গোলাপি বলে টেস্ট: ক্রিকেটের এক অভিনব সংযোজন

২০০০ সালের প্রথম দিকে জন্ম নেয় ক্রিকেটের এক নতুন ফরম্যাট টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট। ধীরে ধীরে অন্য সব ফরম্যাটকে ছাপিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে যায় এই ফরম্যাট। ওয়ানডে ফরম্যাট তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখলেও টেস্ট ক্রিকেট হারাতে থাকে তার জৌলুস। কেনই বা হারাবে না যেখানে তিন ঘণ্টার টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দর্শকদের পাঁচ দিনের এই কুলীন ফরম্যাটের চেয়ে বেশি বিনোদন দেয়। যখন ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী ফরম্যাট হুমকির মুখে তখনই উদয় হয় দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচের পরিকল্পনা। একে একে করে এগিয়ে আসতে থাকে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো। শুরু হয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ। অনেক পরিকল্পনা এবং গবেষণার পর ২০১৫ সালে মাঠে গড়ায় ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ।

কেন দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ?

টেস্ট ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খেলা গড়ানোর সময়। যেহেতু একটি টেস্ট ম্যাচ খেলা হয় পাঁচ দিন ধরে তাই খেলার বেশিরভাগ দিনগুলো সপ্তাহের কাজের দিনগুলোতে পড়ে। এছাড়াও ম্যাচ শুরু হয় সকাল ন’টায় তখন বাচ্চারা স্কুলে এবং বেশিরভাগ মানুষ কাজে ব্যস্ত থাকে ফলে তাদের আর কাজ থেকে ফিরে খেলা দেখা হয়ে উঠে না। এ বিষয়ে ২০০৯ সালে তৎকালীন ইসিবি চেয়ারম্যান জাইলস ক্লার্ক বলেন, “দর্শকরা সন্ধায় ক্রিকেট খেলা দেখতে পছন্দ করেন এবং টি-টোয়েন্টি এটা প্রমাণ করেছে।”

দিনের বেলায় টেস্ট ম্যাচে দর্শকশুন্য গ্যালারি; Image Courtesy: dnaindia.com

দিবা-রাত্রির টেস্ট আয়োজন করা হলে ম্যাচ কিছুটা দেরিতে শুরু হবে এবং বাচ্চা এবং বড়রা স্কুল ও কাজ থেকে ফিরে কয়েক ঘণ্টার জন্য মাঠে এসে খেলা দেখতে পারবে। এছাড়াও টিভিতে খেলা দেখা দর্শকদের সংখ্যাও বাড়বে বলে আশা করেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

দিবা-রাত্রির ম্যাচে কিছু নিয়ম পরিবর্তন করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো খেলার সময়ে। সাধারণত টেস্ট ম্যাচ শুরু হয় সকাল ৯ টার দিকে, ত্রিশ ওভার পরে ৪০ মিনিটের মধ্যাহ্নভোজের বিরতি। এরপর ত্রিশ ওভার শেষে ২০ মিনিটের চা বিরতি। এভাবে তিনটি সেশনে ত্রিশ ওভার করে মোট নব্বই ওভারের খেলা গড়ায় একদিনে।

কিন্তু দিবা-রাত্রির টেস্টে সময় এবং বিরতির ধরন কিছুটা ভিন্ন। খেলা শুরু হয় ২ টার দিকে। প্রথম বিরতি হলো চা বিরতি যা দেওয়া হয় ৪ টার সময় ২০ মিনিটের জন্য। দ্বিতীয় বিরতি হলো নৈশভোজের জন্য যা দেওয়া হয় ৪০ মিনিটের জন্য।

দিবা-রাত্রির টেস্টের আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো এই ম্যাচ লাল বলের পরিবর্তে গোলাপি বল দিয়ে খেলা হয়।

ফ্লাডলাইটের নিচে টেস্ট ম্যাচের দৃশ্য; Image Courtesy: bdcrictime.come

শুরুটা হলো যেভাবে

জেনে অবাক হবেন হয়তো যে গোলাপি বলের প্রথম খেলা হয়েছিল নারীদের ক্রিকেটে তবে সেটা টেস্ট ম্যাচ নয় বরং ওয়ানডে ম্যাচ। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ড ওয়ানডে ম্যাচে প্রথম গোলাপি বল দিয়ে খেলা হয়।

এর কিছুদিন পর, ২০১০ এর জানুয়ারিতে প্রথম গোলাপি বলে টেস্ট ক্রিকেটের আয়োজন করা হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজে। খেলাটি ছিল প্রথম শ্রেণির একটি টেস্ট ম্যাচ। সেই ম্যাচে অংশগ্রহণ করেছিল গায়ানা এবং ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো। খেলাটি শুরু হয়েছিল দুপুরে। এক এক করে অন্যান্য দেশগুলো তাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে গোলাপি বলের টেস্টের পরীক্ষা শুরু করতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে ইসিবি ২০১০ সালে আবু ধাবিতে আগের কাউন্টি মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন ডারহাম এবং এমসিসির ম্যাচ দিয়ে আয়োজন করে চ্যাম্পিয়ন কাউন্টি ম্যাচ যা হয়েছিল কৃত্রিম আলোর নিচে এবং গোলাপি বলে।

তিন রঙের ক্রিকেট বল; Image Courtesy: sportskeeda.com

পাকিস্তান তাদের প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্ট কয়েদ-এ-আজম ট্রফির ২০১০-১১ মৌসুমের ফাইনাল ম্যাচ ফ্লাডলাইটের নিচে আয়োজন করেছিল কিন্তু ম্যাচে গোলাপি বলের পরিবর্তে কমলা বল ব্যবহার করা হয়। তবে পরের মৌসুমে গোলাপি বলে খেলা হয়।

বাংলাদেশেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দিবা-রাত্রির টেস্টের পরীক্ষা চালানো হয়। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয় সেন্ট্রাল জোন ও নর্থ জোন। ম্যাচটি গোলাপি বলে মাঠে গড়ায় এবং দিবা-রাত্রির খেলা হয়। গোলাপি বলে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে এই ম্যাচে শতক হাঁকান রাকিবুল হাসান। গোলাপি বলে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচ উইকেট পান নর্থ জোনের সানজামুল ইসলাম। ৭৩ রানে ৮ উইকেট নেন তিনি। সেন্ট্রাল জোন ৩১ রানে ম্যাচটি জিতে নেয়।

গোলাপি বলে বিসিএল ফাইনাল; Image Courtesy: Roar Bangla

২০১৪ সালের অস্ট্রেলিয়ার শেফিল্ড শিল্ড টুর্নামেন্টের সকল ম্যাচ গোলাপি কুকাবুরা বলে হয়। শেফিল্ড শিল্ড টুর্নামেন্টের সফলতার উপর ভিত্তি করে অস্ট্রেলিয়া ২০১৫ সালের নভেম্বরে অ্যাাডিলেইডে আয়োজন করে প্রথম আন্তর্জাতিক দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ। প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড। ম্যাচের তৃতীয় দিনেই নিউজিল্যান্ডকে তিন উইকেটে হারায় অজিরা। এই দিবা রাত্রির টেস্টে দর্শকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ড তাদের ক্যালেন্ডারে আরো দিবা রাত্রির টেস্ট সংযোজন করে।

প্রথম আন্তর্জাতিক দিবা-রাত্রি টেস্ট ম্যাচ অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ড; Image Courtesy: এবিসি

কেন গোলাপি বল?

দিবা-রাত্রির টেস্ট আয়োজনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলের রঙ। কারণ টেস্ট ম্যাচে লাল রঙের বল দিয়ে খেলা হতো কিন্তু দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচে তা সম্ভব না। লাল বল রাতে দেখতে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই লাল বল দিয়ে কৃত্রিম আলোতে খেলা সম্ভব না।

অনেকে পরামর্শ দেন যে রঙিন পোশাক পরে সাদা বলে ম্যাচ খেলার জন্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন রঙিন পোশাক পরে টেস্ট খেললে টেস্ট ম্যাচ তার স্বকীয়তা হারাবে। এছাড়াও টেস্টে সাদা পোশাক পরে খেলার প্রধান কারণ হলো সাদা পোশাক অন্যান্য রঙের পোশাকের তুলনায় কম উষ্ণতা শোষণ করে। আরেকটি কারণ হলো সাদা বল খুব তাড়াতাড়ি ময়লা হয় তাই সাদা বল দিয়ে ৮০ ওভার খেলা সম্ভব না।

কুকাবুরা কোম্পানি প্রথমে কমলা এবং হলুদ বল দিয়ে পরীক্ষা চালায় কিন্তু কমলা ও হলুদ বল মাঠে ক্যামেরাম্যানের দেখতে সমস্যা হচ্ছিলো তাই সর্বশেষ গোলাপি বল দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং তা সফল হয়। প্রধানত তিনটি কোম্পানি গোলাপি বল তৈরি করে। এগুলো হলো: কুকাবুরা, এসজি এবং ডিউক। উপমহাদেশের প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট যা হয়েছিল ভারত বনাম বাংলাদেশের মধ্যে সেই ম্যাচে এসজি গোলাপি বল দিয়ে খেলা হয়।   

ভারত বনাম বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচে ব্যবহৃত হয় এসজি বল; Image Courtesy: tbs.net

গোলাপি বলের বিশেষত্ব

রঙ ছাড়াও লাল বল এবং গোলাপি বলের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যগুলো এমনকি অনেক সময় খেলাকেও নিয়ন্ত্রণ করে।

  • লাল বল তৈরি করা হয় ‘র’ লেদার দিয়ে। লাল বলে আলাদা করে করে রঙ করার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু গোলাপি রঙের চামড়া পাওয়া যায় না বলে গোলাপি বলের উপর আলাদাভাবে রঙ করা হয়।
  • গোলাপি বলে আলাদাভাবে রঙ করা হয় তাই এই বল তৈরি করতে লাল বলের তুলনায় সময় বেশি লাগে। একটি গোলাপি বল তৈরি করতে সাধারণত সাত থেকে আট দিন সময় লাগে।
গোলাপি বল তৈরির প্রক্রিয়া; Image Courtesy: JagranJosh
  • গোলাপি বলে মোট দুইবার রঙ করা হয়। চূড়ান্ত সেলাইয়ের আগে একবার এবং পরে আবার রঙ করা হয়। অতিরিক্ত রঙ থাকায় এটি কারো কাছে কমলাও দেখায়।
  • লাল বলের তুলনায় গোলাপি বলে শাইন বেশি সময় থাকে। এর কারণ হলো বলকে ঝকঝকে করার জন্য এতে বিশেষ ধাতুর স্তর বা ল্যাকার দেওয়া হয়। এই শাইন সুইংয়ে সাহায্য করে। তাই গোলাপি বলে স্পিনারদের তুলনায় পেসাররা বেশি সুবিধা পায়।
  • গোলাপি বলে লাল বলের তুলনায় শাইন বেশি থাকে তাই এই বল দিয়ে রিভার্স সুইং করানো বেশ কঠিন।
  • গোলাপি বলের সেলাই অনেক মোটা, এটি সম্পূর্ণ হাতে সেলাই করাই হয়। তাই সিমে ফেলে বাড়তি বাউন্স আদায় করে নিতে পারেন পেসাররা।
  • গোলাপি বলের সিমে কালো সুতা ব্যবহার করা হয় অন্যদিকে লাল বলে সাদা সুতা ব্যবহার করা হয়।
গোলাপি ও লাল বলের সিমের পার্থক্য; Image Courtesy: 99sportz

গোলাপি বলে পরিসংখ্যান

যদিও দিবা-রাত্রির টেস্টের পরিসংখ্যান আলাদা করে দেখার কিছু নাই তবুও এমন কিছু রেকর্ড আছে যা অগ্রাহ্য করা যায় না।

গোলাপি বলে প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ হয় অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ড এর মধ্যে এবং ম্যাচটি খেলা হয়েছিল অ্যাডিলেড ওভালে।

২০১৫ এর নভেম্বর থেকে এই পর্যন্ত মোট ১৪ টি দিবা-রাত্রির ম্যাচ হয়েছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সবচেয়ে বেশি সাতটি ম্যাচ খেলেছে। পাকিস্তান ও শ্রীলংকা ৪ টি ম্যাচ, ইংল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ড ৩ টি ম্যাচ, দক্ষিণ আফ্রিকা ২ টি ম্যাচ এবং ভারত, বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে ১ টি করে ম্যাচ খেলেছে। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে শুধু আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড এখন পর্যন্ত ফ্লাডলাইটের নিচে ম্যাচ খেলেনি।

গোলাপি বল; Image Courtesy: sportzwiki.com

গোলাপি বলের টেস্টেও পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার দাপট লক্ষ্য করার মতো। জয়ের হার, ব্যাটিং এ সর্বোচ্চ রান এবং সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব তাদের দখলে।

অজিরা মোট ৭ টি ম্যাচ খেলেছে এবং ৭ টি তেই জয় লাভ করেছে, জয়ের হার শতভাগ। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তিনটি ম্যাচ খেলেছে, সবগুলোতেই হারের মুখ দেখতে হয়েছে তাদের।

গোলাপি বলে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটি ডেভিড ওয়ার্নারের। ছয় ম্যাচে মোট ৫৯৬ রান করেছেন তিনি। এক ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটিও তার দখলে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ৩৩৫ রান করে এই অনন্য রেকর্ড করেন তিনি।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ট্রিপল সেঞ্চুরির পর ডেভিড ওয়ার্নার; Image Courtesy: BBC.com

দিবা-রাত্রির টেস্টে একবার হলেও শতরান পার করেছেন এমন ব্যাটসম্যান হলেন: হেনরি নিকলস, উসমান খ্বাজা, আসাদ শফিক, জো রুট, ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভ স্মিথ, শন মার্শ, এইডেন মারক্রাম, ফাফ ডু প্লেসিস, ড্যারেন ব্রাভো, পিটার হ্যান্ডসকম্ব, ভিরাট কোহলি, মার্নাস লাবুশানে, অ্যাালিস্টার কুক, ইয়াসির শাহ এবং কেন উইলিয়ামসন।

দিবা-রাত্রির টেস্টে দুইবার সেঞ্চুরি হাঁকানো একমাত্র ব্যাটসম্যান পাকিস্তানের আসাদ শফিক।

গোলাপি বল দিয়ে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকার করেছেন অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক। সাত ম্যাচে তিনি মোট ৪২ টি উইকেট আছে তার ঝুলিতে।

গোলাপি বলে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি মিচেল স্টার্ক; Image Courtesy: Cricket Australia

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেবেন্দ্র বিশুর পাকিস্তানের বিপক্ষে দুবাইয়ে ৪৯ রানের বিনিময়ে ৮ উইকেট হলো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো একক বোলিং নিদর্শন।

দিবা-রাত্রি টেস্টের সুবিধা এবং অসুবিধা

দিবা-রাত্রির টেস্ট আয়োজন করার প্রধান লক্ষ্য ছিল মাঠে দর্শকদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা এবং তা যথাযথভাবেই সফল হয়েছে। গত দশ বছরে টেস্ট ম্যাচে দর্শকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এর কারণ হলো খেলার সময় বেশিরভাগ মানুষ অফিসে এবং স্কুলে থাকেন ফলে তাদের পক্ষে খেলা দেখা সম্ভব হয় না। তাই দিবা রাত্রির টেস্ট আয়োজন করলে দর্শকরা কাজ শেষে কয়েক ঘণ্টা মাঠে এসে খেলা দেখতে পারবেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের ৮১ শতাংশ মানুষ চায় অস্ট্রেলিয়ার সব টেস্ট ম্যাচ দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ হোক। এর থেকে বোঝা যায় মানুষের দিবা রাত্রির টেস্টের প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে যা টেস্টের ভবিষ্যতের জন্য একটি সুবাতাস।

মাইকেল স্মোলেন্সকির এক গবেষণা অনুসারে, অ্যাথলিটদের শারীরিক কার্যক্ষমতা বিকাল ৩ টা থেকে ৬ টার মধ্যে বেশি থাকে। ট্র্যাক এবং সাইক্লিং ইভেন্টগুলির প্রায় সব রেকর্ড সন্ধায় ভাঙা এটি একটির বড় কারণ।

এর কারণ হলো দিনের ওই নির্দিষ্ট সময়ে খেলোয়াড়দের শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকে যা একধরনের প্রাকৃতিক ওয়ারম-আপ হিসেবে কাজ করে। তাই দেখা যায় সন্ধার পর যেসব খেলা হয় সেই খেলায় খেলোয়াড়রা অন্যান্য সময়ের তুলনায় ভালো খেলেন।

দিবা-রাত্রি টেস্টে দর্শকের সংখ্যা বেশি থাকে; Image Courtesy: espncdn.com

গোলাপি বলে পেসাররা অনেক সুইং এবং বাউন্স পেলেও স্পিনারদের ক্ষেত্রে তেমনটি হয় না। তাই এটি এশিয়ান দলগুলোর জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাড়াতে পারে। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মতো দেশ যারা স্পিনারদের উপর নির্ভরশীল তাদের জন্য এক বড় সমস্যা হলো গোলাপি বলের বাইরের স্তর এবং তার সাথে পিচের ঘাস একধরনের প্লেয়িং কন্ডিশন যা শুধু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে দেখা যায়। ফলে এশিয়ান দলগুলোর জন্য পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। এর কারণেই হয়তো এশিয়ান দলগুলোর দিবা-রাত্রির টেস্টের প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক কম।

দিবা-রাত্রির টেস্ট মাঠে দর্শকদের আনতে সক্ষম হলেও টেস্ট ক্রিকেটের আসল ঐতিহ্যকে কখনো প্রতিনিধিত্ব করে না। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন দিবা রাত্রির টেস্ট সাফল্য লাভ করলেও নিয়মিত দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলা উচিত হবে না এর ফলে টেস্ট ক্রিকেট তার স্বকীয়তা হারাবে। এই বিষয়ে ভারতের অধিনায়ক ভিরাট কোহলি বলেন,

“গোলাপি বলের টেস্ট তার জায়গায় ঠিক আছে কিন্তু এটি নিয়মিত খেলা উচিত না। আমার মতে, এটি যেন টেস্ট খেলার একমাত্র উপায় না হয়। কারণ তারপরে আপনি সকাল বেলা টেস্টের প্রথম সেশনের সেই স্নায়ুচাপ অনুভব করার অভিজ্ঞতা পাবেন না।”

গোলাপি বলে ভিরাট কোহলি; Image Courtesy: indiatimes.in

গোলাপি বলের ভবিষ্যৎ

এই পর্যন্ত গোলাপি বলে টেস্ট সফল, এর প্রমাণ হলো অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার দিবা-রাত্রির ম্যাচগুলোতে অন্যান্য ম্যাচের তুলনায় বেশি দর্শক সমাগম হয় এবং তাদের প্রচার স্বত্ব বেড়েছে।

দিবা-রাত্রি প্রত্যেক টেস্ট ম্যাচের ফলাফল এসেছে। তবুও এখনো অনেক দেশ এই টেস্ট ম্যাচ নিয়ে সন্দিহান। বেশিরভাগ দলগুলো গোলাপি বলের আচরণ নিয়ে বেশ বিভ্রান্ত। তবে ফরম্যাটটি নতুন হওয়ার জন্য অনেক দলের মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো উন্নতির মাধ্যমে দিবা-রাত্রির টেস্টকে ক্রিকেটের এক নতুন রুপ হিসেবে পরিচয় করানো যেতে পারে।

Feature Image Courtesy: Dhaka Tribune