পৃথিবীর আকার নিয়ে যত জল্পনা কল্পনা:

যদি পৃথিবী সমতল হয় তবে আমাদের পক্ষে সেই স্থানে যাওয়া সম্ভব যেখানে আকাশের সাথে পৃথিবী মিলিত হয়েছে। পূর্বদিকের সেই স্থানে যাওয়া সম্ভব যেখান থেকে সূর্য উদিত হয়। আমরা সূর্যকে সেখান থেকেও স্পর্শও করতে পারব (যদি না সূর্যের উত্তাপ আমাদের কে ধ্বংস করে দেয়)।

পৃথিবীর আকার নিয়ে যত জল্পনা কল্পনা: পৃথিবী কি সমতল? (প্রথম পর্ব) পড়তে এখানে ক্লিক করুন


যদি আমরা পৃথিবীর যথেষ্ট পশ্চিমে ভ্রমণ করতে পারি তবে আমরা সূর্য যেখান থেকে অস্ত যায় সেখানেও পৌঁছাতে পারব।

প্রাচীন কালের কিছু মানুষ ভাবত যে আমরা আসলেও সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হওয়ার সাথে পৌঁছাতে পারব! তাদের এই চিন্তা ভাবনার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের আঁকা বিভিন্ন ছবির মধ্যে। তারা এমন ছবি এঁকেছেন যেখানে সূর্য পূর্বদিকে উদিত হচ্ছে এবং একজন মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করছে! সে চাইলে আকাশে নিজের মাথা ঠেকাতে পারে এবং আকাশের আবর্তনের পদ্ধতি উপলব্ধি করতে পারে।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকেরা এই ব্যাপারগুলি বিশ্বাস করতেন না। যা হোক; মানুষ যতই পূর্বে বাঁ পশ্চিমে ভ্রমণ করুক না কেন তাদের পক্ষে সূর্যোদয় বাঁ সূর্যাস্তের সাথে পৌঁছানো সম্ভব না। তারা যত দূরেই ভ্রমণ করুক না কেন তারা কখনো সূর্য, চাঁদ কিংবা তারাদের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে না। সম্ভবত কখনোই আকাশ পৃথিবীর সাথে মিলিত হয় না। আমাদের চোখ যখন দিগন্তের দিকে তাকায় তখন তারা আমাদের বোকা বানায়।

Medieval universe; Image Courtesy: How did we find out about the earth is round? Issac Assimove

সম্ভবত পৃথিবী অনেক লম্বা একটি সমতল ভূমি তবে এটি এতটাও লম্বা নয় যে আকাশের পরিমণ্ডলের সমান হবে।

যদি এইরকম হতো তবু সূর্য, চাঁদ ও তারারা পৃথিবীর সীমা থেকে অনেক দূরে থাকবে। পৃথিবীর কোনও মানুষ কখনো তাদের স্পর্শ করতে বাঁ কাছাকাছি যেতে পারবে না!

কারণ সম্ভবত সমতল পৃথিবীর মাঝখানে স্থলভূমি এবং স্থলভূমির চারপাশে পানি দ্বারা বেষ্টিত। অর্থাৎ পানি দ্বারা আমাদের স্থলভূমি বেষ্টিত। এ কারণেই আমরা যখন স্থলভূমির শেষ প্রান্তে ভ্রমণ করব তখন শুধু সমুদ্র দেখতে পাব। যার ফলে আমরা সমুদ্র পার করে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারব না। সমুদ্র সমতল পৃথিবীর স্থলভূমিকে ঘিরে রেখেছে। প্রাচীন কালে মানুষ তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে ভ্রমণ করত না। সম্ভবত এ কারণেই তারা কখনও পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারে নি।


কিন্তু
ক্ষেত্রে সমুদ্রের পানি কেন পৃথিবীর বাইরে ছিটকে পড়ে না?

সম্ভবত পৃথিবীর শেষ প্রান্তে প্রাচীর তৈরি করা আছে যাতে পানি বাইরে যেতে না পারে। সম্ভবত পৃথিবীর আকার সমতল না বরং অগভীর অর্ধ গোলকের মত আকারের!


এক্ষেত্রে
পুরো পৃথিবী নিচের দিকে পড়তে থাকে না কেন?

পৃথিবী সমতল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অনেক কঠিন ছিল। যদিও আকাশের বিশাল পরিমণ্ডল এর কথা বলা হয়েছিল। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সমস্যাকেও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। তবু পৃথিবী যে সমতল তা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।

যদি পৃথিবীর আকার সমতল না হয় তবে এর আকার কেমন হবে?

মনে করি আমরা আকাশের দিকে আবার লক্ষ্য করলাম। আকাশের যতো উজ্জ্বল বস্তু আছে তাদের বেশিরভাগ হচ্ছে নক্ষত্র বাঁ তারা! নক্ষত্রগুলো ছিল শুধু আলোক বিন্দু! প্রাচীন দার্শনিকগণ নক্ষত্রের ব্যাপারে কিছুই বলতে পারেন নি।

The Earth as a shallow bowl; Image Courtesy: How did we find out about the earth is round? Issac Assimove

আকাশের দুটি বস্তু তাদের থেকে আলাদা ছিল। তারা হলো চাঁদ ও সূর্য।

সূর্য হলো সম্পূর্ণ আলোর একটি বৃত্ত। কিন্তু চাঁদ এমন ছিল না। কখনও এটি আলোর সম্পূর্ণ বৃত্ত, আবার কখনও অর্ধবৃত্ত। আবার কখনও অর্ধবৃত্ত ও বৃত্তের মাঝামাঝি কোনও আকৃতি। আবার কখনও চিকন বক্ররেখা যাকে ‘Crescent’ বলে।

গ্রিকরা চাঁদকে রাতের পর রাত পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা লক্ষ্য করেন চাঁদের অবস্থানের পরিবর্তন হয় সূর্যের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। তারা আরও লক্ষ্য করেন যে অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে চাঁদের আকারেরও পরিবর্তন হয়। যখন সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীর পরস্পর বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন চাঁদ পূর্ণ বৃত্তের আকার ধারণ করে।

যখন চাঁদ ও সূর্য একই পাশে অবস্থান করত তখন তারা চাঁদকে একেবারেই দেখতে পেত না। চাঁদের অপর পাশে সূর্য থাকাকালীন চাঁদের আলো দেখা যেত না। চাঁদের আকৃতির অংশটুকুন কালো দেখা যেত।

প্রাচীন দার্শনিকগণ এটি দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে সূর্যের নিজস্ব আলো থাকলেও চাঁদের নিজের কোনও আলোর উৎস নাই। চাঁদ আলোকিত হয় সূর্যের আলোর প্রতিফলনের দ্বারা। চাঁদের উজ্জ্বলতার কারণ হলো ‘প্রতিফলিত আলোক রশ্মি’।

প্রাচীন গ্রীকরা জ্যামিতি নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। তারা মূলত বিভিন্ন বস্তুর আকৃতি নিয়ে পড়াশুনা করতেন। তারা চাঁদের বিভিন্ন উজ্জ্বল অংশের আকৃতি নিয়ে কাজ করতেন। তারা এই অংশগুলিকে অর্ধচন্দ্র, এক চতুরংশ ও আরও বিভিন্ন আকৃতিকে বিভক্ত করেছিলেন। চাঁদ ছিল একটি গোলাকার বল বাঁ গোলক।

তবে সূর্যের আকৃতি কেমন হবে?

সূর্য চাঁদের উজ্জ্বলতার কারণ। যখন চাঁদ ও সূর্য পরস্পর বিপরীতে অবস্থান করে অথবা একই পাশে অবস্থান করে অথবা তাদের মাঝামাঝি কোনও অবস্থানে অবস্থান করে তখন চাঁদের আলোকিত অংশটুকু আসলে হয় চাঁদের যে অংশটুকু সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে সেইটুকু। এর মানে হলো সূর্যের আকৃতি একমাত্র গোলক হতে পারে।

Moon Phase Chart; Image Courtesy: wishingmoon.com

এইসব মাথায় রেখে এনাক্সিম্যান্ডার দেখেছিলেন যে আকাশে তিনটি বস্তু আছে আদের আকার একই; চাঁদ, সূর্য ও আকাশ নিজের। এই তিনটিই গোলক আকারের।

এর মানে কি এই দাড়ায় যে পৃথিবীর আকৃতিও গোলক? এর মানে কি এই যে পৃথিবীর আকার সমতলের পরিবর্তে গোল?

এটি প্রয়োজনীয় না অবশ্য। সম্ভবত আকাশ ও পৃথিবীর জন্য সূত্রগুলি আলাদা। এর কারণ হলো আকাশে কিছু বস্তু অবস্থান করে। আকাশ গোল তার মানে এই না যে পৃথিবীকেও গোল হতে হবে।

সূর্য প্রচণ্ড উত্তপ্ত কিন্তু পৃথিবী না। আবার চাঁদ নিজের অবস্থানের ক্রমাগত পরিবর্তন করে কিন্তু পৃথিবীকে দেখে মনে হয় না সে তার অবস্থানের পরিবর্তন করছে। আকাশের প্রচুর নক্ষত্র আছে কিন্তু পৃথিবীর নক্ষত্র নেই।

The Changing position of the stars; Image Courtesy: How did we find out about the earth is round? Issac Assimove

এ কারণেই পৃথিবীর আকৃতির কথা চিন্তা করার সময় শুধু পৃথিবীকে নিয়েই চিন্তা করা হত। অন্য কোনও বস্তুর আকারের সাথে তুলনা করে পৃথিবীর আকার নির্ধারণ করা হত না।

চলুন আবার পৃথিবীর বিষয়ে ফিরে আসা যাক। নিজেকে একটা প্রশ্ন করা যাক: আমরা কি নক্ষত্রগুলিকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্নরকমভাবে দেখি?

যদি পৃথিবী সমতল হয় তবে একই রকম দেখা যাবে। মনে করি আমরা রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। আমরা সব নক্ষত্র স্পষ্ট দেখতে পাব যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে। আমরা যদি পৃথিবীর অন্য কোথাও থাকি তবুও আমরা একই নক্ষত্র দেখতে পাব।

কিন্তু বাস্তবে এইরকম হয় না!

প্রাচীন কালে এমন মানুষ ছিল যারা ভ্রমণ করত। যারা উত্তরে ভ্রমণ করত তারা উত্তরে যাওয়ার পর আকাশের নক্ষত্রগুলিকে আকাশে ভিন্নরকম দেখত। তারা উত্তর অক্ষরেখার কাছে তারাগুলিকে তাদের কাছাকাছি দেখত। তবে তারা যখন আবার তাদের পূর্বের স্থানে পৌঁছাত তখন তারা ঐ তারাগুলিকে হয় দেখতেই পেত না; না হয় পূর্বের স্থানে দেখতে পেত না। উত্তরের বদলে দক্ষিণে যারা ভ্রমণ করত তারা ঠিক উল্টো চিত্র দেখতে পেত। তারা দক্ষিণে তাদের মাথার উপর এমন কিছু নক্ষত্র দেখতে পেত যাদের তারা বাড়িতে আসার পর আর আকাশে দেখতে পেত না! ঠিক যেন নক্ষত্রগুলি অদৃশ্য হয়ে গেছে!!!

The Earth as a Cylinder; Image Courtesy: How did we find out about the earth is round? Issac Assimove

পৃথিবীর সব স্থান হতে নক্ষত্রগুলিকে দেখতে একরকম হয় না। অতএব পৃথিবীর আকার কোনোভাবেই সমতল হতে পারে না।

সম্ভবত পৃথিবীর আকার ছিল সিলিন্ডারের মত। ঠিক এই ব্যাপারটাই এনাক্সিম্যান্ডার ভেবেছিল। সিলিন্ডারের কেন্দ্র হলো গোলক আকাশের কেন্দ্র। আপনি যখন উত্তর ও দক্ষিণে ভ্রমণ করেন তখন সিলিন্ডার আপনার সাথে সাথেই পরিবর্তিত হয়। যার ফলে আমরা নক্ষত্রগুলিকে ভিন্ন জায়গায় দেখতে পাই!

এর মানে হলও আপনি এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় গেলে আকাশ নিজেও পরিবর্তিত হয়ে সেই স্থানে আবির্ভূত হয়!

Feature Image Courtesy: gisgeography.com
Reference: How did we find out about the earth is round? Issac Assimove