ফোবিয়া কিংবা ভীতি খুবই সাধারণ ব্যাপার। কারো মাকড়শা কিংবা কারো অন্ধকারে ভীতি থাকতেই পারে। আমেরিকার একটি সংস্থার মতে পৃথিবীতে প্রায় ১৯ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিভিন্ন ধরনের ফোবিয়াতে ভুগে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯%। স্বাভাবিক কিছু ফোবিয়া ছাড়াও এমন সব অদ্ভুত ফোবিয়া আছে যা শুনে যে কারোই চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। অথচ এইরকম অদ্ভুত রকমের ফোবিয়া নিয়েই আশেপাশের অনেক মানুষ লড়াই করে যাচ্ছেন। চলুন দেখে আসা যাক দুনিয়ার কিছু অদ্ভুত ও কিম্ভূতকিমাকার ফোবিয়ার কথা

মরটুসেকুসফোবিয়া: টমেটো কেচাপের ভীতি

শুনতে কিছুটা বিদঘুটে শুনালেও কিছু মানুষের টমেটো কেচাপের ভীতিও রয়েছে। লাল রঙের এই আচারের উপস্থিতিতে অনেক মানুষই অস্বস্তি অনুভব করেন। মূলত যারা লাল রঙ সহ্য করতে পারেন না তাদের মধ্যেই এই ভীতির জন্ম নেয়। আর এই ধরনের মানুষ-ই আক্রান্ত মরটুসেকুসফোবিয়া নামের এই অদ্ভুত ফোবিয়াতে।

টমেটো কেচাপের ভীতি থেকে জন্ম নেয় মরটুসেকুসফোবিয়া; Image Courtesy: InformOverload
টমেটো কেচাপের ভীতি থেকে জন্ম নেয় মরটুসেকুসফোবিয়া; Image Courtesy: InformOverload

কুম্পুনোফোবিয়া: বোতামের ভীতি

কুম্পুনোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষের যত ভীতি বোতাম ঘিরে। বোতাম স্পর্শ করা দূরে থাক বোতাম দেখলেই তারা চোখ সরিয়ে নেয়। ৭৫ হাজার লোকের মধ্যে ১ জনের মধ্যে এই ধরনের ফোবিয়া দেখা যায়। সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত লোকেরা বোতামের বদলে মানুষের মুখের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। তবে অনেকের মতে এই ভীতির উৎপত্তি নিল জেইমানের ‘কোরালাইন’ নামের এক ভৌতিক উপন্যাস থেকে। যেখানে মানুষের চোখের বদলে থাকে বোতাম। আবার শৈশবের দুঃসহ স্মৃতি থেকেও হতে পারে এই ফোবিয়া।

বোতামের ভীতি থেকে জন্ম নেয় কুম্পুনোফোবিয়া; Image Courtesy: dailymail.co.uk

পোগোনোফোবিয়া: দাঁড়ির প্রতি ভীতি

ঐতিহাসিকভাবেই দাঁড়ি থাকা মানুষ অনাস্থাভাজন ও অবিশ্বাসযোগ্য হয়ে থাকে এই ধারণা প্রচলিত। সেইজন্য আমেরিকায় বেশিরভাগ রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গকেই দাঁড়িবিহীন দেখা যায়। শুধুমাত্র আব্রাহাম লিংকন ছিলেন এর ব্যাতিক্রম। সেই থেকেই দাঁড়ির প্রতি এক ধরণের ভীতি অনেকের মাঝেই দেখা যায়। যেই ভীতির আভিধানিক নাম হচ্ছে পোগোনোফোবিয়া।

দাঁড়ির প্রতি ভীতি থেকে জন্ম নেয় পোগোনোফোবিয়া; Image Courtesy: buggedspace.com

ডিডাস্কালেইনোফোবিয়া: স্কুলে যাওয়ার ভীতি

স্কুলে যাওয়ার ভীতি থাকা বাচ্চাদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের মধ্যে ২% থেকে ৫% বাচ্চা এই রোগে ভুগে থাকে। মূলত বুলিং এর স্বীকার থেকেই জন্ম নেয় এই ধরনের ফোবিয়া। এছাড়া স্কুলে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় বাজে পারফর্ম করাও মাঝে মাঝে এ ধরনের ফোবিয়ার উৎস হয়ে থাকে। অনেকের মতে বিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্র টম স্যায়ার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাচ্চাদের স্কুলে না যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। যদিও টম স্যায়ারের এই ধরনের ফোবিয়া ছিল না।

অনেক বাচ্চাদের মাঝেই রয়েছে স্কুলে যাওয়ার ভীতি; Image Courtesy: wowparenting.com

লেপিডোপ্টেরোফোবিয়া: প্রজাপ্রতির ভীতি

মাকড়শা ভীতি অনেকটা সাধারণ ব্যাপার হলেও প্রজাপ্রতির প্রতি ভীতি কিছুটা অদ্ভুত। তবে বেশ কিছু মানুষ এই ধরনের ফোবিয়াতে ভুগে থাকেন। তাদের মতে প্রজাপ্রতির অস্থিরভাবে ডানা ঝাপটানোর কারনেই এই ভীতির সৃষ্টি হয়। এই ফোবিয়া অনেকটা এনটোমোফোবিয়ার মতই। যারা কিনা মথকে ভয় পায়। বিখ্যাত অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যান ও লেপিডোপ্টোরোফোবিয়ায় আক্রান্ত। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রায় ৩৬০০ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। যা আসলে অতি নগন্যই বলা চলে।

প্রজাপ্রতির ভীতি থেকে জন্ম নেয় লেপিডোপ্টেরোফোবিয়া; Image Courtesy:
hireanillustrator.com

নোমোফোবিয়া: মোবাইল না থাকার ভীতি

অনেকের মতে বর্তমানে প্রায় ৫০% মানুষই এই ফোবিয়া আক্রান্ত। আপনি কিছুক্ষন পর পর যদি ফোন ঠিক আছে কিনা তা চেক করেন তাহলে আপনিও সেই ৫০% এর অন্তর্গত। সাধারণত মোবাইল ফোন দূরে থাকলে এই ধরনের মানুষেরা হতাশায় ভুগে। কিংবা ফোন কাছে না থাকলে নিজেকে একা মনে হওয়ায় এই ফোবিয়ার উপসর্গ। বর্তমান প্রজন্মে এই ফোবিয়াটি প্রকট রুপ ধারণ করেছে।

নোমোফোবিয়া বর্তমানে সবচেয়ে বড় ফোবিয়া; Image Courtesy: reglo.org

ডিপনোফোবিয়া: ডিনার পার্টির ভীতি

সাধারণত ডিনার পার্টি এবং সেখানে থাকাকালীন অবস্থায় হালকা আলোচনায় অংশগ্রহন করা নিয়ে এই ভীতি তৈরী হয়। অসামাজিক কিংবা অনালাপী লোকজন এই ধরনের ফোবিয়াতে ভুগে থাকে। অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রেও এই ফোবিয়া পেয়ে থাকে লোকজন। এই অদ্ভুত ফোবিয়াতে ভোগা লোকের সংখ্যা একেবারেই ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

ডিনার পার্টির ভীতি থেকে জন্ম নেয় ডিপনোফোবিয়া; Image Courtesy: beritagar.id

ফ্যাগোফোবিয়া: গিলে ফেলা বা খাওয়ার ভীতি

একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাবার ও পানি অতি আবশ্যক জিনিস। কিন্তু যদি ভয়ের কারনে খাবার না খেতেই পারেন তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে? এইরকম ভীতি থেকেই জন্ম নেয় রুগ্ন শরীর কিংবা ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের। খাবার গিলতে না পারা বা খেতে না পারার এই ভীতির নাম ফ্যাগোফোবিয়া। গ্রিক শব্দ ফ্যাগো মানে হচ্ছে খাওয়া। সাধারণত এই ফ্যাগোফোবিয়া থেকে জন্ম নেয় ডিসফ্যাগিয়া নামের আরেক ভীতি। ডিপ্রেশনের পাশাপাশি ওজন ও কমে যায় এই ফোবিয়ার কারনে।

গিলে ফেলা বা খাওয়ার ভীতি থেকে জন্ম নেয় ফ্যাগোফোবিয়া; Image Courtesy: elitereaders.com

ট্রিসকাইডেকাফোবিয়া: ১৩ সংখ্যার ভীতি

আদিকাল থেকেই কুসংস্কার কিংবা কিছু পৌরাণিক কাহিনীর জন্য ১৩ সংখ্যাটিকে অশুভ হিসেবে ধরা হয়। কিছু মতবাদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি হলো লাস্ট সাপারে জিশুর সাথে ১৩ জন অনুচারী ছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েন তিনি। এছাড়া নর্স মিথোলজি ও হিন্দু ধর্মতেও ১৩ সংখ্যাকে অশুভ বলা হয়েছে। এছাড়া জুদাস ও বিশ্বাসঘাতকার চিহ্ন হিসেবে ১৩ কে দেখা হয়। এসবের জন্যই কিছু মানুষের ১৩ সংখ্যার উপর এক ধরনের ভীতি চলে আসে। এই ভীতিকেই আভিধানিকভাবে বলা হয় ট্রিসকাইডেকাফোবিয়া।

১৩ সংখ্যাকে অনেকেই অশুভ হিসেবে দেখে; Image Courtesy: Slide Share

চিরোফোবিয়া: সুখী থাকার ভীতি

অদ্ভুত এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষেরা সুখ নিয়ে আসবে এই ধরনের কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। তার মানে এই নয় যে তারা মনমরা হয়ে থাকতে ভালবাসে। বরং তাদের কাছে মনে হয় সুখ জিনিসটা খুব অল্প সময়ের জন্য। এরপরই ঘিরে ধরবে দুঃখ। তাই তারা সুখ জিনিসটার কাছে পারতপক্ষে ঘেষতে চায়না। এই ধরনের মানুষগুলো কনসার্ট কিংবা পার্টিগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। এই ধরনের মন মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় চিরোফোবিয়া।

সুখী থাকার ভীতি থেকে জন্ম নেয় চিরোফোবিয়া; Image Courtesy: bustle.com

চিকলেফোবিয়া: চুইংগাম ভীতি

চুইংগাম বেশ জনপ্রিয় একটি পণ্য। তবে অনেকের মাঝেই চুইংগাম ভীতি দেখা যায়। চুইংগাম এর দিকে তাকিয়ে থাকতে বা রাস্তা ঘাটে  চুইংগাম দেখলেই তারা অস্বস্তিতে ভুগে। জনপ্রিয় তারকা অপরাহ উইনফ্রেও চিকলেফোবিয়ায় আক্রান্ত। পিপল ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে তিনি চুইংগামকে ঘৃণা করেন। চুইংগামের কথা ভাবলেই তিনি অসুস্থ অনুভব করেন।

অনেকেরই রয়েছে চুইংগাম ভীতি; Image Courtesy: Freerange.com

মেলোফোবিয়া: সঙ্গীত ভীতি

সঙ্গীত বা গান মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। তবে গানের মধ্যে হঠাৎ করে সুর পরিবর্তন হওয়া অনেকের মাঝে অস্বস্তির উদ্রেক তৈরী করে। এই ধরনের অস্বস্তি থেকেই জন্ম নেয় মেলোফোবিয়া। কিছু কিছু মৃগী রোগীর ক্ষেত্রেও এই মেলোফোবিয়া কাজ করে।

সঙ্গীত ভীতি থেকে তৈরি হয় মেলোফোবিয়া; Image Courtesy: psycolab.com

কোরোফোবিয়া: নাচার ভীতি

এলেন ডিজনেরাসের একটি শো তে এসে বিখ্যাত অভিনেতা জনি ডেপ বলেছিলেন তিনি নাচতে যাওয়াটাকে সবচেয়ে ভীতিকর মনে করেন। নাচার বদলে তিনি দরকার হলে এক ব্যাগ চুলও গিলে ফেলতে পারবেন। এই নাচার ভীতিকেই আভিধানিক ভাবে বলা হয় কোরোফোবিয়া। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাধারনত অন্য মানুষেরদের  নাচতে দেখলে এই ধরনের মানুষেরা বিষন্ন হয়ে পড়েন। এই ধরনের ফোবিয়া অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক অনুশাসন থেকেও পেয়ে থাকেন ভুক্তভুগীরা।

নাচার ভীতি থেকে তৈরি হয় কোরোফোবিয়া; Image Courtesy: 10mosttoday.com

চেইটোফোবিয়া: চুলের ভীতি

পশম বা চুল থেকে জন্ম নেওয়া এই ভীতির নাম চেইটোফোবিয়া। চুল পড়ে যাওয়া কিংবা টাক হয়ে যাবে এই ধরনের দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয় এই ভীতি। এই ভীতির সাথে জীবাণু ভীতিও জড়িত। চুলের যত্ন নেওয়ার পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করা মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তাই বলা চলে বেশিরভাগ মানুষই নিজের ভেতর চেইটোফোবিয়া ধারন করেন।

অনেকেরই রয়েছে চুলের ভীতি; Image Courtesy: nowness.com

ক্রোমোফোবিয়া: রঙের ভীতি

ক্রোমোফোবিয়া কয়েক ধরনের হতে পারে। কারো কারো নির্দিষ্ট কোনো রঙ এর উপর বিতৃষ্ণা থাকতে পারে। যেমন লাল রঙ। রক্ত কিংবা হিংস্রতার সাথে লাল রঙ জড়িত। সেক্ষেত্রে অনেকেরই লাল রঙ এর প্রতি ফোবিয়া কাজ করে।

রঙের ভীতি থেকে জন্ম নেয় ক্রোমোফোবিয়া; Image Courtesy: fineartamerica.com

পাশাপাশি অন্য রঙ এর প্রতি যাদের ফোবিয়া আছে তাদের জীবন শোচনীয় হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের ভীতির রঙ এর মুখে পড়তে হয় বলে তারা সাধারণত রঙ্গিন স্থান গুলো উপেক্ষা করে চলেন। লাস ভেগাসের মত জায়গা তাই ক্রোমোফোবিয়া আক্রান্ত মানুষদের জন্য বীভিষীকাময়।


Feature Image Courtesy: therecoveryvillage.com

References: Links are hyperlinked within the article.