে লিওন একের পর এক শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম স্টাডি করেছেন। পুরো ইউরোপ চষে বেড়িয়েছেন একেকটি ফ্রেম নিখুঁত করার অভিপ্রায়ে৷ এছাড়া রবার্ট ডি নিরোসহ বাকিদের অভিনয়ও চমৎকার। কিন্তু এই সিনেমার গল্পের একটি বড় অংশ সিনেমার চরিত্রগুলোর জন্য বাস্তব নাকি অবাস্তব তা নিয়ে বিতর্কও দর্শক মহলে আজও বিদ্যমান। এছাড়া একটি ধর্ষণ দৃশ্যের জন্য সিনেমাটি সমালোচিত হয়েছিল। তবুও দর্শক সমালোচক সকলের মতে এটি সার্জিওর নির্মিত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র।

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন আমেরিকা’ সিনেমার একটি দৃশ্য; Image Courtesy: hearstapps.com

লিওনের শ্যুট করা দৃশ্য প্রায় ছয় ঘন্টার ছিল৷ তিনি দুই ভাগে এটি মুক্তি দিতে চাইলেও প্রযোজকরা রাজি হননি। শেষে কেটে ছেটে তিন ঘন্টা ৪৯ মিনিটে আনলেও তা আরো কেটে, এর নন লিনিয়ার ভঙ্গি বাদ দিয়ে ক্রমিকতা অনুযায়ী দৃশ্য সাজিয়ে সিনেমা মুক্তি দেয়া হয়। আর কী হবে, ফ্লপ। কিন্তু কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর এটি আবারও লিওনের জন্য সম্মাননা বয়ে আনে৷

পরিচালক সার্জিও লিওন; Image Courtesy: pinterest.com

এই বিশাল দৈর্ঘ্যের সিনেমার জন্য মরিকোনির করা কম্পোজিশনও রেকর্ড হিসেবে বিক্রির নতুন রেকর্ড তৈরি করে।             

এই অস্থির সময়ে দেখে ফেলতে পারেন অনবদ্য এই তিনটি সিনেমা! সময় ভাল কাটবে আশা করি।

ওহহো পাঁচ মিনিট কত আগেই শেষ। শেষ সিনেমা নিয়ে বকবক করতে করতেই। বাকি দুটো নিয়ে তাহলে কাল বলি। ততক্ষণ News Views এর সাথেই থাকবেন প্লিজ! 

Feature Image Courtesy: expresselevatortohell.com