'না' বলতে হবে যেভাবে

শব্দ নিজে থেকে কোন অর্থ বহন করে না। শব্দের অর্থ ব্যক্তির মাঝে লুকিয়ে থাকে। ব্যক্তিভেদে শব্দের অর্থের পার্থক্য ঘটে। ‘না’ শব্দটি আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আবার এই শব্দটি আমাদের প্রায়শই ভাবিয়ে তোলে। অনেকেই ‘না’ শব্দটি বলতে না পেরে ভূতের বেগার খাটে। নিজের কঠিন ব্যস্ততার সময়ে অন্যের কাজে সাহায্য করতে গিয়ে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় কেবল এই ‘না’ শব্দটি বলতে না পারার জন্য।

‘না’ বলা যেভাবে শুরু হয়

Image Courtesy: The Kurdish Mother

আমরা ছোটবেলা থেকেই সহজে ‘হ্যাঁ’ বলা শিখি; এতে পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। আবার ‘না’ বললে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। তাছাড়া কিছু পরিবারে বাচ্চাদের চুপ করে থাকতে শেখানো হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। তাই অনেকেই না বলা শিখতে পারে না। এ কারণে কর্ম জীবনে অনেকেই একের পর এক অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে থাকেন। তবে আমাদের জেনে রাখা উচিত, ‘না’ বলা কোন অপরাধ নয়। সরাসরি ‘না’ বলে দিতে পারলে ভবিষ্যতে অনেক সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। শুরুতেই বলেছি ‘না’ কেবল একটি শব্দ। যৌক্তিকভাবে আপনি কাউকে না বলে দেওয়ার পর অপর লোকটি কি ভাববে সেটা সম্পূর্ণ তার ওপর নির্ভর করবে।

আমরা প্রায়ই কিছু ম্যানুপুলেশন এর শিকার হই

উপহার দিয়ে হ্যাঁ বলতে চাপ প্রয়োগ করে; Image Courtesy: Gift Ideas Dinner Party

কিছু লোক আমাদের বিনামূল্যে উপহার দিয়ে থাকে যাতে ভবিষ্যতে কোন কাজ হাসিল করে নিতে পারে।

বুলি মানুষকে খেপিয়ে তুলে; Image Courtesy: Usa Today

বুলি করা অর্থাৎ আপনাকে বারবার খোটা দিয়ে তার নিজস্ব উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইতে পারে। এক্ষেত্রে রিয়্যাক্ট করা অনুচিত।

Image Source: Inside.AcronChildren.com

ঘ্যানঘ্যান করা অর্থাৎ অনেকে বারবার একই কথা বলতে থাকে ‘হ্যাঁ ‘বলানোর জন্য।

                                     
তোষামোদ অর্থাৎ অনেকে অতিরিক্ত প্রশংসা করে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার পায়তাড়া করতে পারে।

‘না’ বলার কার্যকরী কিছু কৌশল

কারণ জানিয়ে দেয়া: আপনি তাকে না বলার কারণটি জানিয়ে দিলে ঐ ব্যক্তির মনে আর প্রশ্ন থাকবে না। তবে না করার পরও বারবার জেদ করলে তাকে এড়িয়ে চলা উচিত।

মিথ্যা না বলা: ‘না’ বলার ক্ষেত্রে সত্য কারণ টা সম্ভব হলে জানিয়ে দেয়া উচিত। তা না হলে বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পাবে এবং একবার মিথ্যে কথা বললে আপনাকে সেই মিথ্যে কথাটি কীভাবে বলেছিলেন তা স্মরণ করতে হবে বারবার।

Image Courtesy: The Well Project

প্রায়োরিটি সেট করা: আপনি অবশ্যই কম এবং বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা কাজকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।  তাহলে কারো কথা কে ‘না’ বলা বেশ সহজ হবে।

সরাসরি ও বিনয়ের সাথে বলা: আপনাকে এমন ভাবে ‘না’ বলতে হবে যাতে ব্যক্তিটি আপনার আশায় বসে না থাকে। কথায় কখনো কর্কশ ভাব দেখানো যাবেনা। লোক যেন না ভাবে আপনার একটি বাজে দিনের ফলস্বরূপ জবাব হিসেবে সেই ‘না’ কথাটা এসেছে।

সিডিউল মেনে চলা: আপনার নিজের সকল কাজ রুটিন অনুযায়ী করা উচিত। শিডিউল সম্পর্কে অবগত থাকলে ‘না’ বলা সহজ হবে।

সময় নিয়ে বলা: তৎক্ষণাৎ ‘না’ বলে দিলে ব্যক্তিটি মনে আঘাত পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কিছুটা সময় নিয়ে জানানো উচিত। তবে অতিরিক্ত চিন্তা করে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা চলবে না।

একইকাজে একজনকে না  এবং অন্যজনকে হ্যাঁবলা: এই পথ অবলম্বন করলে আপনার ওপর ‘না’ শোনা লোকটির বিশ্বাস অতলে ডুবে যাবে। তবে প্রায়োরিটি হলে আগেই লোকটিকে জানিয়ে দিন।

টপিক চেঞ্জ: আপনি কথার বিষয়কে এক দুইবার পরিবর্তন করলেই ব্যক্তিটি ইঙ্গিত পেয়ে যাবে যে আপনি ‘না’ বলতে চাইছেন।

ব্যক্তিগত সমস্যা আছে: আপনি অনেক সময় লোককে ‘না’ বলার কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে পারেন। এটি করলে লোকটির অতিরিক্ত প্রশ্ন করার সম্ভাবনা কম। কারণ সকলেরই প্রাইভেট স্পেস কে সম্মান করা উচিত।

আরেকটি উপায় বলে দেওয়া: আপনি কাজটি পারছেন না তবে আপনি জানেন কোন ব্যক্তির কাছে লোকটি সাহায্য পেতে পারেন তার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিন অথবা অন্য কোন উপায় বলে দিন।

অবাচনিক মাধ্যমে 'না' বলা; Image Courtesy: Dreams Time

অঙ্গভঙ্গির সাহায্য নেওয়া: আপনি আপনার মুখভঙ্গি ও শারীরিক ভঙ্গিমার সাহায্যে না করে দিতে পারেন ।

ফ্রী গিফট কম নেওয়া: আপনাকে অনেকেই  গিফট দিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করতে চাইবে।  সম্ভব হলে তাদের এড়িয়ে চলুন।

না’ বলেছি দেখে বেশি হতাশা ব্যাক্ত করা যাবে না; Image Courtesy: Free Pik

অতিরিক্ত আফসোস না করা: আপনি একটা কাজে না বলেছেন বলে বেশী আফসোস করলে ঐ ব্যক্তি ভাববে আপনার কাজটি করতে বেশি ইচ্ছা হচ্ছে। তখন হিতে বিপরীত হতে পারে।

ভবিষ্যতে জানিয়ে দিব:  তাৎক্ষণিক কাজটি না করলেও ভবিষ্যতে সুযোগ মিললে আপনি কাজটি করবেন এমনটা আপনি জানিয়ে দিলে ভালো হয়। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আপনি কেবল সময় ও সুযোগ মিললেই তাকে সাহায্য করতে পারবেন এমনটা জানাবেন। এতে লোকটি অযথা আপনার আশায় বসে থাকবে না।

নিজ সাধ্যমতো সাহায্য করা; Image Courtesy: Human Window

কিছু অংশে হ্যাঁ এবং কিছু অংশে না: সবসময় সম্পূর্ণ কাজটিকে ‘না’ বলে দিতে হবে তা নয়।  কেবল আপনার পছন্দ এবং সাধ্য মতো যা করতে পারবেন ততটুকুর জন্যই হ্যাঁ বলতে পারেন।

মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়া: নিজের মূল্যবোধে আঘাত আনতে পারে এমন কোনো কিছু তে ‘হ্যাঁ’ না বলাই উত্তম।

সমস্যায় পড়ে না: আপনি জানতেন কাজটি আপনি করতে পারবেন তবে কাজের মাঝে সমস্যায় পড়ে গেলেন এবং আপনি বুঝে গেলেন এই কাজ করা আর সম্ভব হচ্ছে না। তখন সেটা লোকটিকে তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেওয়া উচিত। শেষ মুহূর্তে জানানো হলে ব্যক্তিটির ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

অন্যজনের অজুহাত দেয়া:  আপনি আপনার কোন বন্ধু বা আত্মীয় সমস্যার কারণ দেখিয়ে কাজটিকে না করে দিতে পারেন।

শেষ কথা

আপনাকে সবসময় স্মরণ রাখতে হবে আপনি একা সব কাজ করতে পারবেন না। যে কাজ করতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না সেই কাজে আপনার ‘হ্যাঁ’ বলা উচিত নয়। তাছাড়া আপনার নিজেরও কাজ থাকতে পারে। ওয়ারেন বাফেট বলেছিলেন, “অধিক সফল ও সফল ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য হচ্ছে অধিক সফল ব্যক্তিরা প্রায় সব কিছুতেই ‘না’ বলে থাকেন। আর স্টিভ জবস বলেছিলেন, “একটা আইডিয়াকে ‘হ্যাঁ’ বলা মানে অন্য হাজারটা আইডিয়াকে ‘না’ বলে ফেলা।”



Feature Image Courtesy: agileleanlife.com/

Reference:

কমিউনিকেশন স্কিল;  নিয়াজ আহমেদ, মোঃ জামাল উদ্দিন জামি, সাদিয়া তাসমিয়া

https://www.inc.com/jonathan-alpert/7-ways-to-say-no-to-someone-and-not-feel-bad-about-it.html