গেইম অফ থ্রোনসের

প্রায় নয় বছর ধরে চলতে থাকা ফ্যান্টাসি ঘরানার টিভি সিরিজ গেইম অফ থ্রোনস ২০১৯ সালে এসে শেষ হয়। বিশ্ব জুড়ে অগণিত মানুষকে সর্বশেষ সিজন দিয়ে গেইম অফ থ্রোনস হতাশ করলেও সব মিলিয়ে টিভি সিরিজ ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক সিরিজ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসবে। ২০১১ সালের ১৭ এপ্রিলে প্রথম এপিসোড মুক্তি পাওয়ার পর অবশেষে ২০১৯ সালের ১৯ মে এই সিরিজটির সর্বশেষ এপিসোডটি মুক্তি পায়। তারই মধ্য দিয়ে ড্রাগন, হোয়াইট ওয়াকার, র্যাভেন ইত্যাদি বিচিত্র কল্পকাহিনীর ইতি ঘটে। আজ আমরা জানবো গেইম অফ থ্রোনস-এর কিছু মজার ও আজানা দিক।

পুরষ্কার হাতে গেইম অফ থ্রোনসের কলাকুশলীরা; Image Courtesy: Popsugar
পুরষ্কার হাতে গেইম অফ থ্রোনসের কলাকুশলীরা; Image Courtesy: Popsugar

.
স্বাভাবিকভাবেই অন্য যে কোনো টিভি সিরিজ থেকে বেশি বাজেট দিয়েই নির্মাণ করা হয়েছে এই কালজয়ী সিরিজ। কিন্তু টাকার পরিমানটাই বা কত? সর্বশেষ সিজনের প্রতিটি এপিসোড নির্মাণ করতে এইচবিও খরচ করেছে ১৫ মিলিয়ন ডলার। সিজন ৬ পর্যন্ত যেটি ছিলো ৬ মিলিয়ন ডলার। তবে এই বাজেট সিরিজের কলাকুশলীদের পাওয়া টাকার অঙ্ক বাদ দিয়েই গণনা করা হয়েছে। শুধুমাত্র প্রধান পাঁচ ক্যারেক্টার ডেনেরিস, সার্সেই, জন স্নো, টিরিয়ন ও জেইমি ল্যানিস্টার চরিত্রে অভিনয় করা কলাকুশলীরা এপিসোড প্রতি পকেটে পুরেছেন ৫ মিলিয়ন ডলার। এছাড়াও হাজার হাজার ক্রু ও অসংখ্য সেটে নিয়ে গেইম অফ থ্রোনস এখন পর্যন্ত শুটিং করা হয়েছে ৮ টি দেশে।

২.
প্রথম সিজনেই নেড স্টার্কের মৃত্যু নাড়া দিয়েছিলো সবাইকে। ক্যামেরার সামনে নেড স্টার্কের চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন অভিনেতা শন বিন। প্রথম সিজনে মারা যাবেন সেটি শন বিন জানলেও জন স্নো এর আসল মা যে লিয়ানা স্টার্ক সে সম্পর্কে কিছুই জানতেন না শন বিন। অন্যান্য অনেক প্লট জানলেও এই ব্যাপারটি জানতেন না তিনি। সিজন ১ শেষে এক সাক্ষাৎকারে তাকে এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শন বলেছিলেন তিনি নিজেও এখনো জানে না জন স্নো-এর মা কে।

নেড স্টার্ক চরিত্রে শন বিন; Image Courtesy: HBO.com
নেড স্টার্ক চরিত্রে শন বিন; Image Courtesy: HBO.com

.
পুরো সিরিজ জুড়েই হুটহাট করেই অনেক জনপ্রিয় চরিত্রকে মেরে ফেলা হয়েছে। আর এ নিয়েই পর্দার বাইরেও বেধেছিলো বিপত্তি। সিরিজটির লেখক ও পরিচালক ডেভিড বেনিওফ পড়েছিলেন এই বিপাকে। তার অভিনেত্রী স্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে জন স্নো চরিত্রকে মেরে ফেলা হয় তিনি ডিভোর্স দিয়ে দিবেন বেনিওফকে। কে জানে হয়তো সেজন্যই জন স্নোকে আবার জীবিত করে তুলেছিলেন বেনিওফ। তবে শুধু বেনিওফ নয়, জর্জ আর মার্টিনও নিজের স্ত্রীর কাছে পেয়েছিলেন এমন হুমকি। আরিয়া কিংবা সানসাকে যাতে না মেরে ফেলেন বারবার তা স্মরণ করে দিয়েছিলেন মার্টিনের স্ত্রী।

.
টরেন্টফ্রিকের ভাষ্যমতে টানা ছয় বছর ধরে গেইম অফ থ্রোনস পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পাইরেটেড হওয়া শো। ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টানা ৬ বছর পাইরেটের দিক দিয়ে এটি ছিলো এক নাম্বারে। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দ্য ওয়াকিং ডেড থেকে দ্বিগুন বেশি অনৈতিকভাবে ডাউনলোড করা হয়েছে এই সিরিজ। অবশেষে ২০১৮ সালে এসে গেইম অফ থ্রোনসকে টপকে যায় দ্য ওয়াকিং ডেড। এর পিছনে কারণ ছিলো ২০১৮ সালে গেইম অফ থ্রোনস এর কোনো এপিসোড প্রকাশ না হওয়া। তবে ২০১৯ সালে আবারও এক নাম্বার স্থান দখল করে নিয়েছে এই বিখ্যাত টিভি সিরিজ।

৫.
সোফি টার্নারকে নিজের পরিণতি নিয়ে বোকা বানিয়েছিলেন জন স্নো। নিজের মৃত্যুর পর সানসা চরিত্রে অভিনয় করা সোফিকে জন স্নো জানিয়েছিলেন সিরিজে আর ফিরছেন না তিনি। আর সেটি বিশ্বাস করে জন স্নো কে তার কাজ ও তার সাথে কাজ করার অনুভূতি নিয়ে বিশাল এক চিঠি লিখেছিলেন সানসা। যেটি এখনো নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন কিট হ্যারিংটন।

জন স্নো এর জীবিত হয়ে উঠার দৃশ্য; Image Courtesy: Vanity Fair
জন স্নো এর জীবিত হয়ে উঠার দৃশ্য; Image Courtesy: Vanity Fair

৬.
স্পয়লার পেয়ে যাওয়ার ভয়ে শুধু নিজের পান্ডুলিপি বাদে স্ক্রিপ্টের আর কিছুই পড়তেন না মার্জারি টাইরেল। মার্জারি চরিত্রে অভিনয় করা নাটালি ডর্মার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে প্রথম সিজন তিনি সাধারণ দর্শক হিসেবেই উপভোগ করেছেন। দ্বিতীয় সিজনে গেইম অফ থ্রোনস এ যোগদান করলেও একজন ফ্যান হিসেবে পর্দার বাইরেও সিরিজটি উপভোগ করার জন্য স্পয়লারের ব্যাপারে বেশ সচেতন ছিলেন নাটালি।
৭.
মেলিসান্দ্রে চরিত্রটি পর্দার সামনে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ডাচ অভিনেত্রী ক্যারিস ভ্যান হাউটেন। কিন্তু শুরুতে জর্জ আর মার্টিন ও পরিচালকেরা সার্সেই চরিত্রের জন্য চেয়েছিলেন ক্যারিসকে। কিন্তু সেইসময় ইন্ট্রুডার্স মুভির শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাতে রাজি হন নি এই অভিনেত্রী।
৮.
ডেনেরিসের কল্যাণে খালিসী নামটি দুনিয়া ব্যাপি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ২০১৩ সালে মেয়েদের পছন্দের নামের তালিকায় ১০২১ নাম্বারে অবস্থান ছিলো এই নামটির। ২০১৪ তে যা দাঁড়ায় ৭৫৫ নাম্বারে। আর সর্বশেষ ২০১৮ সালে মেয়েদের জনপ্রিয় নামের তালিকায় ৫৬৯ নাম্বার স্থান দখল করেছে ‘খালিসী’ নামটি। খালিসীর পরে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে পরের দুটি গেইম অফ থ্রোনস ক্যারেক্টার নাম হচ্ছে আরিয়া ও টিরিয়ন।

ডেনেরিস চরিত্রে এমিলিয়া ক্লার্ক; Image Courtesy: Telegraph
ডেনেরিস চরিত্রে এমিলিয়া ক্লার্ক; Image Courtesy: Telegraph

৯.
সিরিজের সবচেয়ে ঘৃণিত ভিলেন হিসেবে বিবেচিত রামসি বোল্টন চরিত্রটি। যেই চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন ইয়ান রিয়ন। কিন্তু ভিলেনের পরীবর্তে হিরোই হতে পারতেন তিনি। টেলিগ্রাফের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অভিনেতা জানান যে প্রথমে জন স্নো চরিত্রের জন্য অডিশন দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জন স্নো এর পর তিনি ছিলেন দ্বিতীয় পছন্দ। তবে পরিচালকেরা শুরুতেই তাকে জানিয়ে দেন সিজন থ্রি তে একটি চরিত্রের জন্য তাকে মনে ধরেছে তাদের। তবে স্পয়লার যাতে না পেয়ে যান তাই তাকে সেই চরিত্রের নামটি সেই সময় জানাননি পরিচালকেরা। সিজন থ্রি এর চিত্রায়নের আগে এসে ইয়ান রিয়ন জানতে পারেন তার চরিত্রের নাম রামসি বোল্টন।
১০.
সিরিজ চিত্রায়ন শুরুর আগে অনুমতির জন্য ডেভিড বেনিওফ ও ডিবি ওয়েস গিয়েছিলেন জর্জ আর মার্টিনের কাছে। কিন্তু শুরুতে জর্জ আর মার্টিন কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। তার ধারনা ছিলো এই দুইজন তার বই ভালো করে না পড়েই সিরিজ বানাতে চাচ্ছে। আর তা না হলে ড্রাগন কিংবা হোয়াইট ওয়াকার এত সুবিস্তৃত প্লট নিয়ে সিরিজ বানানোর সাহস কেউই করতোনা। বই সম্পর্কে যাচাই করার জন্য মার্টিন তাদের একটি প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি ছিলো জন স্নো এর মায়ের নাম কি? ‘লিয়ানা স্টার্ক’ এই সঠিক উত্তর দেওয়ার পরই জর্জ মার্টিন সিরিজ বানানোতে সায় দেন।

দুই পরিচালকের সাথে লেখক জর্জ আর মার্টিন; Image Courtesy: Reddit
দুই পরিচালকের সাথে লেখক জর্জ আর মার্টিন; Image Courtesy: Reddit

১১.
অন্ধ মাস্টার আমন টারগারিয়ান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পিটার ভন। প্রকৃতপক্ষেই অন্ধ ছিলেন এই অভিনেতা। আর মাস্টার আমন ই ছিলো তার করা সর্বশেষ চরিত্র।
১২.
দুনিয়া জুড়ে অসংখ্য ভক্ত রয়েছে গেইম অফ থ্রোনসের। যার মধ্যে একজন সাবেক যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। ডাভোস চরিত্রে অভিনয় করা লিয়াম কানিংহাম জানান যে সিজন ৫ এর পর পরিচালকদের কাছে জন স্নো এর পরিণতি নিয়ে জানতে স্বয়ং বারাক ওবামাই ফোন করেছিলেন। তাই সিজন ৬ শুরুর আগেই বারাক ওবামা জেনে গিয়েছিলেন যে জন স্নো এর জীবিত হওয়ার ঘটনা।
১৩.
শুধুমাত্র গেইম অফ থ্রোনস সিরিজের জন্যই ডথরাকি নামে সম্পূর্ন একটি ভাষা তৈরী করা হয়। ২০১৪ সালে এইচবিও এর সাথে কাজ করে ডথরাকি ভাষাকে নতুন এক ভাষায় রুপদান করেন ভাষাতত্ত্ববিদ ডেভিড পিটারসন। খাল ড্রোগোর সেই ভাষা চাইলে ইন্টারনেট থেকে আপনিও শিখে বন্ধুদের চমকে দিতে পারেন।

সিজন এইটের একটি মূহুর্ত; Image Courtesy: Telegraph
সিজন এইটের একটি মূহুর্ত; Image Courtesy: Telegraph

১৪.
অনেক চরিত্র সিরিজে মেরে ফেলা হলেও জর্জ আর মার্টিনের বইয়ে এখনো জীবিত রয়েছে সেইসব চরিত্র। যার মধ্যে অন্যতম হলো শিরিন ও স্ট্যানিস ব্যারাথিওন, ব্যারিস্টান সেলমি, মাইরসেলা ব্যারাথিওন প্রমুখ। তবে জর্জ আর মার্টিনের দুইটি বই এখনো প্রকাশিত হয়নি। যেগুলো ২০২১ সাল নাগাদ প্রকাশিত হবে।
১৫.
পুরো সিরিজ ধরে বিভিন্ন চরিত্রের অদল বদল দেখা গিয়েছে দারিও নাহারিস কিংবা মাউন্টেনের চরিত্রেও অভিনেতা পরিবর্তিত হয়েছে। তবে অভিনেতা ইয়ান হোয়াইট সর্বমোট চারটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন পুরো সিরিজ জুড়ে। সাধারণত স্টান্ট চরিত্রে অভিনয় করা এই আইরিশ অভিনেতা সিজন ১ ও ২ এ ছিলেন হোয়াইট ওয়াকার। সিজন ৩ এ ছিলেন জায়ান্টের চরিত্রে। আর এরপরের সিজন গুলোতে ক্যামেরার সামনে ফুটিয়ে তুলেছিলেন গ্রেগর ক্লিগেন বা মাউন্টেনের চরিত্রটি।

Feature Image Courtesy: adayinthelifeoferikryman.blogspot.com