আমেরিকা স্বাধীনতা পাওয়ার পরও সেখানে ছিল কিছু স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলোতে থাকতেন আমেরিকার বিভিন্ন আদিবাসী গোত্রের মানুষেরা। প্রতিটি গোত্রের একজন প্রধান ছিলেন। তাদের ছিল নিজস্ব বিচারব্যবস্থা। প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও ছিল স্বতন্ত্র। গোত্রগুলো ছিল স্বনির্ভর। নিজেরাই আবাদ করে খেত সেখানকার মানুষ। তারা ধরে রেখেছিল নিজস্ব রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি।

আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন ঠিক করলেন এই মানুষগুলোকে সাদা মানুষদের মত শিক্ষা-দীক্ষা দিতে হবে। তাদেরকে সভ্য করে তুলতে হবে। অভ্যস্ত করতে হবে সাদাদের মত খাদ্যাভাসে, পোশাকে, রীতি-নীতিতে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন ভেবেছিলেন সাদাদের সাথে আদিবাসীদের মিশে যাওয়াটা অনিবার্য। আর এই গ্রামগুলোতেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে সাদাদের সেটেলার হিসেবে আনা দরকার। তুলা চাষের সুবিধার্থে এখানে কারখানা স্থাপন করলে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে বলে তার ধারণা ছিল। তবে সেজন্য এই বিপুল জমি-জমা অধিগ্রহণ করার পাশাপাশি আদিবাসীদের অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা প্রয়োজন। ১৮০৩ সালে কেনা লুইসিয়ানা দ্বীপের কথা ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর কথা চিন্তা করে আর আগাননি খুব একটা।

শেষপর্যন্ত প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জ্যাকসন উদ্যোগ গ্রহণ করেন গ্রামগুলো অধিগ্রহণের। ১৮৩০ সালের ২৮ মে সিনেটে পাশ হয় ইন্ডিয়ান রিমুভাল অ্যাক্ট। এই অ্যাক্টের আওতায় গ্রামগুলোর আদিবাসী গোত্রপ্রধানদের ভালোরকম আর্থিক সুবিধা দিয়ে, তাদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পাঁচটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে মিসিসিপি-র পূর্বে তাদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় স্থানান্তরের কথা ছিল।

আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন; Image Courtesy: britannica.com

কিন্তু অল্প কিছু মানুষ রাজি হলেও গ্রামগুলোর বেশিরভাগ মানুষই রাজি ছিলো না এভাবে নিজ ভিটা-মাটি ছেড়ে যেতে। তারা চায়নি তথাকথিত সভ্যতার নামে নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে।

কিন্তু এন্ড্রু জ্যাকসনও হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি রিমুভাল অ্যাক্টে উল্লেখিত চুক্তিগুলো মানার প্রতি তেমন আগ্রহ দেখালেন না। আলাপ-আলোচনা বা আর্থিক সুবিধাপ্রদানের দিকে না হেঁটে তিনি নিলেন ভিন্ন এক কৌশল।

প্রশাসনিক মদদে প্রচুর পরিমাণ সেটেলার আসতে থাকলো এই গ্রামগুলোতে। তখন আমেরিকায়জর্জিয়া, উত্তর ক্যারোলিনা, টেনেসি, আলাবামা, ফ্লোরিডার মত অঙ্গরাজ্যগুলো নতুন গড়ে উঠেছে। এই গ্রামগুলো ছিল মূলত এসব অঙ্গরাজ্যের ভেতর, তবে স্বায়ত্তশাসিত এলাকা হিসেবে। আমেরিকার দক্ষিণে এবং মিসিসিপির পশ্চিম তীরে ছিল আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর বসতি। যে পাঁচটি আদিবাসী গোষ্ঠীকে সভ্য করে তোলার কথা বলা হচ্ছিলো সেগুলো হলো- চিরোকী, ক্রীক, সেমিনোল, চোকটাও, চিকসও।

ঘটনার মূল হোতা এন্ড্রু জ্যাকসন; Image Courtesy: allthatsinteresting.com

নতুন নতুন অঙ্গরাজ্য গড়ে ওঠার সাথে সাথে এখানে সাদা চামড়ার মানুষেরা বসতি গড়ে তোলে। কিন্তু সেই বসতি বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, তারা ঢুকে পড়তে থাকে এই আদিবাসী গ্রামগুলোর সীমানায়। আর তুলার মিল বসানোর পরিকল্পনা তো ছিলোই। তাই প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জ্যাকসনও মদদ দিতে থাকেন এদের।

আগেই উল্লেখ করেছি, রিমুভাল অ্যাক্টের ধারাগুলো মানার ইচ্ছা তার ছিল না। তাই কোনরকম আর্থিক প্রণোদনা ছাড়াই প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে তিনি শুরু করলেন আদিবাসী উচ্ছেদ

১৮৩১ সাল থেকে শুরু হয় এই উচ্ছেদের কাজ। একদিকে বানের জলের মত আসতে থাকে সাদা চামড়ার সেটেলাররা, আরেকদিকে আদিবাসীদের ওপর তৈরি হয় গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার চাপ। প্রথম আক্রমণটা আসে চোকটাও গোষ্ঠীর মানুষদের ওপর। স্থানীয় সরকারের মদদে সেটেলাররা দখল করে নিতে থাকে তাদের বাড়ি-ঘর। তাদের জমি-জমা দখল ও বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটতে থাকে নিয়মিত। চোকটাওরা এই ঘটনায় তেমন কোন প্রতিবাদ করতে পারেনি। মিসিসিপির পূর্বে তাদের পুনর্বাসনের জন্য করা জায়গার উদ্দেশ্যে দলে-দলে রওনা হয় তারা। কিন্তু বিপদসংকুল এই যাত্রা কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে, অনাহারে, কলেরায় সব মিলিয়ে প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

চিরোকী গোষ্ঠীর প্রধান জন রস; Image Courtesy: allthatsinteresting.com

চোকটাওদের প্রধান আলাবামার এক পত্রিকাকে বলেছিলেন এই ট্রেইল রক্ত আর মৃত্যুর এই যাত্রা দুঃস্বপ্নসম

এদিকে চিরোকীদের প্রধান জন রস কিন্তু মেনে নিলেন না এমন নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্ত। তিনি সোজাসুজি কোর্টে গেলেন। তাদের বিচার চাইবার ক্ষেত্রটি অনেকটাই সংকুচিত করা হয়েছিল রিমুভাল অ্যাক্টে। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। প্রথমে বিচারক জন মার্শাল কেসটি নিতে চাননি। কোর্ট সোজাসুজি বলে দিয়েছিল এ বিষয়ে তাদের কোন এখতিয়ার নেই। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ১৮৩২ সালে আবারো কোর্টে যান তিনি। এবার কোর্ট বলে এ বিষয়ে কোন জোর-জবরদস্তির অধিকার নেই কেন্দ্রীয় কিংবা প্রাদেশিক সরকারের। আপাতাত কিছুটা স্বস্তি মিললো তাদের।

এদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রও বসে নেই। চোকটাওদের পর এবার তারা সেমিনোলদের উৎখাতে নামলো। ১৮৩২ এর ঘটনা সেটা। সেমিনোলরা এমনিতেও লড়াকু জাতি। তারাও ছেড়ে দিতে চাইলো না নিজেদের জায়গা-জমি। বেঁধে গেলো যুদ্ধ। তবে আমেরিকার সেনাবাহিনী, পুলিশদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি তারা। দুই বছর চলে এমন অবস্থা। তাদের বেশকিছু মানুষ হতাহত হয়। শুরু হয় গণগ্রেফতার। বিদ্রোহীদের পেছনে লেলিয়ে দেয়া হয় শিকারী হাউন্ড। ১৮৩৪ সাল থেকে তারাও নিজেদের ভিটে-মাটি ছেড়ে দলে দলে যেতে থাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে। পথে অনাহারে, কলেরায়,  শীতে জমে গিয়ে তাদেরও হতে থাকে নির্মম মৃত্যু। সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মানুষকে হারায় সেমিনোল-রা।

ট্রেইল অব টিয়ারস এর বিভিন্ন রুট; Image Courtesy: Wikipedia.com

এই একই পরিণতি হয় চিকসও গোষ্ঠীরও। চোকটাও ও চিকসও-রা মূলত বাস করত মিসিসিপির পশ্চিমে। জোরপূর্বক মিসিসিপির পূর্বে করা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হতে থাকে তাদেরও। তেমন শক্ত প্রতিরোধ গড়তে পারেনি তারাও। ট্রেইল ধরে হেঁটে যাওয়ার সেই বিপদসংকুল যাত্রায় প্রাণ হারায় তাদের প্রায় তিন হাজার মানুষক্ষুধা-পিপাসা, কলেরা, আর সাথে সেই অস্বাভাবিক ঠাণ্ডায় জমে মরা- চোকটাও বা সেমিনোলদের মত তাদেরও সেই একই পরিণতি।

তবে তুলনামূলক সহজে সরানো গিয়েছিল ক্রীক জনগোষ্ঠীর লোকেদের। তারা মূলত আর্থিক চুক্তির বিনিময়ে দক্ষিণে তাদের বসতি ছেড়ে পাড়ি জমায় মিসিসিপির পশ্চিমে। তবে মৃত্যুর বিষয়টি তাদেরও পিছু ছাড়েনি। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে সংখ্যায় কম হলেও দীর্ঘযাত্রায় মৃত্যু হয়েছিল তাদের অনেকের।

এদিকে চিরোকীদের নেতা জন রস তখনও হাল ছাড়েননি। ১৮৩২ এ কোর্টের রায় তাদের পক্ষে এলেও সরকারের সেসব মানার কোন আগ্রহ ছিলো না। চিরোকীরা ছিলেন এই পাঁচ জনগোষ্ঠীর ভেতর সবচেয়ে উন্নত। জন রস নিজেও ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি বিশ্বাস করতেন আধুনিকতার সাথে নিজেদের সংস্কৃতির সামঞ্জস্য রক্ষায়। তাঁকে ৩ মিলিয়ন ডলার অফার করা হয় রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে তখন বসেছেন মার্টিন ফন বুরেন। তিনি নানাভাবে চেষ্টা করেন জন রসকে কেনার। কিন্তু লাভ হয়নি। রস বুঝেছিলেন সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। তাই তিনি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না এই প্রস্তাবে।

ছবিতে ট্রেইল অব টিয়ারস; Image Courtesy: History.com

তখন ভিন্ন একটি চাল দেয় রাষ্ট্রযন্ত্র। জন রসের বিরোধী পক্ষকে অফার করা হয় ৫ মিলিয়ন ডলার। তারা রাজি হয়ে যায়! আর তাদের সাথে অভিজাতদেরও কয়েকজন হাত মেলান। তারা ‘ট্রিটি অভ নিউ ইকোটানামে চুক্তিসাক্ষর করেন ১৮৩৫ এর ডিসেম্বরেফলে চিরোকীদের তাদের ভূমি থেকে উৎখাতও সহজ হয়ে যায়।

তবে জন রস এই চুক্তি মেনে নেননিতিনি চুক্তি প্রত্যাখান করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষদেরও একটা অংশ বিভ্রান্ত হয়। তারা নতুন জায়গায় যেতে চাচ্ছিল উন্নত জীবনের আশায়। তবে বেশিরভাগ মানুষ তখনও রাজি ছিল না।

প্রেসিডেন্ট মার্টিন এবার কঠোর হন। অত্যাচার-নির্যাতন-দখলদারিত্ব শুরু হয়। ক্যাম্প করে চিরোকীদের সেখানে রাখা হয়। নির্ধারণ করে দেয়া হয় সীমানা। কেউ সীমানা পেরিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলেই চালানো হতো গুলি! ক্যাম্প থেকে তাদের নতুন আবাসে পুনর্বাসন শুরু হয়। কিন্তু অত্যধিক গরমে যাত্রাপথেই মারা যাচ্ছিল অনেকে। ফলে সময় পিছিয়ে শীতে নেয়া হয়।

সেবারের শীত ছিল ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র। ফলে যাত্রাপথে ঠাণ্ডায় জমে মারা যেতে থাকে প্রচুর মানুষ। সাথে কলেরা বা ক্ষুধার জ্বালা তো ছিল-ই। ১২০০ মাইল পথ পেরোতে গিয়ে মারা যান চিরোকীদের প্রায় চার হাজার মানুষ।

বেঁচে যাওয়া চিরোকীদের একজন- এলিযাবেথ স্টিভেন্স; Image Courtesy: allthatsinterseting.com

আদিবাসীদের এই উৎখাত চলেছিল ১৮৭০ সাল পর্যন্ত। সবমিলিয়ে তাদের ট্রেইল ধরে পাড়ি দিতে হয়েছিল ৫০৪৩ মাইল!মোটাদাগে নয়টি অঞ্চল অতিক্রম করেছিলেন তারা। এগুলো হলো- আলাবামা, আরকানসাস, জর্জিয়া, ইলিনয়, কেনটাকি, মিসৌরি, উত্তর ক্যারোলিনা, ওকলাহোমা ও টেনেসি।

তাদের ব্যাপক-বিস্তৃত ভূমিগুলো এরপর থেকে পুরোমাত্রায় চলে যেতে থাকে সেটেলার দস্যুদের দখলে। রাষ্ট্রীয় মদদে সংঘটিত এই নিপীড়ন ও উচ্ছেদের ফলে বাস্তুহারা হয়েছিল প্রায় এক লাখ মানুষ। মারা যায় প্রায় পনেরো হাজার।  

ঘটনার স্মরণে নির্মিত মনুমেন্ট; Image Courtesy: Wkipedia.com

১৯০৭ সালে ওকলাহোমা আমেরিকার অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকায় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সমাপ্তি ঘটে।

তবে ইতিহাসের পাতায় মানুষের এই দীর্ঘ পদযাত্রা আর রক্ত-অশ্রু-মৃত্যুর কথা লেখা হয়ে গেছে ট্রেইল অফ টিয়ারস নামে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের নামে কী করে ভিটে-মাটিছাড়া করা হয়েছিল আমেরিকার আদিবাসীদের, কী করে ঠেলে দেয়া হয়েছিল মৃত্যুর মুখে- সেসব কিছুই আজও ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে।  

Feature Image Courtesy: cnn.com

References:

1. Allthatsinteresting.com

2. History.com