তালা ভাঙার পালা

২০২০ এর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত যেসব বই তুমুল আলোচিত হয়েছিল তার ভেতর অন্যতম হলো নবীন লেখিকা জান্নাতুন নাঈম প্রীতির বই ‘তালা ভাঙার পালা’। এটি প্রকাশিত হয় পেপারব্যাকে, পেন্ডুলাম পাবলিশার্স থেকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রীতি বইটি উৎসর্গ করেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসকে।


বইটিতে তিনি তুলে এনেছেন সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু। মূলত আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি আমরা দেখেও দেখি না, শুনেও শুনি না, বলতে চাইলেও বলতে পারি না। অর্থাৎ, আমাদের সবখানেই উপস্থিত অদৃশ্য এক তালা। আর সেই তালা ভাঙারই সময় এসেছে এখন, যার বার্তা দিয়েছেন প্রীতি তার বইয়ের গল্পগুলোতে। ‘জীবনের গল্প মূলত শরীরের অভ্যন্তরীণ শরীরের কথা, যে শরীর ছোঁয়া যায় না কয়েকশো ধর্ষণের পরেও’- বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা এই কথাগুলো আমাদের বইয়ের গল্পগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে দেয়।

বইটিতে গল্প আছে মোট ১২ টি। প্রীতি একেকটি গল্পে তুলে এনেছেন একেকটি ইস্যু।

আমাদের সমাজে এমন অনেকসময়ই দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার নারীকে বিয়ে দেয়া হয় ধর্ষকের সাথেই! কিংবা গ্রাম্য সালিশে কয়েক হাজার টাকার মীমাংসা বা কানধরে ওঠ-বস করিয়েই দায়মুক্তি দিয়ে দেয়া হয় ধর্ষককে। এমনই একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা নিয়ে বইটির প্রথম গল্প ‘গর্ত’। লিলি নামের এক ধর্ষণের শিকার নারীর জীবনের গল্প, নির্মম ধর্ষণের ফলে আলাদা হয়ে গিয়েছিল যার ইউটেরাস। আর ধর্ষকের পিঠ খাবলে সেখানে সে করে দিয়েছিল আরেকটি গর্ত। তাদের বিয়ে দিয়ে দেয় এই সমাজ! ধর্ষকের সাথে ধর্ষণের শিকার নারীকে বেঁধে দেয়া হয় সারাজীবনের জন্য!

লেখক জান্নাতুন নাঈম প্রীতি, Image Courtesy: priyo.com

বইয়ের দ্বিতীয় গল্প ‘বিক্রিত ও বিকৃত’চমকপ্রদ নামের গল্পের কাহিনিটিও বেশ চমকপ্রদ। উত্তমপুরুষে লেখা গল্পটির কাহিনি শুরু হয় মাদকবিরোধী অভিযানে মারা যাওয়া একটি লাশ উদ্ধার থেকে। দেখা যায়, মৃত লোকটির সাথে দ্বন্দ্ব ছিলো ডন ইয়াবা মতি-র। আবার, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গণরুম, গেস্টরুম, রাজনৈতিক প্রোগ্রামসহ অনেককিছুই উঠে এসেছে লেখাটিতে। তবে বিশাল ক্যানভাসের গল্প হিসেবে এখানে আরো ডিটেইল আনতে পারতেন লেখক। প্লট অসাধারণ হলেও লেখাটাকে ঠিক গোছানো মনে হয় না।                                                                                                           


বইয়ের তৃতীয় গল্প ‘সীমান্ত’-র কাহিনীসীমান্তহত্যা নিয়ে। কুড়ানি নামে একটি নিরীহ মেয়ে প্রতিবেশি দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে হত্যার শিকার হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত এর বিচার কী হলো?

সীমান্তহত্যা আমাদের কাছে খুব পরিচিত একটি বিষয়। আর সেই বিষয়টিকে উপজীব্য করেই অত্যন্ত মর্মস্পর্শী হাতে প্রীতি তুলে এনেছেন এক হতভাগ্য কিশোরীর জীবনের কথা।

চতুর্থ গল্প ‘একটি ইন্টেলেকচুয়াল ডিবেট’গল্পটি বিদ্রুপাত্মক। শহরে জমায়েত হয়েছেন নানা দল-মতপন্থী বুদ্ধিজীবীরা। তারা বুদ্ধিজীবী, তবে তাদের বুদ্ধি নিজেদের দল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। রাজ্যের উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা নিতে থাকেন তারা। এই রাজ্যের মানুষেরা সবসময়ই ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায় তাদের। বুদ্ধিজীবীদের মনের সুখ মিটিয়ে মেরে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ে!

পরের গল্পটি ‘কসাই’। গল্পটিতে দুটো ভিন্ন সময়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একটি মুক্তিযুদ্ধ, আরেকটি মত প্রকাশের দায়ে হত্যাকাণ্ড। মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা নিজের জীবনের বিনিময়েও গোপন তথ্য ফাঁস করেননি হানাদারদের কাছে, আশা করেছিলেন স্বাধীন দেশে মানুষ বাঁচবে স্বাধীনভাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন কি পূরণ হলো– এ নিয়েই গড়ে উঠেছে গল্পটির কাহিনী।

বইটি প্রকাশিত হয় পেন্ডুলাম পাবলিশার্স থেকে; Image Courtesy: পেন্ডুলাম – Pendulum

বইয়ের ষষ্ঠ গল্পটি একটু অতিপ্রাকৃত ধাঁচের। একটি আংটির সূত্র ধরে এক তরুণ জানতে পারে তার গতজন্মের অসম্পূর্ণ ভালোবাসার কথা। কী করে রাজতন্ত্র আর পৌরহিত্যের বলি হয়েছিল তাদের ভালোবাসা- এ নিয়েই গল্প- ‘আংটি’

বইয়ের সপ্তম গল্পটির নাম ‘তালা ভাঙার পালা’বইয়ের শিরোনাম গল্প এটি। ভিন্ন ভিন্ন চার ধরণের পরিবেশে বেড়ে ওঠা চারজন আলাদা-আলাদা মানুষের লড়াইয়ের গল্প। এই মানুষগুলো লড়েছিলেন তাঁদের চারপাশের নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে। কিন্তু শেষপর্যন্ত প্রায় সবারই হয়েছে করুণ পরিণতি। চারটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে প্রীতি লিখেছেন গল্পটি। তবে গল্পটিতে ঘটনাগুলো এসেছে আলাদাভাবে এবং পড়তে গিয়ে এটিকে ঠিক ছোটগল্প মনে হয় না, মনে হয় আখ্যান।

আট নম্বর গল্পটা প্রেমে ভাঙন ও এ সংক্রান্ত বেদনা নিয়ে। নাম ‘আন্তর্জাতিক মানের দুঃখ-কষ্ট’বেকারত্বের অভিশাপে আমাদের অনেকেরই প্রেম বা এরকম সম্পর্ক ভেঙে যায়। একসময় হয়ত আর্থিক অভাব ঘোঁচে, কিন্তু  ভাঙনের এই বেদনা রয়ে যায়।

নবম গল্পটা একজন সিনেমার নায়িকার গল্প। তার দুঃখগ্রস্থ শৈশব, বাবা-মার বিচ্ছেদ, সম্পর্কে প্রতারিত হওয়া কিংবা ব্যক্তিজীবনে নিঃসঙ্গতার গল্প। পাবলিক ফিগারদের নিয়ে অনেক আগ্রহ থাকে আমাদের। পর্দায় তাদের দেখে আমরা তাদের বিচার করে ফেলি আমাদের চোখে। কিন্তু তাদেরও আছে ব্যক্তিপর্যায়ে আর দশজন মানুষের মত একটা জীবন। তাদেরও দুঃখ-বোধ হয়, প্রেম তাদেরও জীবনে আসে, প্রতারণা বা বিচ্ছেদও থাকে তাদের জীবনে। আর এসবকিছু নিয়েই গল্প ‘সিনেমা প্রিমিয়ার’

দশম গল্প ‘উপদেশের উপকথা’;মূলত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের গল্প। হ্যাঁ, পাঠক, ঠিকই পড়েছেন- তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সত্যিই হয়ে থাকে- তবে তার পরবর্তী পৃথিবী কেমন হবে এ নিয়েই গল্প। তবে গল্পটিতে ডিটেইলের অভাব ছিলো বেশ। প্লট ভালো হলেও কাহিনীর গভীরে খুব একটা পৌঁছানো গেছে বলে মনে হয় না।

বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌসকে; Image Courtesy: haorbarta24.com

বইয়ের এগারো নম্বর গল্পটি যৌনতা-সম্বন্ধীয়। নাম ‘আদর্শ ভাতের হোটেল’বান্ধবী সুনন্দার বাড়িতে প্রায়ই প্রেমিক রোহিতকে নিয়ে সময় কাটাতে আসে সুনয়না। এই বাড়িটিকে তার কাছে আবাসিক হোটেল বা অন্য কোন ফ্ল্যাটের চেয়ে বেশ নিরাপদ মনে হয়। ভাত যেমন তার বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য রোহিতও,  অপরিহার্য সঙ্গম। কিন্তু একদিন হঠাৎ বান্ধবী সুনন্দার অভিনব এক প্রতারণা চোখে পড়ে তার। তারপর কী করলো সে, কী করে সামলালো সবকিছু- এ নিয়েই গল্প।

বইয়ের সর্বশেষ গল্পটি আয়তনে ছোট, কিন্তু এর ভাব অত্যন্ত গভীর। ‘একটি ময়নাতদন্তের সুরতহাল’ নামের গল্পটিতে তিনি সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে এনেছেন কৌশলে। চাপাতির কোপে ক্ষত-বিক্ষত দর্জি, ক্যান্টনমেন্টে ধর্ষণের শিকার নারী কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলে নিহত যুবক- সবাইকে দারুণভাবে তুলে এনেছেন একটি ময়নাতদন্তের টেবিলে। গল্পের শেষটাও বেশ চমকপ্রদ।

প্রীতির লেখা সাবলীল। পাঠক বইটি একটানে পড়ে ফেলতে পারবেন। কিছু কিছু গল্পে তিনি আরো ডিটেইল বা গভীরতা আনতে পারতেন। কাহিনিবিন্যাস কিছুক্ষেত্রে আরেকটু গোছানো হতে পারত। তবে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়কে প্রীতি যেভাবে প্রতীকী করে তুলে ধরেছেন তা তাঁর সৎসাহসের পরিচায়ক। বইটি চলমান সময়ের একটি দলিল হয়ে থাকতে সক্ষম। আর এখানেই ‘তালা ভাঙার পালা’-র সার্থকতা। 

Feature Image Courtesy: chintasutra.com