মার্কিন-স্পেন যুদ্ধ, নব্যসাম্রাজ্যবাদ ও কিউবার শাসন

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ফরাসী, স্প্যানিশ ও ব্রিটেনদের মতো অতটা পুরনো নয়। মার্কিন পরাশক্তির নব্যসাম্রাজ্যবাদ পাকাপোক্ত হয় মূলত উনিশ শতকের শেষ ভাগে যা জানা যায় ফেলে আসা ইতিহাস থেকে এবং এ সম্পর্কে জানতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক শতক পিছনে।

১৫ শতকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর ধীরে ধীরে আমেরিকায় ইউরোপিয়ানদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। সেখানে রেড ইন্ডিয়ানরা বিচ্যুত হতে থাকে শেতাঙ্গ জাতি দ্বারা। এভাবেই মূলত আমেরিকায় বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ১৮ শতকে মার্কিনরা ‘Ideology of Republicanism’ ধারণ করতে থাকে এবং ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরাশক্তির তকমা পাওয়ার আভাস আরও পরে সামনে আসে এবং তা ঘটে মার্কিন-স্প্যানিশ যুদ্ধের মাধ্যমে। এ যুদ্ধের সূত্রপাত স্পেনের কাছ থেকে কিউবান স্বাধীনতার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যা ১৮৫৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছিল। Cuban conflict-টি দ্বীপে মার্কিন বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকারক ছিল যার আনুমানিক মূল্য ছিল বার্ষিক $৫০ মিলিয়ন এবং কিউবান বন্দরগুলির সাথে মার্কিন বাণিজ্য প্রায় শেষ হয়েছিল যার মূল্য ছিল বার্ষিক $১০০ মিলিয়ন ডলার।

১৫ শতকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার করে; Image Courtesy: gray-wilx-prod.cdn.arcpublishing.com

মার্কিন মুদ্রা স্বার্থের উপর এর প্রভাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমেরিকান মানবিক মনোভাবের আবেদন। স্পেনীয় কর্তৃপক্ষ কিউবান পুনর্গঠনকারীদের জন্য আশ্রয়, খাদ্য, স্যানিটেশন বা চিকিৎসার যত্নের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেনি। যাদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ এক্সপোজার, ক্ষুধা এবং রোগে মারা গিয়েছিল। এই শর্তগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য চাঞ্চল্যকর সংবাদপত্রগুলির দ্বারা চিত্রিত হয়েছিল (উল্লেখযোগ্যভাবে জোসেফ পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড এবং উইলিয়াম র্যান্ডলফ হার্স্টের সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত নিউ ইয়র্ক জার্নাল)।

স্পেন ৯ই এপ্রিল একটি যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং কিউবার স্ব-সরকারের সীমাবদ্ধ ক্ষমতা প্রদানের জন্য তার নতুন কর্মসূচিকে ত্বরান্বিত করে। তবে মার্কিন কংগ্রেস শীঘ্রই এমন রেজ্যুলেশন জারি করে যা হাভানার স্বাধীনতার অধিকার হিসাবে ঘোষিত হয়, দ্বীপ থেকে স্পেনের সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানায় এবং কিউবার জোটবদ্ধকরণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো নকশাকে বাতিল করে দেওয়ার পরে রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম ম্যাককিনলে এই শক্তি প্রত্যাহারের জন্য বল প্রয়োগের অনুমতি দেয়।

কিউবা ইস্যুতে মার্কিন-স্প্যানিশ যুদ্ধ সংগঠিত হয়; Image Courtesy: assets.sutori.com

স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগ্রামরত ঔপনিবেশিক মানুষের প্রতি আমেরিকান সহানুভূতির সাথে ভোগা কিউবানদের জন্য মানবিক উদ্বেগ যুক্ত হয়েছিল। আর কিউবার মধ্যেই স্বাধীনতাকামী জাতির জন্যই মার্কিনদের আরও সহজ হয়ে যায় স্পেনের বিরুদ্ধে লড়াই। স্পেনের তখন মার্কিন সামরিক শক্তি পর্যবেক্ষণের অত সময় ছিল না ফলে সে সম্পর্কে ধারণা করতেও ব্যর্থ হয় তারা। তাই একদিকে দেশের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বিপ্লবী গোষ্ঠী, অন্যদিকে মার্কিন পরাশক্তি ঘায়েল করার উদ্দেশ্য নিয়েই স্পেন ১৮৯৮ সালের ২৪ এপ্রিল তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ ঘোষণা করে।

মার্কিন-স্পেন যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী স্প্যানিশ বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয় এবং আমেরিকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়াম, পুয়ের্তো রিকো এবং ফিলিপাইন জয় করে নেয়। ফিলিপাইন ইস্যুটি সহজ হয় এইজন্য যে এই দেশটিও তখন স্পেন ঔপনিবেশিক ছিল। ফলে সেখানেও স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে এবং যুদ্ধে মার্কিনেরা অনুকূল পরিবেশ লাভ করে।

চার মাসব্যাপী দীর্ঘ এই যুদ্ধে ২ হাজার ৪৪৫ মার্কিন সদস্য প্রাণ হারায়। বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার স্প্যানিশ সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ইউএস টুডের এক প্রতিবেদনে এই যুদ্ধের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মার্কিন-স্প্যানিশ যুদ্ধের মাধ্যমে কিউবা স্বাধীনতা লাভ করে; Image Courtesy: britannica.com

স্পেন-আমেরিকান এই যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিল প্যারিস চুক্তিটির মাধ্যমে যা ১৮৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্পেন কিউবার সমস্ত দাবি ত্যাগ করে গুয়াম এবং পুয়ের্তো রিকোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমর্পণ করে এবং ফিলিপাইনের উপর সার্বভৌমত্বকে ২০ মিলিয়ন ডলারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত করে। আবার এই ফিলিপাইনের সাথে ১৮৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বাধে কারণ ফিলিপাইন প্যারিস চুক্তি মোতাবেক মার্কিন পরাশক্তির অধীন হতে অস্বীকৃতি জানায়। এভাবেই স্পেন ঔপনিবেশিককাল থেকে কিউবা পদার্পণ করে নতুন যুগে, স্বাধীনতার তকমা লাগিয়ে। যদিও তা মোটেও স্বাধীনতা ছিল না কারণ এ সবই ছিল মার্কিন পরাশক্তির নব্যসাম্রাজ্যবাদের রূপ।

কিউবায় এস্ট্রাদা পালমার অধীনে ১৯০২ সালের ২০ মে রিপাবলিকান প্রশাসন গড়ে ওঠার পিছনে ছিল মূলত মার্কিন প্রভাব। ১৯০৬ সালের নির্বাচনের প্রভাব সেপ্টেম্বরের বিদ্রোহ এবং দ্বিতীয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দখলের দিকে নিয়ে যায়। মার্কিন যুদ্ধের সেক্রেটারি উইলিয়াম হাওয়ার্ড টাফট এই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হন এবং এস্ট্রদা পালমা পদত্যাগ করেন। ফলত চার্লস মাগুন অস্থায়ী গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। একটি উপদেষ্টা কমিশন নির্বাচনী পদ্ধতি সংশোধন করে এবং ১৯০৯ সালের জানুয়ারিতে মাগুন সরকারকে লিবারেল রাষ্ট্রপতি জোসে মিগুয়েল গমেজের হাতে সোপর্দ করেন। এদিকে ২০ দশক পর্যন্ত চিনির বাজার দখলের ফলে কিউবার অর্থনীতি অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবৃদ্ধির পথে ছিল।

এস্ট্রাদা পালমার; Image Courtesy: cubacute.com

গমেজ প্রশাসন ১৯০৯ সাল পর্যন্ত কিউবার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য বিশেষত আফ্রো-কিউবানদের দুর্নীতি, কুফল, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার একটি প্যাটার্ন সেট করে। এভারিস্টো এস্তেনোজ এবং পেদ্রো আইভনেটের নেতৃত্বে আফ্রো-কিউবানরা উন্নততর চাকরি এবং আরও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা সুরক্ষিত করার জন্য সংগঠিত হয়। ১৯১২ সালে সরকারী সেনারা ওরিয়েন্ট প্রদেশে বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এসবই ছিল মার্কিন পরাশক্তির রিমোট কন্ট্রোল।

একে একে মারিও গার্সিয়া মেনোকাল, আলফ্রেডো জায়েস, জেরার্ডো মাচাডো ই মোরালেস, ফুলজেনসিও বাতিস্তা শাসনামল মার্কিনপন্থী প্রশাসনের অধীনে দুর্নীতির ধারা অব্যাহত ছিল। কারচুপি, সেনা এবং হত্যাকারীদের দ্বারা ক্ষমতা অধিষ্ঠিত মাখাদো অন্যতম কুখ্যাত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। মার্কিন সরকার বামপন্থী দলগুলোকে ১৯৩৩ সালের তথাকথিত বিপ্লবে তাকে উৎখাত করতে সহায়তা করেছিল যার ফলে ক্ষমতায় আসে বাতিস্তা।

কিউবার স্বৈরশাসক বাতিস্তা; Image Courtesy: pinterest.com

চিনি থেকে কিউবার আয় তখন প্রচুর ছিল যা এখনও রপ্তানি আয়ের চার-পঞ্চমাংশ হিসাবে গণ্য হয়। এছাড়াও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার (১৯১৯-৩৩) বছরগুলিতে হাভানার হোটেল, ক্যাসিনো এবং পতিতালয়গুলির উপর ভিত্তি করে একটি জোরালো পর্যটন বাণিজ্য বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৫০-এর দশকের শেষ নাগাদ কিউবা লাতিন আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতির একটি হিসাবে গড়ে ওঠে; উল্লেখ্য: ১৯৫৮ সালে মাথাপিছু আয় ছিল $৩৫৩ (এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ)। তবুও অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং বেশিরভাগ পল্লী শ্রমিকেরা বছরে গড়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ আয় করে। যদিও সমৃদ্ধিশালী অর্থনীতি কয়েক কিউবানকে সমৃদ্ধ করে, তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠের দারিদ্র্য (বিশেষত গ্রামাঞ্চলে), জনসাধারণের সেবার ভয়াবহ অভাব এবং বেকারত্ব এবং অল্প বেকারত্বের অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য ছিল।

চিনি থেকে কিউবা অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রচুর টাকা আয় করে; Image Courtesy: usslave.blogspot.com

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ, প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলোর ৯০ শতাংশ এবং চিনি উৎপাদনের ৪০ শতাংশের মালিকানায় অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ১৯৫০ এর দশকের বেশিরভাগ সময় বাতিস্তা রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ রাখে।

দীর্ঘ এই সময়কাল পরে ১৮৯৮ সাল থেকে বিদ্যমান স্বাধীনতার নামে সাম্রাজ্যবাদ ও নৈরাজ্যবাদের পতন শেষে ১৯৫৯ সালে বাতিস্তা সরকার পতনের মাধ্যমে বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।

Feature Image Courtesy: latinamericanstudies.org

References:

1. mimirbook.com

2. britannica.com

3. history.com

4. britannica.com