উৎপল দত্তের গ্রেফতার বরণের কাহিনী

বিভিন্ন সিনেমা, চিত্রগল্প কিংবা নাটকের জন্য কালের মহান সব সৃষ্টিমানদের যাতনা ভোগ করতে হয়েছে। কেননা শিল্পীকূল, প্রযোজক কিংবা পরিচালক কেউই সাধারণত সর্বেসর্বাদের মতের অমিলে গেলে রেহাই পান না। আমাদের উৎপল দত্তকেও কেন এরকমটি ভোগ করতে হয়েছিলো তা কি আমরা জানি?    

১৯৬৫ সালের আগস্ট মাস। কোলকাতায় মিনার্ভা থিয়েটারের সামনে নেমেছে মানুষের ঢল। চলছে উৎপল দত্তের নাটক কল্লোল-এর প্রদর্শনী। কল্লোল মানে ঢেউ। আর নাটকের কাহিনীটিও জাহাজ নিয়ে, ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহের কথা উৎপল তুলে আনেন তাঁর এই নাটকে। শুধু বিদ্রোহের কথাই নয়, তার সাথে সাথে কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের বিশ্বাসঘাতকতার কথাও তিনি তুলে আনেন এ নাটকে। সাড়া পড়ে যায় গোটা পশ্চিমবাংলা জুড়ে। প্রতিষ্ঠিত প্রায় কোন সংবাদপত্রকেই এই নাটকের বিজ্ঞাপন ছাপাতে দিতে চাচ্ছিলো না কংগ্রেস সরকার। কিন্তু লিফলেটে-লিফলেটে আর মানুষের মুখে-মুখে ছড়িয়ে যায় কল্লোলের কথা। সেই ‘৪৬ এর ফেব্রুয়ারিতে নৌ-বিদ্রোহ যেমন সাড়া ফেলে দিয়েছিল, বিদ্রোহের ঢেউ জাগিয়ে দিয়েছিল, উৎপলের কল্লোলও তেমনি জোয়ার এনে দিলো গণমানুষের মাঝে।

এরপর কী হলো তা হয়ত শিরোনাম দেখেই পাঠকবৃন্দ অনুমান করতে পেরেছেন। তবে তার আগে চলুন নৌ-বিদ্রোহ সম্পর্কে একটু জেনে আসা যাক।

১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। মুম্বাইয়ের এইচএমএসআই আকবর নামের জাহাজ থেকে শুরু নৌ-বিদ্রোহের। রেডিও অপারেটর বলাই দত্ত প্রথম শুরু করেন এ বিদ্রোহের। কর্মচারীদের মূল দাবি ছিলো অতি নিম্নমানের খাবারের পরিবর্তে ভালো মানের খাবার আর সাথে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাবৃদ্ধি। এম.এস খানকে প্রেসিডেন্ট ও মদন সিংকে জেনারেল সেক্রেটারি করে একটি কমিটিও গঠন করেন তারা। শুরু হয়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট। এ বিদ্রোহ শুধু থেমে থাকেনি মুম্বাইয়ের একটিমাত্র জাহাজে। বিদ্রোহের আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের বহু জাহাজে। শুধু তা-ই নয় করাচি, মুম্বাই, দিল্লী, আসামসহ আরো অনেক জায়গাতেই শুরু হয়ে যায় এই নৌ-বিদ্রোহ।

এইচ.এম.এস.আই আকবর জাহাজ, Image Courtesy: Wikipedia.com

গোটা ভারতজুড়ে শুরু হয় সংঘাতময় পরিস্থিতি। ইংরেজরা এই বিদ্রোহের মাধ্যমেই বুঝতে পেরে গিয়েছিল তাদের শাসন আর বেশি দিন টিকবে না। বিদ্রোহীদের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল সাধারণ অনেক মানুষও, দিল্লীর রাস্তায় জনতার সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। কমিউনিস্ট পার্টিও বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়। তবে বিদ্রোহীদের সমর্থন করেনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। কংগ্রেসের সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল ও মুসলিম লীগের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ- উভয়ই বিদ্রোহীদের অনুরোধ জানান তাদের ধর্মঘট তুলে নিতে। এম.এস খান ও মদন সিং এর সাথে সর্দার প্যাটেলের মিটিংও অনুষ্ঠিত হয়। তাঁদের দাবি মেনে নেয়া হবে ও কাউকে গ্রেফতার করা হবেনা- এমন শর্তে তারা সাময়িকভাবে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। সেটা ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬ সালের কথা।

পত্রিকায় নৌ-বিদ্রোহের খবর; Image Courtesy: indianexpress.com

কিন্তু ধুরন্ধর ইংরেজ সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। এমনিতে বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে আটজন নিহত ও তেত্রিশজন সরকারি হিসাবে আহত হন। প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা ছিলো আরো বেশি। বিদ্রোহীরা ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেবার পরপরই শুরু হয়ে যায় গণ-গ্রেফতার, ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয় অনেককে। আর এই পরিণতির দায় অনেকাংশে বর্তায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের উপর।

এই ঘটনাটি উৎপল দত্ত তুলে আনেন তার কল্লোল নাটকে। চোখে আঙুল দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন এই রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে নিজেদের স্বার্থের জন্য বিক্রি করে দেয় গণমানুষের স্বার্থ। কীভাবে ইংরেজদের ডিভাইড এণ্ড রুল নীতিকেই আরো শক্তিশালী করে তারা।

নৌ-বিদ্রোহের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য; Image Courtesy: wikiwand.com

১৯৪৭ এর দেশভাগেই অবশ্য বোঝা গিয়েছিল তাদের এই স্বার্থরক্ষার কথা। এরপর ক্রমাগত পশ্চিমবাংলায় দরিদ্রতা বাড়তে থাকে। উদ্বাস্তু সমস্যা, জিনিসপত্রের আগুন চড়া দামসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হতে থাকে পশ্চিমবাংলা। উৎপল দৃঢভাবে বিশ্বাস করতেন ক্ষমতালোভী বা সাম্রাজ্যবাদীরা কখনো গণমানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারেনা। আর তাই তিনি তাঁর নাট্যচর্চাকেই হাতিয়ার বানিয়েছিলেন এদের মুখোশ খুলে দেবার জন্যে।

১৯৬৫-৬৬ সালের দিকে এমনিতেও খাদ্য আন্দোলনে পশ্চিমবাংলা জর্জরিত ছিলো। জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছুঁয়েছে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের উঠেছে নাভিশ্বাস। সেসময়েই উৎপল নিয়ে এলেন এই নাটক। তিনি মনে করতেন ‘যে নাটকের রাজনীতি ভুল, তার সবকিছু ভুল।’ তিনি চাইতেন কংগ্রেসের এই অপশাসনের সমাপ্তি হোক, আসুক এমন সরকার যারা হবে গণমানুষের। আর তাই কংগ্রেসের গণবিরোধী অবস্থান তুলে ধরতে তিনি মিনার্ভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ করলেন কল্লোল। নাটকটি আলোচিত হয়ে ওঠে সর্বত্র, মিনার্ভা থিয়েটারে নামে জনতার ঢল। নাটকের দর্শক এত বেড়ে যায় যে, একদিনে দুটো প্রদর্শনীর জায়গায় চারটে করে প্রদর্শনী করতে হয়েছিল। মিনার্ভার আসন ভরে গিয়ে ভরে উঠেছিল মেঝে এমনকি আঙিনাও! এমন ঢল আগে কখনো দেখেনি মানুষ। আর এই উত্তুঙ্গ গণজোয়ার দেখে প্রমাদ গুনলো কংগ্রেস সরকার। নিষিদ্ধ হলো কল্লোল নাটক। ১৯৬৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিন গ্রেফতার করা হলো উৎপল দত্তকে।

উৎপল দত্ত, Image Courtesy: newsfrontliner.org

কংগ্রেস সরকার ভেবেছিল এতে করে জনতার জোয়ারকে সাময়িকভাবে স্তিমিত করে ফেলা যাবে। কিন্তু হলো এর বিপরীত। সত্যজিৎ রায়, মন্মথ বসু-দের সামনে রেখে গড়ে উঠলো আন্দোলন। শুধু ভারতেই নয়, খবরটি আলোচিত হলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও। গার্ডিয়ান, টাইমস, অবজার্ভারের মতো পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয় সংবাদটি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অনেক শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মী উৎপলের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দেন। যাঁদের মধ্যে ছিলেন সোভিয়েত কবি দালমাতোভস্কি, মার্কিন আন্ডারগ্রাউণ্ড থিয়েটারের জোসেফ সেলবি, জার্মান কবি ফনকুবা ও নাট্যকার হ্যান্স পের্টেন।

কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও উৎপলের মুক্তি মিলছিলো না। এসময় কোলকাতার বিভিন্ন শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিককর্মীরা ঠিক করলেন উৎপলের মুক্তির দাবিতে তাঁরা গণ-মিছিল বের করবেন। তখন খাদ্য আন্দোলন চরমে। রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত। এর মাঝেও মিছিলে গুলি চালানো হতে পারে বলে উপর মহল থেকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। কিন্তু এতে দমে যাননি মিছিলকারীরা। সত্যজিৎ রায় স্বয়ং মিছিলের নেতৃত্ব দেন। মিছিলটি ছিলো স্মরণকালে কোলকাতার সবচেয়ে বড় মিছিল। এর পর উৎপলের মুক্তির দাবি আরো জোরালো হয়। অবশেষে গ্রেফতারের সাতমাস পর ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ উৎপল মুক্তি পান।

সত্যজিৎ রায় ও উৎপল দত্ত; Image Courtesy: zeenews.com

উৎপল দত্তের গ্রেফতারের পর আশংকা সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর নাটকের দল বন্ধ হয়ে যাবার। কিন্তু কর্মীরা শিফট করে পাহারা দিতেন দলের কার্যালয়। নানারকম হুমকি-ধামকিতেও দমে যাননি তাঁরা, করেননি দলত্যাগ। আর তাই তাঁর নাটকের দলটিও টিকে যায় ভালোভাবেই।

উৎপল দত্তের মুক্তিলাভের পর ১৯৬৬ সালের ৭ মার্চ তাঁকে দেয়া হয় গণ-সংবর্ধনা। জাহাজের আদলে বিশাল মঞ্চ তৈরি করা হয়। পাঁচলক্ষ মানুষ এসেছিল তাঁকে বরণ করে নিতে। তাদের পক্ষ থেকে তাঁকে বিজয়মালা পরিয়ে দেন সত্যজিৎ রায়। আর কল্লোল– সেই নাটকটি অমর হয়ে রয়েছে গণমানুষের নাটক হয়ে, সাথে সাথে অমরত্ব দিয়েছে মহান নাট্যকার উৎপল দত্তকেও।

Feature Image Courtesy: kolkata24x7.com