বঙ্গের শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের ১০০ বছর ছুঁই ছুঁই। ইংরেজদের শাসন বেশ পাকাপোক্ত তখন। বঙ্গদেশ তখন এক মহা দোটানায়। একদিকে রক্ষণশীল সমাজ, মধ্যযুগীয় নানা রীতিনীতি; অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার পালে হাওয়া লাগছে। বঙ্গের মানুষেরা না পারছে পুরো রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলতে, না পারছে পাশ্চাত্য শিক্ষার আদলে পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে। কোন পথে যে চলি- এ দ্বন্দ্বের দাঁড়িয়ে সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতি শহরকে যে কয়েকজন মানুষ দিকনির্দেশনা দিতে চেয়েছিলেন তাদেরই একজন হুতুম পেঁচা। তার আসল নাম কালীপ্রসন্ন সিংহ।

জোড়াসাঁকোর বারানসি ঘোষ স্ট্রিটের বিখ্যাত ধনী সিংহ পরিবারে ১৮৪০ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। বাবা ছিলেন বিখ্যাত ধনী নন্দলাল সিংহ, মা ত্রৈলোক্যমোহনী দাসী। কিন্তু ভরা সংসার করা হলো না নন্দলাল সিংহের। ১৮৪৬ সালে বিশাল জমিদারি, বছর ছয়েকের ছেলে, পরিবার সব রেখে কলেরায় মৃত্যু হলো অত্যন্ত সৌখিন নন্দলালের। আদালতের হুকুমে নন্দলাল সিংহের এই বিষয়সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্ব পান পারিবারিক বন্ধু হরচন্দ্র ঘোষ। তিনি ছিলেন নির্লোভ, সৎ। বিষয় আশয় দেখাশুনার পাশাপাশি কালিকে নিজের ছেলের মতো মানুষ করতে লাগলেন তিনি।

যুবক বয়সে কালীপ্রসন্ন সিংহ; Image Courtesy: eitihas.com

১৮৫৩ সালে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এক বিয়ের খবর। পাত্রের বয়স মাত্র তেরো। পাত্র জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত এক জমিদারের ছেলে কালীপ্রসন্ন। পাত্রী বেণীমাধব বসুর কন্যা ভুবনমোহিনী দাসী। পাত্রী তখনো বড়দের কোলে পিঠে ঘুরে বেড়ায়। যথাসময়ে বিয়ে সম্পন্ন হল। সকলেই বর-কনেকে আশীর্বাদ করলেন তাদের দীর্ঘায়ু ও পরম সুখ। কিন্তু পরম সুখ, দীর্ঘায়ু কপালে থাকলে তো! বিয়ের কিছু সময় বাদে ভুবনমোহিনী এই জগতের মায়া ত্যাগ করেন। দ্বিতীয়বারের মতো প্রিয়জন হারানোর বেদনা সহ্য করতে হয় কালীপ্রসন্ন সিংহকে। কিছুকাল পরেই রাজা প্রসন্ননারায়ন দেবের নাতনি শরৎকুমার দাসীর সঙ্গে ফের বিয়ে। কিন্তু এই দাম্পত্যের সুর আদৌ বেজেছে কিনা সে সম্পর্কে ইতিহাস এ যাবত পর্যন্ত কোনো কথা বলে না। তবে কালীপ্রসন্ন এর মৃত্যুর পরে তার ভাইয়ের ছেলে বিজয় চন্দ্রকে দত্তক নেন শরৎকুমারী।

কালীপ্রসন্ন স্বভাবে ছিল বেশ ডানপিটে, দস্যি। ক্লাসে পড়াশোনায় মন নেই, মারামারি, ঠাট্টা, ইয়ার্কি এই সবেই মেতে থাকতেন। একদিন ক্লাস চলছে। সবাই খুব মন দিয়ে স্যারের পড়ানো শুনছে। হঠাৎ-ই একটি ছেলে ক্লাসরুমে তুমুল কান্নাকাটি শুরু করে দিল।

কালীপ্রসন্ন সিংহকে নিয়ে লেখা একটি বই; Image Courtesy: readbengalibooks.com

‘‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?’’ জিজ্ঞাসা করলেন স্যার।

‘‘আমাকে কালীপ্রসন্ন মাথায় জোরে চাঁটি মেরেছে।’’ বলেই আবার কান্না।

‘‘সে কী! কালী, তুমি ওর মাথায় মেরেছ?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’’

‘‘আমার কোনও দোষ নেই স্যার।’’

‘‘দোষ নেই মানে? ওকে মারলে কেন?’’

‘‘স্যার আমি জাতে সিংহ থাবা দিয়ে শিকার ধরা আমার জাতীয় স্বভাব ছাড়ি কী করে বলুন?’’ গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন কালীপ্রসন্ন।

এভাবে ক্লাস করতে করতে ১৮৫৭ সালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাঠ চুকালেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। তাই বলে পড়াশোনা ছাড়লেন না‌। টোলে পণ্ডিতের কাছে সংস্কৃত আর উইলিয়াম কার্কপ্যাট্রিক এর কাছে পড়তেন ইংরেজি। জীবনের প্রথম নাটক লেখা মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে। নাম ‘বাবু’। নাটক মঞ্চায়নের গুরুত্ব বুঝতে পেরে নিজের বাড়িতেই তৈরি করলেন ‘বিদ্যোৎসাহিনী’ থিয়েটার। সেখানে মঞ্চস্থ হলো রামায়ণ তর্করত্নের অনুবাদ করা  ‘বেণীসংহার’ নাটক। অভিনয় করলেন নিজে। সেই অভিনয় দেখতে এলেন বিচারপতি আর্থার বুলার, ভারত সরকারের প্রধান সচিব সিসিল বিভন সহ আরো অনেকে। প্রশংসা পেলেন খুব।

মহাভারতের বঙ্গানুবাদ করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ; Image Courtesy: Papyrus Pub

প্রশংসা ও উৎসাহ পেয়ে আবার কলম ধরলেন কালীপ্রসন্ন। অনুবাদ করলেন কালিদাসের ‘বিক্রমোর্ব্বোশী’ নাটক। সে নাটকও মঞ্চস্থ হলো। রাজা পুরবার চরিত্রে অভিনয় করলেন তিনি। এই নাটক এমন সাফল্য পেল যে অনেকেই বিশ্বাস করেনি এটি এই নাবালক কালীপ্রসন্নের অনুবাদ করা। পরে ধীরে ধীরে ‘মালতি মাধব নাটক’ অনুবাদ, ‘সাবিত্রী সত্যবান’ মৌলিক নাটক রচনা করেন তিনি।

নাটকের পাশাপাশি অসংখ্য প্রবন্ধ ও মহাভারতের অনুবাদ আর হুতুম পেঁচার নকশা তাকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। মহাভারত অনুবাদ প্রসঙ্গে কিছু কথা। জনশ্রুতি আছে যে, কালীপ্রসন্ন প্রথমে মহাভারতের কিছু অংশ অনুবাদ করে তার অভিভাবক হরচন্দ্রের কাছে নিয়ে যান এবং পুরো মহাভারত অনুবাদ করার ইচ্ছা জানান। হরচন্দ্র তাকে পণ্ডিতদের সহযোগিতা নেয়ার কথা বলে। কালীপ্রসন্ন বিদ্যাসাগরের কাছে গেলে তার সক্রিয় পরামর্শ ও সাতজন পণ্ডিতের সহযোগিতায় প্রায় আট বছর ধরে এই অনুবাদটি হয়। শুধু অনুবাদ করেই তিনি থেমে যাননি। ১৭ টি খন্ডে প্রকাশিত এই মহাভারতের মোট প্রায় ৫১ হাজার কপি তিনি বিনামূল্যে বিতরণ করেন।  মহাভারতের অনুবাদ কর্মের এই সুবিশাল পরিকল্পনায় প্রায় আড়াই লক্ষ মুদ্রা খরচ হয়। এই ব্যয় ভার বহন করতে গিয়ে তাকে তার অনেক জমি-জমা বিক্রি করতে হয়।

মহাভারতের মোট প্রায় ৫১ হাজার কপি বিনামূল্যে বিতরণ করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ; Image Courtesy: pinimg.com

হুতুম প্যাঁচার নকশায় কালীপ্রসন্ন ব্যবহার করেছিলেন কথ্য ভাষা। আসলে তিনি বুঝেছিলেন সমাজে যা অনাচার, বিকৃতি, বর্বরতা, ভুতের নাচন চলছে তার উপর আঘাত হানতে হলে প্রয়োজন কথ্য ভাষা, সংস্কৃত ঘেষা বাংলা নয়। নকশার প্রথম ভূমিকায় কালীপ্রসন্ন লিখলেন ‘‘সত্য বটে অনেকে নকশাখানিতে আপনারে আপনি দেখতে পেলেও পেতে পারেন, কিন্তু বাস্তবিক সেটি যে তিনি নন তা বলাই বাহুল্য, তবে কেবল এইমাত্র বলতে পারি যে আমি কারেও লক্ষ্য করি নাই অথচ সকলেরেই লক্ষ্য করিচি। এমনকী স্বয়ংও নকশার মধ্যে থাকিতে ভুলি নাই।” তখনকার সমাজকে, তার বাবা-মাকে একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে তিনি সামনে নিয়ে আসলেন। প্রথম খন্ড প্রকাশের পর কলকাতার বাবুদের রে রে অবস্থা। কারণ কালীপ্রসন্ন যে কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি। এমনকি নিজেকেও না।

দ্বিতীয় খন্ডেও তিনি একই কাজটি করেছেন। এটি প্রকাশ করে তিনি কলকাতার ফুল বাবুদের হাড়ি একেবারে মাঠের মাঝখানে ভেঙে দিলেন। তাদেরও লাগলো আতে ঘা। বাবুরাও একজোট হলেন। ঝাঁপিয়ে পড়লেন কালীপ্রসন্নের উপর। ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় ‘আপনার মুখ আপনি দেখ’ বই লিখে তাকেও একহাত নিলেন। আবার চুনিলাল মিত্র ‘কলিকাতার নুকোচুরি’ তে একেবারে সরাসরি কালীপ্রসন্ন এর উপর আক্রমন করলেন।

‘হুতুম পেঁচার নকশা’র জন্য বিখ্যাত কালীপ্রসন্ন সিংহ; Image Courtesy: pocketfm.in

মহাভারতের অনুবাদ বা হুতুম পেঁচার নকশা নয় শুধু। বাংলা সাহিত্যে বিকাশের জন্য তিনি সবসময় পাশে ছিলেন কবি সাহিত্যিকদের। অন্তমিল ছন্দের বাইরে গিয়ে অমিত্রাক্ষর ছন্দে মধুসূদন রচনা করলেন মেঘনাদবধ কাব্য। ছি ছি শুরু করল বাংলা সাহিত্যের পন্ডিত মহল। ঠিক তখন ঘটা করে কালীপ্রসন্ন বিদ্যোৎসাহিনী সভা থেকে মধুসূদন কে সংবর্ধনা দিলেন। ভূয়সী প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন তাঁকে। আবার নীলকরদের বর্বরতাকে জনগণের সামনে তুলে ধরতে দীনবন্ধু মিত্র রচনা করলেন নীলদর্পণ নাটক। প্রথম সংস্করণ শেষ। দ্বিতীয় সংস্করণ এর জন্য নেই টাকা। এগিয়ে এলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। সমস্ত ব্যয় তিনি বহন করলেন। এদিকে নীলদর্পণ ইংরেজিতে অনুবাদ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন রেভারেন্ড লং। সেখানেও এগিয়ে এলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। শুনানি চলছে আদালতে। উপস্থিত তিনি। রায় হলো লং সাহেবকে জরিমানা দিতে হবে এক সহস্র মুদ্রা। একেবারে রায়ের পর মুহূর্তে উঠে দাঁড়ালেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। পকেট থেকে টাকার থলি রাখলেন বিচারকের সামনে। জামিনে মুক্ত করলেন লং সাহেবকে।

দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক প্রকাশে সাহায্য করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ; Image Courtesy: somewhereinblog.net

দাতাকর্ণ হিসেবে বেশ নাম ছিল কালীপ্রসন্ন সিংহের। সমাজের কল্যাণে যেখানে যত অর্থ প্রয়োজন তিনি দান করতেন। বিদ্যাসাগর মশাই যখন বিধবা বিবাহ আইন চালু করে একে একে বিধবা বিবাহ দেয়া শুরু করলেন তখন কালীপ্রসন্ন প্রত্যক্ষভাবে সেখানে অর্থ সহায়তা করতেন। কিন্তু বিধবা বিবাহ করার লোক ছিল কম। কালীপ্রসন্ন সিংহ ঘোষণা দিয়ে বসলেন যে ব্যক্তি বিধবা বিবাহ করবেন তাকে তিনি এক সহস্র মুদ্রা করে দিবেন। অবশ্য অনেকেই বিধবা বিবাহের নাম করে কালীপ্রসন্ন থেকে অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল।

‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ এর সম্পাদক হরিশ মারা যাওয়ার পর হরিশের পরিবার ও পত্রিকার একেবারে যায় যায় অবস্থা। পরিবারের পথে বসার উপক্রম আর পত্রিকা বন্ধ হবার। সেখানেও কালীপ্রসন্ন সিংহ হাজির। কিনে নিলেন পত্রিকা। আবার তা শুরু হলো পূর্ণ উদ্যমে। আবার বিদ্যাসাগর মশাই যখন কৌলিন্য প্রথা, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে তুললেন তাতেও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল কালীপ্রসন্ন সিংহের। তৎকালীন কলকাতায় পানীয় জলের তখন বড় অভাব ছিল। বিষয়টি দেখে ইংল্যান্ড থেকে ২৯৮৫ টাকায় ৪টি ‘ধারাযন্ত্র’ আনালেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। কলকাতার সাতটি জায়গায় বসানো হলো পরিশুদ্ধ জলের কল।

বিধবা বিবাহ আইন বাস্তবায়নে সাহায্য করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ; Image Courtesy: anandabazar.com

এমন সব জনহিতকর কাজ আর বিনামূল্যে মহাভারত বিতরণ করতে করতে এক সময়ে ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে একেবারে পথে বসলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। ১৮৬৬ সালে তার নামে মোট ২০ টি মামলা রুজু হল। একের পর এক সম্পত্তি আটক করে পাওনাদারদের দেনা মেটাতে থাকলেন হাইকোর্টের শেরিফ। পাওনাদারদের দাবিতে ওয়ারেন্ট জারি হল কালীপ্রসন্ন সিংহের নামে। তখন একেবারে বিধ্বস্ত জোড়াসাঁকোর এই জমিদার। দাঁড়াতে হলো আসামির কাঠগড়ায়। দোষী সাব্যস্ত হলেন তিনি। বিচারপতি নেহাত দয়া দেখিয়ে মুক্তি দিলেন তাঁকে। এই দয়াই বোধহয় সহ্য হয়নি একসময় প্রতাপ দেখিয়ে চলা কালীপ্রসন্ন সিংহের। নানা আঘাতে বিধ্বস্ত কালীপ্রসন্ন সিংহ অনেক আগে নিজেকে ডুবিয়েছিলেন মদের নেশায়। ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলেন। কেই-বা রেখেছিল খোঁজ!

মামলার রায়ের পর ঠিক চার মাস কাটলো। ১৮৭০ সাল, ২৪ জুলাই বিকেলে ডিসঅর্ডার অফ লিভারে আক্রান্ত হয় গঙ্গার ধারের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তখন তার বয়স সবে মাত্র ৩০ ছুঁয়েছে!

Feature Image Courtesy: anandabazar.com