বিগ ব্যাং থিওরি

ধরেই নিলাম যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। যদি মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয় তবে আজকের মহাবিশ্বের আকার গতকালের মহাবিশ্বের আকারের তুলনায় বেশি! ঠিক একই ভাবে গতকালের মহাবিশ্বের আকার তার পূর্বের দিনের আকারের তুলনায় বেশি!

বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচিতি: দমকা ফিরে আসা গ্যালাক্সির কথা (চতুর্থ পর্ব)

আবার মহাবিশ্ব ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে হতে একসময় শূন্যেও মিলিয়ে যেতে পারে। এই ব্যাপারগুলি নিয়ে সর্বপ্রথম কথা বলেন বেলজিয়ামের জ্যোতির্বিদ জর্জ ই লেমারুহ। তিনি ১৯২৭ সালে বলেন যে বহু বছর আগে মহাবিশ্বের সকল বস্তু একসাথে গাদাগাদি করে ছিল। তিনি এই অবস্থাকে নাম দেন ‘কসমিক এগ’। তিনি ভেবেছিলেন যে এই কসমিক এগ একসময় বিস্ফোরিত হয় এবং বস্তুগুলি মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এর পর থেকেই মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং এখন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

রাশিয়ান আমেরিকান বিজ্ঞানী জর্জ মেগাও এই ধারণাকে সমর্থন করেন। তিনি এই বিস্ফোরণ কে নাম দেন ‘বিগ ব্যাং’। তিনি এটিকে মহাবিশ্বের শুরু বলে উল্লেখিত করেন।

তাহলে কত দিন আগে এই বিস্ফোরণ হয়? কত বছর আগে বিগ ব্যাং সংগঠিত হয়? আর আমাদের এই মহাবিশ্বের বয়স-ই বা কত?

Big Bang; Image Courtesy: StudiousGuy

মহাবিশ্বের বয়স কত তা জানা যাবে যদি জানা যায় মহাবিশ্ব কত দ্রুতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিজ্ঞানী হাবল ১৯২৯ সালে পৃথিবীর এই সম্প্রসারণ নিয়ে কাজ করেছেন। আর এই সম্প্রসারিত হবার হারকে তিনি উল্লেখ্য করেন ‘হাবলের ধ্রুবক’ বলে। হাবলের ধ্রুবকের হারেই এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। হাবলের ধ্রুবকের মান যত বেশি হবে তত দ্রুত মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হবে। আর এই সম্প্রসারণ হচ্ছে সেই বিগ ব্যাং এর সময় থেকেই। হাবলের ধ্রুবক থেকেই জানা যায়, মহাবিশ্ব তৈরি হয় যে বিগ ব্যাং থেকে তা সংগঠিত হয়েছিল ২,০০০,০০০,০০০ বছর (দুই বিলিয়ন বছর) আগে। এর মানে হলো আসলে মহাবিশ্ব দুই বিলিয়ন বছরের পুরনো!

তবে পৃথিবীর কিছু বিজ্ঞানী যারা পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তু নিয়ে গবেষণা করছিল তাদের কিছু কাজ এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে। কারণ পৃথিবীতে এমন কিছু পাথর ছিল যা তিন বিলিয়ন বছর পুরনো ছিল! এই বিজ্ঞানী দল খুব নিশ্চিত ছিলেন যে আমাদের সৌর জগত গ্যাস ও ধূলিকণা থেকে ৪,৬০০,০০০,০০০ বছর (৪.৬ বিলিয়ন বছর) আগে জন্ম নিয়েছে। সৌর জগত কীভাবে পুরো মহাবিশ্ব থেকে বেশি পুরনো হতে পারে?

The Oldest Stone; Image Courtesy: Smithsonian Magazine

এর পরের ২০ বছর এই ধাঁধার কোনও সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় নি! এখানে আসলে প্রশ্ন ছিল কারা সঠিক ছিল? জ্যোতির্বিদরা নাকি ভূতত্ত্ববিদ রা?


যখন বাদি ১৯৫২ সালে দেখান যে সেফোয়েড হলো আসলে দুই প্রকার! তখন এটি মনে হয়েছিল যে জ্যোতির্বিদগণ আসলে ভুল ছিল! সেফোয়েড দিয়ে জ্যোতির্বিদ রা যে দূরত্ব আবিষ্কার করেছিল তার থেকে আসলে আমাদের এই মহাবিশ্ব অনেক অনেক বেশি বড়। এর মানে হলো আসলে হাবল ধ্রুবকের মান তারা যা ভেবেছিল তার থেকেও অনেক বেশি ছিল!


মহাবিশ্ব আসলে সৌরজগতের তুলনায় অনেক বেশি পুরনো বা বয়স্ক ছিল! তাতে কোনো সন্দেহ নেই!

এখন কোনো কোনো জ্যোতির্বিদ মনে করেন যে বিগ ব্যাং ১০,০০০,০০০,০০০ বছর (১০ বিলিয়ন) আবার কেউ কেউ মনে করেন ২০,০০০,০০০,০০০ বছর (২০ বিলিয়ন) আগে হয়েছিল!

আবার কোনও কোনও বিজ্ঞানী মনে করেন যে বিগ ব্যাং কখনো হয়ই নি! তারা মনে করেন যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এর ফলে ধীরে ধীরে নতুন নতুন পদার্থ তৈরি হচ্ছে! নতুন নতুন মহাবিশ্ব, নক্ষত্র, গ্রহ উপগ্রহের জন্ম নিচ্ছে যা অন্যগুলোকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে!

এই তত্ত্বকে বলা হয় ‘দ্য থিওরি অফ কন্টিনিউয়াস’ অর্থাৎ অনন্ত এক মহাবিশ্বের ধারণা এখানে উল্লেখিত হয়েছে। আর এই তত্ত্ব টি ছিল ইংরেজ জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হয়লে, অস্ট্রিয়ান জ্যোতির্বিদ হার ম্যান বন্ডি, থমাস গোল্ডের। তারা এই তত্ত্বটি দিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে। যদি এই অসীমতার তত্ত্বটি সঠিক হয় তবে এই মহাবিশ্বের কোনো শেষ নেই! এই মহাবিশ্ব টি অনন্ত কাল পর্যন্ত চলতেই থাকবে। এই মহাবিশ্বের যেমন কোনও শেষ নেই তেমন এর কোনও শুরুও নেই!

Fred Hoyle; Image Courtesy: The world of David Darling

এর মধ্যে গ্যামো একটি ব্যাপার ধরতে পারেন। তিনি বলেন যে অবশ্যই মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে বিগ ব্যাং থেকে। বিগ ব্যাং এর সময় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডিগ্রী তাপমাত্রা ছিল ও একটি রেডিয়েশনের মাধ্যমে বিগ ব্যাং সংগঠিত হয়। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে আসলে রেডিয়েশনের ও সম্প্রসারণ হতে থাকে। সেই সাথে সাথে তাপমাত্রাও কমতে থাকে।

বিগ ব্যাং এর বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পরে গড় তাপমাত্রা অবশ্যই অনেক কমে গিয়েছে! তাপমাত্রা যখন উচ্চ ছিল তখন রেডিয়েশন ছিল কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আর তাপমাত্রা যত কমেছে রেডিয়েশনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগ ব্যাং এর সময়ে যে রেডিয়েশন ছিল তা এখনো আছে, একে আমরা বলি ‘রেডিও তরঙ্গদৈর্ঘ্য’।

গ্যামাও ভেবেছিল যে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্য অবশ্যই আকাশের কোথাও পাওয়া যাবে। টেলিস্কোপের মধ্যে দিয়ে অনেকেই এই রেডিও ওয়েভ সনাক্ত করণের চেষ্টা করেছে যা বিগ ব্যাং এর সময় থেকে নিঃসরিত হচ্ছে। আমরা যদি মহাবিশ্বের যথেষ্ট দূর পর্যন্ত দেখতে পারি তবে আমরা এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে শনাক্ত করতে পারবো যা বিগ ব্যাং এর প্রমাণ হিসেবে আমাদের সামনে নতুন এক জগতের উন্মোচন করবে। এই রেডিও ওয়েভ মহাবিশ্বের সব দিক থেকেই আসতে পারে।

এমন সময় গ্যামাও বলেন যে এমন কোনো যন্ত্র নেই যা আসলে আমাদের এই রেডিও ওয়েভকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জ্যোতির্বিদরা আরো শক্তিশালী টেলিস্কোপ নির্মাণ করেন। একজন আমেরিকান জ্যোতির্বিদ রবার্ট এইচ ডিকি ১৯৬৪ সালে গ্যামাও এর উক্তিগুলো খুঁজে পান।

তারা এই রেডিও ওয়েভ খুঁজতে শুরু করেন। দুইজন আমেরিকান বিজ্ঞানী অণু এ পএনজিয়াস ও রবার্ট উব্লিউ উইলসন ১৯৬৫ সালে এমন একটি সেট আপ তৈরি করেন যা এই সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্য শনাক্ত করতে পারে। গ্যামাও যেরকম ভেবেছিল ঠিক সেরকম তরঙ্গদৈর্ঘ্য তারা শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

Telescope; Image Courtesy: KERA’s Think

তখন থেকেই অনেক বিজ্ঞানী ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন। এর থেকে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় যে বিগ ব্যাং হয়েছিল। এর থেকেই অসীম মহাবিশ্বের ধারণা বাতিল হয়ে যায়!

আমরা আমাদের টেলিস্কোপ দিয়ে প্রায় ১০,০০০,০০০,০০০ (১০ বিলিয়ন) আলোক বর্ষ পর্যন্ত দেখতে পারি! এখানে আমরা যে আলো দেখতে পাই তা আসলে ১০ বিলিয়ন বছর আগের যা বিগ ব্যাং এর অনেক পরের ব্যাপার না!

আমরা কি এর থেকেও দূরবর্তী কুয়াশা শনাক্ত করতে পারব? সম্ভবত পারব না! সম্ভবত সেখানে বিগ ব্যাং এর উত্তপ্ত রেডিয়েশন আছে। সম্ভবত এগুলি ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকে দেখতে পাওয়া যাবে।

ভবিষ্যতে কি হতে চলেছে?

একটা সম্ভাবনা হতে পারে যে মহাবিশ্ব অনন্তকাল পর্যন্ত শুধু সম্প্রসারণ হতেই থাকবে! গ্যালাক্সি গুলো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর পর্যন্ত শুধু বিস্তৃত হতেই থাকবে হতেই থাকবে! এই ধরণের ধারণাকে বলে ‘ওপেন ইউনিভার্স’।

History of The Universe; Image Courtesy: Pinterest

এই যে গ্যালাক্সিগুলো সম্প্রসারিত হচ্ছে এই সম্প্রসারণের ফলে তাদের মধ্যে একধরণের মহাকর্ষীয় বলের প্রভাব দেখা যাবে। যার ফলে এই সম্প্রসারণ ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। এই সম্প্রসারণ কমতে কমতে একসময় শূন্যের কোঠায় চলে আসবে। আর এরপর থেকেই শুরু হবে সংকোচন। আর তখন গ্যালাক্সিগুলো কাছাকাছি আসতে থাকবে। এই কাছে আসার হারটা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। একসময় ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ সম্পন্ন হবে। একে বলা হয় ‘ক্লোজড ইউনিভার্স’।

এরকমও হতে পারে যে বিগ ব্যাং শূন্য থেকে হয়েছিল এবং বিগ ক্রাঞ্চের মধ্যমে মহাবিশ্ব আবার শূন্যেই মিলিয়ে যাবে। আবার এমনও হতে পারে যে বিগ ক্রাঞ্চ হবার পর আবার নতুন এক বিগ ব্যাং এর সূচনা হলো! এভাবে অনন্ত কাল বিগ ব্যাং আবার বিগ ক্রাঞ্চ এভাবে চলতেই থাকলো!

Feature Image Courtesy: The Indian Express
Reference: How did we know about the Universe? Issac Ashimove