ওয়েগনার মার্সিনারি

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সংঘাত স্থলে ‘প্রাইভেট মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রি’ বা বেসামরিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কথা আলোচনার টেবিলে তুললে শুরুতেই যে নাম উঠে আসবে তা হলো মার্কিন প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি ব্ল্যাকওয়াটার। ইরাক যুদ্ধে একের পর এক বিজয় এনে দিয়ে পেন্টাগনের অন্যতম নির্ভরতার জায়গা অর্জন করে নেয় ব্ল্যাকওয়াটার। পুতিন হয়তো আমেরিকান এ মার্সিনারির নামডাক মোটেও পছন্দ করেননি। তাই-তো বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানিটি হচ্ছে রুশ মার্সিনারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘দ্যা ওয়েগনার গ্রুপ’। সাবেক রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ওয়েগনার গ্রুপের আসল সদস্য সংখ্যা কারও জানা নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তার ও পুতিনের নীতিগত উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অব্যর্থ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এ ওয়েগনার গ্রুপ।

গোড়াকার

ধারণা করা হয়, প্রভাবশালী রুশ ব্যাবসায়ী ইয়েনগেনি প্রিগোজিন ২০১৪ সালে ওয়েগনার গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই এর আর্থিক পৃষ্ঠপোষক। অনুরূপ জীবনচরিতের কারণে প্রিগোজিনকে ল্যেভ তলস্তয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আন্না কারেনিনার’ চরিত্র ভরস্কায়ের সাথে তুলনা করেন অনেকে। পুতিনের  সাথে সখ্যতার কারণে তাকে ‘Putin’s Chef’  অর্থ্যাৎ ‘পুতিনের রাধুনি’ ছদ্মনামেও ডাকা হয়। ওয়েগনার গ্রুপের ‘ট্রল ট্রুপস’-কে ব্যবহার করে ২০১৬ মার্কিন প্রেসিন্ডেসিয়াল ইলেকশনকে প্রভাবিত করার করার মত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে প্রিগোজিনের বিরুদ্ধে। যদিও প্রিগোজিন তথা ক্রেমলিন ওয়েগনার গ্রুপকে পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্নে বরাবরই চুপ। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমের এ ব্যাপারে শক্ত প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করে তারা।

ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ইয়েনগেনি প্রিগোজিন; Image Courtesy: bbc.com

ওয়েগনার গ্রুপের প্রধান সাবেক রুশ বিগ্রডিয়ার কমান্ডার দিমিত্রি উটকিন। মূলত তার নেতৃত্বেই ওয়েগনার গ্রুপ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে অপারেশন সংগঠন করে থাকে। ২০১৪ থেকে এখন পর্যন্ত ক্রিমিয়া, সিরিয়া, লিবিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, ভেনিজুয়েলা, সুদান, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার সহ অনেক দেশে ওয়েগনার গ্রুপের উপস্থিতির প্রমান পাওয়া গেছে।

ক্রিমিয়া দখল অভিযান

মূলত ক্রিমিয়ায় রুশ প্রতিপত্তি বাড়াতে ওয়েগনার গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১৪ সালে। ইউক্রেনে বিদ্রোহীদের সাহায্য করাই ছিল ওয়েগনার গ্রুপের মূল লক্ষ্য। সমরক্ষেত্রে তারা ইউক্রেনিয়ান ll-76 বিমান ভূপাতিত করে যা ৪০ ইউক্রেনিয়ান প্যারাট্রুপের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে ক্রিমিয়ানদের সাথে ওয়েগনার গ্রুপের সেনাদের আচরণ এতটাই নমনীয় ছিল যে স্থানীয়রা তাদের ‘পলাইট পিপল’, ‘লিটল গ্রীন সোলজার’ নামে ডাকতেন। ক্রিমিয়ার নিয়ন্ত্রন নেয়ার পরও ওয়েগনার গ্রুপ ক্রিমিয়াতে থেকে যায়।

সিরিয়া অভিযান

রুশ সমর্থিত বাশার আল আসাদ সরকারের বাহিনীকে সাহায্যের জন্য সিরিয়ায় ওয়েগনার মার্সিনারির অস্তিত্ব প্রথম পাওয়া যায় ২০১৫ সালে। ধারণা করা হয় সিরিয়, গৃহযুদ্ধে ধাপে ধাপে প্রায় সাত হাজার ওয়েগনার মার্সিনারি মোতায়ন করা হয়েছে। সিরিয়া মিশনে ওয়েগনার গ্রুপকে বেশ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। তাদের প্রথম কাজ ছিল জঙ্গীগোষ্ঠী আইএস-এর হাত থেকে তেলের খনি গুলো উদ্ধার করা এবং তাতে একক কর্তৃত্ব বজায় রাখা। সফলতার সাথে তারা উতরেও যায় আইএস সমর পরীক্ষা।

পালমিরা দখল অভিযান ও দির ইজ-জোর যুদ্ধে সফল ভাবে আইএসকে নির্মূল করতে সক্ষম হয় ওয়েগনার গ্রুপ ও সিরিয় সরকারি বাহিনী। বলার অপেক্ষা রাখে না পুরো অভিযানটি ছিল রুশ সমরকর্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী। তারপর একের পর এক অভিযানে হামা প্রদেশ দখল, কাশহাম যুদ্ধ ও রাজধানী দামেস্ক রক্ষা করে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে। এসব সংঘাতে অনেক ওয়েগনার সেনা হতাহতের স্বীকার হয়।  

বিশ্বব্যাপী ওয়েগনার গ্রুপের উপস্থিতি; Image Source: Startfor Worldview

লিবিয়া গৃহ যুদ্ধ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে রীতিমতো বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে লিবিয়া গৃহ যুদ্ধে ওয়েগনার মার্সিনারি পাঠায় রাশিয়া৷ মে মাসে জাতিসংঘ থেকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, রুশ মার্সিনারিদের সংখ্যাটা ৮০০-১২০০ পর্যন্ত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, লিবিয়ায় এ মার্সিনারিরা জেনারেল হাফতারের পক্ষ হয়ে জাতিসংঘ স্বীকৃত GNA সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। লিবিয়ার প্রধান প্রধান তেলের খনি সহ লিবিয়ার প্রায় ৮০% দখল করে নিয়েছে এই জেনারেল হাফতার। অবশ্য বরাবরের মতই  লিবিয়ান GNA সরকারে রাশিয়ান মিলিটারির অবস্থানের সকল অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে মস্কো।  

ভেনেজুয়েলায় রুশ প্রতিপত্তি অটুট রাখা

২০১৯ এ ভেনিজুয়েলার রাজনীতিক মেরুকরণের সময় প্রায় ৪০০ ওয়েগনার মার্সিনারিকে পাঠানো হয় সেখানকার রুশ সমর্থিত রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে নিরাপত্তা প্রদানের উদ্দেশ্যে। তারা সফলভাবে নিকোলাস মাদুরোকে তার ক্ষমতা রক্ষা করতে সহায়তা করে। ধারণা করা হয়, ২০১৮ সালে ওয়েগনার গ্রুপ ‘প্রো-মাদুরো কালোটিভোস প্যারামিলিটারদের প্রশিক্ষণেও সহায়তা করে৷

ওয়েগনার গ্রুপে রাশিয়ার লাভটা কোথায়?

রাশিয়ার আইন অনুযায়ী Private Military Company (PMC) বা বেসামরিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বৈধ নয়। ১৯৯৬ এর রাশিয়ান ক্রিমিনাল কোড আর্টিকেল ৩৫৯ দ্বারা মার্সিনারি বা ভাড়াটে সৈনিক সম্পূর্ণ অবৈধ। তবে রাশিয়ায় ঠিকাদারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান (Private Security Company, PSC) বৈধ। ওয়েগনার গ্রুপ PSC নামে রেজিস্টার ভুক্ত। কিন্তু PSC ও পমচ এর মাঝে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। PSC কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু নিরাপত্তা কর্মী বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রদানকারী যোগান দিয়ে থাকে। PMC  নিরাপত্তা কর্মী ছাড়াও বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সেনা বা মার্সিনারির যোগান দিয়ে থাকে। রাশিয়া বিভিন্ন সংঘাত স্থলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মালিকানাধীন সম্পত্তির নিরাপত্তা প্রদানের নামে গোপনে ওয়েগনার গ্রুপকে প্রেরণ করে থাকে। ওয়েগনার গ্রুপ নামে বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলেও কাজ করে সম্পূর্ণ ক্রেমলিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশ অনুযায়ী। ধীরে ধীরে গোটা অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে পড়ে। মিডিয়া বা কোন রাষ্ট্র যদি মার্সিনারি পাঠানোর অভিযোগের আঙ্গুল তোলে রাশিয়ার দিকে তাহলে রাশিয়া খুব সহজেই তাদের আইন দেখিয়ে অভিযোগ নাকোচ করে দেয়। এভাবেই রাশিয়া সরাসরি কোন অঞ্চলে প্রকাশ্যে তাদের সামরিক অভিযান না চালিয়েও ঠিকই তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে নেয়। এতে করে রুশ প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় থাকে।

সিরিয়ার আলেপ্পোতে রুশ সৈন্য; Image Courtesy: REUTERS

ধারণা করা হয়, ওয়েগনার গ্রুপের প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও সকল সুযোগ সুবিধা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দিয়ে থাকে। কারণ যে সব স্থানে কূটনীতিক কারণে রুশ সামরিক হস্তক্ষেপ সম্ভব হয়না সেখানে তারা ওয়েগনার গ্রুপকে প্রেরণ করে তাদের সামরিক বাহিনীর বিকল্প হিসেবে।

পুতিনের ধরি মাছ না ছু্ঁই পানি নীতি বাস্তবায়নের উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার গয়ে ওঠেছে এই ওয়েগনার গ্রুপ। ভূ-রাজনীতিতে রুশ প্রভাব সুদৃঢ়করণে ওয়েগনার গ্রুপ যে এক্স ফেক্টর হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে এ নিয়ে বিশ্লেষকদের কোন সন্দেহ নেই।



Feature Image Courtesy: sorientxxi.info