বার্সেলোনার যত অদ্ভুতুড়ে সাইনিং

হালের মেসি, নেইমার কিংবা সুয়ারেজ সহ অনেক নামী দামী খেলোয়াড়েরাই গায়ে চাপিয়েছেন কাতালুনিয়ার নীল-মেরুন বিখ্যাত জার্সি। এ তালিকায় আরো রয়েছেন ম্যারাডোনা, রিভালদো, রোনালদিনহো থেকে শুরু করে অনেকেই। বড় বড় তারকাদের ন্যু ক্যাম্পে ভিড়ানোর দিক দিয়ে বেশ সফলই বলা চলে ক্লাবটিকে। তবে হুটহাট অদ্ভুতুড়ে সাইনিং এর জন্যও বেশ দুর্নাম কুড়িয়েছে ক্লাবটি। অযথা এবং আনকোরা খেলোয়াড়রাও অনেকে তাই খেলেছেন বার্সেলোনার জার্সি গায়ে। আজ আমরা দেখবো আধুনিক যুগে বার্সেলোনার অদ্ভুতুড়ে যত সাইনিং

১. কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং

বার্সেলোনার সর্বশেষ সাইনিংটিও রীতিমত ভড়কে দিয়েছে সবাইকে। সুয়ারেজের বিকল্প স্ট্রাইকার হিসেবে চলতি মৌসুমের শীতকালীন দলবদলে বার্সেলোনা দলে ভেড়ায় বুড়িয়ে যাওয়া কেভিন প্রিন্স বোয়েটাংকে। যদিও ধারেই এসেছেন বোয়েটাং তবুও চুক্তির জন্য বার্সেলোনাকে খরচ করতে হয়েছে ৮ মিলিয়ন ডলার। বেশিরভাগের মতেই টাকাটা স্রেফ জলেই ফেলেছে ক্লাবটি।

 কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং; Image Courtesy: Sportskeeda
কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং; Image Courtesy: Sportskeeda

৩১ বছর বয়সী বোয়েটাং বার্সেলোনার আগে যাযাবরের মতো খেলেছেন ১১ টি ক্লাবে। তার মধ্যে এসি মিলান, ডর্টমুন্ড ও স্পার্সদের হয়েও খেলেছেন এই ঘানাইয়ান। তবে ক্যারিয়ারের সোনালি সময় ফেলে এসেছেন বহু আগেই। বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার আগে সাসুইলোর হয়ে চলতি মৌসুমে বোয়েটাং এর নামের পাশে ছিলো মাত্র ১ গোল।

কোনোরকম পরিকল্পনা ছাড়াই যে বোয়েটাং কে দলে ভিড়িয়েছে ক্লাব তা এখন স্পষ্ট সবার কাছেই। তিনি এখন পর্যন্ত লিগে খেলেছেন মাত্র ৬০ মিনিট। কোপা দেল রে তে যা ৩ মিনিট বেশি। ধারে নিয়ে এসে বোয়েটাং কে দিয়ে বেঞ্চই গরম করাচ্ছেন ভালভার্দে।

২. পাউলিনহো

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বেশ সাড়া জাগালেও আস্তে আস্তে নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে শুরু করেন পাউলিনহো। যার পরিপ্রেক্ষিতে ফর্ম ফিরে পেতে চীনে পাড়ি জমান এই ব্রাজিলিয়ান। চাইনিজ লিগে ভালো খেললেও লিগের মান নিয়ে আঙ্গুল তুলেছেন কম বেশ সবাই। এমনকি ব্রাজিল জাতীয় দলে তিতের অধীনে বেশকিছু গোল করলেও দলে পাউলিনহোর অন্তর্ভুক্তিতে সন্তুষ্ট ছিলেননা অনেকেই। সেই পাউলিনহোকেই গত বছরে হুট করে দলে ভেড়ায় বার্সেলোনা। তখন সবাই বেশ ভ্রু কুঁচকালেও পাউলিনহো নিজেকে বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করেন। বার্সেলোনার হয়ে প্রথম মৌসুমে ৯ টি গোল ও ২ টি এসিস্ট করেন পাউলিনহো। জেতেন লিগ ও কোপা দেল রে শিরোপাও।

পাউলিনহো; Image Courtesy: Everything Barca
পাউলিনহো; Image Courtesy: Everything Barca

নিজেকে প্রমাণ করার পর সবাই হয়তো ভেবেছিলো স্থায়ীভাবেই ন্যু ক্যাম্পে তাবু গাড়বেন তিনি। কিন্তু আবারো সবাইকে চমকে দিয়ে পাউলিনহোকে তাঁর সাবেক ক্লাব গুয়াংজুতেই ফেরত পাঠায় বার্সা। ৪০ মিলিয়নে তাঁকে কিনে নিতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি গুয়াংজু এভারগ্রান্ডে।

৩. এলেক্স সং

জাভি, ইনিয়েস্তা, বুস্কেটস, থিয়াগো, ফ্যাব্রেগাস এই কয়টি নামই যথেষ্ট ২০১২ সালে বার্সেলোনার মধ্যমাঠের গভীরতা বুঝাতে। অথচ এতসব খেলোয়াড় থাকতেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে বার্সেলোনা দলে ভেড়ায় এলেক্স সংকে।

আর্সেনালের হয়ে ২০৬ ম্যাচ খেলে কোনো শিরোপা না জেতা সং কে ঠিক কোন কারণে সেই সময় বার্সেলোনা দলে ভিড়িয়েছিলো তা এখনো অজানা। ১ মিলিয়নে কেনা সং কে বার্সেলোনার কাছে আর্সেনাল বিক্রয় করে ১৫ মিলিয়ন ডলারে। মধ্যমাঠে এত সব খেলোয়াড় থাকায় স্বাভাবিক ভাবেই বেঞ্চেই বেশিরভাগ সময় কাটান তিনি। মাঝে সেন্টার ব্যাক হিসেবে খেললেও সেই ফাটকাটা কাজে লাগেনি। যদিও দুই সিজন সাইড বেঞ্চ গরম করেও জিতেছেন একটি লিগ ও একটি কোপা দেল রে শিরোপা। বার্সেলোনা থেকে পরবর্তীতে ধারে পাড়ি জমান ওয়েস্ট হামে।

এলেক্স সং; Image Courtesy: BBC
এলেক্স সং; Image Courtesy: BBC

৪. আরদা তুরান

এটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে তুরানের দারুন মৌসুম কাটানোর পর বার্সেলোনায় যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই ছিলো অদ্ভুত। লিগ শিরোপা, কোপা দেল রে, ইউরোপা লিগ ও সুপার লিগ জেতার পরও ক্লাবে থাকতে চাননি আরদা। তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিলো সেই সময় ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞা থাকায় বার্সেলোনায় যোগ দানের প্রথম ছয় মাস খেলতে পারবেন না জেনেও সেই পথই বেছে নেন এই তার্কিশ ফুটবলার।

আরদা তুরান; Image Courtesy: Diario AS
আরদা তুরান; Image Courtesy: Diario AS

নিয়মিত খেলোয়াড় থেকে অনিয়মিত হয়ে যাওয়ার শুরু সেখানেই। মুটিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফর্মও ছিলো পড়তির দিকে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বার্সেলোনা জার্সি গায়ে অভিষেক হয় তুরানের। কিন্তু বার্সা স্টাইলের সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম হননি তিনি। বার্সেলোনায় নিজের শেষ মৌসুমে লা লিগায় একটি ম্যাচের জন্যও মাঠে নামেননি তুরান।

৫. থমাস ভারমেলেন

সম্ভাবনাময় এই ডিফেন্ডারের সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিলো ইনজুরি। কিছুদিন পর পরই ইনজুরিতে ভুগা ভারমেলেন আর্সেনালে নিজের শেষ মৌসুমে মাঠে নামতে পেরেছিলেন মাত্র ১৪ বার। দলে জায়গা হারান পার মার্টেসেকার ও লঁরা কশিয়েনলির কাছে। আর তাই বার্সেলোনায় ১৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ন্যু ক্যাম্পে নিয়ে আসে ভারমেলেনকে

থমাস ভারমেলেন; Image Courtesy: bein Sports
থমাস ভারমেলেন; Image Courtesy: bein Sports

সম্ভবত বার্সেলোনা তাদের মেডিকেল টিমের উপর বেশিই আস্থা রেখেছিলো। কিন্তু ভারমেলেনের অবস্থার উন্নতি হয়নি একটুও। আগের মতোই মৌসুমের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন মাঠের বাইরে। পাঁচ বছর আগে আর্সেনালের হয়ে লিগে এক মৌসুমে ১৪ বার মাঠে নামার রেকর্ডটিও এখনো ভাঙ্গতে পারেননি তিনি। ইনজুরি প্রবণ হওয়া সত্ত্বেও বার্সেলোনার ভারমেলেনকে দলে নেওয়ার ব্যাপারটি আসলেই অদ্ভুতুড়ে ছিলো।

৬. কেরিসন

বার্সেলোনায় যোগ দিয়েই নিজের ইচ্ছার কথা বলেছিলেন কেরিসন। পেপ গার্দিওলা দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে হতে চান ন্যু ক্যাম্পে খেলা অন্যান্য ব্রাজিলিয়ান তারকাদের মতো।

২০০৯ সালের শুরুতে বার্সেলোনা কিছু তরুন প্রতিভা ভেড়ানোর ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে উঠে। কেরিসন নামের এক ব্রাজিলিয়ান তরুন সেই সময়ে করিটিবা ক্লাবের হয়ে করে বসেন ৩৩ গোল। সেখান থেকে এই তরুন যোগ দেন ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব পালমেইরাসে। করিটিবার হয়ে এক মৌসুম দুর্দান্ত খেলা দেখেই বার্সেলোনা ভেবে বসে পরবর্তী বিখ্যাত স্ট্রাইকার হতে যাচ্ছেন কেরিসন। তাই যেই ভাবা সেই কাজ। তড়িঘড়ি করে তাঁকে দলে ভেড়ায় ক্লাব কতৃপক্ষ। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কেরিসনকে প্রথম মৌসুমেই ধারে পাঠানো হয়। আর সেখানেই সব শেষ। ধারে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন কেরিসন। বার্সেলোনাতেও তাই আর ফেরা হয়ে উঠেনি এই ব্রাজিলিয়ানের। ২০১৪ সালে এক ম্যাচ না খেলা কেরিসন ক্লাব ত্যাগ করেন। খেলা শুরু করেন ব্রাজিলের নিম্ন বিভাগের একটি দলে। আর অন্যদিকে কেরিসনের পেছনে খরচ করা ১৪ মিলিয়ন ইউরোই জলে যায় বার্সেলোনার।

কেরিসন; Image Courtesy: Sambafoot
কেরিসন; Image Courtesy: Sambafoot

৭. ডগলাস

রাইট ব্যাক পজিশনে বার্সেলোনার ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন দানি আলভেজ। এই ব্রাজিলিয়ানের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে আরেক ব্রাজিলিয়ানকেই মনে ধরে বার্সেলোনার।

যদিও দানি আলভেজের মতো এতটা প্রতিভাবান ছিলেন না তারপরও ২০১৪ সালে সাও পাওলো থেকে ডগলাসকে দলে ভেড়ায় কাতালান ক্লাবটি। ৪ মিলিয়ন ইউরো খরচ হয় তাতে। ডগলাসের সাথে চুক্তি হয় পাঁচ বছরের। সেই হিসেবে এখনো বার্সেলোনার খেলোয়াড় হিসেবেই আছেন তিনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এখনো পর্যন্ত সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেক ঘটাতে পারেননি ডগলাস। মাঝে ধারে এ ক্লাব থেকে ও ক্লাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু মূল দলে জায়গা পাওয়ার মতো পারফরম্যান্সের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি কখনো। পরে বাধ্য দানি আলভেজের শূন্যস্থান পূরন করতে নেলসন সেমেদোকে কিনে নেয় বার্সেলোনা।

ডগলাস; Image Courtesy: Marca
ডগলাস; Image Courtesy: Marca

৮. হেনরিক

ডগলাসের মতো আরেক ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার হেনরিককেও ঠিক কি কারণে বার্সেলোনা কিনে নেয় তা জানা নেই কারো। অতটা আহামরি পারফরম্যান্স না করলেও ২০০৮ সালে ৮ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে পালমেইরাস থেকে হেনরিককে কিনে নেয় বার্সেলোনা। তখন সবেমাত্র পেপ গার্দিওলা যুগ শুরু। প্রথম মৌসুমেই হেনরিককে ধারে পাঠানো হয় বুন্দেস লিগার ক্লাব বায়ার লেভারকুসেনে। সেখান থেকে আরো দুই ক্লাব ঘুরলেও জায়গা হয়নি বার্সেলোনা মূল দলে। ২০১২ সালে একটি ম্যাচও না খেলে ক্লাব ছাড়েন এই সেন্টার ব্যাক।

হেনরিক
হেনরিক, Image Courtesy: Sportskeeda

সবচেয়ে বড় কথা বার্সেলোনায় খেলার মত যোগ্যতাও ছিলোনা হেনরিকের। তারপরও আরো অনেকের মতই তাঁকে দলে ভেড়ায় বার্সেলোনার অদ্ভুত ক্লাব ম্যানেজমেন্ট।

Feature Image Courtesy: amazon.com