স্টকহোম সিনড্রোম

মেরেছিস কলসির কানা, তা বলে কি প্রেম দেব না?’

লাইনটা পড়ে খাবি খাচ্ছেন? একটা গল্প বলি শুনুন। আজ থেকে প্রায় পাঁচশত বছর আগে ভারতের নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যদেব বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করেছিলেন। তার এ কাজের একজন সহচর ছিলেন, নাম নিত্যানন্দ। প্রচলিত আছে, সেসময় নবদ্বীপে জগাই ও মাধাই নামে দুই দুরাচারী বাস করতো। এই পতিত আত্মাদ্বয়কে উদ্ধারের নিমিত্তে নিত্যানন্দ একবার তাদেরকে শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ করতে বললে জগাই-মাধাই খেপে যায়। নিত্যানন্দের বারংবার অনুরোধে ক্রোধান্বিত দুই ভাই শেষমেশ তাকে একটি কলসির কানা দিয়ে আঘাত করে। তা-তে নিত্যানন্দের মাথা কেটে গিয়ে রক্ত ঝরলেও তিনি ক্ষুদ্ধ না হয়ে বরং আরও বেশি প্রেমপূর্ণ কণ্ঠে তাদেরকে হরিনাম নিতে বলেন। অর্থাৎ, মেরেছিস কলসির কানা, তা-ই বলে কি প্রেম দেব না?

এ গল্পের মূল বাণী হলো, ক্ষমা মহৎ গুণ। যার কাছ থেকে যন্ত্রণা প্রাপ্তি ঘটে, তাকে ক্ষমা করে দিয়ে তার প্রতি উল্টো ভালোবাসা দেখানোটা একটু বাড়াবাড়ি বলে মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। উপরের গল্পটি পাঁচশ বছর পুরনো এবং আদৌ ঘটেছিল কিনা তার সত্যতা সম্পর্কে কোনো নিরঙ্কুশ প্রমাণও নেই। কিন্তু যদি বলি, বাস্তব জীবনেও এরকম ঘটনা ঘটা সম্ভব তাহলে নিশ্চয়ই অবাক হবেন? আচ্ছা, ধরুন কেউ আপনাকে অপহরণ করে নিয়ে গেল, আপনার মুক্তিকে পণবন্দী করে রাখলো, তখন তার প্রতি আপনার কি ঘৃণা, অপছন্দ ব্যতীত অন্য কোনো অনুভূতি তৈরি হবে? না হওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু স্টকহোম সিনড্রোমে যারা ভোগেন, তারা বরং ঠিক উল্টোটা অনুভব করবেন! আরেকটা গল্প শোনা যাক।

Image Courtesy: futurecdn.net

১৯৭৩ সালের ২৩ অগাস্ট, সকালবেলা। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের ব্যস্ত ব্যাংক সোয়ারিয়াস ক্রেদিটবাঙ্কেন-এ প্রবেশ করলেন একজন জেলপলাতক আসামী। জ্যাকেটের অন্তরাল থেকে একটি সাবমেশিন গান বের করে সিলিং-এ তাক করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে ইংরেজিতে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘দ্য পার্টি হ্যাজ জাস্ট বিগান!’

জন-এরিক ওলসন সেদিন ওই ব্যাংকের চারজন কর্মীকে জিম্মি করেন। ওলসনের দাবি ছিল তাকে সাত লাখ ডলার দিতে হবে, পালানোর জন্য একটা গাড়ি সরবরাহ করতে হবে এবং ক্লার্ক ওলফসন নামের আরেকজন কারাবন্দীকে মুক্তি দিতে হবে। তার কথা মতো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কর্তৃপক্ষ সবগুলো দাবি পূরণ করে ফেলে।

স্টকহোমে জন-এরিক ওলসনের জিম্মি করা এবং পুলিশের উদ্ধার করার কিছু দৃশ্য; Image Courtesy: roughdiplomacy.com

তারপর… তারপর ঘটলো সেই আশ্চর্য ঘটনা। ব্যাংকের এক ভল্টের মধ্যে বন্দী থাকা ওই চারজন জিম্মি সহসা তাদের অপহরণকারীর প্রতি দুর্বলতা অনুভব করতে শুরু করলেন। কিন্তু এ অবোধ্য বন্ধনের কারণ কী? কারণ ওলসন স্বয়ং। তার আচরণ জিম্মিদের মাঝে ভয়ের বদলে মুগ্ধতা ছড়াতে লাগলো। ক্রিস্টিন এনমার্ক যখন শীতে জবুথবু, তখন ওলসন ‘পরম মমতায়’ তার গায়ে একটি উলের জ্যাকেট মুড়িয়ে দিলেন। ক্রিস্টিন দুঃস্বপ্ন দেখলে তাকে শান্ত করলেন, এমনকি নিজের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে একটা বুলেট খুলে নিয়ে ক্রিস্টিনকে দিলেন মেমেন্টো হিসেবে রাখার জন্য। ওদিকে বিরগিত্তা লুন্দব্লাদ যখন নিজের ঘরে ফোন করতে গিয়ে বারবার লাইন পাচ্ছিলেন না, তখন তাকে আত্মবিশ্বাস জাগানো সুরে ওলসন বললেন, ‘চেষ্টা চালিয়ে যাও; হাল ছেড়ো না।’ আরেকজন জিম্মি এলিসাবেথ ওল্দগ্রেনের আবদ্ধ জায়গায় দম আটকে আসছে জেনে তাকে ত্রিশ ফুট দড়ির সাথে জুড়ে দিয়ে ভল্টের বাইরে হাঁটার ব্যবস্থাও করে দিলেন ‘ভালো কিডন্যাপার’ ওলসন।

ওলসনের এহেন কাণ্ডে মন গলে গেল চারজনের। তাদের সাথে তাদের কিডন্যাপারের সখ্য গড়ে উঠলো ক্রমশ। উপরন্তু তারা পুলিশকে ভয় পেতে শুরু করলেন এই ভেবে যে পুলিশের উদ্ধার অভিযানই হয়তো তাদের মৃত্যুর কারণ হবে। এনমার্ক তো একেবারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফোন করে ওলসনদের সাথে চলে যাওয়ার আবদার জুড়েছিলেন!

Image Courtesy: ytimg.com

অগাস্টের ২৮ তারিখে, ছয় দিন পর এই জিম্মিদশার অবসান ঘটে দুইজনের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। এ ঘটনার কয়েকমাস পরেই জিম্মিদের এ মানসিক অবস্থাকে স্টকহোম সিনড্রোম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন মনোবিদেরা। তার মানে বুঝতেই পারছেন, অপহরণ করেছে বলে কী হয়েছে, তা-ই বলে অপহরণকারীকে ভালোবাসা যাবে না সে তো অসম্ভব নয়!

স্টকহোম সিনড্রোম হচ্ছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিস্পন্দন। জিম্মি ও জিম্মিকারীর মধ্যকার এ মানসিক সংযোগ তৈরি হতে পারে দিন, সপ্তাহ, মাস এমনকি বছরের পর বছর জিম্মিদশায় থাকার ফলে। ভয়, আতঙ্ক বা ঘৃণার পরিবর্তে জিম্মি এক্ষেত্রে তার বন্দিকারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে বন্দী, জিম্মিকারীর উদ্দেশ্যকে নিজের উদ্দেশ্য বলে ভাবতে শুরু করেন, তার কাজে সাহায্য পর্যন্ত করে থাকেন। এ সিনড্রোমের ফলে জিম্মির পুলিশ বা উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের প্রতি নেতিবাচক মনেভাব জন্মাতে শুরু করে, এমনকি উদ্ধার অভিযান ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টাও অনেকে করে থাকে।

স্টকহোম সিনড্রোম সব জিম্মির সাথে অবশ্যই ঘটে না এবং এটি ঘটার পেছনের কারণও অস্পষ্ট। তবে অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন স্টকহোম সিনড্রোম হচ্ছে জিম্মির এক প্রকার কোপিং মেকানিজম। জিম্মিকে এই ভয়ানক দশায় টিকে থাকতে সাহায্য করে এ সিনড্রোম।

Image Courtesy: wp.com

মনের কোন বিকার ঘটলে অপহরণকারীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি হতে পারে? এর একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে পরিস্থিতির কারণে আবেগের পরিবর্তন এ সিনড্রোম তৈরি করে। যখন কেউ অপহৃত হন, তখন তিনি মারাত্মক ভয় ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যান। স্বাভাবিকভাবেই এ সময় তার মনে মৃত্যুভয়ের উদ্রেক ঘটে। এমতাবস্থায় অপহরণকারী যদি জিম্মির প্রতি কোনোপ্রকার সহানুভূতিশীল বা অপ্রত্যাশিত আচরণ করে, তাহলে ওই জিম্মি তখন অপহরণকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় গলে যান। জিম্মি অপহরণকারীর প্রতি অনুকম্পা বোধ করতে শুরু করেন এবং তিনি যদি মনে করেন এ বন্দীদশা থেকে তার পক্ষে পালানো অসম্ভব, তখন অপহরণকারীই তার একমাত্র বাঁচা-মরার অবলম্বন হয়ে ওঠে। সেজন্য তিনি অপহরণকারীকে না ঘাঁটিয়ে বরং তার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে তৎপর হন।

স্টকহোম সিনড্রোম সচরাচর জিম্মিদশার সাথে সম্পর্কিত হলেও অন্যান্য পরিস্থিতিতেও দেখা দিতে পারে। দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে একজন আরেকজনের ওপর চড়াও হওয়া সত্ত্বেও অত্যাচারিত ব্যক্তি তার পীড়কের প্রতি অনেকসময় টান অনুভব করতে পারেন। সেজন্য আমরা দেখি অনেক দম্পতি একজন আরেকজনের দ্বারা অত্যাচারিত হলেও মুখ বুজে সয়ে নিয়ে সংসার করে যান বছরের পর বছর। শিশু নিপীড়নের ক্ষেত্রে নিপীড়ক শিশুকে নানাবিধ হুমকি প্রদান করে, এমনকি মৃত্যুভয়ও দেখায়। তখন শিশু তার নিপীড়ককে খুশি করার চেষ্টা হিসেবে তার বাধ্য হয়ে থাকে। কখনো যদি নিপীড়ক কোনো প্রকার করুণা প্রকাশ করে, তাহলে শিশু সেটাকে সত্যি বলে ভুল করে ক্রমশ তাদের সম্পর্কের নেতিবাচক দিকটির সাথে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, খেলার কোচিং-এও স্টকহোম সিনড্রোমের চর্চা হতে পারে। কড়া ধাঁচের কোচিং কখনো কখনো অবমাননাকর পর্যায়ে রূপ নিতে পারে। কিন্তু কোচের এই কাঠিন্যবোধকে খেলোয়াড়রা নিজেদের আখেরের মঙ্গলের জন্য ভেবে থাকলে তা চূড়ান্তভাবে এক প্রকার স্টকহোম সিনড্রোমেই পরিণত হয়।

Image Courtesy: genesisshelter.org

তবে স্টকহোম সিনড্রোম খুবই বিরল একটি মানসিক ক্রিয়া। ১৯৯৯ সালে এফবিআই-এর এক রিপোর্টের হিসেবে দেখা যায়, ৯২ শতাংশ জিম্মি কখনোই স্টকহোম সিনড্রোমের কোনো লক্ষণ দেখান না। আর মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কোনো রোগ নয়। স্রেফ মানুষের মানসিক অবস্থা বা প্রতিক্রিয়ার একটি বিশেষ রূপ মাত্র।

শেষ করবো একটি সিনেমার কথা দিয়ে। সিডনি পোলকের পরিচালনায় এবং রবার্ট রেডফোর্ড-ফেই ডুনাওয়ে জুটির অনন্য অভিনয়ে ১৯৭৫ সালের স্পাই-থ্রিলার ‘থ্রি ডেইজ অভ দ্য কন্ডর’ সিনেমাটি দেখে নিতে পারেন। এ সিনেমায় স্টকহোম সিনড্রোম-এর চমৎকার রেশ রয়েছে। এছাড়া ইন্টারনেট ঘাঁটলে এ সিনড্রোমের বিষয়ে অসংখ্য সিনেমা, বই, আর্টিকেল পেয়ে যাবেন।

Feature Image Courtesy: cognifit.com

References: