একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর চাঁদ নিজের আলো বা উজ্জ্বলতা হারায়। চাঁদ তার পূর্ণ উজ্জ্বলতা পাওয়ার আগে চাঁদের উপর দিয়ে একটি কালো ছায়া অতিক্রম করে। কিছু সময় পর অন্ধকার ছায়া কেটে যায়। চাঁদ অন্ধকার ছায়া কেটে যাবার পর তার পূর্ণ উজ্জ্বলতা ফিরে পায়। চাঁদের এই পূর্ণ উজ্জ্বলতা পাওয়ার ঘটনার পুরো সময়কে ‘চন্দ্রগ্রহণ’ বলে।


পৃথিবীর আকার নিয়ে যত জল্পনা কল্পনা: পৃথিবী কি সব দিকে সমান বক্র? (তৃতীয় পর্ব) পড়তে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন


মানুষ প্রাচীনকালে চাঁদের এই গ্রহণ দেখে ভয় পেত। তারা মনে করত চাঁদ চিরকালের জন্য অন্ধকারাছন্ন হয়ে যাচ্ছে। চাঁদ যদি তার উজ্জ্বলতা হারাত তবে তাদের রাতের বেলা অন্ধকারে পথ চলতে অসুবিধা হত।

যারা আকাশ কে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তারা জানতেন যে চাঁদ তার আলো বাঁ উজ্জ্বলতা কখনোই হারাবে না। তারা আরও লক্ষ্য করেন যে এই অন্ধকার সময় আসে পূর্ণচন্দ্রের পূর্বে, অন্য কোনও সময় নয়। তাদের মনে তখন প্রশ্ন জাগে এটি কেন অন্য সময় ঘটে না? প্রাচীন গ্রিকরা জানতেন যে চাঁদ পূর্ণ চন্দ্রের সময় সূর্যের বিপরীতে অবস্থান করত। সূর্য এর দিকে পৃথিবীর যে অংশ মুখ করে থাকত তার পুরো অংশই সূর্য আলোকিত করত। সূর্যের আলোক রশ্মি চাঁদের উপর পড়ার ফলে প্রতিফলিত হয়ে চাঁদ আলোকিত হয়।

Eclipse of moon; Image Courtesy: How did we find out the earth is round?

ধরুন, পৃথিবী চাঁদ ও সূর্যের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করছে। তখন কী হবে? তখন সূর্যের রশ্মিকে চাঁদ পর্যন্ত পৌছাতে হলে অবশ্যই পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে যেতে হবে অর্থাৎ পৃথিবীকে ভেদ করে যেতে হবে। সূর্য রশ্মির অক্ষে কখনোই পৃথিবীকে ভেদ করে যাওয়া সম্ভব নয়। একারণেই এমন অবস্থায় কখনোই সূর্যের রশ্মি চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছাবে না।

এটি চাইলে অন্যভাবেও বলা যায়। এই অন্যভাবে বলার উপায় হলো পৃথিবীর ছায়া। গ্রহণের সময় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া পড়ে। এই ছায়া পড়ার কারণেই চাঁদ তার উজ্জ্বলতা হারায় অর্থাৎ অন্ধকারাছন্ন হয়ে পড়ে। প্রত্যেকবার যখন পূর্ণচন্দ্র হয় তখন পৃথিবী চন্দ্র ও সূর্যের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করে। ঠিক এই সময়েই গ্রহণ সম্পন্ন হয়।

যখন চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া পড়ে তখন আমরা পৃথিবীর ছায়া দেখে পৃথিবীর আকার সম্পর্কে একটা ধারণা পাই। পৃথিবীর ছায়ার শেষ প্রান্ত বক্র যা বৃত্তের অংশ বলে মনে হয়। গ্রীকরা চন্দ্রগ্রহণকে আকাশের বিভিন্ন স্থান, উচ্চ আকাশ, নিম্ন আকাশ, দিগন্ত এ অবস্থান করা চাঁদের উপর পর্যবেক্ষণ করেছেন। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের উপর আলো পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা হতে আসে। যার কারণে ছায়ার আকৃতির পরিবর্তন হওয়ার কথা। কিন্তু চাঁদের উপর পৃথিবীর যে ছায়া পড়ে তা কখনোই পরিবর্তিত হয় না। সবসময় এটিকে দেখতে বৃত্তের অংশ বলেই মনে হয়। পৃথিবীর আকার এমন যা প্রত্যেক দিকেই বৃত্তীয় ছায়া ফেলে। সমস্ত দিকেই বৃত্তীয় ছায়া ফেলা একমাত্র কোনো গোলকের পক্ষেই সম্ভব।

The Shadow of the earth on moon; Image Courtesy: How did we find the earth is round?

গ্রীক দার্শনিক ফিলুলাস ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ ইতালিতে বাস করতেন। তিনি সকল তথ্য প্রমাণ একত্র করেন। নক্ষত্রদের পরিবর্তন, জাহাজের অদৃশ্য হওয়া, পৃথিবীর ছায়া সবকিছুর শেষে তিনি একটি উপসংহারে আসেন যে পৃথিবী গোলক যা এর থেকেও বৃহৎ গোলক আকাশের কেন্দ্রে অবস্থিত। ফিলুলাস হলও প্রথম ব্যক্তি যিনি বলেন পৃথিবী গোল।

কিন্তু এখনো কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়! পৃথিবী গোলক হলে ও আমরা পৃথিবীর শীর্ষে অবস্থান করলে, আমরা যখন শীর্ষ থেকে দূরে সরে যাই তখন কেন পৃথিবী থেকে ছিটকে পড়ি না? সমুদ্রের পানি কেন পড়ে যায় না? বাতাসের প্রবাহের কেন পরিবর্তন হয় না?

বস্তুর নিচে পড়ার ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা করা যাক। যদি কোনো বস্তুকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় তবে তা সবসময় নিচের দিকে পড়ে। বস্তুটি কখনোই উপরের দিকে যায় না! কিন্তু কেন নিচের দিকেই পড়ে? পৃথিবী যেহেতু গোলক, বস্তুটি পৃথিবীর কেন্দ্রের আকর্ষণ বলের কারণে নিচে অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে পড়ে।

Down is toward the center of earth; Image Courtesy: How did we find out The Earth is round?

এই পৃথিবীর সকল মানুষদের জন্য এই ব্যাপারটি সত্য। পৃথিবীর সকল মানুষ যে যেখানেই থাকুক না কেন তার জন্য ব্যাপারটি সত্য। পৃথিবীর সকল বস্তু যেখানেই থাকুক পৃথিবীর এই প্রান্তে অথবা এর মাঝামাঝি যেকোনো স্থানেই থাকুক সকলেই পৃথিবীর কেন্দ্র দ্বারা আকর্ষিত হবে! যেখানেই থাকুক না কেন তার পা সবসময় ‘নিচে’ এবং মাথা সবসময়য় ‘উপরে’ থাকবে।

এরিস্টটলের দর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর সকল বস্তু তার কেন্দ্রের দিকে যেহেতু আকর্ষিত হয় তাহলে এর আকার হবে গোলক। এর মাধ্যমেই বুঝা যায় কেন পৃথিবীর বায়ু ও সমুদ্রের পানি পৃথিবীর বাইরে যায় না! এরা যখনি পৃথিবীর সীমার বাইরে যেতে চায় তখনি এদের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করা হয়। যার ফলে এরা পৃথিবীর বাইরে যেতে পারে না!

Feature Image Courtesy: musclestory.net

References: How did we know the earth is Round? Issac Asimove