আধুনিক অলিম্পিক গেমসের অন্যতম আকর্ষণ ম্যারাথন রেস; Image Courtesy: 99designs-blog.imgix.net

ম্যারাথন রেস বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দীর্ঘ দূরত্বের এক দৌড় প্রতিযোগিতা যেখানে সাধারণত প্রতিযোগিদের ছাব্বিশ মাইল দৌড়াতে হয়। ম্যারাথন রেস আধুনিক অলিম্পিক গেমসের একটি জনপ্রিয় ইভেন্ট। অলিম্পিক গেমস আনুমানিক ৭১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চালু হলেও ১৮৯৬ সালে গ্রিসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত আধুনিক অলিম্পিকের গ্রীষ্মকালীন আসরে ইভেন্ট হিসেবে প্রথম স্থান করে নেয় ম্যারাথন রেস।

পাঠক, আপনি কী কখনো ভেবেছেন ম্যারাথন রেসে কেন ছাব্বিশ মাইলই দৌড়ানোর নিয়ম করা হয়েছে?

যদি উত্তর হয় না, তবে চলুন ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে জেনে নেওয়া যাক ম্যারাথন রেসের পেছনের গল্পটা। সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২ সালের ঘটনা, পারস্য সম্রাট দারায়ুসের নাম তখন বিশ্বের সবার মুখে মুখে। এশিয়ার অধিকাংশ স্থান তার অধীনে চলে এসেছে, এবার চোখ ইউরোপের দিকে। গ্রীসের কিছু অংশ দখল করেছেন। ক্রমে এগিয়ে যাবেন বিশ্বজয়ের পথে।

আধুনিক অলিম্পিক গেমসের অন্যতম আকর্ষণ ম্যারাথন রেস; Image Courtesy: 99designs-blog.imgix.net

কিন্তু হঠাৎই বাধাপ্রাপ্ত হলেন সম্রাট দারায়ুস, গ্রীসের অন্তর্ভুক্ত কিছু নগররাষ্ট্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে তার বিরুদ্ধে। তারা পারস্য সম্রাটের দখলদারিত্ব মেনে নেবে না। শুনে তো সম্রাট রেগেমেগে আগুন, কার এত সাহস যে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে?

তিনি জানতে পারলেন এথেন্স হলো এই বিদ্রোহের নাটেরগুরু যারা অন্য নগররাষ্ট্রগুলোকেও উৎসাহিত করছে দারায়ুসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে। সম্রাট সিদ্ধান্ত নিলেন নগররাষ্ট্রগুলোকে একটা উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে।

প্রথমে দারায়ুস তার প্রতিনিধিকে পাঠালেন বিদ্রোহী নগরগুলোতে যেন তারা সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়, নয়তো তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া হবে। দারায়ুসের এ ঘোষণায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে অনেকের মধ্যে, অনেক রাষ্ট্র বশ্যতা স্বীকারও করে নেয়।

কিন্তু কোনো কোনো নগররাষ্ট্র এই পরাধীনতার শৃঙ্খলে নিজেদের আবদ্ধ করতে চায়নি। এদের মধ্যে এথেন্স ও স্পার্টা অন্যতম। তাই তারা নগরপ্রধানদের নির্দেশে দারায়ুসের দূতকে কূপে নিক্ষেপ করে হত্যা করে।

পারস্য সম্রাটের ছিল সুসজ্জিত সৈন্য-সামন্ত; Image Courtesy: Ancient History Encyclopedia
পারস্য সম্রাটের ছিল সুসজ্জিত সৈন্য-সামন্ত; Image Courtesy: Ancient History Encyclopedia

এই ঘটনা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে তোলে পারস্য সম্রাটকে, প্রতিশোধের নেশায় তিনি উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। গড়ে তোলেন ৬০০ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এক বিশাল নৌবহর যার সৈন্য-সামন্ত, মাঝি-মাল্লার সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার। এই নৌবহর নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেন এথেন্সের দিকে।

কিন্তু দমলো না এথেন্স, যে করেই হোক স্বাধীনতার রঙিন সূর্যকে রক্ষা করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল এথেন্সবাসী। আলোচনায় বসেন নগরের বিজ্ঞ পণ্ডিতবর্গ, সমরবিদগণ ও সাধারণ নগরবাসীরা।

তারা ভাবতে লাগলেন, মাত্র নব্বইটা যুদ্ধ জাহাজ আর স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে অত বড় পারস্য বাহিনীর মোকাবেলা কি আদৌ সম্ভব হবে? এদিকে পারস্য বাহিনী এথেন্স থেকে ছাব্বিশ মাইল দূরে ম্যারাথন উপসাগরের পাশে নোঙর ফেলেছে, যেকোনো মূল্যে তারা এথেন্সকে কব্জায় আনতে প্রস্তুত।

একনজরে ম্যারাথন প্রান্তর; Image Courtesy: realmofhistory.com
একনজরে ম্যারাথন প্রান্তর; Image Courtesy: realmofhistory.com

সিদ্ধান্ত হলো সাহায্যের জন্য দূত পাঠানো হবে স্পার্টার রাজার কাছে-পাঠানো হলো বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ফিডিপাইডিসকে। কিন্তু বাধ সাধলো স্পার্টার আদিবাসীদের অতিরিক্ত ধর্মভীরুতা। তাদের মতে পূর্ণিমার আগে যুদ্ধে যাত্রা অমঙ্গল। তাই পারস্যের সম্রাটের বিরুদ্ধে এথেন্সকে সহযোগিতা করতে আপত্তি না থাকলেও পূর্ণিমার আগে তারা কোনো সাহায্য পাঠাতে পারবে না।

এদিকে ম্যারাথন উপসাগর থেকে যেকোনো সময় আক্রমণ হানতে পারে পারস্য বাহিনী। তাই এথেন্সবাসীকে যা করার পূর্ণিমার আগেই করতে হবে কেননা তখন ছিল কেবল নবমী তিথি।  অতএব স্পার্টার কাছ থেকে সাহায্যের আশায় বসে থাকা বোকামি হবে, ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল দূত ফিডিপাইডিস। চিন্তার ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকলো এথেন্সবাসীর কপালে। তারা জানত দারায়ুস বাহিনী তাদেরকে পূর্ণিমার আগেই আক্রমণ করবে। তাই মাত্র নয় হাজার সৈন্য এবং সামান্য কিছু যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে তারা রওনা দিলো ম্যারাথন প্রান্তরে।

এথেন্সকে সাহায্যর জন্য স্পার্টার রাজার কাছে বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ফিডিপাইডিসকে পাঠানো হয়; Image Courtesy: Richard Hook.
এথেন্সকে সাহায্যর জন্য স্পার্টার রাজার কাছে বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ফিডিপাইডিসকে পাঠানো হয়; Image Courtesy: Richard Hook.

এথেন্স বাহিনীর যুদ্ধ সরঞ্জাম ও সৈন্য সংখ্যা কম থাকলেও যুদ্ধ কৌশলে তারা ছিল অতুলনীয়। তারা জানতো এথেন্সকে আক্রমণের সুযোগ দিলে সেই আক্রমণ এথেন্সবাসী সহ্য করতে পারবে না। তাই তারা আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ করতে ম্যারাথন প্রান্তরে রওনা দিয়েছে। দেশপ্রেমের সঞ্জীবনী শক্তিতে বলীয়ান এথেন্স বাহিনী নানা পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র-বন-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আগাতে থাকল।

৪৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ম্যারাথন উপসাগরে শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। যেখানে বিরাট পারস্য বাহিনীর প্রতিপক্ষ ক্ষুদ্র এথেন্স বাহিনী। অতর্কিত আক্রমণের মুখে হতবিহ্বল হয়ে যায় দারিয়ুসের সৈনিকরা, যুদ্ধে তাদের পরাজয় ঘটে। পরাজয়ের কলঙ্ক গায়ে নিয়ে দেশে ফিরে যায় তারা। পেছনে ফেলে যায় বহু যোদ্ধার লাশ।

এথেন্সের যোদ্ধারা সুজসজ্জিত বিশাল পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করে; Image Courtesy:  Richard Hook.
এথেন্সের যোদ্ধারা সুজসজ্জিত বিশাল পারস্য বাহিনীকে পরাজিত করে; Image Courtesy:
Richard Hook.

অন্যদিকে এত অল্প সংখ্যক সরঞ্জাম আর সৈন্য নিয়ে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে এথেন্স যোদ্ধারা। মাতৃভূমি রক্ষার এই মহা আনন্দের সংবাদ দ্রুত পৌঁছানো দরকার উদ্বিগ্ন নগরবাসীর কাছে। এবারও দায়িত্ব নেন দেশপ্রেমিক দূত ফিডিপাইডিস।

ম্যারাথন থেকে ছাব্বিশ মাইল দূরের এথেন্স নগরীর দিকে আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে যেন উড়ে চলে আসেন এথেন্সে। দেশে পৌঁছে নগরবাসীদের জানালেন স্বাধীনতা রক্ষার সুসংবাদ জানায় ফিডিপাইডিস। কিন্তু দীর্ঘ পথচলায় ক্লান্ত হয়ে পরেছিলেন তিনি, লুটিয়ে পড়লেন মাটির ওপরে, চির নিদ্রায় শায়িত হলেন স্বাধীন এথেন্সের বুকে।

দেশের প্রতি ফিডিপাইডিসের এই আত্মত্যাগের পবিত্র স্মৃতি রংক্ষার্থে অলিম্পিক গেমসে চালু হয় ম্যারাথন রেস ইভেন্ট যার পরিধি ছাব্বিশ মাইল।

Feature Image Courtesy: jrailpass.com