সুস্থ থাকতে খেতে হবে রঙিন ফল ও সবজি

বেশিরভাগ মানুষই পর্যাপ্ত পরিমাণ ফল ও সবজি গ্রহণ করে না এবং রঙিন ফল ও সবজির উপকারিতা সম্পর্কে অবগত নয়। শীতকাল মানেই ফল, শাক-সবজির মৌসুম।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন ২২০ গ্রাম সবজির প্রয়োজন। পুষ্টিবিদদের মতে, সুস্থ সবল দেহের জন্য দৈনিক জনপ্রতি ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার। তা যোগান দেয়া সম্ভব না হলে কমপক্ষে ৬০ গ্রাম ফল খাওয়া বাঞ্ছনীয়।

ফল এবং শাকসবজি গুলোতে সাধারণত খুব কম ফ্যাট, কোলেস্টেরল বা সোডিয়াম থাকে এবং জটিল শর্করা, ফাইবার এবং পুষ্টি সরবরাহ করে। বেশিরভাগের ক্যালরি কম থাকে এবং এগুলিতে পরিশোধিত চিনির বিপরীতে প্রাকৃতিক চিনি থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রায় আকস্মিক ওঠানামা ঘটাতে পারে। তাই পুষ্টিকর সুবিধাগুলি সর্বাধিক করে তোলার জন্য প্রতিদিন ডায়েটে প্রতিটি রঙের কিছুটা অংশ নেওয়া উচিত।

সুস্থ থাকতে রঙিন ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: betterhealth.vic.gov.au

ফল এবং শাকসবজির প্রতিটি রঙ নির্দিষ্ট ফাইটোনিট্রিয়েন্টগুলির কারণে ঘটে যা প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ। এটি উদ্ভিদকে জীবাণু, বাগ, সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি এবং অন্যান্য হুমকির হাত থেকে রক্ষা করে। প্রতিটি রঙ নির্দিষ্ট পুষ্টি প্রচুর পরিমাণে নির্দেশ করে।


হলুদ এবং কমলা রঙের ফল ও শাকসবজি                                                   

হলুদ ও কমলা ফল যেমন- কমলা, মালটা, হলুদ আপেল, কলা, লেবু, জাম্বুরা, পাকা আম, পিচ, ফুট, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, নাশপাতি ইত্যাদি। আর হলুদ ও কমলা সবজি হল মিষ্টি আলু, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি কর্ন, হলুদ মরিচ, হলুদ টমেটো, ভুট্টা, হলুদ ক্যাপসিকাম, হলুদ বিট ইত্যাদি।

  • জিজানথিন, ফ্লেভোনয়েড, লাইকোপেন, পটাশিয়াম ও ভিটামিন এ, ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি, ফলেট এবং প্যানটোথেনিক অ্যাসিডের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের আধার এই ফলগুলো।
  • পেঁপে ত্বকে আর্দ্রতা যোগায়, ত্বক উজ্জ্বল ও কোমল করে। কলাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, বায়োটিন, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন সি এবং বি৬।
  • কমলা-হলুদ ফল ও সবজি হার্ট ভালো রাখে। মিষ্টি আলু, গাজর, মিষ্টি কুমড়ায় বিটা ক্যারোটিন নামের ফাইটোকেমিক্যাল থাকে। এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এ ছাড়া ঠান্ডার সমস্যা দূর এবং চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে এগুলো । ফলের মধ্যে কমলা ও আঙুরে বায়োফ্লেভোনয়েড থাকে, যা ভিটামিন সি-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীরকে সুস্থ রাখে।
সুস্থ থাকতে হলুদ রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: boldsky.com
  • কমলা এবং হলুদ ফল এবং শাকসবজি হাড় ও দাঁত শক্ত করে, দ্রুত ক্ষত সারায় ও ত্বক সুন্দর করে।
  • কমলা এবং হলুদ ফল এবং শাকসবজি ইমিউন ফাংশন উন্নত করে।  কিছু ক্যারোটিনয়েডস, বিশেষত বিটা ক্যারোটিন শরীরের মধ্যে ভিটামিন এ রূপান্তরিত করে, যা স্বাস্থ্যকর দৃষ্টি এবং কোষের বৃদ্ধি প্রচারে সহায়তা করে।
  • সাইট্রাস ফলগুলিতে হেস্পেরিডিন নামে একটি অনন্য ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকে যা রক্ত ​​প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করে।
  • কমলা ও হলুদ ফল এবং শাকসবজি স্নায়ুতন্ত্রকে সুরক্ষিত করে, চোখের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ করে থাকে। এগুলি ত্বকের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে, প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং শক্তিশালী হাড় গঠনে সহায়তা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • এসবে পাওয়া অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন সি, পটাসিয়াম, ফলিক অ্যাসিড এবং ব্রোমেলাইন। এগুলো  বদহজমকে দূর করতে সাহায্য করে এবং ফোলা ও সংক্রমণ হ্রাস করতে পারে।
সুস্থ থাকতে কমলা রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: amwayconnections.com

লালগোলাপি রঙের ফল ও শাকসবজি                                                  

লাল রঙের ফল এবং সবজির তালিকায় রয়েছে লাল আপেল, তরমুজ, ডালিম, টমেটো, লাল স্ট্রবেরি, চেরি, লাল আঙুর, লাল শাক, লাল মরিচ, লাল পেঁয়াজ, লাল বাঁধাকপি, তরমুজ, বেরি, বিট ইত্যাদি।
  

  • এই ফল-সবজিতে লাইকোপেন অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, এলজিক এসিড সহ ফাইটোকেমিক্যাল থাকে। এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।
  • আপেলে প্রচুর পরিমাণ ম্যালিক অ্যাসিড রয়েছে। ম্যালিক অ্যাসিড অন্যান্য অ্যাসিডের সাথে মিশে ত্বক উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। আপেলে থাকা ভিটামিন ত্বকের কোষের বিন্যাস ঠিক রাখে এবং ত্বক টানটান রাখে।
সুস্থ থাকতে লাল রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: aarp.org
  • গাঢ় গোলাপি বা লাল রঙের স্ট্রবেরিতে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ভিটামিন সি ও ম্যাঙ্গানিজ এবং এটি খুবই ভালো ত্বক পরিষ্কার করে।
  • হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ত্বকের গুণমান উন্নত করা ছাড়াও বিভিন্ন ক্রনিক রোগ সারাতে পারে এসব ফল ও সবজি। এ ছাড়া লাল রঙের ফলে অ্যান্থোসায়ানিন নামের যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে তার কারণে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, উচ্চ কোলেস্টেরল হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে।
সুস্থ থাকতে গোলাপি রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: moralfibres.co.uk

নীলবেগুনি রঙের ফল ও শাকসবজি                                                  

নীল এবং বেগুনি রঙের ফল, সবজি মানেই বেগুন, কালো আঙুর, চেরি, নীলবেরি, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি, ব্লুবেরি, বেগুনি আঙ্গুর, ডুমুর, বেগুনি বাঁধাকপি, বেগুনি আলু ইত্যাদি।

     ●  নীল ও বেগুনি রঙের ফল ও সবজিতে রোগ প্রতিরোধক্ষম ফাইটোকেমিক্যাল অ্যান্থোসায়ানিন ও ফিনোলিকস থাকে। এই সমস্ত ফল এবং শাক-সবজি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে ভাস্কুলার সিস্টেমকে সুস্থ রাখে।

সুস্থ থাকতে নীল-বেগুনি রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: pinterest.at

●  বিভিন্ন ধরনের বেরি, কিশমিশে অ্যান্থোসায়ানিন ও ফেনোলিকস থাকে। এগুলো হৃদরোগ, আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।

●  এগুলো অ্যান্টোসায়ানিনস এবং রেভেভারট্রোল সহ ফাইটোনিট্রিয়েন্ট সমৃদ্ধ। অবাঞ্ছিত প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং আমাদের তরুণ রাখতে সহায়তা করে, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে, মূত্রনালীর স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেয় এবং স্বাস্থ্যকর হজম নিয়ন্ত্রণ করে।

সুস্থ থাকতে নীল-বেগুনি রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: pinterest.at

সবুজ রঙের ফল ও শাকসবজি                                                  

রোগ প্রতিরোধে সবুজ শাকসবজির কোনো বিকল্প নেই। সবুজ ফলের মধ্যে রয়েছে পেয়ারা, সবুজ আঙুর, সবুজ আপেল, কামরাঙা, লেবু, বরই, আমড়া, আমলকি, জলপাই, কাঁচা আম, অ্যাভোকাডো, কিউই, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি। সবুজ পাতাযুক্ত শাক-সবজির মধ্যে পুঁইশাক, পালংশাক, লেটুসপাতা, পুদিনাপাতা, ব্রোকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি,শতমূলী, শসা, কাঁচামরিচ, সবুজ মটরশুটি, সবুজ মরিচ ইত্যাদি রয়েছে। সবুজ পাতাযুক্ত সবজির রং যত গাঢ় হয়, এতে তত বেশি পুষ্টি থাকে। জেন্থেফিল উপস্থিতির কারণে সবুজ ফল পাকলে রঙিন হয়।

    ●   সবুজ শাক-সবজি ও ফলমূলে লুটেইন গিক্সাথিন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা চোখের জন্য ভালো।

     ●  এগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্লোরোফিল, ফাইবার, লিউটেইন, জিজানথিন, ক্যালসিয়াম, ফলেট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, লৌহ, পটাশিয়াম ও বিটা ক্যারোটিন। আরোও রয়েছে ভিটামিন এ, সি, ই, কে ও কয়েক ধরনের ভিটামিন বি-এর উৎস।

    ●   সবুজ ফল এবং শাকসবজি ইমিউন সিস্টেমকে জোর দেয়, দেহকে ডিটক্সাইয়েড করতে, শক্তি এবং প্রাণবন্ততা পুনরুদ্ধার করতে, স্তন ও প্রোস্টেট গ্রন্থির ক্যানসার প্রতিরোধ করে।

সুস্থ থাকতে সবুজ রঙের রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: freepic.com


●  এসব লুটিন, আইসোথিয়োকানেটস, আইসোফ্লাভোনস এবং ভিটামিন কে সমৃদ্ধ – যা রক্ত ​​এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়।

●  সবুজ শাক-সবজি ফোলেট সমৃদ্ধ – জন্মগত প্রতিবন্ধকতা প্রতিরোধে সহায়তা করার জন্য গর্ভবতী মহিলাদের খাওয়ার জন্য বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি।

●  সবুজ ফল এবং শাকসবজি বয়সের সাথে সম্পর্কিত ম্যাকুলার অবক্ষয়ের ঝুঁকি কমায়, ক্যান্সার এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের উচ্চ স্তরের হাত থেকে রক্ষা করে, হজম নিয়ন্ত্রণ সহ আরও নানাভাবে আমাদেরকে উপকৃত করে।

সুস্থ থাকতে সবুজ রঙের রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: freepic.com

সাদা রঙের ফল ও শাকসবজি                                                  

এই ফল এবং সবজির তালিকায় রয়েছে সাদা জাম,কলা, সাদাপীচ, নাশপাতি, পেঁয়াজ, রসুন, মুলা, মাশরুম, সেলারি, আলু, ফুলকপি, শালগম ইত্যাদি।

  ●  সাদা রঙের ফল বা সবজিতে অ্যালিসিন নামের শক্তিশালী ফাইটোকেমিক্যাল থাকে। এই সাইটোকেমিক্যাল কেবল হাড়রে জন্যই উপকারি নয়, ক্যানসার প্রতিরোধেও সাহায্য করে।

   ●  ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াবিরোধী ক্ষমতা আছে সাদা সবজি কিংবা ফলে। সাদা রঙের রসুনে যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে তা শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে পারে।

সুস্থ থাকতে সবুজ রঙের রঙের ফল ও সবজি খেতে হবে; Image Courtesy: belmarrahealth.com

●  হাড়কে শক্তিশালী রাখে, দেহে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কম করার সাথে সাথে উচ্চ রক্তচাপকে কম করে।

●  এগুলি আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, কোলন, প্রস্টেট এবং স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও হ্রাস করে।

আমাদের সকলের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফল বা শাকসবজি রাখা উচিত। ছোট বাচ্চাদেরকে বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি প্রয়োজন মত খাওয়ানো উচিত। শীতে প্রচুর সবজি বাজারে পাওয়া যায়। পুষ্টিকর খাবার সব সময়ই শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এ সময় তাই বেশি করে শাকসবজি খেতে হবে। এতে শরীর যথেষ্ট পুষ্টি পাবে এবং রোগব্যাধি কমবে। শীতকালে  বরাবরই আমরা রোগাক্রান্ত বেশি হই। করোনা ও অসুস্থতা  এড়াতে আমাদের উচিত সচেতনতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা। তবে যে কোন খাবারই রোজ খাওয়ার আগে শরীরের অবস্থা বুঝে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া উচিত।

Feature Image Courtesy: community.jennycraig.com

References: