টানেল অফ লাভ

আচ্ছা, বাঙালিরা তো সবসময়ই বিরাট সাহসী। আপনিও কি চাঁদের পাহাড়, কাকাবাবু, ফেলুদার নায়কদের মত কখনো বুকে সাহস নিয়ে কোনো সুড়ঙ্গে টুক করে ঢুকে পড়েছেন? ভেতরে কেমন যেন একটা ছমছমে পরিবেশ, তাই না? এই বুঝি পায়ের তলা থেকে কিছু বের হলো, এই বুঝি কোনো অজানা কিছুর আবির্ভাব হলো ভেবে ভেবে বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করে। গভীরে যেতে যেতে তো আবার মনে হয়, “আর যদি বের না হতে পারি কী হবে তখন?” আচ্ছা এমন সময় অন্ধকারে হঠাৎ করে যদি অজগর সাপের লেজে পা দিয়ে ফেলেন অথবা কোনো এক বিশালাকৃতির জন্তুর সামনে গিয়ে পড়েন, কী হবে? হুহ! কী আর হবে, সোজা কেল্লা ফতে।

এখন যদি বলি একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে যাওয়ার পর আপনার আর বের হতে ইচ্ছে করবে না। মন চাইবে সুড়ঙ্গের সৌন্দর্য চোখে লেগে থাকুক আমৃত্যু। এমনকি পুরো পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হলেও সেখানে থেকে যেতে চাইবেন। বিশ্বাস হচ্ছে না তাই তো? ভাবছেন, “ধুর! যত্তসব আজগুবি কথা। এসব আবার হয় নাকি।”

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। এরকমই একটি সুড়ঙ্গ আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। যার নাম ‘টানেল অফ লাভ’। নামের মতই প্রেমময়ী সৌন্দর্যের অধিকারী এই সুড়ঙ্গটি অবস্থিত ইউক্রেনের ক্লেভান শহরে।

ট্রেন চলাচলরত টানেলের রূপ; Image Courtesy: rfel.rl.com

কয়েক বছর আগেও এই টানেলের খবর জানা ছিল না কারোর। ২০০১ সালে আরএফইএল/আরএল’র সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার অ্যামস চ্যাপল এর একটি প্রতিবেদন ইন্টারনেটে প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া ফেলে এই টানেল অফ লাভ। তারপর থেকেই শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। চ্যাপল জানান, ক্লেভান এবং ওরঝিভ গ্রামের কেইভেল-রিভনা  লাইনের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই অসাধারণ টানেলটি। গ্রামটি থেকে প্রায় সাত কি.মি দূরবর্তী স্থানে এই টানেলের প্রবেশপথ শুরু। ক্লেভান শহরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সৌন্দর্যমণ্ডিত এই টানেল অফ লাভ-এর ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, টানেলটি মূলত একটি রেললাইনের পরিবেশ থেকেই তৈরি। অর্থাৎ বর্তমানে যেখানে টানেল তথা সুড়ঙ্গটি রয়েছে, আগে সে জায়গাটি রেললাইনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

ম্যাপে টানেল অফ লাভ ও ওডেক প্লাইউড ফ্যাক্টরির অবস্থান; Image Courtesy: businessinsider.com

আরও জানা যায়, ওরঝিভের কাছাকাছি এসে সিঙ্গেল ট্র‍্যাক রেলপথটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি গেছে ক্লেভানের দিকে এবং অপরটি চলে গেছে একটি মিলিটারি বেইজ এর রাস্তা বরাবর। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সেই ট্র‍্যাকটি ব্যবহার করা হত মিলিটারি সরঞ্জাম ট্রেনে করে আনা-নেয়ার জন্য। আর সেটি গোপন রাখতে রেলপথের পাশে ঘন গাছপালা রোপণ করা হয়েছিল যাতে দূর থেকে তাদের কার্যক্রমের উপর কেউ নজর না রাখতে পারে। তবে গুগল ম্যাপে এখনো সেই জায়গায় মিলিটারি বেইজের অবস্থান আছে বলে জানা গেছে এবং সেখানে যুদ্ধে ব্যবহৃত অনেক যানবাহনের উপস্থিতি বিদ্যমান।

এ তো গেল পেছন দিকের গল্প। বর্তমানে সৌন্দর্যের পরিচায়ক টানেল অফ লাভ –র অসাধারণ রূপের পেছনে যার হাত রয়েছে সেটি হলো দ্য ওডেক প্লাইউড ফ্যাক্টরি।  ক্লেভান থেকে কারখানা পর্যন্ত কাঠ সহজে কাঠ পৌঁছানো এবং পরবর্তী সময়ে ক্লেভানের পশ্চিম প্রদেশে উৎপাদিত পণ্য স্থানান্তর করার জন্য নিজ মালিকানায় ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়। সেসময়ে রেললাইনের সীমানা পরিচয়ে দুই পাশে লাগানো হয় ফ্লোরা ফুলের গাছ। ১.৮ কি.মি ব্যাপী রেললাইনের মধ্যে ট্রেন সারাদিনে মাত্র তিনবার আসা যাওয়া করে। ফলে গাছগুলোও অনায়াসেই খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। একসময় বড় হয়ে দু’পাশের গাছের ডালপালা একত্রিত হয়ে টানেলের আকৃতি ধারণ করে। যার বর্তমান রূপ অভিভূত করে প্রায় সকলকে।

আর তাই টানেল অফ লাভের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ হারে। সবুজের রাজ্যে যখন সূর্যের কিরণের পরশ পাওয়া যায়, বর্ণিল রঙে ফটোগ্রাফারের ক্যামেরাও যেন নিজেকে ধন্য মনে করে। দেশটির সরকার এবং কারখানা কারোরই কোনো হস্তক্ষেপ নেই এর উপর তাই টানেলটি সার্বক্ষণিকই উন্মুক্ত থাকে দর্শনার্থীদের জন্য।

গ্রীষ্মকালে টানেল অফ লাভ; Image Courtesy: 4.bp.blogspot.com

মোহনীয় সৌন্দর্যের প্রতীক টানেল অফ লাভ একেক সময় একেক বেশভূষায় সজ্জিত হয়। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বসন্ত প্রতি সময়ে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজায় তাকে। আপনি যদি গ্রীষ্মের গরমে টানেলে ভ্রমণ করতে যান তাহলে দেখার সুযোগ পাবেন পত্রশুণ্য ডালপালা কীভাবে আলিঙ্গন করে আছে একে অপরকে। আর শীতকালে গেলে আপনাকে স্বাগত জানাবে টানেলের বরফের রাজ্য। তখন অবশ্য হেঁটে হেঁটে কল্পনা করতে আপনাকে কিছুটা বেগ পেতে হবে। সেজন্যই সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হল বসন্তকাল। বসন্তকালে আপনার চারপাশ যেমন সবুজ থেকে সবুজতর হয়ে ওঠে সেখানে টানেল অফ লাভ  বোধ হয় আপনাকে একটু বেশিই সতেজতা উপহার দিতে পারবে। যার অন্য একটি নাম গ্রিন মাইল টানেল।  নির্জনতম জায়গাটি তখন যেন পুরো একটি স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। কী? বিশ্বাস হচ্ছে না? বেশ তবে ঘুরে আসুন না, তারপর না হয় বলবেন।

ভালোবাসার প্রতীক টানেল অফ লাভ; Image Courtesy: inhabitat.com

মনে প্রশ্ন জাগছে না, সুড়ঙ্গপথের নাম টানেল অফ লাভ কেন? তবে কি ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। ভালোবাসার সম্পর্কই শুধু নয় রীতিমত মানত করার প্রথাও চালু আছে এই টানেলটিকে ঘিরে। সবুজে ঘেরা এই মায়াবী সৌন্দর্যের টানেলে প্রেমিকযুগলের আনাগোনাই সবচেয়ে বেশি। শোনা যায় কোনো প্রেমিক দম্পতি যদি এই টানেলে একে অপরের হাত ধরে হাঁটে এবং কোনো প্রার্থনা করে সেটি নাকি পূরণও হয়। তাই আপনার ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে সেখানে গেলে দেখা পেতে পারেন আপনার মতই কয়েক দম্পতিকে। মাত্র তিনবার ট্রেন চলাচল ছাড়া আপনার ব্যক্তিগত মুহূর্তে বিরক্ত করার মত আর কিছু নেই। চাইলে দুজন দুজনের হাত ধরে পুরো টানেলটি প্রদক্ষিণ করতে পারবেন যতবার খুশি ততবার। সুযোগ থাকলে আর অপেক্ষা কেন? চলে যান আপনার ভালোবাসার মানুষকে সাথে নিয়ে। সবার মতন আপনারও রোমান্টিক কিছু মূহুর্তের সাক্ষী হয়ে থাকবে টানেলঅফ লাভ। আর আমি যে এত কিছু বললাম তার বদলে আমাকে কী দেবেন শুনি?

Feature Image Courtesy: businessinsider.com

References: